"সন্মাত্রানন্দের লেখা 'ভামতী অশ্রুমতী' একটি গল্পগ্রন্থ। ঐতিহাসিক পটভূমিকায় বিরচিত দুটি বৃহদায়তন গল্প--'ভামতী' ও 'অশ্রুমতী'--- এ দুয়ের সমবায়ে গঠিত এই গল্পগ্রন্থটি।পটভূমিকাটুকু ঐতিহাসিক হলেও,এই দুই গল্পে লেখক মানবসম্পর্কের চিরন্তন আয়াৎ ধরতে চেয়েছেন।"
ঐতিহাসিক বড়োগল্প বা উপন্যাস শুধু যে লেখাই কঠিন, তা নয়। সে জিনিস পড়াও মাঝেমধ্যে কঠিন হয়ে পড়ে। কখনও অপটু লেখকের পরীক্ষানিরীক্ষা চলে ভাষা নিয়ে, আর তার ফলে কাহিনি অবধি পৌঁছনোই যায় না। কখনও বিষয় বা সময়টির জটিলতা দুর্লঙ্ঘ্য বাধা হয়ে ওঠে পাঠকের সামনে। আবার কখনও, যা এই ধাবমান কালের জন্যই বিশেষভাবে প্রযোজ্য, বিষয়টি ও লেখনী যে নিষ্ঠা দাবি করে তা ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশনের মধ্যে জোগাড় হয়ে ওঠে না। সৌভাগ্যক্রমে এই বইটিতে তাদের কোনোটিই পাঠে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। সন্মাত্রানন্দের ভাষায় সেই আশ্চর্য গভীরতা ও শীতলতা আছে যা স্রোতস্বিনী নদীর সঙ্গে তুলনীয়। তাই তৎসম শব্দের বাহুল্য থাকলেও কাহিনির রসাস্বাদনে তা ব্যাঘাত ঘটায় না। বিষয়টির জটিলতা বলেও কিছু নেই। ইতিহাসের দু'টি বিশেষ মুহূর্তে কয়েকটি নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্পর্কের রহস্যকে মন্থন করাই এই বইয়ের কাহিনিদ্বয়ের উপজীব্য। শেষে এও স্বীকার্য, মাত্র ৯৬ পাতার এই বইটা পড়ার মতো সময় ও মনোযোগ সংগ্রহে সমস্যা হয়নি আমার। কী নিয়ে লেখা হয়েছে এই বইয়ের দুটি বড়োগল্প?
খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে পণ্ডিত বাচস্পতি মিশ্র ও তাঁর স্ত্রী ভামতীর জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে প্রথম উপাখ্যান। দ্বিতীয় কাহিনির পটভূমি ও বিষয় দুই-ই বাংলা সাহিত্যে অভিনব। গৌতম বুদ্ধের প্রয়াণের প্রায় আট শতক পরে গান্ধার ও কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে সমতলে নেমে আসা এক নদীর জীবনালেখ্য এটি। এই আখ্যান কিন্তু ভূগোল হয়নি, বরং এক নারীর ব্যক্তিগত ইতিহাস রূপে বিধৃত হয়েছে এই কাহিনি। তারই সঙ্গে মিশে গেছে সেই সময়ে চলা নানা দর্শন ও চিন্তনের মধ্যে টানাপোড়েন। লেখক এই গল্পে নিজের মতো করে রুক্ষ ঈশ্বরোপাসনা আর লুব্ধ ভোগের পন্থা পরিহার করতে বলেছেন। বরং প্রেম ও করুণাকেই তিনি পরম পাওয়ার পথ হিসেবে দেখিয়েছেন।
তবে এই কাহিনিদ্বয় আপনার কাছে কীভাবে আসবে, সে শুধু আপনিই বলতে পারবেন। আমার কাছে এরা রৌদ্রতপ্ত দিনে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে এল।
অত্যন্ত সুন্দর দুটি ছোট ছোট ঐতিহাসিক কাহিনীর সংকলন এটি। ভামতী আর অশ্রুমতি নামের দুই সময়ের দুই নারীর গল্প- দুজনেই প্রেম পিয়াসী। কিন্তু ভামতীর স্বপ্ন ঝরে যায় স্বামীর জ্ঞানপিপাসার কাছে, আর অশ্রুমতী নানা ঘাত-প্রতিঘাতে হয়ে ওঠে এক আত্মউৎসর্গের প্রতিক। তবে আমার কাছে অশ্রুমতীর কাহিনী বেশি মনোগ্রাহী লেগেছে। লেখনিও চমৎকার।পড়ার পরেও যেন রেশ থেকে যায়। ছোট পরিসরে ভাবনা জাগানোর মত এক বই।
অগ্রজ সমালোচক ও চিন্তাবিদ ঋজু গঙ্গোপাধ্যায় দা যেটুকু লিখেছেন, তার এই অংশটি: "তবে এই কাহিনিদ্বয় আপনার কাছে কীভাবে আসবে, সে শুধু আপনিই বলতে পারবেন। আমার কাছে এরা রৌদ্রতপ্ত দিনে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে এল।" কপিপেস্ট করে দিলেই চলে যেত।
কিন্তু আমি আমার মতো করে দু'কলম লেখার ধৃষ্টতা করছি।
সন্মাত্রানন্দের ভামতী অশ্রুমতী গ্রন্থটি দুটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত বৃহৎ গল্পের সমন্বয়ে গঠিত। প্রথম গল্প 'ভামতী' নবম শতাব্দীর পণ্ডিত বাচস্পতি মিশ্র ও তার স্ত্রী ভামতীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে, যেখানে জ্ঞানপিপাসা ও দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন তুলে ধরা হয়েছে।
দ্বিতীয় গল্প 'অশ্রুমতী' গৌতম বুদ্ধের প্রয়াণের প্রায় আট শতক পরের সময়ের পটভূমিতে রচিত, যেখানে গান্ধার ও কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক নদীর জীবনালেখ্য এক নারীর ব্যক্তিগত ইতিহাসের সঙ্গে মিশে গেছে। এই গল্পে বিভিন্ন দর্শন ও চিন্তাধারার সংঘাত এবং প্রেম ও করুণার মাধ্যমে পরম পাওয়ার পথ অনুসন্ধান করা হয়েছে।
উভয় গল্পেই লেখক মানবসম্পর্কের চিরন্তন আয়াম তুলে ধরেছেন। 'ভামতী' গল্পে স্বামীর জ্ঞানপিপাসা ও স্ত্রীর অবহেলার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন ফুটে উঠেছে। 'অশ্রুমতী' গল্পে প্রেম, করুণা এবং আত্মউৎসর্গের মাধ্যমে জীবনের গভীর অর্থ অনুসন্ধান করা হয়েছে।
'অশ্রুমতী' গল্পে বিভিন্ন দর্শন ও চিন্তাধারার মধ্যে টানাপোড়েন এবং প্রেম ও করুণার মাধ্যমে পরম পাওয়ার পথ অনুসন্ধান করা হয়েছে। লেখক রুক্ষ ঈশ্বরোপাসনা ও লুব্ধ ভোগের পথ পরিহার করে প্রেম ও করুণাকে জীবনের মূল মন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
দুটি গল্পই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নারীর ভূমিকা ও তাদের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে রচিত। 'ভামতী' গল্পে স্ত্রীর ত্যাগ ও সহনশীলতা, এবং 'অশ্রুমতী' গল্পে নারীর আত্মউৎসর্গ ও জীবনের গভীর অর্থ অনুসন্ধান তুলে ধরা হয়েছে।
লেখকের ভাষা প্রাঞ্জল ও গভীর, যা পাঠকদেরকে গল্পের আবহে মগ্ন করে। তৎসম শব্দের ব্যবহারে কাহিনির রসাস্বাদনে কোনো ব্যাঘাত ঘটে না; বরং এটি গল্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সমৃদ্ধ করে। লেখার শৈলী সহজবোধ্য হলেও গভীর অর্থবহ, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে।
পরিশেষে বলতে হয় যে 'ভামতী অশ্রুমতী' একটি অনন্যসাধারণ গল্পগ্রন্থ, যা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মানবসম্পর্ক, দর্শন ও নারীর ভূমিকা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা উপস্থাপন করে। লেখকের প্রাঞ্জল ভাষা ও শৈলী পাঠকদের মুগ্ধ করে এবং গল্পের শেষে একটি স্থায়ী ছাপ ফেলে। যারা গভীর ও অর্থবহ সাহিত্যকর্ম পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।