খোঁড়া ভৈরবীর মাঠ ---- পাঠ প্রতিক্রিয়া
লেখক অভীক সরকার
প্রকাশক পত্রভারতী
মূল্য ১৫০
বি দ্র: প্রতিক্রিয়াটি আদ্যোপান্ত মোবাইলে লেখা, বানান ভুলের ত্রুটি মার্জনা করবেন।
এই যে মশাই, হ্যাঁ হ্যাঁ আপনাকেই বলছি, লেখক বাবু তো, কি পান বলেন দেখি পাঠক কে ভয় পাইয়ে। আপনার জন্য তো দেখি রাত বিরেতে একা একা ইয়ে করতে যেতেও ভয় লাগছে। কাল রাত্রে হাতে পেয়েছিলাম বইটি, মধ্যরাতের পর কালিয়া মাসানের ভয় এরকম জাঁকিয়ে বসলো যে বেডরুম লাগোয়া বাথরুমে যেতেও ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে ফেললাম। কি লিখেছেন দাদা, সত্যি। তথাকথিত ভূতের গল্প এখন এই একত্রিশের কোঠায় এসে যখন হাস্যাস্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই সময় আপনার গল্প পড়ে ভয় তো দেখছি সেই ছোটবেলার হ্যারিকেনের আলোয় একা একা বারান্দায় পড়তে বসার সময়ের ভয় মনে করিয়ে দিল। সেলাম দাদা, সেলাম আপনাকে আর আপনার কলমকে।
লেখকের প্রথম বই এবং ইনকুইজিশন পড়েছিলাম মাস খানেক আগে। একটি গল্প বাদ দিয়ে ভীষণ ভালো লেগেছিল বাকি তিনটি গল্প। তারপর বইচই পূজাবার্ষিকীতে পড়লাম পেতবুথথু। উফ:, ছাপিয়ে গেছিলেন আগের সব সৃষ্টিকে, বিজ্ঞানের সাথে তন্ত্রের মিল যে কি বস্তু বুঝিয়ে ছেড়েছিলেন লেখক মহাশয় তাঁর সব গুণমুগ্ধ পাঠক কে। তারপর এই খোঁড়া ভৈরবীর মাঠ। বইটা প্রকাশের পর কিনতে একটু দেরি হল, কিন্তু বিশ্বাস করুন কেনার পর আর ফেলে রাখিনি। কাল রাত্রের ঘণ্টা ছয়েক ঘুমের সময় বাদ দিয়ে মোটামুটি দম বন্ধ করেই গিলেছি বইটি।
পছন্দের লেখকের বই পরেও ভ���লো লাগা খারাপ লাগার খতিয়ান কষতে বসা ঠিক পোষায় না, তবু ওই বয়েসের সাথে বদভ্যাসের মতো বিজ্ঞ যে ভাবটা মস্তিষ্কে এঁটেলুর মতো এঁটে বসেছে সেটার দৌলতে কিছু লিখেই ফেলছি।
প্রথমেই আসি ভালো লাগার কথা বলতে।
১) যে দুটি গল্প আছে বইতে, অর্থাৎ কালিয়া মাসান আর খোঁড়া ভৈরবীর মাঠ দুটোই মেদহীন লেগেছে আমার কাছে। পাঠক চিত্তে পটভূমি অঙ্কন করতে ঠিক যেটুকু বর্ণনা প্রয়োজন সেটুকুই লেখা হয়েছে। পুরো গল্প পড়ে শেষ হবার একবার ও মনে হয়নি যে অমুক জায়গা পড়েছিলাম যার সাথে গল্পের কোনও লিঙ্ক নাস্তি।
২) কালিয়া মাসান গল্পে প্রথম থেকে দুলকি চালে গল্পের গতি এগিয়ে ধীরে গতি-লাভ করে প্রচণ্ড উত্তেজনা বাড়িয়ে একদম সঠিক সময়ে থেমে গেছে আবার পরের গল্পটি প্রথম থেকেই পাঠক কে একেবারে নিঃশ্বাস বন্ধ করিয়ে আটকে ধরে রেখেছে বইয়ের পাতায়। দুটি গল্পের গতির এই ভিন্ন ত্বরণ কিন্তু বেশ একটি লক্ষণীয় বিষয়। লেখক মহাশয় যে নিজের সৃষ্টি নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন তারই দ্যোতনা বোধহয় লুকিয়ে রয়েছে এর মধ্যে। নতজানু হই স্যার আপনার সম্বন্ধে, দুরকম গতিতেই স্বাচ্ছন্দ্যে খেলেছেন আপনি আর খেলেছেন নিঃসন্দেহে বেশ দৃষ্টি নন্দন ভাবেই।
৩) সোম রসের স্বাদ আস্বাদনে আমেজ আসে, আর ভয়াল রসের? এ আরও ভয়ঙ্কর নেশা মশাই। পড়তে যত ভয় লাগবে ততো মনে হবে আরেকটু পরে দেখি, আরেকটু, শেষটা কি হচ্ছে। শেষ করে তবে শান্তি পাবে মন। এই ব্যাপারটুকু কিন্তু অভীক বাবুর সব গল্পে কমন। ভয় যতই লাগুক নেশা টা ধরে ভয়ের থেকে বেশি, তাই শেষ করতেই হয়, না পড়ে ফেলে রাখার জো নেই একটুও।
৪) গল্পে ভয়াল রস যতই সম্পৃক্ত পর্যায়ে থাকুক না কেন শেষ মেশ একটু ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়ে টুইস্ট। উফফ, কালিয়া মাপান গল্পের মজাটা অনেকগুণ যেন বেড়ে গেছে স্নেহের পরশ বুলানো উপসংহারটিতে। পুরো গল্পে যেমন ভয়ে ভেস্তে গেছিলুম শেষটুকুতে মন ভালো করা উপসংহার টি যেন বলিয়েই ছাড়ছে 'সেলাম তোমাকে সেলাম।'
এবার একটু একটা ছোট ব্যাপারে খারাপ লাগাটা শেয়ার করি। যেটা বলতে চলেছি সেটা আমার পর্যাপ্ত বোঝার খামতিও হতে পারে তবু কথা পেটে রাখলে গ্যাস হবার ভয়ে বলেই ফেলি। শেষ অর্থাৎ ২ নম্বর গল্প বইয়ের, অর্থাৎ খোঁড়া ভৈরবীর মাঠ গল্পের শেষে যিনি ভৈরবীর রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন তাঁর পরিচয় গল্পের প্রথম দিকে পেয়েছি স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে, গল্প যত এগিয়েছে তার ব্যাবহারে ও আদব কায়দায় পাঠকের মনে একটি পিশাচিনির ছবি ভেসে এসেছে, কিন্তু গল্পের একদম শেষে প্রচণ্ড টুইস্ট এসে তার ভৈরবী রূপ দেখিয়ে ফেলেছে। এই ট্রান্সিসন টা পাঠক হিসেবে আমার একটু বেহিসাবি রকম মনে হয়েছে। হয়তো এই শেষ মুহূর্তের টুইস্টের আগে যদি চরিত্রটিকে আরেকটু বেশি করে পাঠক মনে অঙ্কিত করা হতো তবে মনে হয় বেশি ভালো লাগতো গল্পটা। এরকম টান টান একটা গল্পের শেষটা যেন প্রচণ্ড মোচড় দিয়ে দুম করে থেমে গেল। যাই হোক এটা তো নেহাৎ আমার ব্যক্তিগত মত। গল্পের মান যে একটুও কমতি নয় সেটা বলাই বাহুল্য।
সবশেষে প্রণাম জানাই লেখক মহাশয় কে, আরও মাতিয়ে রাখুন পাঠক কূলকে আপনার কলমের সৃষ্টি দিয়ে। ভালো থাকবেন স্যার।
ইতি
সহস্রাংশু