রহস্যভেদের চাবি রয়েছে ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে। আর তাই যতক্ষণ না তিনি সেই চাবি ঘোরান, রহস্যের তালা ততক্ষণ খোলে না। মহেশমুন্ডার কৃষ্ণমূর্তির সোনার মুকুট কীভাবে লোপাট হয়, কলকাতায় একটি চলন্ত গাড়ির টায়ার ফাটিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট ঘটানো হয় কেন, অন্ধকারে কে হাতিয়ে নেয় এক জাঁদরেল মহিলার গয়না, দেরাদুনে কে মারতে চায় এক ধনী মহিলাকে, বালিগঞ্জের লেকে কোন স্বার্থে কে গুলি চালায়, আর 'চন্দ্রগুপ্ত' নাটকের এক অভিনেত্রীকে কেন খুন হতে হয় - বড় কঠিন সব প্রশ্ন, যার উত্তর একমাত্র ভাদুড়িমশাই জানেন। তারই ছ'-টি তাক-লাগানো কীর্তি কাহিনি রয়েছে 'ভাদুড়ি-সমগ্র'র এই দ্বিতীয় খণ্ডের ছ'টি উপন্যাসে। প্রতিটি উপন্যাসই চমকে ঠাসা, অবসর কাটানের সেরা সঙ্গী।
সূচি: রাত তখন তিনটে মিসেস তালুকদারের আংটি লকারের চাবি বরফ যখন গলে আড়ালে আছে কালীচরণ একটি হত্যার অন্তরালে
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জন্ম ফরিদপুর জেলার চান্দ্রা গ্রামে, ১৯ অক্টোবর ১৯২৪।পিতা জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের বিখ্যাত অধ্যাপক।শিক্ষা: বঙ্গবাসী ও মিত্র স্কুল; বঙ্গবাসী ও সেন্ট পল’স কলেজ।সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দৈনিক ‘প্রত্যহ’ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে আনন্দবাজার প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। একসময় ছিলেন ‘আনন্দমেলা’র সম্পাদক এবং পরবর্তীকালে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র সম্পাদকীয় উপদেষ্টা।কবিতা লিখছেন শৈশব থেকে। কবিতাগ্রন্থ ছাড়া আছে কবিতা-বিষয়ক আলোচনা-গ্রন্থ। আর আছে উপন্যাস ও ভ্রমণকাহিনি।শব্দ-ভাষা-বানান-শৈলী নিয়ে রচিত বিখ্যাত বই ‘বাংলা: কী লিখবেন, কেন লিখবেন’।পুরস্কার: ১৯৫৮ উল্টোরথ, ১৯৭৩ তারাশঙ্কর, ১৯৭৪ সাহিত্য অকাদেমি, ১৯৭৬ আনন্দ। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি (২০০৪-২০১১)। সাহিত্য অকাদেমির ফেলো ২০১৬। এশিয়াটিক সোসাইটির ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণপদক ২০১৫। কলকাতা (২০০৭), বর্ধমান (২০০৮), কল্যাণী (২০১০) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডি লিট।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বিদ্যাসাগর লেকচারার হিসাবে ১৯৭৫ সালে প্রদত্ত বক্তৃতামালা ‘কবিতার কী ও কেন’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। ১৯৯০ সালে লিয়েজে বিশ্বকবি-সম্মেলনে একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি।শখ: ব্রিজ ও ভ্রমণ।
কবি'র সাথে গোয়েন্দাগল্পের ব্যাপারটা ঠিক যায় না, অন্তত আমার সেরকমই ধারণা ছিল। কাজেই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাদুড়ি সিরিজটা তেমন কোন প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করিনি। কিন্তু নীরেন্দ্রবাবুর সাথে গোয়েন্দাকাহিনীটা বেশ ভালভাবেই গেছে। বরং কবি বলে, এবং তার গল্পের গোয়েন্দা চারুচন্দ্র ভাদুড়ি এবং তার সহকারি ও বন্ধুস্থানীয় কিরণ চ্যাটার্জী আর সদানন্দ বোসের কথাবার্তা চালচলনে বেশ একটা মজলিশি ভাব আছে বলে (মানে কথায় কথায় মূল কাহিনী থেকে সরে গিয়ে তারা একটা আড্ডা জমিয়ে ফেলেন, আবারো প্রসঙ্গে ফিরতে বেশ দেরি হয়, কিন্তু নীরেনবাবুর উদ্দেশ্যও মনে হয় সেটাই ছিল) পড়তে বেশ ভাল লাগে। ভাদুড়ি সমগ্র ২-এ মোট ছয়টা উপন্যাস আছে; এর আগে এই সিরিজের 'চশমার আড়ালে' আর 'কামিনীর কণ্ঠহার' পড়েও মোটামুটি লেগেছিল বলে সমগ্রটা ধরলাম। সময়টা নষ্ট হয়নি, সেটা বলতে পারি। চরিত্র হিসেবে চারু ভাদুড়ি একমেবাদ্বিতীয়ম বা ট্রেন্ড সেটার কোনটাই নন, বরং এ যাবৎ বাংলা সাহিত্যে যেসব গোয়েন্দা এসেছেন তাদের নানাজনের মিশেলই বলা যায়। কিন্তু লেখার গুণে, এবং কাহিনীতে গোঁজামিল নেই বলে পড়ে ফেলা যায় এক বসায়। আপত্তি একটাই; কমিক রিলিফ দিতে গিয়ে সদানন্দবাবুর চরিত্রটাকে যেন লালমোহন গাঙ্গুলির দুর্বল একটা কপি-পেস্ট বানিয়ে ফেলা হয়েছে। অবশ্য লেখকের দোষ দিতে পারি না, সত্যজিৎ রায় ফেলু-তোপসে-জটায়ু দিয়ে পরের লেখকদের সর্বনাশ করে গিয়েছেন; নিজের অজান্তেই অনেকের লেখায় এই ত্রয়ীর ছাপ চলেই আসে। সমগ্রটার জন্য আমার রেটিং সোয়া তিন।