বিস্ফোরক ! ছোট এ উপন্যাসের পুরো কাহিনি বেশ জমজমাট। আর শেষটুকু পড়ে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেলাম। এ কোথায় এসে থামলেন লেখক! প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বেশিরভাগ পাঠক "লঘু গুরু"র গল্প মেনে নিতে পারেননি এর দুঃসাহসিক বিষয়বস্তু ও ভণিতাহীন সংলাপের জন্য। এখনো বেশিরভাগ পাঠক এ উপন্যাস মেনে নিতে পারবে না। অথচ আমার মনে হোলো, এর চাইতে ভয়াবহ কিন্তু সহজ, স্বাভাবিক পরিণতি আর হয় না।
‘লঘু-গুরু’ উপন্যাসে স্ত্রী মৃত্যুর পর বিশ্বম্ভর হঠাৎ দেখা হওয়া এক পতিতা উত্তমকে স্ত্রীর পরিচয়ে বাড়ি নিয়ে আসে। উত্তম নিজের পুরনো পরিচয় ভুলে মাতৃস্নেহে বিশ্বম্ভরের শিশুকন্যা টুকিকে বড় করে তোলে। এতদিন মা আর নেশাগ্রস্ত বাবার যত্ন থেকে একেবারে বঞ্চিত ছিল টুকি। কিন্তু এদিকে আশেপাশের প্রতিবেশী আর বিশ্বম্ভরের বন্ধুদের কথা আর আচার ব্যবহার প্রতি মুহূর্তে বিশ্বম্ভর, টুকি কে উত্তমের আগের পরিচয়কে বারবার মনে করে দেয়। এদিকে নানা ঝুট ঝামেলার মধ্যে যখন টুকির বিয়ে হয়, নতুন পরিবেশে টুকি বুঝতে পারে সে এখন আগের চেয়ে বড় বিপদে আছে। জগদীশচন্দ্র গুপ্ত এত সহজ স্বাভাবিক ভাবে লিখেছেন, রাখ-ঢাক রেখে বাংলা সাহিত্য লেখার যে প্রচলন ছিল, তার চেয়ে পুরোই আলাদা।
আজ থেকে ৯০ বছর আগে যখন এই বই প্রকাশিত হয়, বাংলা সাহিত্যে তখন মোটামুটি ঝড় তুলে যায়। রবীন্দ্রনাথ এই বইয়ের একটা দীর্ঘ সমালোচনা লেখেন। রবীন্দ্রনাথের জন্য এটা ব্যতিক্রম। কারন তিনি সাধারণত কারও সমালোচনা করতেন না। উপন্যাসটি স্বাভাবিক জীবন বাস্তবতার সাথে যায় না, বলেই তিনি অভিযোগ করেন।
‘এই উপন্যাসে যে লোকযাত্রার বর্ণনা আছে আমি একেবারেই তার কিছু জানিনে। সেটা যদি আমারই ত্রুটি হয় তবু আমি নাচার।... দূর থেকেও আমার চোখে পড়ে না। লেখক নিজেও হয়তো বা অনতিপরিচিতের সন্ধানে রাস্তা ছেড়ে কাঁটাবন পেরিয়ে ও জায়গায় উঁকি মেরে এসেচেন। ...বেশ্যাবৃত্তিতে যে মেয়ে অভ্যস্ত সেও একদা যে কোনো ঘরে ঢুকেই সদ্গৃহিনীর জায়গা নিতে পারে এই কথাটাকে স্বীকার করিয়ে নেবার ভার লেখক নিয়েচেন।... কারণ আধুনিক রিয়ালিজমের সেন্টিমেন্টালিটিতে এই কথাটির বাজার দাম বাঁধা হয়ে গেছে।’ রিয়ালিজ়ম নিয়ে তিনি আরও বললেন, ‘...পতিতা নারীর মধ্যেও সতীত্বের উপাদান অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে এই তত্ত্বটাকে একটা চমক লাগানো অলঙ্কারের মতোই ব্যবহার করা হয়েচে। সাধুতাকে ভাবরসের বর্ণবাহুল্যে অতিমাত্র রাঙিয়ে তোলায় যত বড়ো অবাস্তবতা, লোকে যেটাকে অসাধু বলে তাকে সেন্টিমেন্টের রসপ্রলেপে অত্যন্ত নিষ্কলঙ্ক উজ্জ্বল করে তুললে অবাস্তবতা তার চেয়ে বেশি বই কম হয় না। অথচ শেষোক্তটাকে রিয়ালিজম নাম দিয়ে একালের সৌখীন আধুনিকতাকে খুশি করা অত্যন্ত সহজ। যেটা সহজ সেই তো আর্টের বিপদ ঘটায়।'
বলা হয়ে থাকে তখনকার দিনে কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের দ্বারা যে নতুন ধরনের লেখার প্রচলন শুরু হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ এই বইয়ের সমালোচনা করে তাদেরকেই উদ্দেশ্য করেছেন।
জগদীশচন্দ্র সমালোচনার কোন জবাব না দিলেও পরে এক চিঠিতে লেখেন, “আমার লঘু-গুরু বইখান সম্বন্ধে ‘জজিয়তী’ করিতে বসিয়া জজগণ যে রায় দিয়েছেন তাহার মধ্যে ‘পরিচয়’-এ প্রকাশিত রায়টিই প্রধান, কারণ, তাহার ঘোষক স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ; এবং এর দ্বিতীয় কারণ, বিচার্য্য বিষয় ছাড়িয়া তাহা বিপথগামী হইয়াছে, ... লোকালয়ের যে চৌহদ্দির মধ্যে এতকাল আমাকে কাটাইতে হইয়াছে সেখানে ‘স্বভাবসিদ্ধ ইতর’ এবং ‘কোমর বাঁধা শয়তান’ নিশ্চয়ই আছে, এবং বোলপুরের টাউন-প্ল্যানিং এর দোষে যাতায়াতের সময় উঁকি মারিতে হয় নাই, ‘ও জায়গা’ আপনি চোখে পড়িয়াছে। কিন্তু তথাপি আমার আপত্তি এই যে, পুস্তকের পরিচয় দিতে বসিয়া লেখকের জীবনকথা না তুললেই ভাল হইত, কারণ উহা সমালোচকের ‘অবশ্য দায়িত্বের বাইরে’ এবং তাহার ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ ছিল না।”
আস্তে আস্তেই ঘটনা এগোচ্ছিল, শেষে এসে হঠাৎ মোড় নিয়ে হঠাৎ শেষ হয়ে যায়, তাই মনে হয় আরেকটু হলে ভাল হত না? উত্তমের হঠাৎ গৃহস্থে মনোনিবেশ আবার উত্তমের পালিত সতীন কন্যা টুকির মনে হঠাৎ বাস্তব চিন্তার উদ্রেক এরকম ভাবিয়েই তোলে। লঘু চরিত্রে রয়েছে টুকির বাপ বিশ্বম্ভর,টুকির বয়সী স্বামী, সুন্দরী আর গুরু চরিত্রে রয়েছে উত্তম,টুকি। উপন্যাস আকারে লঘু অথচ যে মেসেজ দেয় তা গুরু।