নালন্দার আচার্য শীলভদ্রের মৃত্যুর কয়েক বছর পর কনৌজের মহারাজ হর্ষবর্ধণ পরোলোক গমন করেন। উত্তরসুরীর অভাবে এক বিশাল রাজ্য দ্রুত খণ্ড খণ্ড অংশে ভেঙ্গে পড়ে। রাজা হর্ষের মন্ত্রিদের একেকজন নিজেদের রাজা ঘোষণা দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েন। হর্ষবর্ধণের অধীনে শাসিত মগধ রাজ্যের শাসক হিসেবে নিযুক্ত আদিত্য গুপ্ত নিজেকে রাজা হিসেবে ঘোষণা দেন। অন্যদিকে গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ দখল করে নেন কামরূপ রাজা ভাষ্কর বর্মণ। ভাষ্কর বর্মণের রাজত্ব বেশি দিন থাকেনি। তার মৃত্যুর পর রাজ আসনে বসেন অবন্তী বর্মণ। তার রাজত্বেই কামরূপ জুড়ে প্রজারা বিদ্রোহ করে উঠে। খুব অল্প সময়েই এই বিদ্রোহ বড় আকার ধারণ করে। অবশেষে সলস্তম্ভ নামের বিদ্রোহী নেতা রাজাসন দখল করে ম্লেছ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে, পতন হয় বর্মণ রাজবংশের। ধীরে ধীরে ছোট সামন্ত রাজ্যগুলো নিজেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। নিজেদের মধ্যে ক্রমাগত যুদ্ধে তারা আরো দুর্বল শক্তিতে পরিণত হয়। যে দুর্বল তার কোন মিত্র নেই। এভাবে খুব দ্রুতই রাজ্য, রাজা ও রাজপটের পরিবর্তন হতে থাকলো। সমতটের কিছু অংশে রাত রাজ বংশ তাদের রাজত্ব স্থাপনের চেষ্টা করলো কিছুকাল, কখনো বা খড়গ বংশের রাজত্বের প্রকাশ ঘটলো। কিন্তু তারা কেউ স্থায়ীভাবে দীর্ঘদিন থাকতে পারলো না।
এমনি অরাজকীয় সময়ে তিব্বতের রাজা বাং-ছান-গেমপো বাংলায় বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করলেন। সে সময় বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুট হয়ে যায় তিব্বতে। অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে পুনঃপুনঃ বৈদেশিক আক্রমণে বাংলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এসময়ই রাজা হিসেবে আবির্ভাব হয় কনৌজের রাজা যশোবর্মণের। দিকে দিকে তার জয় জয়কার প্রসারিত হতে থাকে। ঠিক তখনি তাঁকে পরাজিত করে এই মধ্য-পূর্ব ভারত তথা বাংলায় লুট করেন কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য। এভাবেই একের পর এক পরিবর্তনে বাংলা, গৌড় ও সমতটের গৌরব ম্লান হয়ে যায়। একজন দীর্ঘস্থায়ী মহারাজার অভাব ও পাশাপাশি রাজ্যগুলোর মধ্যে বন্ধুত্ব, ঐক্যবদ্ধতার অভাব প্রজাদের মধ্যেও সেচ্ছাচারিতা, প্রতিহিংসা, লুটতরাজ ও দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার বাড়তেই থাকে। আইন প্রয়োগকারী কেউ নেই তাই সৃষ্টি হয় অন্ধকার এক সময়ের। অষ্টম শতকের মধ্যভাগে বাংলার এই সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার থকে মুক্তি পেতে ‘প্রকৃতিপুঞ্জ’ অর্থাৎ বাংলার প্রধান নাগরিকবৃন্দ একজন সামন্ত রাজাকে বাংলার রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন। তার নাম গোপাল, পাল রাজবংশের প্রথম রাজা। এর মাধ্যমেই পরিসমাপ্তি ঘটে বাংলার ইতিহাসের অন্যতম এক অন্ধকার, অরাজক কাল মাৎস্যন্যায়ের।
মাৎস্যন্যায় শব্দটির উল্লেখ পাওয়া মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী চাণক্য বা কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ বইটিতে। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো মাছের মত কিংবা মাছের রাজ্যের মত। মাছের রাজ্যে ছোট মাছকে বড় মাছ গ্রাস করে। দুর্বলকে রক্ষার কোন বিধান সেখানে নেই।
আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে ভারতবর্ষের শাসন ব্যবস্থায় আসে এমন মাৎস্যন্যায় কাল। যখন শক্তিশালী কোন সম্রাট কিংবা রাজা না থাকায় দুর্বলকে সবল অত্যাচার করে। অপরাধীকে দণ্ডদান কিংবা নিপীড়িতকে ন্যায়বিচার দেবার সকল নিয়ম তখন স্থবির। ঠিক সেই অস্থিতিশীল সময় আগমনের পূর্বে মহাবিহার নালান্দার তৎকালীন আচার্য শীলভদ্রের জীবানাচরণ এবং রাজনৈতিক উত্থান পতন নিয়ে লেখক বইটি লিখেছেন।
তৎকালীন বাংলার (গৌড়) রাজা শশাঙ্ক এবং কনৌজের রাজা হর্ষবর্ধনের মৃত্যু মধ্যদিয়ে মাৎস্যন্যায় শুরু হয়। কারণ এই দুই রাজার মৃত্যুর পর থেকে পাল বংশের প্রথম রাজা গোপালের পূর্ব পর্যন্ত সময়কালকেই মাৎস্যন্যায় বলা হয়। যার প্রমাণ পাওয়া যায় সমসাময়িক লিপি খালিমপুর তাম্রশাসন এবং সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে পাল বংশের অব্যবহিত পূর্ববর্তী সময়ের বাংলার নৈরাজ্যকর অবস্থাকে ‘মাৎস্যন্যায়ম্’ বলে উল্লেখ করাকে।
মাৎস্যন্যায়কালের পূর্বে নালান্দা মহাবিহারের আচার্য ছিলে শীলভদ্র। যার প্রকৃত নাম ছিল দান্তে ভদ্র। যিনি ছিলেন এক সামন্ত রাজ্যের রাজপুত্র। কিন্তু জ্ঞানের অন্বেষণে তিনি সকল ঐশ্বর্য ত্যাগ করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। বিভিন্ন স্থান ঘুরে অবশেষে তিনি এসে পৌছান নালান্দা মহাবিহারের আচার্য ধর্মপালের কাছে।
এই বইটির মূল কাহিনী প্রথম থেকে দুটি দিকে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে দান্তে ভদ্রের জীবনী এবং দর্শন আবার অন্যদিকে তুলে ধরা হয়েছে তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার পালাবদল। আবার উপন্যাসটি পরিণতিতে গিয়ে দুটি দিক একবিন্দুতে মিলিত হয়েছে।
গুপ্ত সম্রাজ্যের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসার প্রাক্কালে ভোজবাজির মত উত্থান ঘটায় গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক। শশাঙ্ককে বঙ্গদেশের প্রথম সার্বভৌম রাজা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই রাজার বংশ পরিচয় সম্পর্কে তেমন বিশেষ কিছুই জানা যায় না।
শুধু শশাঙ্ক নয় নতুন স্বাধীন রাজা হিসাবে আত্নপ্রকাশ করে কৌনজের মৌখরী রাজবংশ, থানেশ্বরের বর্ধণ রাজবংশসহ আরও অনেকে যার দীর্ঘকাল ধরে গুপ্ত সম্রাজ্যের সামন্ত রাজা ছিল। এসব রাজ্যের মাঝে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকতো।
নিজের ক্ষমতা সংহত করার পর, শশাঙ্ক রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন। তিনি প্রথমে দক্ষিণের দণ্ডভুক্তি, উৎকল ও কোঙ্গোদ রাজ্য জয় করেন। এই সময় দক্ষিণের বঙ্গ রাজ্যের রাজা তাঁর কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন।
এই সময় মৌখরীদের অত্যন্ত শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল। এই সময় মৌখরীর রাজা ছিলেন গ্রহবর্মণ। ইনি থানেশ্বরের রাজা (পুষ্যভূতি রাজবংশের রাজ) প্রভাকরবর্ধনের কন্যা রাজ্যশ্রীকে বিবাহ করেন। ফলে বৈবাহিক সূত্রে উভয় রাজ্য শক্তিশালী হয়ে উঠে। মালবরাজের সাথে গ্রহবর্মণের মিত্রতা থাকলেও রাণী রাজ্যশ্রীর রূপে মোহিত হয়ে মালবরাজ গ্রহবর্মণকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে রাজশক্তি বৃদ্ধির জন্য শশাঙ্ক এবং দেবগুপ্ত মিত্রতায় আবদ্ধ হন। অন্যদিকে কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মণ শশাঙ্কের শক্তিবৃদ্ধিতে শঙ্কিত ছিলেন। তাই ভাস্করবর্মণ, মৌখরী-পুষ্যভূতি-দের পক্ষে যোগ দেন। ক্ষমতার এই মেরুকরণ সম্পন্ন হওয়ার পর কিছুদিন উভয় পক্ষ নির্লিপ্তভাবে সময় কাটায়। এরপর এই রাজ-শক্তিদ্বয়ের ভিতর যুদ্ধ শুরু হয়। আর এই যুদ্ধের ফলাফল পর্ববর্তী মাৎস্যন্যায় কালের সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর সেই ফলাফল জানতে এবং ইতিহাসে তার তাৎপর্য বুঝতে এই বইটি পড়া যেতে পারে।
ব্যক্তিগত অভিমতঃ
লেখক বইটিতে এমন একটি সময়কে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন যে সময় সম্পর্কে ইতিহাসের পাতায় পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব রয়েছে। হয়তো কালাপাহাড় নালান্দা মহাবিহারের অমূল্য গ্রন্থাগার পুড়িয়ে না দিলে সেই সময় সম্পর্কে আরও অমূল্য তথ্য আমরা পেতাম। বইটির পরিসর হত আরও বড়। আমাদের দুর্ভাগ্য। তবে লেখকের গবেষণা, প্রচেষ্টা এবং পরিশ্রম বইটির প্রতি পৃষ্ঠায় স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এই স্বল্প পরিসরের বইটি ইতিহাসপ্রেমীদের ভাল লাগবে আমার বিশ্বাস।
প্রিয় উক্তিঃ
"যখন সবাই তোমার প্রশংসা করবে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করবে। সাফল্যের পর নিজেই নিজের সমালোচনা করবে, এতে নিজের মধ্যে অহংবোধ তৈরি হবে না।" --- আচার্য শীলভদ্র
১. ঠিকঠাক লে-আউট হলে বইটা গোটাষাটেক পাতার বেশি পুরু হবে না। লেখকের ভাষাও স্বচ্ছন্দ ও নির্ভার। পড়তে একেবারেই সময় লাগেনি তাই। ২. বইটা আদৌ মাৎস্যন্যায় নিয়ে নয়। এপার বাংলায় বইটা খোয়াবনামা থেকে 'মহাস্থবির শীলভদ্র' নামে প্রকাশিত হয়েছে। সেই নামটিই যথাযথ। ৩. বইটা ওয়ার্ক অফ ফিকশন। তাতেও তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এমন কিছু বইপত্র, যেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আজ থেকে একশো বছর আগেই প্রশ্ন উঠেছিল। ভ্রান্তি, মিথ্যা ও প্রোপাগান্ডায় পূর্ণ সেইসব টেক্সট নিয়ে আজকেও ইতিহাসের পরিকাঠামোটি রচনা করার কোনো মানেই হয় না। তাদের গাঁজাখুরি তত্ত্বের আলোয় কিছু গুল্প এখানে ইতিহাস হিসেবে বর্ণিত হয়েছে— যা কাঙ্ক্ষিত নয়। ৪. শীলভদ্রের কাল্পনিক জীবনীটি ভালোভাবে ফোটানো হয়েছে। তবে সেই কাহিনিক্রমেও কোনো মৌলিকত্ব পেলাম না। 'নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা' একটা কিংবদন্তিতুল্য কাজ হয়ে থাকবে অতীশের জীবন ও দর্শনের আলোয় অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে ফুটিয়ে তোলার জন্য। তার ছিঁটেফোঁটাও পেলাম না এই বইয়ে। সব মিলিয়ে বইটা ইতিহাস-অনুরাগী পাঠককে হতাশই করবে। তবে ভাষাটা সহজ ও মোটামুটি শুদ্ধ বলে পড়তে খারাপ লাগল না— এই আর কি।
সময়ের আবর্তে পরিবর্তনশীল এই পৃথিবীতে যুগে যুগে মহান ব্যক্তিরা তাদের মহিমায় অমর হয়ে আছেন।তাঁদের জ্ঞান ও কর্মে মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গল সাধিত হয়েছে। জন্মের পর থেকে জ্ঞানের তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে জ্ঞান অন্বেষণে সাধনা করে চলেছেন এবং একদিন সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ ও করে জীব জগতের কল্যানই করে চলেছেন।
১৫০০০ বছর আগে জ্ঞানের অন্বেষণে রাজপরিবারের এক সন্তান দান্তে ভদ্র সংসারের মায়াজাল ছিড়ে পথে নেমেছিলেন। রাজ পরিবারের সুখ শান্তি ত্যাগ করে হয়েছিলেন পথের ভিখিরি। এক সময় তিনি হয়ে ওঠেন এক জ্ঞান নক্ষত্র। যাঁর জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়েছিল দেশ ও জাতি। তাইতো সুদূর চীন দেশ থেকে চৈনিক পরিব্রজক তাঁর ছাত্র হন। মহান এই জ্ঞানী ব্যক্তিটি আসলেই কে ছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি সবার সামনে কিভাবে পরিচিতি পান? সমাজ ও রাজনীতি তে তার প্রভাবটাই বা কি ছিল? এমনই সব জানা অজানা বিষয় নিয়েই এই বই নিসর্গ মিরাজ চৌধুরী এর " মহাস্থবির শীলভদ্র "।
সমতট তথা বাংলাদেশের কুমিল্লার এক সামন্ত রাজার ছেলে ছিলেন দান্তে ভদ্র যদিও সংসারে মন ছিল না তার। গৃহত্যাগ করে ঘুরতে ঘুরতে একসময় বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তীতে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মগধ বা বর্তমান বিহারের নালন্দার ছাত্র এবং পরবর্তীতে অধ্যক্ষও হন তিনি। তার নাম হয় শীলভদ্র। মহাস্থবির শীলভদ্রের জীবনীকাল নিয়েই এই কাহিনী যদিও কাহিনীতে প্রথম জীবন বা তার পরিব্রাজক জীবন প্রায় আসেই নি। শুরুটা মগধরাজের সভায় দাক্ষিণাত্যের ব্রাহ্মণ পন্ডিত ব্রাত্যদেবকে পরাজিত করা থেকে। ব্রাত্যদেব অবশ্য তর্কে আহবান করেছিলেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান আচার্য ধর্মপালকে। সেই তর্কযুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন শীলভদ্র। উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন একটি নগর যা তিনি গ্রহণ না করে সেখানে একটি বৌদ্ধ বিহার বানিয়ে দেবার অনুরোধ করেছিলেন মগধরাজকে। নির্লোভ এই জ্ঞানী ভিক্ষু ধর্মপালের উত্তরসুরী হয়ে কালক্রমে হন নালন্দার অধ্যক্ষও। প্রৌঢ় বয়সে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন চৈনিক পরিব্রাজক হিওয়েন সাঙকে। তার জ্ঞানের সবটুকু উজার করে দিয়েছিলেন তার এই প্রিয় শিষ্যটিকে। মূলত হিউয়েন সাঙের ভ্রমণকাহিনী এবং তিব্বতি ভাষায় অনুদিত তার রচনা "আর্য-বুদ্ধভূমি ব্যাখ্যান" ছাড়া শীলভদ্রের সম্পর্কে প্রামাণিক কিছুই এখন পাওয়া যায় না। শত শত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তিনি সেসব ধ্বংস হয়ে গেছে তুুর্কী আক্রমণে নালন্দা ধ্বংস হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে।
শীলভদ্র এমন একটি যুগসন্ধিক্ষণে নালন্দায় ছিলেন যখন কনৌজের রাজা হয়েছিলেন বিখ্যাত বীর রাজা হর্ষবর্ধন, গৌড়ে রাজত্ব করেছিলেন সামান্য সামন্ত রাজা থেকে গৌড়াধিপতি হওয়া শশাঙ্ক আর কামরূপে ছিলেন ভাস্করবর্মা। শীল ভদ্রের এবং এই তিন শক্তিশালী রাজার মৃত্যুর পর যোগ্য উত্তরসুরীর অভাবে এ অঞ্চলে যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল তাকেই বলা হয় আরও সহস্রাব্দ আগে চাণক্য উল্লিখিত মাৎস্যনায়। এই বই মাৎসনায় নিয়েও নয়। শীলভদ্রের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য থাকাকালীন সময়কালই মূলত এই বইয়ের উপজীব্য। সাথে এসেছেন হর্ষবর্ধন, শশাঙ্ক এবং সমসাময়িক ঐতিহাসিক রাজা এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বও। সেই সব কাহিনীর কতটুকু ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত জানা নেই, সেই সময় নিয়ে আগে তেমন কিছু পড়া হয় নি। গুপ্ত সাম্রাজ্য তখন ভেঙে গেছে, সীমান্তে সমানে চলেছে হুন আক্রমণ, এই মধ্য ও পূর্ব ভারতে বৌদ্ধ এবং ব্রাহ্মণ্য মতের বিরোধও চলছে সমানে। কোন রাজা ছিলেন বৌদ্ধ মতের অনুসারী আবার কেউ বা তার ঘোরতর বিরোধী। ধর্মের বিরোধ, রাজাদের বিরোধে বারবার বয়ে গেছে রক্তের বন্যাও। শীলভদ্রকে বাঙালি দাবি করা যায় কিনা জানিনা কারণ বাংলা ভাষা বা বাঙালি জাতীয়তা হয়তো তখনও আলাদা করে গড়েও ওঠেনি। তবু তিনি তো ছিলেন বর্তমান বাংলার ভূমিপুত্র, আমাদেরই পূর্বসুরী। এই মহান ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লেখা এই বইটি আকৃতিতে ছোট কিন্তু লেখা এবং বিষয়বস্তু আকর্ষণীয়। মনে হয়েছে আরেকটু কেন দীর্ঘায়িত হলো না উপন্যাসটি। শেষ হয়েও তাই যেন অপূর্ণতা রয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল বলেই।
আশ্চর্য, চান্দিনার ঐ লোকটা হাজার বছরের ইতিহাস হয়ে র'লো?
মাৎস্যন্যায় একটি সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী যখন কোথাও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এমন পর্যায়ে চলে যায় যেন তা মাছের রাজ্যের সাথে তুলনীয়। অর্থাৎ বড়ো মাছ যেমন ছোটো মাছকে খেয়ে ফেলে তেমনি আইন-শৃঙ্খলা না থাকার কারণে সবল সর্বদা দুর্বলকে শোষণ করবে।
‘মাৎস্যন্যায়’ উপম্যাসটিতে লেখক নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী তেমনই এক অস্থির সময়ের বর্ণনা করেছেন। যদিও সেই সময় থেকেও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বাঙ্গালী জ্ঞানপিপাসুর বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা’র আচার্য হয়ে ওঠার ইতিহাস।
মহাস্থবির শীলভদ্র ছিলেন বৌদ্ধশাস্ত্রের একজন দার্শনিক ও নালন্দা মহাবিহারের আচার্য। তাঁর জন্ম তৎকালীন সমতট রাজ্য, বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার চান্দিনার কৈলাইন নামক গ্রামে। ছোটোবেলা থেকেই জ্ঞান অন্বেষণে তার প্রবল আগ্রহ ছিলো। জ্ঞান আহরণে তিনি ভারতবর্ষের বহু রাজ্য ভ্রমণ করে মাহধের নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছেন। সেখানে আচার্য ধর্মপালের কাছে তিনি দীক্ষা নেন। তার জ্ঞান, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে দিয়ে হয়ে উঠেন ধর্মপালের সবচেয়ে পছন্দের ছাত্র। তর্কযুদ্ধে জয়ী হয়ে তিনি পুরষ্কার স্বরূপ একটা শহর উপহার পান, আর সেখানেই গড়ে তুলেন একটি বিহার। পরবর্তীতে ধর্মপালের মৃত্যুর পর নালন্দা মহাবিহারের আচার্য হন ‘মহাস্থবির শীলভদ্র'।
রাজা হর্ষবর্ধন বিদ্রোহী ব্রাহ্মণ নিধন করে রাজ্য দখলে মনোনিবেশ করলে রাজা শশাঙ্ক এর প্রতিশোধ স্বরূপ বৌদ্ধ ভিক্ষু নিধন করে রাজ্যের পরিধি বাড়াতে থাকেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নিরাপত্তার স্বার্থে শীলভদ্র তাঁর বিহারের দরজা সকলের জন্য খুলে দেন, যাতে ভিক্ষুরা শশাঙ্কের নির্মমতা থেকে রক্ষা পায়। এ খবর পেয়ে শশাঙ্ক সেই বিহারে আক্রমণ করে, এবং বিহারে ঢুকতে না পেরে প্রায় একশত ভিক্ষু হত্যা করে। ঠিক সে সময় বিহারের দরজা খুলে জ্ঞানের রাজ্যে শশাঙ্ককে আমন্ত্রণ জানায় শীলভদ্র। শীলভদ্রের ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানে অভিভূত হয়ে শশাঙ্ক ফিরে যায়, নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হয়।
মূলত রাজা হর্ষবর্ধণ ও শশাঙ্কের মৃত্যু ও শীলভদ্রের নির্বাণ লাভের পরবর্তী অরাজক সময়টিই মাৎস্যন্যায় নামে পরিচিত। এই বইটিতে মাৎস্যন্যায় সময়টির আগমুহূর্তের কাহিনীর বর্ণনা রয়েছে, যা সত্যিই চমকপ্রদ। একজন বাঙ্গালী হিসেবে শীলভদ্রের বিশ্বের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হওয়াটাও আমাদের জন্য গৌরবের বিষয়। শীলভদ্র এতটাই জ্ঞানী ছিলেন যে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন যে ১০০ টি বিষয় পড়ানো হতো, সেই সবগুলো বিষয়েই তিনি সমান জ্ঞান রাখতেন।
সম্প্রতি এই বইটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কোলকাতা থেকেও প্রকাশ পেতে যাচ্ছে। কিছুটা নতুন আঙ্গিকে ও নতুন নামে করোনা পরবর্তী সময়ে হয়ত বইটি পাঠকের হাতে পৌঁছে যাবে। মাৎস্যন্যায় থেকে মহাস্থবির শীলভদ্র নামে প্রকাশ পাবে, সেজন্য লেখক নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী ভাইকে অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আশাকরি দেশের বাইরেও বইটি সাড়া ফেলবে।
কথাটি উল্লেখ আছে চাণক্য বা কৌটিল্যের ❝অর্থশাস্ত্র❞ বইটিতে। সেখানে ❝মাৎস্যন্যায়❞ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। এর আভিধানিক অর্থ ❝মাছের মতো বা মাছের রাজ্যের মতো❞। যখন দন্ডদানের আইন অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন দেখা যায় অরাজকতা যা মাছের রাজ্যের মতো পরিস্ফুটিত হয়। যেখানে বড়ো মাছ ছোটো মাছকে গ্রাস করে। এমনই ভাবে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার নিপীড়ন চলতে থাকে কিন্তু আইন অকার্যকর থাকে।
বাংলার ইতিহাসে ৬৫০-৭৫০ খ্রিস্টাব্দের সময়কালকে বলা হয় ❝মাৎস্যন্যায়❞। রাজা শশাঙ্ক ও হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর থেকে সময়কে ❝মাৎস্যন্যায়❞ নামে অভিহিত করা হয়। কীভাবে এর শুরু? তৎকালীন সমতটের এক ছোট্ট গ্রাম কৈলানের রাজ পরিবারে জন্ম নেয় এক বালক। রাজ পরিবার হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে এসব পরিচালনার কোন মোহ বা তাগিদ ছিল না। সে ছিল জ্ঞানপিপাসু। প্রকৃতির বিপুল রহস্যের অর্থ জানা বুদ্ধের জীবনের গভীর মর্ম জানাই ছিল তার ধ্যান। তাই রাজ পরিবারের সুখ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলেন সে পৃথিবীর পথে। হলেন ভিখিরি। শেষমেষ এসে স্থায়ী হলেন তখনকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দায়। শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন আচার্য ধর্মপালের। সেই বালকটির নাম ❝দান্তে ভদ্র❞। শিষ্য, কুলপতি, উপাধ্যায় পদ পেরিয়ে নালন্দা মহাবিহারের ধর্মনিধি হয়ে ওঠেন দান্তে ভদ্র ওরফে ❝শীলভদ্র❞। ভারতবর্ষের ইতিহাসের প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক জ্ঞানপিপাসু শীলভদ্র। নালন্দার পুড়ে যাওয়া ইতিহাসের সাথে সে-ও অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে। খুব কমই পাওয়া যায় এই জ্ঞানপিপাসুর নাম। ভারতবর্ষে ❝মাৎস্যন্যায়❞ যুগের আগে নালন্দার আচার্য ছিলেন শীলভদ্র। ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতবর্ষে অস্থির এক রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছিল। গুপ্ত বংশের পতন ও ছোটো ছোটো বহু রাজ্যের উৎপত্তি সব মিলে শাসনব্যবস্থা বাঁধা পেতে থাকে। থানেশ্বর ও মগধের রাজা নিজেদের মধ্যে সন্ধি করে। কনৌজের রাজার কাছে আনুগত্য স্বীকার করে নেন মালবের রাজা। ফলে বিরাট এক ঐতিহাসিক পট রচিত হয়। এক সাধারণ সৈন্য থেকে সামন্ত রাজায় রূপ নেয় বাংলার (তৎকালীন গৌড়) মহারাজ শশাঙ্ক। বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন তিনি। এই বিপুল সম্পদ ও বিশাল সাম্রাজ্য জয় করতে পার হতে হয়েছে অনেক লাশের, রক্তের পথ ইতিহাসে বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যার নিষ্ঠুর ঘটনার কারিগর তিনি। মালবের রাজা দেবগুপ্ত ও থানেশ্বরেরর সদ্য অধিষ্ঠিত রাজা রাজ্যবর্ধনকে কৌশলে হত্যা করে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করেন শশাঙ্ক। সম্প্রসারিত হতে গৌড় রাজ্য। কিশোর বয়সে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রথমে দুর্নাম অর্জন করলেও পরে সকলের শ্রদ্ধাভাজন হন থানেশ্বরের নতুন অধিপতি হর্ষবর্ধন। বিদ্রোহী দমন ও হিন্দু ব্রাহ্মণ হত্যা করে ক্ষেপিয়ে তোলেন গৌড়ের রাজা শশাঙ্ককে। পাল্টা জবাব দিতে শশাঙ্ক শুরু করেন বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যা। হত্যা করতে করতে শশাঙ্ক এগিয়ে যান নালন্দা মহাবিহারের দিকে। আর সেখানেই মুখোমুখি হন ধর্মনিধি শীলভদ্রের। তার ব্যাক্তিত্বের আলোয় হতভম্ব হয়ে যান তিনি। শীলভদ্রের কথার জ্যোতিতে তিনি নিজেকে যেন নতুনভাবে চিনতে পারেন। বন্ধ করে দেন অসহায় বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যা। প্রায় আশি বছর ধরে নালন্দায় শিক্ষা অর্জন ও পরবর্তীতে নতুন শিষ্যদের জ্ঞান দানের কাজ করে আসছেন শীলভদ্র। জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবার যে আশা নিয়ে পরিবার ত্যাগ করেছিলেন সে জ্ঞান সাধন করেছেন। তবুও বহু বছরের ফেলে আসা জন্মস্থানের কথা মনে পড়ে তার। মনে পড়ে মায়ের ডাক, খেলার মাঠ। স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন তিনি। এরই মাঝে স্বপ্নে দেখেন তিনি। পান এক আশ্চর্য দৈব আদেশ। সেই আদেশ পালন করতেই ধর্মনিধি শীলভদ্রের সাথে দেখা হয় চৈনিক ভিক্ষু হিউ এন সাং এর সাথে। রচনা হয় আরেক সমৃদ্ধ ইতিহাসের। শীলভদ্রের থেকে দীক্ষা নিয়ে হিউ এন সাং পারি জমান নিজ দেশের উদ্দেশ্যে। সেখানে প্রচার করবেন বুদ্ধের বাণী। কাজে লাগাবেন শীলভদ্রের থেকে অর্জিত শিক্ষা। কালের প্রবাহে নির্বাণ লাভ করলেন শীলভদ্র। তখন কনৌজের রাজা ছিলেন হর্ষবর্ধন। তিনিও শীলভদ্রের নির্বাণ লাভের কয়েক বছর পর মৃত্যুবরণ করেন। আর ইতিহাসে শুরু হয় মাৎস্যন্যায়ের যুগ। এ অরাজকতার যুগের ইতি ঘটে প্রথম পাল রাজা গোপালের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবার মাধ্যমে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: সপ্তম ও অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়কে ধরা হয় অন্ধকার অরাজকতার যুগ হিসেবে। একে মাৎস্যন্যায় হিসেবে অভিহিত করা হয়। সে যুগ শুরু হবার ঠিক আগের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এই বইতে। সে যুগের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় অবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে এই বইতে। বইটির নাম ❝মাৎস্যন্যায়❞ হলেও সে যুগের বিশেষ কোনো কথা লেখা নেই। বইটিতে প্রাধান্য পেয়েছে থানেশ্বর, কনৌজ, মালব, গৌড় রাজ্যের শাসনব্যবস্থার কথা, সে সময়ের রাজাদের যুদ্ধ, ক্ষমতার লড়াই উঠে এসেছে বইতে। রাজা শশাঙ্কের শাসনামল, রাজ্য পরিচালনায় তার দূরদর্শিতা ও কিছু ক্ষেত্রে তার কিছু নেগেটিভ দিক লেখক তুলে ধরেছেন। এতো কিছুর মাঝে লেখক উল্লেখ করেছেন এমন এক জ্ঞানপিপাসুর কথা যিনি কি না বর্তমান ইতিহাসে আবছা অবস্থায় টিকে আছেন। খুব কমই উল্লেখ আছে তার কথা। ব্যক্তিটি হলেন শীলভদ্র। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ছিলেন তিনি। বিভিন্ন রাজ্যের ঘটনার পাশাপাশি লেখক শীলভদ্রের জ্ঞানের দূরদর্শিতা ও মানুষের শ্রদ্ধাভাজন হবার ঘটনা গল্প আকারে তুলে ধরেছেন। চিত্রায়ন করেছেন তার ব্যক্তিগত জীবনকে। জ্ঞানের মোহে আচ্ছন্ন এক ব্যাক্তি তিনি। জাগতিক মোহ-মায়া ভুলে বুদ্ধের জীবনদর্শন নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন দীর্ঘ জীবন। লেখক ছোটো পরিসরের এই বইতে বেশ দক্ষতার সাথেই তুলে ধরেছেন দীর্ঘ ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো। সত্যি কথা বলতে এই বইটির ব্যাপারে জানার আগে আমার কাছে শীলভদ্র নামটি একেবারেই অপরিচিত ছিল। বইটির ব্যাপারে যখন জানলাম তখন হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম। কিন্তু ততদিনে বইটি আউট অব প্রিন্ট। অনেক চেষ্টা তরিবত করে স্বয়ং লেখকের সুবাদে বইটি নিজের সংগ্রহে নিয়ে নিই। আজ পড়ে শেষ করলাম। এক কথায় আমার বেশ লেগেছে। লেখকের সরল বর্ণনাশৈলি পড়তে খুব স্বাচ্ছন্দ্য লেগেছে। বইয়ের শেষে কিছু সংযুক্তি দেয়া আছে। ভালো লেগেছে (যদিও তিব্বতীয় অনুবাদে শীলভদ্রের বইয়ের কথা কিছুই বুঝিনাই 🥴)। যেহেতু শীলভদ্রের ব্যাপারে বইটি পড়ার আগে কিছু জানতাম না এবং ইতিহাসে উনার ব্যাপারে খুব বেশি কিছু নেই তাই বইতে লেখক ইতিহাসের যেসব ব্যাপার তুলে ধরেছেন তার প্রশ্ন তুলছি না। আশা করছি লেখক সঠিক তথ্যই তুলে ধরেছেন। শীলভদ্রকে নিয়ে বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ❝মহাস্থবির শীলভদ্র❞ থেকে লেখক তথ্য নিয়েছেন। সেটাই শহীদুল্লাহ মৃধা কর্তৃক রচিত ছিল। বইটি ২০১৮ সালে প্রথম প্রকাশ হয়। আমি গতবছর বইটির ব্যাপারে জানতে পারি। আর এ-ও জানতে পারি বেশিরভাগ পাঠকের কাছে বইটি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল নামের কারণে। অনেকেই নাকি শীলভদ্রের ব্যাপারটা ধরতেই পারেননি। আমি পড়ার সময় এমনটা মনে হয়নি। শীলভদ্রের ঘটনাগুলো লেখক নিজের ভাষায় বেশ ভালো ভাবেই তুলে ধরেছেন। যদিও আগে বইটি পড়ার আগেই শীলভদ্র নিয়ে জেনে গেছিলাম। তবুও মনে হয়েছে এটা বুঝতে খুব সমস্যা হবার কথা না। ফ্ল্যাপেই শীলভদ্রকে নিয়ে লেখা ছিল। বইটি ভারতীয় খোয়াবনামা প্রকাশনী থেকে ❝মহাস্থবির শীলভদ্র❞ নামে প্রকাশিত হয়েছে। গতবছর বাংলাদেশী উপকথা প্রকাশনী থেকেও একই নামে বইটি পুনঃপ্রকাশ পেয়েছে।
প্রচ্ছদ ও প্রোডাকশন: বইয়ের প্রচ্ছদ আমার খুবই ভালো লেগেছে। সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে বইয়ের প্রোডাকশন। বইপোকা এক বন্ধুর মুখে বইয়ের ব্যাপারে এবং এর প্রোডাকশনের ব্যাপারে জেনেই মূলত আমি বেশি আগ্রহী হয়েছিলাম বইটা সংগ্রহ করতে। ৯৫ পৃষ্ঠার ছোটো বইয়ের প্রোডাকশনের সব থেকে আকর্ষনীয় দিক হচ্ছে বইটির পৃষ্ঠাগুলো। শুনেছি বইটির পৃষ্ঠাগুলো প্রথমে প্রিন্ট করা হয়েছে। এরপরে লেখা ছাপানো হয়েছে। আর এই ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই দারুণ লেগেছে। বইটা হাতে পাবার পরে আমি বারবার পৃষ্ঠাগুলো এপাশ ওপাশ করছিলাম। এতো সুন্দর প্রোডাকশনের জন্য ❝বইপোকা প্রকাশনা❞ কে সাধুবাদ জানাতেই হবে।
“কে কাকে পরাজিত করবে? এই আঁধারি রাত, যে এই বর্তমান অবস্থান নিয়েছে চারপাশ জুড়ে? নাকি এই প্রদীপ, যে, “আমিই জয়ী” ভাব নিয়ে নিজের ক্ষুদ্র আয়োজনে আপন অস্তিত্বে ধরে রাখার চেষ্টা করছে?”
নিজেকে নিয়ে আমাদের কত অংহকার। আমরা খুজে ফিরি সব সময় প্রশান্তি, সুখ ও আমিত্বের জয়। তবে আমরা কতটা নিজেরদের চিনতে বা জানতে পেরেছি। আদৌ কি আমরা নিজেদের ভেতরে মানুষকে চিনতে পারি। কখন খোজার চেষ্টা করেছি আমার আমি কে। . পৃথিবীতে যুগের পর যুগের পরিবর্তন এসেছে। প্রতিটি যুগেই এমন কেউ এসেছেন যারা ইতিহাসের সাক্ষী হবার সাথে সাথে ইতিহাস রচনা করে গিয়েছেন। তাকে ঘিরেই যেন রচিত হয়েছে সব কিছু। তিনি যেন পৃথিবীর ইতিহাসের পথ পরিচালনা করেছেন। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গিয়েছে মানুষ শুধু সন্ধান করেছে এমন একজনের। অপেক্ষায় ছিল কেউ একজন আসবে যিনি সব কিছুর পরিবর্তন নিয়ে আসবে। হয়ত তখন পৃথিবীর অবস্থা অন্য রকম হয়ে যাবে। তেমন ই একজন ছিলেন মহাস্থবির শীলভদ্র। . মাৎস্যন্যায় শব্দটির উল্লেখ পাওয়া মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী চাণক্য বা কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ বইটিতে। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো মাছের মত কিংবা মাছের রাজ্যের মত। মাছের রাজ্যে ছোট মাছকে বড় মাছ গ্রাস করে। দুর্বলকে রক্ষার কোন বিধান সেখানে নেই। বলা যায় বিধানে এভাবেই লিখে রাখা হয়েছে। . প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে ভারতবর্ষের শাসন ব্যবস্থায় এমন এক পরিবর্তন আসে। অন্ধকার যুগ বা মাৎস্যন্যায় যেটা বলি আমরা। শুরু হয় অবিচার অন্যায় ও অস্থিতিশীলতা। কারণ তখন না কোন রাজা ছিল না কোন সম্রাট। বিচার দেয়ার করার মত বা ন্যায়বিচার পাবার মত কোন আশাই ছিল না। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার ছিল। আর সব কিছু হয়ে গিয়েছিল স্থবির। . ঠিক এই সময়ের আগমণের পূর্বের রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষাপট এবং সেই সাথে মহাবিহার নালান্দার তৎকালীন আচার্য শীলভদ্রের জীবনের উপর নির্ভর করে লেখা হয়েছে “মহাস্থবির শীলভদ্র”। এটি কোন আত্মজীবনী নয়, তবে ইতিহাস নির্ভর করে লেখা। . বইটিকে আমরা দুটি ভাগে ভাগ করে নিতে পারি। একটি আচার্য শীলভদ্রের জীবন এবং সেই সাথে তখনকার রাজা, রাজনীতি, যুদ্ধ, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি। মুলত এভাবেই বইটি লেখা হয়েছে। কিন্তু সব কিছু সুন্দর ভাবে এক সূত্রে গেথেছেন লেখক। . বাংলার এই মাৎস্যন্যায় শুরু হয় রাজা শশাঙ্ক এবং রাজা হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর। এরপরই শুরু হয় অরাজকতা এবং সেটা চলতে থাকে পাল বংশের প্রথম রাজা গোপাল এর রাজা হবার আগ পর্যন্ত। দুই রাজার মৃত্যু ও পাল বংশের শুরু হবার মধ্যখানি সময়কেই মাৎস্যন্যায় বলা হয়ে থাকে। . মহাস্থবির শীলভদ্র যিনি একাধারে মহাবিহার নালন্দার তৎকালীল আচার্য ছিলেন। তবে তিনি তার আগে একজন রাজপুত্র ছিলেন। তখন তিনি দান্তে ভদ্র নামেই পরিচিত ছিলেন। এরপর তিনি গৃহ ত্যাগ করে জ্ঞান অন্বষণে বেরিয়ে পরেন। সেই জ্ঞানের খোজ করতে গিয়ে তিনি পৌছে যান মহাবিহার নালন্দায় আচার্য ধর্মপালের কাছে। . "যখন সবাই তোমার প্রশংসা করবে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করবে। সাফল্যের পর নিজেই নিজের সমালোচনা করবে, এতে নিজের মধ্যে অহংবোধ তৈরি হবে না।"
আচার্য শীলভদ্র ধীরে ধীরে জ্ঞানের পরিধি ও জ্ঞান আহরণে নিজেকে নিমগ্ন করে ফেলেন। এতে করে তিনি সব কিছু থেকেই নিজেকে মুক্ত করে ফেলেন। আচার্য ধর্মপালও তাকে খুব পছন্দ করেন আর তার জ্ঞানের গভীরতায় মুগ্ধ হন। তাই ধর্মপাল মৃত্যুর সময় তাকে মহাবিহারের দায়িত্ব দিয়ে যান। . অপর দিকে তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে থাকার কারণে কখন কি হয় সেটা বোঝা না। রাজা শশাঙ্ক ও হর্ষবর্ধনের যুদ্ধবিগ্রহ অন্তর্দ্বন্ধ, একে অপর আক্রমণ ও রাজ্য দখলের নেশায় তারা যেন মত্ত হয়ে ছিল। তারা যেন সব সময় নিজেরদের রাজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিল আর ছিল রাজ্য জয়ের নেশা। তারা এতটাই নিজেদের নেশায় মত্ত ছিল ঠিক ভুলের হিসেবে তাদের কাছে একদম ছিল না। একে অপর কে পরাজিত করাই তাদের লক্ষ্য ছিল। ঠিক এমন সময়েই শশাঙ্কের দেখা হয় আচার্য শীলভদ্র এর সাথে। এরপরের দৃশ্যপট অনেক পালটে যায়। ধীরে ধীরে অনেক কিছুর পরিবর্তন আসে। . সময়ের সাথে সাথে মাৎস্যন্যায়ের সময় ঘনিয়ে আসে। আর সেই সাথে ঘনিয়ে আসে মহাস্থবির আচার্য শীলভদ্রের মুক্তির সময়। যাকে মহাশুন্য বা মহামুক্তিও বলা যায়। . আমার কাছে মনে হয় যদি নালন্দা কে ধ্বংস করা না হতো পৃথিবী অনেক মহামুল্যবান ও গভীর জ্ঞানের সন্ধান পেয়ে যেত। যা পৃথিবীর কল্যানের কাজেই আসত। তবে সেটা এখন ভেবে আর কি হবে। সময় ও যুগের পরিবর্তনের সাথে সব কিছুর একটা নির্দিষ্ট জীবন কাল থাকে। যেমন ছিল “মহাস্থবির শীলভদ্র” এর জীবন।