বই : পলায়ন পর্ব লেখক : মাহবুব আজীজ ধরন : উপন্যাস প্রকাশনী : অবসর প্রকাশনা প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ পৃষ্ঠা : ৮৮ মূল্য : ২০০ _____________________ দৃশ্যের অন্তরালে কিছু পলায়নের উপলব্ধি!
মানুষ নামের প্রাণীদের বিচিত্র গুণাবলী আর অভ্যাসের বৈচিত্র্য থাকে। একের ভেতর থাকে একের অধিক সত্ত্বা। কেউ সেগুলোকে পুষে বেড়ায়; কেউ তাদের পোষ মানে। দায়িত্ব আর পরিপার্শ্বিক বাস্তবতায় কেউ সব সয়ে গিয়ে ভাগশেষ হয় তৃতীয় কোনো সমীকরণের। তবে সেও থাকে সুযোগ সন্ধানী। স্থির মানুষটাই হঠাৎ চঞ্চল হয়ে যায়, তার ভেতরে জেগে ওঠে পলায়নপর এক সত্ত্বা। প্রথম উপন্যাস মন্দ্রজালে মাহবুব আজীজ শ্রেণিচেতনাকে মুখ্য করে তৈরি করেছিলেন সামন্তীয় সমাজ, আকস্মিক ও নির্লিপ্ত বাস্তবতার একটি নিখাদ উপাখ্যান। তাঁরই দ্বিতীয় উপন্যাস— পলায়ন পর্ব; শুরুর কথাগুলো বইটির গল্প নিয়েই। অবশ্য শুধু যে শাদা শাদা পৃষ্ঠায় কালো কালো অক্ষরের বই; এমন নয়, বরং বলা যায় রংচঙা রূপ বদলের যে জীবন আমরা বয়ে বেড়াই, তারই খণ্ডাংশের এক লেখিত রূপ— এই বই; পলায়ন পর্ব।
'গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে গ্রাম... সমান্তরালে বহমান জীবন ও সময়ের মধ্যে 'পলায়ন পর্ব'র চরিত্ররা কেউ কেউ চরিত্রহীন। কারও বা আবার একের অধিক চরিত্র; শম্পা—এমনই এক গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে তখন ছোট। বাবা-মা'র সাথে ছোট্ট পরিবার। একটা সময় ঘুম থেকে জেগে দেখতো— বসন ঠিক নেই। আর, মনেও পড়েনা কিছু! আড়ি পাততে হবে, ভাবে শম্পা। দিন গড়িয়ে তার কণ্ঠে ফুঁসে ওঠে বাঁধ ভাঙার আওয়াজ। সে বড় হয়। আরও বড় হয়। আপনবিবরে থেকে ভাবে তাকে হতে হবে আরও আরও বড়। প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ যেন একগুঁয়ে জীবন। শম্পার বাঁধ ভাঙার আওয়াজ ভাঙতে হাজির হয় সমাজ-বিপ্লবের আদর্শবাদী, দুই ক্লাস জুনিয়র রঞ্জু। রঞ্জু ভালোবাসে মেঘের ছবি তুলতে। আর শম্পার উপরে অগোচরে চেপে বসে নতুন এক চরিত্র— পলায়নপর চরিত্র। রঞ্জুর মনে স্বতঃস্ফূর্ত সৌন্দর্য শম্পার যেই মেঘ গর্জে; তার কিছু বর্ষে খোদ শম্পার মনেই। সুনীলের ভাষান্তরে সেই গল্পই যেনো লিখেছেন শার্ল বোদলেয়র—
"-কাকে তুমি ভালোবাসো, হেঁয়ালি মানুষ, আমায় বলো! তোমার বাবা, মা বোন, ভাইকে? -আমার বাবা নেই, মা নেই, বোন নেই, ভাই নেই। -তোমার বন্ধুদের? -তুমি এমন একটা শব্দ ব্যবহার করেছো, যার অর্থ আমি আজ পর্যন্ত বুঝিনি। -তোমার দেশ? কোন দ্রাঘিমায় তার অবস্থান আমি জনি না। -সৌন্দর্যকে? -আমি আনন্দের সঙ্গেই তাকে ভালোবাসতাম, যদি হতো সে কোন দেবী এবং অমর। -সোনা? -আমি তা ঘৃণা করি, যেমন তুমি ঈশ্বরকে। -তবে কী তুমি ভালোবাসো, অসাধারণ আগন্তুক? -আমি ভালোবাসি মেঘ, যেসব মেঘেরা ভেসে যায়, ওই ওখানে ... ওই সেখানে ... বিস্ময় মেঘেরা!"
নিজেরা বুঝতে পারে তারা পরষ্পরের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠছে। লেকের পাড়ে অন্ধকারে বসে আছে দু'জন। রঞ্জু দেখতে পায়; আবছা-অস্পষ্ট; চার-পাঁচ আঙুল দূরে বসা এটি কোন মানবীয় মুখ নয়; চাঁদের টুকরো কেটে কাটানো দেবির মুখ; রঞ্জুর মনে হতে থাকে, ওই মুখ ছুঁতে না পারলে সে বাঁচবে না। দুই হাতে আজলা বানিয়ে সে আগায়...।
সময় বয়ে চলে পল পল করে। রঞ্জু ভাবে; এটাকে কী বলে? তার সারা শরীর এক অচেনা ঢোলের বাড়িতে কাঁপতে থাকে। ঝনঝন। ঝনঝন। ঝনঝন।
...না, শেষ নয়। পলায়ন পর্বের গল্পে এতোটুক ছিলো প্রবেশদ্বার! কিশোরগঞ্জের বদিহাটিতে পৈতৃক বাড়ি "দলিল মঞ্জিলের" পথে হাঁটতে থাকে রঞ্জু। সাথে কুদ্দুস মিয়া। হতদরিদ্র রাস্তায় প্রকাণ্ড এক প্র্যাডো গাড়ি তীব্র আলো জ্বেলে ছুটে যায়। কুদ্দুস মিয়া বলে- এমপি সাবের গাড়ি। রাইত-বিরাইতে হুশহাশ কইরা চলে। ব্যাডা একখান। কুটি টেকা দিয়া গাড়ি কিনছে। ভাইজান, কুটি টেকা মানেটা কী—? -প্রশ্নের উত্তরে কিছুই বলে না রঞ্জু। সে তো বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। তার এখন রাজপথে থাকার কথা, সে মেঠোপথে হাঁটছে কেন? তার ভেতর থেকে কেউ পালিয়েছে? নাকি সেই পালিয়ে এসেছে এই নিরুপদ্রব গ্রামে?
গ্রাম আর নিরুপদ্রব থাকে না। এখানেও সমান্তরালে ঘটে আরেক আখ্যান। মাস্টার রফিকুল হকের মেয়ে মালাকে ওঠিয়ে নেয়া হয় বিয়ের আগের রাতে। ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়ে রঞ্জুও। প্রসঙ্গত সামনে আসে কাজিমউদ্দিন কাজি। তিনবার আই এ ফেল শফিকুল, চাকরিজীবী আইনুল, বিশেষ ঘটনার মূল হোতা তরিক, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা জব্বার হোসেন, প্রামাণিক সহ অনেকেই। হাসপাতালে মালাকে দেখতে গিয়েও দেখা হয়না রঞ্জুর। হাঁটতে থাকে গন্তব্যহীন। সে ভাবে— তার কখনোই কোনো গন্তব্য ছিল না। কিন্তু বাউণ্ডুলে স্বভাব পছন্দ করে না মিতু। সে চায় রঞ্জু ঠিকসময়ে খাবে। পড়বে। ঘুমাবে। কিন্তু কে এই মিতু?
ক্রন্দনরত শম্পা রঞ্জুর সামনে নতুন বিস্ময়। সে বুঝতে পারে না এই মেয়েকে। তাকে বোঝতে না দিয়ে শম্পা বলে; তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখো, প্লিজ!
রঞ্জুর বাবা কুতুবউদ্দিন মৃধা ওরফে কুতুব চৌধুরী। মুনাফার জোরে যিনি নিজের সামন্ত অবস্থানকে আরও জোরদার করে রাজনীতিক হিশেবে আবির্ভূত হতে চান। রঞ্জু তাকে একজন পাতি বুর্জোয়া হিশেবে চিহ্নিত করে। আবার নিজের নীতিবাক্যের বিপরীতে গিয়ে বাবার পক্ষেই করে নির্বাচনী প্রচারণা। একটা ঘটনার স্মৃতি তার মন থেকে সরে না। সমাজবাদী রঞ্জু সমাজ থেকে পালানোর আগে তবে কী মনে করে তার বাবাকে জানাতে চায়?
নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে ব্যস্ত শম্পা রঞ্জুকে তেমন সময় দিতে পারে না। কিন্তু তার পিএস ঝর্ণা রঞ্জুকে জানায়; ম্যাডাম ফটোগ্রাফির উপর আমেরিকা থেকে চার বছরের স্কলারশিপ পেয়েছেন! বাস্তবমুখী শম্পা কি করে এলো এই শখের জীবনে? সারাদিন মোবাইল-ল্যাপটপে ব্যস্ত রঞ্জু গ্রামে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে কী করতে চায়? তার বাবা কি আবারও নির্বাচনে নামবেন?
কয়েকবার ইলেক্ট্রিসিটি যাওয়া আসা করেছে। বদিহাটিতে এটা এক নিয়মিত ঘটনা। রঞ্জু দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়ায়। ভাবনায় হারায়। কী যেন পলায়ন করেছে, কী সেটা! রাতের ঘুম?! সম্ভবত পাখিগুলো...
জীবনের এইসব নানামাত্রিক রূপ বদলের পর্ব, এক থেকে দুইয়ে পলায়নের পরম্পরা, আর! আর আমাদের চারপাশের বিচিত্র শ্রেণি ও পেশার মানুষেরা অগোচরে লিখিত যেই গল্পে মঞ্চস্থ করছি ছোট-বড় নাটিকা; সেসবেরই এক স্ফটিক-স্বচ্ছ গল্প গোচরে এনেছেন সময়ের অন্যতম কথাসাহিত্যিক মাহবুব আজীজ। নিজের বিস্তৃত পথচলার লব্ধ অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে, চলমান সময় ও জীবনবোধকে প্রাধান্য দিয়েই এই কথাশিল্পীর ভাবজগত। ছোট গল্পের নাকি শুরু শেষ নেই। উপন্যাসের মোটামুটি একটা দীর্ঘ কলেবর থাকে। ফলে শেষটা মসৃণ হলে পাঠকের জন্য; আমি মনে করি ভালো। কথাটা বলার কারণ মাহবুব আজীজের লেখার শেষে বেশ দীর্ঘ একটা সময় পাঠককে ভাবতে হয়। পলায়নের পর্বগুলো মিলাতে হয়। এটা অনেকের এমন লেখা থেকে পরবর্তিতে বিমুখ হওয়ার কারণও হতে পারে। তাই গল্পের মতো হুট করে শেষ করে পাঠকের উপর ভাবনার বিশাল দায় না রেখে, উপন্যাসে আরও কিছুটা এগিয়ে নেয়া যায়। রঞ্জু, শম্পা, মিতু, মালা, কুতুবউদ্দিন মৃধা, কাজিমউদ্দিন, রফিকুল স্যার... এইযে পরিপার্শ্বিক বাস্তবতায় এই মানুষগুলো জীবনের এক পর্যায়-পরিস্থিতি থেকে পালটে যাচ্ছে অন্য পর্বে—চেনা থেকে অচেনায়। আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে নতুন বাস্তবতায়—তা কেন? কীভাবে? এক মলাটে সেই গল্পের নামই- "পলায়ন পর্ব"। ঘোরাচ্ছন্ন হয়ে পাঠ উপভোগ করার মতো একটি বই। লেখকের জন্য শুভকামনা। আগামীর সময়টা তাঁর কাছে ফিরবে।