বিশিষ্ট কবি শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের 'কবিতাসমগ্র' সর্বার্থেই স্বতন্ত্র। অর্ধশতাব্দী-অতিক্রান্ত কবিজীবনের সমস্ত শস্যে পাঠকের ডালি পূর্ণ, তবু এই কবি বলেন, "নিজেকে নিংড়োলে যত রক্তপাত— পাঠক চণ্ডাল/চায় তার চেয়ে ঢের বেশি।" প্রখর, অভিমানী, স্পষ্টবক্তা শরৎকুমারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'সোনার হরিণ' প্রকাশিত হয় ২৫ বৈশাখ ১৩৬৪ বঙ্গাব্দে। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কবিদের সঙ্গে প্রবল উন্মাদনায় শাসন করেছেন মধ্যরাত, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে উঠে এসেছে অস্থির বেদনার কথাই— "বন্ধুরা কোথায় আছো এখনি দুয়ার বন্ধ হবে/বন্ধুরা কোথায় শোনো, এখনি দুয়ার বন্ধ হবে/গরল হরণে চলো ট্যাক্সিওলা...", কিন্তু শরৎকুমার মূলত বিরাজ করেছেন নিঃসঙ্গতায়— "তেমন গভীর কোনো কষ্ট নেই, চন্দ্রালোক নেই, যাতে মরতে সাধ হয়..."। প্রেমহীনতার, দুঃখহীনতার কথা যিনি বলেন, তিনি সন্ধান করেন প্রেম আর দুঃখের প্রকৃতকেই। কবির নির্মম বিদ্রূপগুলির মর্মে আছে কান্নাভেজা এক চরাচর। "দুঃখ, এই শব্দটির মাঝখানে অশ্রুপতনের চিহ্ন দেখে মনে হয়, চিরদুঃখিনী বাংলাদেশ, আনন্দে ফেটে পড়বে এমন নিটোল একটিও শব্দ নেই তোমার!" অভিনব এক কবিদৃষ্টি মেলে তিনি দেখেন পৃথিবীর চারপাশ, আপাততুচ্ছকে দেন অদ্ভুত ব্যাপ্তি। তিনি মনে করেন, "পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে মানুষের সূক্ষ্ম এবং বিস্ময়কর সম্পর্ক আছে।" এইসব সম্পর্কের ঘাত-প্রতিঘাতের আলো শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের ব্যতিক্রমী কবিতার প্রাণ। সেখানে গল্প আছে, কিন্তু তা কখনওই অতিক্রম করে যায় না কবিতাকে। আছে নাটকীয়তা, যা কোনও চমক নয়, বরং কবির একপ্রকার সরবতাই।
শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৫ আগস্ট, ১৯৩১। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। বিজনেস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর শংসাপত্র পেয়েছেন যুক্তরাজ্য থেকে। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। শরৎকুমারের প্রথম গল্প ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল কুড়ি বছর বয়সে। প্রবাদপ্রতিম 'কৃত্তিবাস' পত্রিকার সঙ্গে শুরু থেকে যুক্ত ছিলেন। এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ প্রায় তিরিশটি। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী প্রভৃতি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এই সম্মানিত স্রষ্টা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথিরূপে আমন্ত্রিত হয়েছেন একাধিকবার। কথা পুরস্কারে (১৯৯১) ভূষিত শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় বিশ্বসভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী ও অনুসন্ধিৎসু ছিলেন। 'ঘুমের বড়ির মতো চাঁদ' কাব্যগ্রন্থের জন্য ২০০৯-এ সাহিত্য অকাদেমি সম্মানে ভূষিত।