আত্মজীবনী অনেকেই লিখেছেন। আর যাদের আত্মজীবনী আমরা পড়ি, কোন না কোন ভাবে তারা 'বিখ্যাত' মানুষ। বিখ্যাত বলেই তাদের জীবনের কথা আমরা জানতে চাই। সে লেখায় তাদের জীবনের কথা আসে। আসে ছেলেবেলা, যৌবনের স্মৃতি এবং তাদের কাজের ক্ষেত্র। সেই সঙ্গে আমরা জানতে পারি লেখকের সঙ্গে জড়িত আরও অনেক মানুষের সম্পর্কে। তারা হয়ত সুপরিচিত কিংবা অপরিচিত।
গুণী ব্যক্তিদের কলমে, ভাষায় সেই অপরিচিত মানুষেরা হয়ে ওঠেন আমাদের কাছের মানুষ। আর পরিচিত মানুষদের জানা যায় নতুন করে। সেই সাথে লেখকের সময়ের সঙ্গে আমাদের একটা যোগাযোগ ঘটে। এতকিছু মাথায় রেখেই বেশীরভাগ পাঠক আত্মজীবনী হাতে নেয়। আর ব্যক্তিগত স্মৃতি হওয়ার কারণে লেখকেরাও বড় মায়া, যত্ন নিয়ে লেখেন। পড়লেও ভালো লাগে।
বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ অশোক মিত্র। শিল্পকলার উপরেও কাজ করেছেন প্রচুর। জন্ম দেশবিভাগ পূর্বে, বর্তমান বাংলাদেশে। বেড়ে ওঠাও এই ঢাকা শহরে। তারপর কলকাতায় চলে যাওয়া এবং দেশবিভাগের পর ভারতে স্থায়ী হওয়া। জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে শব্দজোড়া নিয়ে আত্মজীবনীর নাম, ‘আপিলা-চাপিলা’।
এমন একজন মানুষের আত্মজীবনী থেকে আমাদের প্রত্যাশা থাকে তিনি যখন লিখবেন তার ছেলেবেলা নিয়ে, তার সঙ্গে আমরাও সেই ফেলে আসা ঢাকা শহরটা ঘুরে দেখবো। তার কাছ থেকে জানবো সেই সময়ের কথা।
কিন্তু অশোক মিত্রের ‘আপিলা-চাপিলা’ সে প্রত্যাশা পূরণ করে না। তার ছেলেবেলা, ঢাকা, সেই সময়ের উত্তাল অবস্থা সবই এসেছে লেখায় কিন্তু সেখানে কোন গভীর পর্যবেক্ষণ তো নেই-ই, লেখক সময় নিয়েও কিছু বলেননি। বরং শুরু থেকে তিনি বলে যান একের পর এক তার আশেপাশে দেখা ঘটনা, অবস্থা ইত্যাদি এবং তা এতো দ্রুত এবং একের পর এক এতো নাম আসে যে কোনকিছুই মনে ছাপ ফেলে না।
পুরো বইটিই এরকম। আড্ডাবাজ লেখক কফি হাউজ থেকে শুরু করে হিল্লি দিল্লী যেখানেই গেছেন, মিশেছেন প্রচুর মানুষের সাথে। লেখায় তাদের কথাই এসেছে বারবার। কিন্তু কাউকেই আমরা পুরোপুরি দেখি না। কেবল নামটাই জানতে পারি। বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ, গৌরকিশোর ঘোষ প্রমুখ সাহিত্যিকদের নাম এসেছে, লিখেছেন দু’ কলম কিন্তু এর বেশি কিছু না।
সম্ভবত ‘রাজনীতিবিদ’ অশোক মিত্রর জন্য খোলাখুলি অনেক কথা লেখা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি কেবল নিজের দেখা মানুষ আর ঘটনা সম্পর্কে কেবল ‘বলে গেছেন’। কোথাও তিনি গভীরে যাননি। আরেকটি বিষয় হলো বইয়ে প্রচুর ‘আমি’ দেখা যায়, যদিও তা অহংকারের আমিত্ব না, কিন্তু পাঠের ক্ষেত্রে তা মোটেও সুখপাঠ্য নয়। বরং অগণিত নাম (কিছু কিছু ক্ষেত্রে নাম উল্লখিত ব্যক্তি সম্পর্কে দ্বিতীয় কোন কথা নেই), এবং ঘটনার পরপর বয়ান পাঠ একঘেয়ে হয়ে দাঁড়ায়।
আনিসুজ্জামানের ‘বিপুলা পৃথিবী’-র সঙ্গে অশোক মিত্রের ‘আপিলা-চাপিলা’র মিল পাই। কথা হলো, এহেন বইটা এতো বিখ্যাত কেন সেটা পুরোপুরি বুঝলাম না। সময়ের দলিল এখানে নেই। নেই স্মৃতিভারের বিষণ্ণতার মন কেমন সুখ। লেখক নিজে তার গদ্যের প্রশংসা করলেও বলতে হয় ‘আপিলা-চাপিলা’র গদ্য এমন কিছু সুখপাঠ্য নয়। হয়ত, বিখ্যাত মানুষের আত্মজীবনী বলেই বইটাও বিখ্যাত।