জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রেনাথের পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী। তৎকালীন যশোর জেলায় তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সাত বছর পর সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে বিয়ের পর জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে বসবাস। পরবর্তীতে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চাকুরী সূত্রে মুম্বাই, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, সিণ্ধু প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় থেকেছেন। বছর দুয়েক খেকেছেন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সেও। এই বইয়ে তিনি তার বাল্য জীবন, বিয়ের পরের জীবন, প্রবাস জীবন সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন।
ছোট্ট একটা বই, ই বই। হঠাৎই খুঁজে পেয়ে পড়ে ফেললাম। রবি ঠাকুরের জীবনী পড়ার সুবাদে তার বৌদি জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর নাম জানা ছিলো। তিনি প্রথম ঠাকুর বাড়ির নারী যিনি অন্তঃপুরের বাইরে যেতে পেরেছিলেন, শুধু তাই নয় স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চাকরীর সুবাদে তৎকালীন বোম্বে প্রদেশের নানা জায়গায় এবং ইংরেজী শিক্ষা ও পাশ্চাত্য সভ্যতা সম্পর্কে জানার জন্য ছেলে মেয়েকে নিয়ে ইংল্যান্ডেও ছিলেন বেশ দীর্ঘ সময়। জন্ম তার তখনকার যশোর জেলার পাড়াগায়ে। পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম, যদিও তার বাবা ছিলেন মুখুটি তথা মুখোপাধ্যায় পদবী ধারী কুলীন ব্রাহ্মণ তবে তিনি পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে বিয়ে করে সমাজচ্যুত হন। বাবা মায়ের অনেক আদরের প্রথম সন্তান ছিলেন তিনি। তৎকালীন পারিবারিক জীবনে কুসংস্কার আর ধর্মাচরন কতো বেশি ছিলো তা তার বাল্য জীবনের স্মৃতির অংশটুকু পড়লে বোঝা যায়। সে আমলে পাড়া গায়ে মেয়েরা প্রকাশ্যে পড়াশোনা করতে পারতো না, সময়টা ১৮৫০ এর কাছাকাছি কোন সময়। তবু বাসায় পাঠশালা থাকায় গুরুমশাইয়ের কাছে অক্ষর পরিচয় হয়েছিলো। মাত্র ০৭ বছর বয়সে তার বাবা তাকে গৌরীদান করে বিয়ে দেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে। পাত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।পরবর্তীতে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম ভারতীয় হিসেবে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ন হলে চাকরীর সুবাদে তিনি তৎকালীন বোম্বে প্রদেশে ( বর্তমান মহারাষ্ট্র, সিন্ধু, গুজরাট, কর্ণাটক প্রভৃতি) দীর্ঘকাল অবস্থান করেন। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী বাঙালি কায়দায় শাড়ি, ব্লাউজ, সায়া পড়ার বর্তমান রীতি প্রচলন করেন পার্সী মেয়েদের শাড়ি পড়ার ধরন থেকে। প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে ভাইসরয় কর্তৃক প্রদত্ত ভোজ সভায় উপস্থিত ছিলেন তিনি। সেই উনিশ শতকের রক্ষনশীল সমাজেও স্বামী ছাড়া সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিলেত যান। সে সময়ের হিসেবে তার এসব কর্মকান্ড ছিলো বৈপ্লবিক, তাও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের মতো পরিবারে যারা মেয়েদের ব্যাপারে ছিলো যথেষ্ঠ রক্ষনশীল। তবে এ ব্যাপারে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধুনিক মনমানসিকতার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই বইয়ে বিস্তারিত কোন কিছুরই বর্ণনা নেই তবু যা আছে তার মূল্য কম নয়। ঠাকুর বাড়ির বধূদের সর মাখিয়ে ফর্সা করার চেষ্টা, পুত্রবতী বধূদের শ্বশুরবাড়িতে আলাদা সম্মান, এমনকি বাড়ির বউকে বাপের বাড়ি পাঠাতে গড়িমসি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতেও চলতো, ভাবা যায়! ১৯৩৭ সালে লিখিত এই বই, জ্ঞানদানন্দিনী দেবী মারা যান ১৯৪১ এ। তার কন্যা বিবি বা ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীও পরবর্তীতে বিখ্যাত হন, যিনি ছিলেন প্রমথ চৌধুরীরর স্ত্রী। এই বইয়ে তার প্রবাস জীবন, বাল্য জীবন, জোড়াসাঁকোর জীবন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অথচ মূল্যবান স্মৃতিচারনা আছে, আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন।