শহরের নাম ঢাকা। ‘ত্রিশের দশকের ঊষালগ্নে আমার বয়স দুই কিংবা তিন।’ শৈশব এগিয়ে চলে সেই শহরে, গোল্লাছুট আর কানামাছির অমল শৈশব। তারপর একদিন আর্মেনিটোলা স্কুল। শৈশব থেকে কৈশোর। স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ অধ্যায়। দাঙ্গা। মন্বন্তর। দেশভাগ। ওদিকে ‘আমরা স্কুলের উঁচুক্লাসে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত বিপ্লবের কথা শুনতে শুরু করেছি।’ এইভাবেই পাতায় পাতায় পর্ব থেকে পর্বান্তরে উন্মোচিত হয় এক বহুমাত্রিক মানুষের বর্ণময় জীবনের কাহিনি। ‘আপিলা-চাপিলা’ এই মানুষটির এলোমেলো ইতস্তত বিচ্ছিন্ন জীবনচর্যার উপাখ্যান। নিজেকে ঘোর অপছন্দ করেন, নিজের গোটা জীবনটাকেও, কিন্তু সেই কবুলতি থেকে নিজেকে তিনি বঞ্চিত করেননি। সেই শৈশবে শুনেছিলেন একটি গ্রাম্য ছড়া ‘আপিলা-চাপিলা ঘন-ঘন কাশি, রামের হুঁকো শ্যামের বাঁশি...।’ সেই ছড়াটিই অবচেতনার স্তর থেকে বেরিয়ে এসে লেখকের চেতনায়, সত্তায় যেন মিশে গেছে। ‘এখন মনে হয় গোটা জীবনটাই ছড়াটির মতো। যতগুলি পর্ব পেরিয়ে এসেছি, বেশির ভাগই ঝাপসা কুয়াশায় আবৃত, কোনও-কোনও মানুষজন-ঘটনার কথা মনে পড়ে। অনেক কিছু পড়ে না।’ এই স্মৃতিকথা ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মকথন নয়, আবার নিছক একটি বিশেষকালের বিশ্লেষণ-সম্পৃক্ত রাজনৈতিক বৃত্তান্তও নয়। দেশ, কাল, সমাজ, একাকী ও যূথবদ্ধ মানুষ, বিত্তশালী-মধ্যবিত্ত-বিত্তহীন মানুষ, সমসময়ের কাব্য-সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতি ইতিহাস— সব মিলিয়ে এক বিরাট প্রেক্ষাপটে বিধৃত আত্মকাহিনি। আবার আত্মকথা হয়েও ‘আপিলা-চাপিলা’ বহু মানুষের জীবনকথা। এই মানুষ পথিক মানুষ, পদাতিক মানুষ, কবিতা থেকে মিছিলের অসংখ্য সাধারণ মানুষ। যাঁরা সহস্র প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যুগ যুগ ধরে ইতিহাস লিখে চলেছেন। আত্মকথার সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে ‘আপিলা-চাপিলা’ এক ব্যাপ্ত সময়ের কণ্ঠস্বর। লেখকের মানসিকতা আপাতবিচারে বিষণ্ণ নাস্তিকতায় সমাচ্ছন্ন, তা হলেও হয়তো এই বৃত্তান্তের মধ্যেই একটি বিশেষ জীবনদর্শন নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছে। দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময় ‘আপিলা-চাপিলা’ পাঠকমহলে তুমুল আলোড়ন তুলেছে যেমন, তেমনই আবার সত্যভাষণের উজ্জ্বল স্বাতন্ত্রে এবং হারানো দিন আর হারানো মানবজনের স্মৃতি উসকে দেওয়ার মরমি মানবিকতায় বহুজনের কাছে সমাদৃত হয়েছে। সেই শাণিত তর্কমুখর, অকপট আত্মকথন এবার গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল।
Ashok Mitra (10 April 1928 – 1 May 2018) was an Indian economist and Marxist politician. He was a chief economic adviser to the Government of India and later became finance minister of West Bengal and a member of the Rajya Sabha.
After completing his graduation from the University of Dacca, he came to India following the partition of India in 1947. Although he attended postgraduate classes in economics at the University of Calcutta, he was refused admission there. He moved to Banaras Hindu University where he earned an M.A. in economics. He joined the newly established Delhi School of Economics in the early 1950s. Later, he attended the Institute of Social Studies in the Netherlands. Under the guidance of Professor Jan Tinbergen of the University of Rotterdam, he was awarded a doctorate in economics there in 1953.
Mitra taught as a lecturer in economics at the University of Lucknow for two years before proceeding to the Netherlands to complete his Ph.D. thesis. He taught at the UN Economic Commission for Asia and the Far East in Bangkok, Thailand before returning to Delhi in 1961. He joined the Economic Development Institute in Washington, DC, as a faculty of economics during the early 1960s. He also worked for the World Bank in the 1960s. In the early-1990s he became the chairman of the Centre for Studies in Social Sciences, Calcutta.
After returning to India he accepted the professorship in economics at the newly established Indian Institute of Management Calcutta. He was the chief economic adviser and later chairman of the Agricultural Prices Commission, both of the Government of India. He was finance minister of West Bengal from 1977–87. In the mid-1990s he became a member of the Rajya Sabha and was chairman of the Parliament's Standing Committee on Industry and Commerce.
He authored the "Calcutta Diary" in Economic and Political Weekly and "Terms of Trade and Class Relations". He contributed articles regularly to the Calcutta-based national daily newspaper, The Telegraph. He also wrote short stories in Bengali. He was conferred the Sahitya Academi Award in 1996 for his Esseys entitled Tal Betal. His publications include China-Issues in Development and From the Ramparts, Prattler's Tale: Recollections of a Contrary Marxist (which has also been published in Bengali as Apila Chapala).
He founded a journal entitled Arek Rakam.
Mitra was married to Gouri, who died aged 79 in May 2008. He died on 1 May 2018 at the age of 90. Ashok Mitra is survived by his only sibling, Sreelata Ghosh(nee Mitra),sister.
ইন্টারেস্টিং, ইনফরমেটিভ কিন্তু ঠিক প্রত্যাশিত মাপের সুখপাঠ্য নয়। আমি বেসিক্যালি বাঙালনামা গোছের মাস্টারপিস আশা করেছিলাম।
উল্লেখযোগ্য সংযোজন বুদ্ধদেব বসু ও কবিতাভবন নিয়ে বিপরীত মত জানা। জীবনের জলছবি এবং আমাদের কবিতাভবন পড়ে ধারণা হয়েছিল নরেশ গুহ, অশোক মিত্র বু.বসুর একনিষ্ঠতম শিষ্য, আদতে প্রগাঢ় শ্রদ্ধার সঙ্গে মতানৈক্যও ছিল শনৈ শনৈ।
তেমনি জানা প্রাচ্যের সুনাম এবং স্বনামধন্য ঢাবির ইতিহাস, সাহিত্যরাগ, বিশেষত কবিতাপ্রেম, দেশ ও বিদেশ ভ্রমণবন্দী, নেহরু তনয়া এবং ইন্দিরা গান্ধী তনয়দের স্বেচ্ছাচারিতার অজানা গল্প, সমর সেন কিংবা ব্যক্তি জীবনানন্দ, বন্ধুকৃত্য এবং ক্ষয়, নকশাল আন্দোলনের এপিঠ-ওপিঠ, বামপন্থী রাজনীতি ও প্রচলিত ঘরানার আমলাতান্ত্রিকতা.... সবই হাজির।
অনুপস্থিত একান্ত ব্যক্তিগত জীবন ও ভাবনা, এমনকি জীবনসঙ্গীনি, নামটিও যাঁর অনুচ্চারিত, সজ্ঞানে।
" অথবা যেসব নাম ভালো লেগে গিয়েছিল: আপিলা-চাপিলা" - জীবনানন্দ দাশ
অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ অশোক মিত্রের সুদীর্ঘ কালযাপনের বয়ান "আপিলা চাপিলা"। অশোক মিত্রের আত্মকথা একইসাথে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের এক মন্ত্রীর ও এক অর্থনীতিবিদের স্মৃতিচারণ। যার সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ, পুরান ঢাকা, অবিভক্ত ভারতবর্ষ আর ঢাবি আর ভারতের রাজনীতির নানা দিক নিয়ে অশোক মিত্রের একান্তই আপনার ভাবনা।
পুরান ঢাকায় জন্মেছিলেন অশোক মিত্র। গেল শতাব্দীর ত্রিশের দশকের ঢাকার স্মৃতির আছে অনিন্দ্য সুন্দর বর্ণনা। সেই সাথে দেশভাগপূর্ব ঢাকার বেশিরভাগ বাঙালি মুসলমানই যে রীতিমত বস্তিতুল্য পরিবেশে বাস করত তা স্বীকার করতে ভোলেন নি। লিখেছেন ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল ও বিভিন্ন বিপ্লবী দলে ঢাকার তরুণপ্রজন্মের অংশগ্রহণের ইতিহাস।
স্কুল-কলেজের পাঠ চুকানোর পর্যায়ে তৎকালীন পাঠক্রম নিয়েও ধারণা পেলাম। শিক্ষকরা কতটা আন্তরিক ছিলেন তা বারবার বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন। আর স্কুলে পড়তে গিয়েই প্রথম উপলব্ধি করেন সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ।যারা ছিল সুহৃদ, হঠাৎ তাদের সাথে তৈরি হতে থাকে অশুভ প্রতিযোগিতার পরিবেশ। তিনি অবশ্য অপর সম্প্রদায়ের তা দেখেছেন। নিজ কউমের রূপ হয়তো লক্ষ করেন নি, নতুবা এড়িয়ে গেলেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন অশোক মিত্র। বাবা ঢাবির শিক্ষক ছিলেন। তাই বাড়িতে আবহটা আগে থেকেই অনুকূল ছিল। প্রবাদপ্রতিম শিক্ষকরা অর্থনীতি বিভাগকে আলোকিত করেছেন। তাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। সত্যি বলতে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চিত্রের ভালো বিবরণ দেন নি অশোক মিত্র। বরং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথার চেয়ে তিনি ঢের বেশি লিখেছেন কলকাতার বিখ্যাত কফি হাউসের অফুরন্ত আড্ডার কথা। যখনই ফুরসত পেতেন, ছুটতেন কলকাতায়। আত্মীয়পরিজনের বাড়িতে রাত্রিকালীন আবাস হলেও দিন কাটত তরুণ তুর্কিদের সাথে কফি হাউজে। সাহিত্যের সব রথী-মহারথীদের নিয়ে অনেক স্মৃতি হাতড়ে বেরিয়েছেন অশোক মিত্র।
অর্নাস করে আসলেন আবারো কলকাতায়। এদিকে দেশভাগ হয়ে গেছে। চাইলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করবেন।ঢাবিতে ফাস্টক্লাস ফাস্ট হয়েছিলেন। অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন ঢাবি থেকে পড়েছেন বলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মাস্টার্স করার সুযোগ দিল না। তবুও কিছুদিন লুকিয়ে ক্লাস করেছিলেন। প্রশ্ন তুলেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে।
বেকার বসে না ভর্তি হলেন হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোনোমতে সেখানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে গবেষণা করার সুযোগ পান সদ্য প্রতিষ্ঠিত দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিকসে। সেখানকার পরিবেশ নিয়ে যেমন খুঁটিনাটি বর্ণনা আছে, তেমনি আছে লক্ষ্নো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবার স্মৃতি। ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কথা। এরপর পিএইচডি করতে গেলেন নেদারল্যান্ডে। সেখানকার স্মৃতি পাঠক হিসেবে আমাকে অভিভূত করেছে। দেশে ফিরে ধীরে ধীরো বামপন্থার দিকে ঝুঁকলেন। ইকনমিক উইকলিতে লিখতে শুরু করেন। নেহেরুর শাসনকালের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে চীন-ভারত যুদ্ধে কতটা ভারতই দায়ী ছিল তাদের অসংবেদনশীল ভূমিকার জন্য তা লিখেছেন। পাক-ভারত যুদ্ধের কথা, কমিউনিস্ট পার্টির বিভক্তি, নকশালবাড়ি আন্দোলনের হঠকারিতা নিয়ে লিখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় অশোক মিত্র ছিলেন ইন্দিরা গান্ধির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তিনি দাবি করেছেন তাজউদ্দীন আহমদের আগেই দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধির সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের দুই প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমান ও রেহমান সোবহানের সাথে (অবশ্য আর আটদশটি ভারতীয়র মতো তিনিও নামের বিকৃতি ঘটিয়েছেন। রেহমান সোবহানকে লিখেছেন রেহমান সোভান বলে)। তাঁর মতে, এই দুই বুদ্ধিজীবির সাথে দেখা হওয়ার পরপরই ইন্দিরা গান্ধি সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশকে সাহায্য করবেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর অশোক মিত্র বাংলাদেশে এসেছিলেন বাহাত্তরের শেষে। তিনি এ সম্পর্কে যা লিখেছেন তাতে দুইটি বিষয় লক্ষ করার মতো । এক. বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত বিরোধিতা মহীরূহ আকার ধারণ করছিল। দুই. সাতচল্লিশ বা তার আগেই যেসব বাঙালি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাদের একটি বৃহৎ অংশ মনে করতে শুরু করল বাংলাদেশ বুঝি তাদের দ্বিতীয় গৃহ। তিন. ইন্দিরার উপদেষ্টা ডি পি ধরের নেতৃত্বে একদল আমলার এদেশ নিয়ে অতিউৎসাহী মনোভাব। এই তিনটিই বেশ গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্ক বুঝতে।
একাত্তরে বিজয় ইন্দিরা গান্ধিকে করে তুলেছিল স্বৈরমনস্ক। তাঁর মন্ত্রিসভা, সংসদে তিনি রীতিমত পূজিত হতে লাগলেন। এতেই ক্ষমতারোগে কিভাবে আক্রান্ত হলেন ইন্দিরা তা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ লিখেছেন অশোক মিত্র। 'ইন্দিরা যা বলবেন তাই হবে ', 'তাঁর মতো নেতা হয় না ' মনোভাব নিজ দলে বিরাজ করতে লাগল। তিনি এতদিন বামপন্থীদের প্রতি নরম মনোভাব রেখে নানা রাজনৈতিক ফায়দা নিলেও এবার পুরোপুরি ঘুরে গেলেন। পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য রাজ্যে বাম নিধন শুরু করলেন। দেশে জারি করলেন জরুরি অবস্থা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশে কিভাবে গণতন্ত্রকে টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল তা প্রত্যক্ষ করেছেন অশোক মিত্র। এই বিরোধীদল নিধনের ঘটনাগুলো পড়তে গিয়ে হঠাৎ মনে দ্বিধা জাগলো। তখনই আমার মনে পড়ল অশোক মিত্র তো ঘোরতর বাম মতাদর্শে বিশ্বাসী তিনি ইন্দিরা শাসনামলকে কতটা যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। এই প্রশ্নটির কিন্তু সমাধা হল না।
জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে নির্বাচনের পর গো হারা হারে কংগ্রেস। এই প্রথম দীর্ঘকাল কেন্দ্রে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ল দল���ি। অশোক মিত্রের জবানি পড়লে এর কারণ মনে হয় দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকায় কংগ্রেস নিজেদের জনগণ থেকে সরিয়ে নিয়েছিল। দলীয়প্রধান হতে উঠেছিলেন বিরোধীদল নিধনযজ্ঞের পুরোহিত।
জয়প্রকাশ নারায়ণসহ সিনিয়র নেতাদের এই জোটসরকার বেশিদিন কেন্দ্রে টেকেনি। আবারো মঞ্চে ইন্দিরা। ততদিনে অশোক মিত্র জ্যােতির্ময় বসুর সিপিএমের সাথে একাত্মা পোষণ করেছেন। সাতাত্তরের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বামদের অবিস্মরণীয় জয়ের পর ক্ষমতা গ্রহণ। অশোক মিত্রের রাজ্যের অর্থমন্ত্রী হিসেবে অভিজ্ঞতার দীর্ঘ খু্ঁটিনাটি বিবরণ পাঠক হিসেবে অনেকক্ষেত্রে অহেতুক মনে হয়েছে।
ততদিনে মঞ্চ থেকে ইন্দিরার বিদায়, 'সহানুভূতি ' ভোটে রাজিবের আগমন, তাঁরও বিদায় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নানা ঘোলাটে রাজনীতির ইতিহাস জানতে পারলাম অশোক মিত্রের কল্যাণে। বামফ্রন্ট সরকারও কীভাবে অন্যান্য সরকারের মতই আয়েশি হয়ে পড়ল তা লিখেছেন অশোক মিত্র। জ্যােতিবসু ও দলের সাথে মতদ্বৈততা এবং নির্বাচনে পরাজয়সহ নানা কারণে অশোক মিত্র সরে যান সরকার থেকে। প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে। মমতার কাছে ২৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর কেন বামফ্রন্টের পতন ঘটল তা নিয়ে ধারণা নেই। তবে বামফ্রন্ট সরকারের পতন কেন অবশ্যাম্ভাবী ছিল তা অশোক মিত্রের লেখা থেকেই পাই।
৩৮০ পাতার এই বইটি নানা অঙ্গনকে স্পর্শ করে গিয়েছে। তবুও বলব অশোক মিত্রের আত্মজৈবনিক এই গ্রন্থে ন্যূনতম আত্মসমালোচনা নেই, বরঞ্চ আছে আত্মপক্ষ অবলম্বন এবং অশোক মিত্রের ঘোরতর আত্মলোচনা কেন্দ্রীক মনোভাব।
আত্মজীবনী অনেকেই লিখেছেন। আর যাদের আত্মজীবনী আমরা পড়ি, কোন না কোন ভাবে তারা 'বিখ্যাত' মানুষ। বিখ্যাত বলেই তাদের জীবনের কথা আমরা জানতে চাই। সে লেখায় তাদের জীবনের কথা আসে। আসে ছেলেবেলা, যৌবনের স্মৃতি এবং তাদের কাজের ক্ষেত্র। সেই সঙ্গে আমরা জানতে পারি লেখকের সঙ্গে জড়িত আরও অনেক মানুষের সম্পর্কে। তারা হয়ত সুপরিচিত কিংবা অপরিচিত।
গুণী ব্যক্তিদের কলমে, ভাষায় সেই অপরিচিত মানুষেরা হয়ে ওঠেন আমাদের কাছের মানুষ। আর পরিচিত মানুষদের জানা যায় নতুন করে। সেই সাথে লেখকের সময়ের সঙ্গে আমাদের একটা যোগাযোগ ঘটে। এতকিছু মাথায় রেখেই বেশীরভাগ পাঠক আত্মজীবনী হাতে নেয়। আর ব্যক্তিগত স্মৃতি হওয়ার কারণে লেখকেরাও বড় মায়া, যত্ন নিয়ে লেখেন। পড়লেও ভালো লাগে।
বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ অশোক মিত্র। শিল্পকলার উপরেও কাজ করেছেন প্রচুর। জন্ম দেশবিভাগ পূর্বে, বর্তমান বাংলাদেশে। বেড়ে ওঠাও এই ঢাকা শহরে। তারপর কলকাতায় চলে যাওয়া এবং দেশবিভাগের পর ভারতে স্থায়ী হওয়া। জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে শব্দজোড়া নিয়ে আত্মজীবনীর নাম, ‘আপিলা-চাপিলা’।
এমন একজন মানুষের আত্মজীবনী থেকে আমাদের প্রত্যাশা থাকে তিনি যখন লিখবেন তার ছেলেবেলা নিয়ে, তার সঙ্গে আমরাও সেই ফেলে আসা ঢাকা শহরটা ঘুরে দেখবো। তার কাছ থেকে জানবো সেই সময়ের কথা।
কিন্তু অশোক মিত্রের ‘আপিলা-চাপিলা’ সে প্রত্যাশা পূরণ করে না। তার ছেলেবেলা, ঢাকা, সেই সময়ের উত্তাল অবস্থা সবই এসেছে লেখায় কিন্তু সেখানে কোন গভীর পর্যবেক্ষণ তো নেই-ই, লেখক সময় নিয়েও কিছু বলেননি। বরং শুরু থেকে তিনি বলে যান একের পর এক তার আশেপাশে দেখা ঘটনা, অবস্থা ইত্যাদি এবং তা এতো দ্রুত এবং একের পর এক এতো নাম আসে যে কোনকিছুই মনে ছাপ ফেলে না।
পুরো বইটিই এরকম। আড্ডাবাজ লেখক কফি হাউজ থেকে শুরু করে হিল্লি দিল্লী যেখানেই গেছেন, মিশেছেন প্রচুর মানুষের সাথে। লেখায় তাদের কথাই এসেছে বারবার। কিন্তু কাউকেই আমরা পুরোপুরি দেখি না। কেবল নামটাই জানতে পারি। বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ, গৌরকিশোর ঘোষ প্রমুখ সাহিত্যিকদের নাম এসেছে, লিখেছেন দু’ কলম কিন্তু এর বেশি কিছু না।
সম্ভবত ‘রাজনীতিবিদ’ অশোক মিত্রর জন্য খোলাখুলি অনেক কথা লেখা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি কেবল নিজের দেখা মানুষ আর ঘটনা সম্পর্কে কেবল ‘বলে গেছেন’। কোথাও তিনি গভীরে যাননি। আরেকটি বিষয় হলো বইয়ে প্রচুর ‘আমি’ দেখা যায়, যদিও তা অহংকারের আমিত্ব না, কিন্তু পাঠের ক্ষেত্রে তা মোটেও সুখপাঠ্য নয়। বরং অগণিত নাম (কিছু কিছু ক্ষেত্রে নাম উল্লখিত ব্যক্তি সম্পর্কে দ্বিতীয় কোন কথা নেই), এবং ঘটনার পরপর বয়ান পাঠ একঘেয়ে হয়ে দাঁড়ায়।
আনিসুজ্জামানের ‘বিপুলা পৃথিবী’-র সঙ্গে অশোক মিত্রের ‘আপিলা-চাপিলা’র মিল পাই। কথা হলো, এহেন বইটা এতো বিখ্যাত কেন সেটা পুরোপুরি বুঝলাম না। সময়ের দলিল এখানে নেই। নেই স্মৃতিভারের বিষণ্ণতার মন কেমন সুখ। লেখক নিজে তার গদ্যের প্রশংসা করলেও বলতে হয় ‘আপিলা-চাপিলা’র গদ্য এমন কিছু সুখপাঠ্য নয়। হয়ত, বিখ্যাত মানুষের আত্মজীবনী বলেই বইটাও বিখ্যাত।
সেই অপহৃত আদর্শ উদ্ধার না করে আমরা ছাড়ব। যদিও আপনার মতন বামপন্থী নই, অশোক মিত্র, তবুও বলছি। সেই আদর্শেই প্রাণাতিপাত করব, নিতান্ত ব্যক্তিগত বৃত্ত থেকে হলেও। মুক্ত বাজারের বিনাশ করে সত্যিকারের বিশ্বায়ন করতেই হবে। তোতা পাখির মতন 'গ্লোবালাইজ়েশন ইজ় আ ব্লিস' আওড়াব না।
অশোক মিত্র ঢাকাইয়া পোলা, দেশভাগের সময় প্রাণ বাঁচাতে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পশ্চিম বঙ্গে আশ্রয় নেয়। আমার এই ধরনের লেখকদের বই পড়তে ভালো লাগে। যদিও অশোক মিত্র ছিলেন অর্থনীতিবিদ কাম কমুনিস্ট রাজনীতিবিদ তবুও লেখার হাতও ছিল অসাধারণ যা বর্তমানে অবিশ্বাস্য তো বটেই এবং অসম্ভবও। যাইহোক, প্রথমার্ধ এক নিঃশ্বাসে শেষ কিন্তু শেষ দিকে এসে রাজনৈতিক আলাপচারিতা ভালো লাগলো না তাই শেষ করতেও বিলম্ব হয়েছে। তবুও এই লেখকের কাছে কৃতজ্ঞ, অনেক অশ্রুত বিস্মরণের অতলে নিমজ্জিত লেখকের সন্ধান পেলাম যারা সমসাময়িক সময়ে পরিচিত মুখ ছিলেন। এদের সবার নাম যে প্রথম শুনেছি তা নয়, অনেকের আত্মজীবনীতেই এদের নাম ঘুরেফিরে আসে। এসব লেখকের বই হার্ডকপি কিনতে গেলে না খেয়ে মরতে হবে তাই সফ্ট কপি খুঁজে বেড়াই,তবে ইন্টারনেটে সব বই পাওয়া যায় না, এটা যেমন পেয়েছি।
আমার জন্ম এই একবিংশ শতাব্দীতে, তাই এইসব বই যখন পড়ি বন্ধুরা বলে এসব মান্ধাতা আমলের বই কেন পড়ি আর এর হদিসও বা পাই কোথায়! কিমাশ্চর্যম!
অশোক মিত্রের স্মৃতিচারণে, হয়তো লেখকের অনিচ্ছাসত্ত্বেও, তিক্ততা আর অম্লতার দখল বেশি। তারপরও তাঁর কলমের গুণে তরতরিয়ে পড়া যায়। ক্ষমতাবান বাঙালির মনে প্রচ্ছন্ন আর প্রকট জমিদারপনা আর তাদের-ঘিরে-জড়োদের মাঝে 'দক্ষতা বনাম বশ্যতা'র দ্বন্দ্ব, এই দুই ঘুণকে তিনি চিহ্নিত করেছেন পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির ক্ষয়ের জন্যে, যার তিনি অসহায় সাক্ষী। মিত্রসাহেবের আদর্শের অনুসারী না হয়েও পাঠক তাঁর কষ্ট আর ক্ষোভ অনুভব করবেন। প্রমত্তা নদীর অদূরে মানুষ যেমন নিষ্ফল দু���শমনীয় সার্বক্ষণিক যাতনায় ভুগে ক্রমশ নিজের চেনা প্রতিবেশকে ক্ষয়ে বিলীন হয়ে যেতে দেখে, লেখক পশ্চিমবঙ্গ আর ভারতের আর্থরাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সেভাবে দেখেছেন।
অননুকরণীয় গদ্যে সাজানো আত্মজীবনী। ঔপনিবেশিক আমলের ঢাকা তথা পুব বাংলা, অর্থনীতিশাস্ত্রের বিবর্তন, চল্লিশের দশকের প্রগতিবাদী শিল্পীমহল, ইন্দিরা সরকার থেকে বাম শাসনের নীতি নির্ধারণের ইতিবৃত্ত, উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশভাবনার আদল, শেষ ষাট ও প্রথম সত্তর দশকের ধারাপাত, বাম সরকারের ভেতরের ঘুণ-সংক্রান্ত ইনসাইডার জবান ইত্যাকার প্রসঙ্গে আগ্রহী, তাঁরা অবশ্যই নেড়েচেড়ে দেখবেন। সঙ্গে, চমৎকার কিছু চরিত্রের উপস্থাপনা, সেকালের বাঙালি ভদ্রলোকের ফুরফুরে হাওয়া।
সমস্যা, আমার কাছে, অন্যত্র। বড় ক্লান্তিকর ঠেকে এক এক সময়। বড় বেশি বিশ্লেষণী, ঐতিহাসিক আকর হওয়ার দিকেই যেন বইয়ের প্রধান ঝোঁক। নাম-উপনামের হাজারো মিছিলে তালগোল গুলিয়ে ওঠে এক এক সময়ে, অন্তত কোনও অনুজ পাঠকের পক্ষে তো বটেই। লেখকের নিজস্ব আত্মা, আর বড় সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার একান্ত নির্জন ব্যক্তিগত হয়ে-ওঠার দিকে দৃষ্টিপাত, হতাশাজনক ভাবে কম।
অশোক মিত্র বলেছিলেন, তিনি ভদ্রলোক নন, কমিউনিস্ট। এ' বই পড়ার পরেও পুরোনো মতে স্থিত থাকলাম যে তিনি আদতে প্রথম বর্গেরই মানুষ ছিলেন। বাকিটুকু, বাঙালি ভদ্রলোকের যেমন হয় আর কী: আত্মসম্পাত।
গোটা স্মৃতিকথাতে এমন অনেক আপাত নিরীহ বা ক্ষুদ্র কথা আছে যা সময়কে বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার এমন অনেক কথা আছে যা এই বইতেই পাওয়া যাবে।তখনকার ছোট শহর ঢাকা, বাংলা সাহিত্যের মর্ডানিজমের কান্ডারিদের সঙ্গে পরিচয়, সদ্য স্বাধীন ভারতের কলকাতা তথা দেশ, নেহেরুভিয়ান সমাজতন্ত্রের অধীনে থাকা এক শুষ্ক সময়, তৎকালীন বিশ্ব কমিউনিজম সম্পর্কে অনেক খন্ড তথ্য, ভয়ঙ্কর ইমারজেন্সি, পরবর্তী রাজনীতি জীবন- সব মিলিয়ে খুবই বৈচিত্রময় জীবনী। লেখক যতটা চেয়েছে তিনি পাঠকের কাছে নিজের জীবনের আশেপাশে সম্পর্কে মেলে ধরবেন ততটাই লিখেছেন। সময়ে সময়ে মনে হয়েছে যে পাঠকের যতটা জানার আগ্রহ ঠিক ততটাই লিখেছেন। এতে সুবিধা হয়েছে, সমগ্র জীবনীটা অহেতুক কথাতে ভরে ওঠেনি। লেখকের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তথ্য কম, তবে এই স্বাধীনতা তিনি নিতেই পারেন। লেখকের গদ্য ভালো।