বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ভূতে বিশ্বাসী ছিলেন। বিচিত্র সব উপাদানের সমাহারে গড়ে উঠে তাঁর অলৌকিক কাহিনী। সেখানে ছায়ামূর্তি আছে, প্রেতাত্মা আছে, আছে তন্ত্র-মন্ত্র, আছে আতঙ্ক। বিভূতিভূষণের যাবতীয় ভয়ের গল্পকে এক মলাটে নিয়ে প্রকাশিত হল তাঁর বৃহত্তম সংকলন ‘ভয়-সমগ্র’ যাতে স্থান পেয়েছে চৌত্রিশটি ভয়ের গল্প।
Bibhutibhushan Bandyopadhyay (Bangla: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়) was an Indian Bangali author and one of the leading writers of modern Bangla literature. His best known work is the autobiographical novel, Pather Panchali: Song of the Road which was later adapted (along with Aparajito, the sequel) into the Apu Trilogy films, directed by Satyajit Ray.
The 1951 Rabindra Puraskar, the most prestigious literary award in the West Bengal state of India, was posthumously awarded to Bibhutibhushan for his novel ইছামতী.
জ্বরাক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলাম, সেই সময় পড়ে ফেলা।
বিভূতিভূষণের ভয়ের গল্পগুলোর মাঝে অনেকগুলোই ঠিক 'ভয়ের' নয়। বয়স্করা আজও একটু রাতের দিকে ছেলেপিলের মনে ভয়ের স্বাদ দিতে যেসব অভিজ্ঞতার কথা বলে, এই সংকলনের গল্পেরা মোটাদাগে তাই, কারো মুখে শোনার স্থানীয় কোনো উপকথা বা কিংবদন্তীর গল্প।
বিভূতির অপ্রাকৃত গল্পের কথা উঠলে ঘুরেফিরে যেন ওই 'তারানাথ তান্ত্রিক' আর 'মেঘমল্লার' এর কথাই শোনা যায় বেশি। তবে আমার মনে ভয় ধরেছিলো 'আরণ্যক' উপন্যাসের এক জায়গায় জঙ্গলের কিছু ঘটনার বর্ণনা পড়ে। এই সংকলনেও দেখলাম 'বোমাইবুরুর জঙ্গলে' শিরোনাম দিয়ে সেই গপ্পোগুলো জায়গা দেয়া হয়েছে। তার বাইরে 'অশরীরী' আর 'আরক' নামের গল্পগুলোও ভালো লাগলো, এদের আগে পড়িনি।
লেখনশৈলী ও বর্ণনা দিয়েই প্রায় প্রত্যেকটা গল্পেই ভয়ের একটা আবহ তৈরি করেছেন লেখক। হাতের পাঁচ আঙুলের মত গল্পগুলোও সমান না, কিন্তু উপভোগ্য। পড়তে ক্লান্তি লাগে না। ক্লাসিক/ ট্র্যাডিশনাল হরর।
দারুন কিছু গল্পের সংকলন রয়েছে এই বইতে।সব গল্প অসাধারণ বা গায়ে কাটা দিবে তা বলবো না।কিন্তু বেশ চমৎকার প্রায় সবগুলা গল্পই।এই বইয়ের সাথে সময়টা বেশ ভালোই কেটেছে।
না, না। উপরের লাইনগুলা 'ভয় সমগ্র' থেকে নেয়াও না। বা, 'ভয় সমগ্র' গা ছমছম করার মতো ভয়ঙ্কর-ও না। কিন্তু, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের মুন্সীয়ানা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার আছে কি? আমার মনে হয় না।
বলছি বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা ভূতের গল্প নিয়ে সমগ্র করা বই 'ভয় সমগ্র'। তার আগে একটা জিনিস বলে নিই। আমি পড়েছি সফা প্রকাশনী থেকে পাবলিশ হওয়াটা। এইটার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৫৯।
বিভূতিবাবু কি লেভেলের লেজেন্ড তা আমি আপনি সবাই জানি। এপার বাংলা বলেন বা ওপার বাংলা এমন লোক পাওয়া ভার যিনি বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়কে পছন্দ করেন না। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখক তিনি। কালজয়ী উপন্যাসগুলা দিয়ে জয় করে নিয়েছেন প্রত্যেক বাঙালীর হৃদয়। তবে, তিনি কিন্তু শুধু উপন্যাসেই থেমে থাকেননি। পাশাপাশি রচনা করেছেন বহু ছোটগল্প। আর ভূতে ছিলো তাঁর অগাধ বিশ্বাস। এমনকি নিজেও তন্ত্রসাধনা করতেন বলে প্রচলন আছে। যাইহোক, তাঁর লেখা ৩৯ টা ভয়ের গল্প নিয়েই এই 'ভয় সমগ্র'।
যখন কোনো সমগ্র নিয়ে বসবেন, তখন একটা কথা মনে রাখবেন। কিছু গল্প আপনার খুব ভালো লাগবে, কিছু এভারেজ, কিছু খারাপও লাগবে। এইটাই স্বাভাবিক। এই সমগ্রও তার বাইরে না। কিছু গল্প অনেক ভালো লেগেছে। কিছু এভারেজ বা বিলো এভারেজ। সবচাইতে ভালো লেগেছে অবশ্যই তারানাথ তান্ত্রিকের দুইটা গল্প। এর আগেও পড়েছি। আবার পড়া হলো। চমৎকারের চাইতেও অনেক বেশি চমৎকার। এছাড়া দাতার স্বর্গ, অভিশাপ, বউচন্ডীর মাঠ, খুঁটি দেবতার মতো আরো অনেক ভালো লাগার মতো গল্প আছে এই সমগ্রে।
সবমিলিয়ে আমি বলবো, কাঁপাকাঁপি টাইপ বই এইটা না। তবে, সুন্দর। ফিল গুড টাইপ বই। পড়ে ফেলুন। আশা করি ভালো লাগবে।
বাংলা সাহিত্যের দিকপাল, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ভৌতিক গল্পের সংকলনটি শুরু করতে পেরে আমি রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। এই বইটিতে রয়েছে প্রেতাত্মা, অশরীরী, ছায়ামূর্তি, তন্ত্র-মন্ত্র—সবই! সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল, বিখ্যাত তারানাথ তান্ত্রিকের স্রষ্টার অন্যান্য ভয়ের গল্পগুলো একসাথে পড়ার সুযোগ। এই প্রবল উত্তেজনা নিয়েই আমি বইটা শুরু করি।
আর বোধহয় এই কারণেই আমার আশাহত হওয়ার পালাও এল। কারণ, বেশিরভাগ গল্পই আমার কাছে ঠিক গা-ছমছমে বা ভয়ঙ্কর মনে হয়নি। সেগুলোকে বরং মনে হয়েছে যেন কোনো বন্ধুদের বা পারিবারিক আড্ডায় রাতে বসে বলা ভয়ের গল্প। সেখানে ভয়ের পরিমাণ হয়তো কম ছিল, কিন্তু গল্প বলার নিপুণতা ছিল দেখার মতো। বিভূতিভূষণ কীভাবে যেন পরিবেশটা এমনভাবে তৈরি করেন যে, ভয় না পেলেও একটা রহস্যময় আবহ তৈরি হয়, যা আমাকে টেনে নিয়ে গেছে।
তারানাথ তান্ত্রিকের গল্পগুলো বাদ দিয়েও আমার বেশ কিছু গল্প দারুণ লেগেছে। যেমন—টান, খুঁটি দেবতা, নুটি মন্তর, পৈতৃক ভিটা, রঙ্খিনীদেবীর খড়গ এবং রহস্য। এই গল্পগুলোতে লেখক তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায় ভয় ও কৌতূহলের এক দারুণ মিশেল ঘটিয়েছেন।
বইটি পড়ার সময় একটি প্রশ্ন বারবার আমার মনে উঁকি দিয়েছে। আমি খেয়াল করলাম, বইটির "কবিরাজের বিপদ" এবং "কাশীকবিরাজের গল্প"—এই দুটো গল্পের কাহিনি প্রায় হুবহু এক। শুধুমাত্র চরিত্রের নাম ভিন্ন। এর সাথে আবার "বিরজা হোম ও তার বাঁধা" গল্পটিরও ভীষণ রকমের মিল খুঁজে পেলাম। আমি ভেবে অবাক হলাম, কেন লেখক একই প্লটকে শুধুমাত্র নাম পাল্টে একাধিকবার লিখলেন? যদিও আমার ব্যক্তিগতভাবে "বিরজা হোম ও তার বাঁধা" গল্পটিই সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।
আর আমার যেহেতু অডিও স্টোরি শোনার অভ্যাস আছে, তাই সংকলনের অনেকগুলো গল্পের কাহিনিই আমার আগে থেকে জানা ছিল। তা সত্ত্বেও বলব, এই সংকলনটি বিভূতিভূষণকে অন্য চোখে দেখার সুযোগ করে দেয়। এটি প্রমাণ করে, কেবলমাত্র তীব্র ভৌতিক উপাদান নয়, গল্প বলার জাদুকরী শক্তি দিয়েই পাঠককে মুগ্ধ করা যায়।
সব মিলিয়ে, বিভূতিভূষণের এই সংকলনটি একটা মূল্যবান সংগ্রহ। যদি আপনি গাঢ়, ক্লাসিক বাংলা সাহিত্য এবং লেখকের সাবলীল বর্ণনাশৈলী ভালোবাসেন, তাহলে বইটি আপনাকে টানবেই। সত্যিকারের পিশাচ-হরর না খুঁজে, যদি অশরীরী রহস্যের এক ভিন্ন স্বাদের গল্প চান, তবে এই বইটি আপনার জন্য। বইটিকে আমি দুই তারা প্লাস এক তারা (শুধুমাত্র তারানাথ তান্ত্রিক ও হাতে গোনা দুই-একটি গল্প ও বিভূতিভূষণ নামটার জন্যে) এই মোট তিন তারা দিলাম।
মন ভালো করার জন্য হোক কিংবা বইয়ের পাতায় করে অন্য জগতে চলে যাওয়ার জন্য, বইটি কিন্তু উপযুক্ত। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ভয় সমগ্র' তে বিভিন্ন ধরনের রহস্যময়, ভৌতিক এবং কষ্টদায়ক গল্প আশ্রয় পেয়েছে। বেশিরভাগ গল্পই আপনাকে ভাবাবে। 'তিরোলের বালা' যেমন আপনাকে কাঁদাবে, 'অভিশাপ' তেমন আপনাকে নিয়ে যাবে এক জমিদার পরিবারের করুণ ইতিহাসের পাতায়। গল্পগুলো একবার করে পড়ে ফেলা যেতেই পারে। রেশ থাকবে। কারণ ইনি বিভূতিভূষণ!
এটা আমার প্রথম বুক রিভিউ, কাঁচা হাতের কাজ,সুতরাং মার্জনা নিজ গুনে করণীয়।
বিভূতিভূষণের ভয় কিংবা ভৌতিকল্পের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো তারানাথ তান্ত্রিক এবং এছাড়া আরো বেশ কিছু রয়েছে যেগুলো আলাদা নজর কারে যেমন মেঘ মাল্লার, অশরীরী, অভিশপ্ত ইত্যাদি । যদিও তার সমালোচনা করার কোন যোগ্যতাই আমার নেই তবুও কাশি কবিরাজ আর কবিরাজের বিপদ গল্পটি প্রায় একদমই কাছাকাছি লেগেছে এটা ভালো লাগেনি।
তবে বিভূতিভূষণ বিভূতিভূষণ তার সব গল্প ই সুখ পাঠ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
ভয় সমগ্রে ভয় পাওয়ার মত গল্প তেমন নেই। অনেক গল্পের মধ্যেই কেমন একটা সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। মেঘমল্লার,খুঁটি দেবতা, অশরীরী ছাড়া বাকি সব গল্প তেমন ভাল লাগেনি।
বাংলা সাহিত্যে প্রেত অশরীরী অপদেবতা নিয়ে প্রচুর ভালো ভালো লেখা আছে। কিন্তু বিভূতিভূষণ এতকিছুর মাঝেও যেনো ব্যতিক্রম। তাঁর লেখনীতে আত্মা প্রেত অশরীরীর পাশাপাশি যে জিনিসটা এসেছে সেটা হলো অপার্থিব পরিবেশ। প্রতিটি গল্পেই তিনি আশপাশের পরিবেশ, আলোছায়া, গাছপালা, গ্রামবাংলা, অরণ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন সেই প্রকৃতির বর্ণনাও মনে শিহরণ এনে দেয়।
এপ্রসঙ্গে "আরক" গল্প থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে- "রাত্রি ক্রমে গভীর হল। অপূর্ব জ্যোৎস্নালোকে হ্রদের জল, মরুভূমির নোনা বালি রহস্যময় হয়ে উঠেছে, কোনো শব্দ নেই কোনোদিকে। ঠাকুরদাদা যথেষ্ট দুঃসাহসী হলেও তাঁর যেন গা ছমছম করে উঠল- জ্যোৎস্নার সে ছন্নছাড়া অপার্থিব রূপে..." . কিংবা " বোমাইবুরুর জঙ্গলে" থেকে- "দিন কতক তো এমন হইল যে, কাছারিতে একলা নিজের ঘরটিতে শুইয়া বাহিরের ধপধপে, সাদা, উদাস, নির্জন জ্যোৎস্নারাত্রির দিকে চাহিয়া কেমন এক অজানা আতঙ্কে প্রাণ কাঁপিয়া উঠত; মনে হত কলকাতায় পালাই, এসব জায়গা ভালো নয়। এর জ্যোৎস্নাভরা নৈশপ্রকৃতি রূপকথার রাক্ষসি রাণীর মতো, তোমাকে ভুলাইয়া বেঘোরে লইয়া গিয়া মারিয়া ফেলিবে...." . এই যে প্রকৃতির অপার্থিব গা ছমছমে ভাব, এটা বিভূতিভূষণ খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। বইটা পড়তে গিয়ে কয়েকবার গায়ে কাঁটা দিয়েছে অস্বীকার করবোনা। . বিভূতিভূষণের হরর আসলেই আসবেন তারানাথ তান্ত্রিক এবং তা স্বাভাবিকও। সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মের অংশ এই তন্ত্রসাধনার আলোকিত ও আঁধার রূপ - দুটোকেই আধুনিক লোকের চোখে চিনিয়েছেন বিভূতিই। তবে তারানাথের পিছনে সমান সমান ক্রেডিট তাঁর সুযোগ্য পুত্র তারাদাস বন্দোপাধ্যায়েরও। এই বইটিতে মূলত বিভূতিভূষণের মূল যে দুটি গল্প তারানাথকে নিয়ে, সে দুটি আছে। এর বাইরে আছে বিভূতিভূষণের বাকি ৩২ টি গল্প। এবং এই গল্পগুলোই তাঁর মূল প্রতিভার স্বাক্ষর। মূল আকর্ষণ। . আমার ব্যক্তিগত পছন্দ (এই কয়েকটি গল্পের বিশেষ বিশেষ জায়গায় গা কাঁটা দিয়েছিলো আসলেই) তিরোলের বালা, বোমাইবুরুর জঙ্গলে, হাসি, আরক, ছায়াছবি, মেডেল, মায়া, খুঁটি দেবতা, পৈতৃক ভিটা ও অশরীরী। এর মাঝে যারা আরণ্যক পড়েছেন বোমাইবুরুর জঙ্গলের সেই সাদা কুকুরের গা শিউরে উঠা গল্প সবারই জানা। বিশেষ করে আরক, মেডেল, মায়া ও খু্ঁটি দেবতা - এই চারটি গল্প একদমই অপার্থিব। পরিবেশের সাথে রহস্য, রহস্যের সাথে ভৌতিকতা - মিলেমিশে একাকার। . তিরোলের বালা-য় সেই হতভাগিনী মেয়েটি কিংবা পৈতৃক ভিটার সেই ছোট্ট স্বজনহারা বালিকার বর্ণনা মন খারাপ করাবে। আবার খুঁটি দেবতা গল্পটি মনে জাগাবে কৌতুহূল - আসলেই কি বিশ্বাসের জোরে সব হয়? অশরীরীর সেই কালো মেয়েটিই বা কে ছিলো? কোনো দেবী? কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী? জানতে চেয়েও উত্তর মিলবেনা। হাসি গল্পটি পড়ে রাতের সুন্দরবনকে দেখবেন অন্য চোখে। কিংবা রাজায় রাজার শত্রুতা যে প্রাসাদের ইটপাথরকেও কলুষিত করে, অভিশপ্ত গল্পটি তারই প্রমাণ। . ফ্র্যাংকলি বললে সবকটা গল্প দশে দশ পাবার মত নয়। কিছু সাধারণ, ভয়হীন গল্পও আছে। তবে আর দশজন লেখকের মত গল্পের মাঝে জোর করে হাসি মশকরা, মামদো ভুতের ছা আর মেছো ভুতের নাকি সুর ঢুকিয়ে দেয়া হয়নি- এটুকু নিশ্চিত। . বইয়ে অজস্র চমৎকার ছবি ও স্কেচ আছে। যদিও বেশিরভাগই গল্প সংশ্লিষ্ট নয়। এটা একটা নেগেটিভ সাইড। . রেটিং ৪.৫/৫। হ্যাপি রিডিং।
তারানাথ তান্ত্রিকের স্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অলৌকিক বা ভয়ের গল্প সবকটা পড়ার ইচ্ছা জেগেছিল লাস্ট ইয়ারে আমার বইপাগল বন্ধু শান্তনুর রেকমেন্ডশনে। তার আগে কিছু কিছু পড়া থাকলেও ওনার গল্পসমগ্র হাতড়ে শুধু এই জঁর খুঁজে বার করা বেশ কঠিন কাজ ছিল। দৈব আশীর্বাদ স্বরূপ তখনই ফেসবুকের দেওয়ালে দেখতে পেলাম বিভূতি বাবুর সবকটা ভয়ের গল্প একত্রিত করে "ভয় সমগ্র" প্রকাশ করতে চলেছে বুক ফার্ম। মনটা যে কী খুশি হয়েছিল সেদিন, বলে বোঝাতে পারব না।
বইপ্রকাশের বাজারে অপেক্ষাকৃত নব খেলোয়াড় তিন বছর বয়সী এই বুক ফার্ম। কিন্তু এদের বাইন্ডিং কোয়ালিটি, ফন্ট সাইজ, বইয়ের ওজন, পাতার মান, আকর্ষক প্রচ্ছদ ও ভেতরের অলংকরণ - সবকিছুই যেন অন্যদের থেকে বেশ এগিয়ে। এদের বেশ কয়েকটা বই পড়েই বুঝলাম অনেক��া সময় এঁরা ব্যয় করেন বইয়ের আউটলুক আর প্রোডাকশনের কোয়ালিটি নিয়ে। প্রকাশনার জগতে যে একজন স্মার্ট খেলোয়াড় এসে গেছেন, সেই নিয়ে সন্দেহ নেই। "ভয় সমগ্র" বইয়ের ভেতরের সমস্ত ছবি এঁকেছেন বিমল দাস ও নারায়ণ দেবনাথ। তবে যতদূর মনে হল, ছবিগুলো অনেক সময়েই গল্পের সাথে খাপ খায়নি, এর কারণ হয়তো আর্টিস্টদের স্টক ইমেজ ব্যবহার করার জন্য হতে পারে। বইয়ের পাবলিকেশনের বছর ২০২৮ ইচ্ছাকৃতভাবে ��েখা কিনা বোঝা গেল না। যদিও এই বইয়ের চাহিদা আরও দশবছর কেন, সারাজীবন থাকবে বলেই আমার মনে হয়।
মোট চৌত্রিশটি অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে এই সংকলন। তাতে ছায়ামূর্তি আছে, ডাকিনী আছে, প্রেতাত্মা আছে, আছে তন্ত্র মন্ত্র, আছে আতঙ্ক। প্রকাশকের ভাষায়, "বিভূতি বাবু নিজে ভূতে বিশ্বাসী ছিলেন। পরলোকের ওপর তাঁর আগ্রহ ও বিশ্বাসের মূল কারণ ছিল তাঁর প্রথম স্ত্রীর অকালমৃত্যু। তাই তাঁর গল্পের অলৌকিক উপকরণগুলি বিচিত্র।"
বিভূতি বাবুর গল্পের সমালোচনা করার মতো অধিকার বা মানসিকতা কোনটাই আমার নেই৷ শুধু বলতে পারি যে লেখকের সৃষ্টি সত্যিই অমর। ২০১৮ সালে বসেও তাঁর গল্পগুলো পড়তে গিয়ে গায়ে কাঁটে দিল। সরল সাধারণ গ্রাম্য পরিবেশেও কিভাবে হাড়হিম করা গল্প বলা যায়, তা ওনার লেখা পড়েই বোঝা সম্ভব। শহুরে অতিপ্রাকৃত ঘটনাও অনেক আছে। বেশিরভাগই প্রথম পুরুষে হওয়ায় সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায় যে লেখকের নিজের অভিজ্ঞতাই অনেক ক্ষেত্রে গল্পের ছলে উঠে এসেছে আমাদের কাছে। মেঘমল্লার, বোমাইবুরুর জঙ্গলে, রঙ্কিনীদেবীর খড়্গ, মেডেল, পেয়ালা, ভৌতিক পালঙ্ক, বউ চণ্ডীর মাঠ, নুটি মন্তর - এই গল্পগুলোর নাম শুনলেই মনে হতে পারে যে আগে কোথাও পড়েছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এগুলো বারবার পড়া যায়, বারবার ভয় পাওয়া যায়৷ অনেকেই হয়তো জানেন না তারানাথ তান্ত্রিকের চরিত্রটি তারাদাস বাবুর কলমে খ্যাতি লাভ করলেও এর সৃষ্টি বিভূতিভূষনের হাতেই। সেই সিরিজের প্রথম দুটি গল্পও স্থান পেয়েছে এই বইতে।
সব মিলিয়ে একটা ফ্যান্টাস্টিক কালেকশন। এই বই সংগ্রহে রেখে দেওয়ার মতো। বুক ফার্মকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এই সংকলনের জন্য। বিখ্যাত লেখকদের বিশেষ জঁরা নিয়ে এমন আরও সমগ্র ভবিষ্যতে আপনাদের প্রকাশনা থেকে পাওয়ার ইচ্ছা রইল।
এক কথায় অসাধারণ ছিল। সর্বমোট ৩৯ টা গল্পের সমন্বয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভয় সমগ্র বইটি রচনা করা হয়েছে। অতি অবশ্যই তারানাথ তান্ত্রিক লেখক এর অমর দুটি গল্পের কথা বলতেই হবে। যদিও বা তার পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের তাড়ানাথ তান্ত্রিক গল্পের পরবর্তী লেখাগুলো নিজেই রচনা করেছেন তবে অবশ্যই তার স্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।।
বলতে দ্বিধা নেই তারানাথ তান্ত্রিক গল্প দুটি পড়েই লেখক এর লেখনীর প্রতি আমার আকর্ষণ তীব্র হয়েছে। বইটিতে ৩৯টি গল্প রয়েছে; প্রত্যেকটি গল্পই যে অসাধারণ সেটা বলবো না তবে কিছু উল্লেখযোগ্য গল্প সত্যিই গা ছমছমে এবং মন ছুঁয়ে যাওয়া ভৌতিক। জানিনা বিশেষণ টা কেমন হলো তবে এটাই ছিল অনুভূতি। কয়েকটা গল্পের কথা না বললেই নয়।-
ভারতীয় বাংলার আরো কয়েকজন লেখকের ভয় সমগ্র নামক কয়েকটি বই রয়েছে যে বইগুলো তাদের লেখা বিভিন্ন ছোটগল্পের সংকলন। যদি সময় পাই এবং সেই সুযোগ থাকে অবশ্যই সেগুলো সংগ্রহ করবো এবং পড়বো।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার সবচেয়ে সুন্দর দিক খুব সম্ভবত ঘটনার পরিবেশ ও তার খুব খুঁটিনাটি বর্ণনা, ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃত লেখার জন্য যা একদম মুড সেট করে দেয়। বেশিরভাগ পাঠকের মত আমিও উনার "তারানাথ তান্ত্রিক" সিরিজের মহাভক্ত, তাই এই বইটি থেকে প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। তার ষোলো আনা পূরণ হয়েছে বৈকি। বইটার নামকরণ নিয়ে আরেকটা কথা না বললেই নয়, ভয় সমগ্র মানে সব গল্পই যে ভূত প্রেত পিশাচ নিয়ে তা কিন্তু না, বরং মানুষের মধ্যেও যে অনেক ভয়ের ব্যাপার আছে, তা এর বেশ কয়েকটি গল্পে ভালোই বুঝা গেছে। প্রিয় গল্পের কথা বলতে হলে " তিরোলের বালা", " অভিশপ্ত", "অভিশাপ", "টান", " মেডেল", "পেয়ালা" উল্লেখ করার মত, আমি বলব। সব মিলিয়ে এমন চমৎকার একটা বই বহুদিন পর পড়া হলো, সময় সুযোগ হলে কোনোদিন অবশ্যই আবার তুলে নিব হাতে।
খুব খুব করে খুজছিলাম তারানাথ তান্ত্রিকের মতো গল্প/ বই পড়তে। গ্রামের পরিবেশে ভুতের বই, যেখানে মানুষের গল্প বেশী থাকবে। অনেক খুঁজেছিলামও। কিন্তু কোথাও মন মতো পেলাম না। কোন এক শুভক্ষণে খোজ পেলাম বিভূতিভূষণের ভয় সমগ্রের। কিছু গল্প আগেই পড়া ছিলো। এক বাক্স দামী চকলেট, বা খুব পছন্দের জলপাই আচার যেমন জমিয়ে রেখে রেখে খাওয়া হয়, তেমনভাবেই গল্পগুলো পড়লাম। কিছু কিছু গল্প খুটি দেবতা, মেঘমল্লার, খোলা দরজার ইতিহাস, আরক প্রথমবার পড়ে খুবই ভালো লাগলো। আর মনের তৃপ্তিও পেলাম খুব। বিভূতিভূষণের ভক্ত হয়ে থাকলে ভালো লাগবে।
অতিপ্রাকৃত, অলৌকিক, দৈনন্দিন বাস্তব অভিজ্ঞতার বাইরের ঘটনা। বেশিরভাগ গল্প-ই সরাসরি ভুতপ্রেতের গল্প না। বিভূতিভূষণ মানেই অন্যরকম, হৃদয়গ্রাহী। বইয়ের প্রচ্ছদ এরকম সাদামাটা ম্যাড়ম্যাড়ে ভুতের চোখ সর্বস্ব না হয়ে বেশ ক্ল্যাসি কিছু হতে পারতো।