আমার বোন দেবযানী (শম্পা) ত্রিপুরা বেড়াতে গিয়ে, বিলোনিয়ার বর্ডার পেরিয়ে [সীমান্তরক্ষীদের হাসিমুখ সাক্ষী] ফেনীর মাটি সযত্ন তুলবে হাতে। ফিরে এসে সেই মাটি সে যখন তুলে দেবে বাবার দুই হাতে, বাবার ঈষৎ হাসি। কিছুটা উদাসীন। ওই হাসির নির্লিপ্ত রূপ আর মানচিত্রের মাঝেই শীতবৈকালের একলা শামুকখোলের মতো বসে থাকবে স্তব্ধতার আখ্যান। আমি দেশ-ছাড়া বাস্তু-খোয়ানো ভাঙাচোরা এক পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম। স্বাধীনতা ও দেশভাগের প্রায় দশ বছর পরে যে পরিবার পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এসেছিল এইপারের ভূখণ্ডে। নিঃস্ব। নিরালম্ব। ছুঁড়ে দিয়েছিল নিজেদের জীবন অনিশ্চয়তার অলাতচক্রে। তৃতীয় প্রজন্মও সেই অনিশ্চয়তার অভিঘাত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারে না, এমনই ছিল সেই কালান্তক উদ্বাসন। নিজের জীবন আর ধুলোবালিখেলা আমায় নিয়তি-নির্দিষ্ট করেছে, এই আখ্যান আমায় লিখতে হবে।
শেষ হল সেই আখ্যান। নামকরণ করলাম – বিয়োগপর্ব । এপারের বাংলা উপন্যাসে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম দশ বছর নিয়ে এই আখ্যান। সময় ও পরিসরের নব্য কোনও ক্রোনোটোপ আবিষ্কৃত হল কিনা, বলবেন পাঠক।
দেবতোষ দাশ-এর জন্ম ১১ জানুয়ারি ১৯৭২। মা-বাবা-স্ত্রী-কন্যাসহ থাকেন দক্ষিণ শহরতলি সুভাষগ্রামে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। রাজ্য সরকারের ভূমি ও ভূমি-সংস্কার দফতরে কর্মরত। প্রথম গল্প প্রকাশ ১৯৯৫ সালে ‘অপর’ পত্রিকায়। গল্প প্রকাশিত হয়েছে দেশ, রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা, শারদীয়া প্রতিদিন, শিলাদিত্য, কিশোরভারতী পত্রিকায়। লেখেন নাটকও। নান্দীকার তাঁর নাটক ‘বিপন্নতা’ মঞ্চস্থ করে ২০১৪ সালে। নাটক ‘ওচাঁদ’ লিখে পেয়েছেন সুন্দরম পুরস্কার। প্রকাশিত উপন্যাস: ‘বিষকন্যা’, ‘বিন্দুবিসর্গ’ এবং ‘সন্ধ্যাকর নন্দী ও সমকালীন বঙ্গসমাজ’। সিনেমা, সংগীত আর খেলাধুলোয় আগ্রহী।
কাহিনি সংক্ষেপঃ ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি। নাথুরাম গডসের গুলিতে খুন হলেন মহাত্মা গান্ধী। এই গল্পের শুরু ঠিক এর পরদিন থেকে। আর প্রেক্ষাপট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত ফেনী মহকুমা।
ফেনী শহরের সামান্য বাইরেই মধুপুরে বসবাস তালুকদার মুরলীধর দাস ও তাঁর পরিবারের। কয়েকটা তালুকের তালুকদারি সহ ফেনী শহরে তাঁর একটা হার্ডওয়্যারের দোকানও আছে। সদ্য দেশভাগ হয়েছে। ফেনী পড়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে৷ দেশভাগ হয়ে গেলেও এখনো মানুষের মন থেকে পুরোনো সাম্প্রদায়িকতার ক্ষত এখনো যায়নি। ১৯৪৬ সালেই পুরো নোয়াখালী জুড়ে হয়ে গেছে রায়ট৷ ভারতে হিন্দুরা মুসলমানদের কাটছে, আর পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানরা কাটছে হিন্দুদের। মাঝে মাঝেই বাতাসে ভর করে আসে রক্তের হোলিখেলার খবর। বিচলিত বোধ করেন মুরলীধর। শেষমেষ কি বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি জমাতেই হবে ওপারে!
বিচলিত বোধ করেন বৃদ্ধ অশ্বিনী দত্তও। প্রবল গান্ধীবাদী এই মানুষটা মহাত্মার মৃত্যুর পর থেকেই সর্বদা কি যেন এক আতঙ্কে থাকেন। নোয়াখালী ও ফেনীর পরিস্থিতি গরম হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। কায়েদে আজমের পাকিস্তান যেন আজ শুধুই মুসলমানদের। হিন্দুদের মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা যে ক্রমশ হুমকির মুখে পড়ছে, তা সংখ্যালঘুরা সবাই কমবেশি টের পাচ্ছেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতা যখন অন্ধ সাম্প্রদায়িকতার নাগপাশে আরো অস্থির হয়ে ওঠে, তখন দুশ্চিন্তা না করে থাকা যায়না। ওপারের মাইনোরিটি মুসলমানদের ওপর যেমন খাঁড়া ঝুলছে, এপারেও হিন্দুদের রক্তের জন্য শান দেয়া হচ্ছে অস্ত্রে। যতোই এসব হুমকি ফুৎকারে উড়িয়ে দেন না কেন, এলএমএফ ডাক্তার সুধীন্দ্রনাথ করও মাঝে মাঝে পড়ে যান দুশ্চিন্তায়। তাঁর বাবা ফেনী শহরের একসময়কার ডাকসাইটে উকিল অম্বিকা কর আবার স্বপ্ন দেখেন এক স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব বাংলার।
গাছের যেমন শেকড় থাকে, শেকড় থাকে মানুষেরও। সেই শেকড় তার নিজ ভূমির সাথে, দেশের সাথে। সেই ভূমি ছেড়ে, আলো-হাওয়া-জল ছেড়ে যখন মানুষকে পরবাসী হতে হয় ঠিক তখনই রচিত হয় ভয়াবহ বিষাদময় এক আখ্যান। ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িকতা বলী হয়ে অনেক পরিবারকে নিজের মাটির সাথে ছিন্ন করতে হলো শেকড়। হারাতে হলো অনেক কিছুই। অস্থির ওই সময়ে সব হারানোর এক দালিলিক আখ্যানই 'বিয়োগপর্ব'।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ ওপার বাংলার জনপ্রিয় লেখক দেবতোষ দাশের 'বিয়োগপর্ব' মূলত ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও তৎপরবর্তী ঘটনা ভিত্তিক ঐতিহাসিক উপন্যাস। লেখকের পূর্বপুরুষের ভিটাও ছিলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমায়৷ অনেকটা তাঁর পরলোকগত বাবা শ্রী ভবতোষ দাসের স্মৃতিচারণ ও আরো অনেকের বয়ান থেকেই দেবতোষ দাশ পেয়েছেন 'বিয়োগপর্ব' লেখার তাগিদ৷ আর এসব প্রামাণ্য বিষয়াদির সাথে কল্পনার তুলির আঁচড় তো ছিলোই।
কিছু কাহিনি আছে, যেগুলো পড়লে একেবারে মর্মমূলে সেটা গেঁথে যায়। 'বিয়োগপর্ব'-ও তেমনই একটা উপন্যাস। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে নিষ্ঠুর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আলাদা করে দেয়া দুটো দেশের জন্ম নিয়ে রাজনীতিবিদরা ভাবলেন, অথচ ভাবলননা কাঁটাতারের এপার-ওপারের মানুষগুলোকে নিয়ে। ভাবলেননা তাদের শেকড় নিয়ে। অর্থহীন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার করাল ছোবলে বারংবার বিক্ষত হয়েছে নামেমাত্র পাওয়া 'স্বাধীনতা'। ঘর তো হারিয়েছেই অনেক মানুষ, সেই সাথে হারিয়েছে নিজের প্রিয়জন, বন্ধু, আপন বলয় এমনকি প্রাণও। কিসের জন্য? ধর্ম? না। ধর্মান্ধতার জন্য, নোংরা সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির জন্যই এসব হারানো। দেবতোষ দাশ এসবের সাথে আজ এতোদিন পর পাঠককে মুখোমুখি করেছেন যা আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসের এক রূঢ় ও ভয়াবহ অধ্যায়।
দেবতোষ দাশের ধীরস্থির গতিতে গল্প বলে যাওয়াটা ভালো লেগেছে। পড়ার সময় একটা কথা বারবার মনে হচ্ছিলো। তিনি যা লিখেছেন, তা ভেতর থেকে গভীরভাবে অনুভব না করলে এমন লেখা সম্ভব না৷ আর তাঁর সেই অনুভবটাই তিনি ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন আমার মধ্যে। এর আগে আমি তাঁর কোন বই পড়িনি। 'বিয়োগপর্ব'-ই প্রথম। একটা বই পড়েই তাঁর লেখনী ভালোবেসে ফেললাম। দেবতোষ দাশের এই গল্পটা নিছক মুরলীধর দাসেরই থাকেনি। কখনো গল্পটা হয়ে উঠেছে সুধীন্দ্রনাথ কর ও তাঁর মেয়ে সত্যবতীর, কখনো বিভূতিভূষণের, কখনো কিরণবালার, কখনো দুই চোখে স্বপ্ন আঁকা সুনীতিবালার আবার কখনো অমিয়ভূষণের। সর্বোপরি গল্পটা ওই অস্থির সময়ের সবারই।
ভূমিপ্রকাশকে ধন্যবাদ 'বিয়োগপর্ব'-এর বাংলাদেশি সংস্করণ হাতে তুলে দেয়ার জন্য। ২০২০-এর অমর একুশে বইমেলায় ভূমিপ্রকাশ থেকে দেবতোষ দাশের আলোচিত থ্রিলার 'বিন্দুবিসর্গ'-ও এনেছে তারা। ওটাও পড়ার তালিকায় যুক্ত করেছি।
সব্যসাচী হাজরার করা অতি সাধারণ প্রচ্ছদটাও অসাধারণ রকমের মেটাফোরিক লেগেছে আমার কাছে৷ প্রচ্ছদটাই যেন অনেক গল্প বলে দেয়। বইটার প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।
সব শেষে একটা কথাই বলবো। মানুষ থাকলে ধর্ম থাকবে। মানুষ না থাকলে কোন ধর্ম থাকবেনা। তাই নিপাত যাক ধর্মান্ধতা। বর্জিত হোক সাম্প্রদায়িকতা।
দেশভাগ নিয়ে যেকোন বই পড়লেই মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। দেশভাগ নিয়ে লেখা বইগুলোতে পূর্ববাংলার প্রাকৃতিক রূপ যেন ফেটে পড়ে। উঠে আসে পূর্ববাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর মানুষ। ধর্মের কাঁটাতারের বেড়া আলাদা করে দিল দুটি দেশকে। খুব মন কেমন করে সমস্ত কিছু ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য। ভয়টা মাঝে মাঝে বর্তমানেও জাঁকিয়ে বসে আজকাল মনে। ভুল, মিথ্যে ভয়-কায়মনোবাক্যে চাওয়া এই মিথ্যেটা যেন মিথ্যেই থাকে সবসময়।
এই বইটির genre বলা যায় historical nostalgia. বইয়ের পিছনে যে "বিস্ফোরক উপন্যাস" লেখা আছে তা আদতে ভাঁওতা। 🧐
রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে একদল লোককে রাজনীতি নিয়ে ভাট বকতে নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন, ওরকমই একটা scene কে ১৯৪৭ এ নিয়ে গিয়ে ফেলে দিন তাহলে তৈরি হয়ে যাবে বইয়ের প্রথম ১৫০ পাতা। 😏🙄🙄 তারপরের ১০ পাতায় একটু লুঠপাট ধরনের অ্যাকশন আছে। তারপর আবার সেই মিয়ানো বিস্কুট। 😑😑
কিভাবে সেন্দল শুটকি রান্না করতে হয়, কিভাবে মাছ ধরতে হয়, পাঁচালী তে কি লেখা আছে তার কি মানে , এমনকি গোটা গোটা গানের স্তবক লেখা আছে বইয়ে (কিছু বোঝানোর জন্য না, কেউ একজন গাইছে scene এ এই যা) এরকম অনেক মনিমানিক্যে ঠাসা এই বই। 🤷🤷
ইতিহাস আমার একদমই ভালো লাগেনা। এই বই সেই ইতিহাস নিয়ে দুঃখ করা। হয়ত লেখকের উদ্দেশ্য ছিল সেই সময়ের মানুষের দুঃখ কষ্ট বোঝানো কিন্তু তার জন্য এরকম "বিস্ফোরক উপন্যাস" লিখে পাঠকদের সাপবাজি উপহার দেওয়ার কোন মানে নেই। 🙄🙄
আখ্যান আরম্ভ ৩১ জানুয়ারি, ১৯৪৮। গান্ধী হত্যার পরদিন। পূর্ব পাকিস্তানের নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমা। কিছুদিন আগেই মূলত নোয়াখালী সদরে ঘটে গেছে কুখ্যাত ৪৬-এর গণহত্যা। সেই যাত্রায় ফেনী বেঁচে গেলেও আশঙ্কার কালো মেঘ সরে না আকাশ থেকে। ফেনীর মধুপুর গ্রামের তালুকদার ও ব্যবসায়ী মুরলীধর দাসের পরিবার কেবল নয়, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত সংখ্যালঘু পরিবারের মনোজগতে আতঙ্ক ও আশঙ্কার মেঘ। নিজের দেশ-মাটি-বাতাসে আতঙ্কে শ্বাস নিতে হবে কেন? কেন মনে হবে নিজভূমে পরবাসী? শেষপর্যন্ত থাকতে পারবেন কি তাঁরা আপন ভিটায়? তাছাড়া এই আতঙ্ক ও বাস্তুত্যাগের সিদ্ধান্ত কি একমাত্রিক, না কি এর পেছনে আছে হঠাৎ-দাপট-হারানো অংশের মনোজাগতিক বহুমাত্রিকতাও?
বিশ্বের বৃহত্তম গণউদ্বাসনপর্বের বহুমাত্রিকতা সন্ধান করা হয়েছে এই উপন্যাসে। তৎকালীন শান্তিহীন ও খণ্ডিত উপমহাদেশের রাষ্ট্রনীতি ও ব্যক্তিগত স্মৃতি মন্থন-করা এক নিরাসক্ত দলিল ‘বিয়োগপর্ব’। একরৈখিক ও ভাবাবেগসিক্ত দেশভাগ-সাহিত্যের মাঝে এক ব্যতিক্রমী আশ্চর্য আখ্যান।
পাঠ্য প্রতিক্রিয়াঃ
বিয়োগপর্ব এক অপূর্ব বেদনাবিধুর উপাখ্যান৷ উপন্যাসটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছোট ছোট চ্যাপ্টারে লেখক যেন বলে গেল পার্টিসনের এক বুক জ্বালার কথা৷ বলে গেলেন মুরালীধরের কথা৷ জীবন নিয়ে যার সাদামাটা চিন্তা। তাকেই নিজে দেশে হতে হল পরবাসী৷ সব কিছু ছেড়ে যাবার বেদনা এই বাঙালি জাতি ছাড়া আর কার সহ্য করতে হয়েছে৷ মুরালীধরের আশেপাশের জগৎ ছোট থেকে ছোট হতে থাকে৷
তার সঙ্গ ছেড়ে দেয় আস্তে আস্তে প্রিয় মানুষ গুলো৷ তবুও নিজের মাটির টান ফেলে যেতে কি দ্বিধা৷ গল্পের গাঁথুনি খুব ধীরে ধীরে আগালেও এর গভীরতায় ডুবে যেতে বেশিক্ষন সময় লাগবে না৷ তৎকালীন ফেনীর পরিবেশ সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন লেখক৷ সেই সাথে ছোটখাট ইতিহাসের ধারা বর্ণনা উপন্যাসটি করে তুলেছে প্রাণবন্ত৷
গল্পের খাতিরে বেশ কয়েকটা চরিত্র বুকে বেশ আঘাত দিয়েছে৷ তার মধ্যে সুহাস-সুনীতি, সুধীন মাষ্টারের কথা আলাদা ভাবে বলতে হয়৷ বলতে হয় সপ্নবিলাসি পুনু কাকার কথা৷ খুব ধীরে সুস্থে দেশ ভাগের সামাজিক ও রাজনীতিক পেক্ষাপট ফুটে উঠেছে গল্পে৷ সত্যি হিংসা, অন্যের মত সহ্য করতে না পারা এ যে সেই ১৯৪৭ সাল থেকে চলে আসছে৷ এই বেদনা তারাই বুঝে যাদের শেকড় দুই বাংলায় পড়ে আছে৷
ধর্মের নামে এই রকম অন্ধ হিংসা, রক্ত পিপাসার মাঝেও সৈয়দদের মত মানুষের সমাজে বেশি দরকার৷ এই মানুষটি না থাকলে হয়তো গল্পটি সম্পূর্ণ হত না৷ দেশ ভাগ নিয়ে সুন্দর একটি উপন্যাস। আশা করি পাঠকের মনে কড়া নেড়ে যাবে৷
‘সুখে দুঃখে ছিল একে অন্যের সাথি, হিন্দু এবং মুসলমানে ছিল সম্প্রীতি’ —বাউলকবি শাহ আবদুল করিম গান্ধীর মৃ ত্যু পরবর্তী দেশ-ভাগের কাঁ টা তা রে আটকে পড়া সংখ্যালঘুদের এক অ্যাখ্যান। ফেনী মহকুমার তালুকদার পরিবার। হিন্দু-মুসলিম-নমশূদ্র নির্বিশেষে ❝কত্তা❞ সম্বোধন করে মুরলীধর দাসকে। তালুকদারি আর হার্ডওয়্যারের দোকান দিয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার করাল গ্রাস পড়লো তাদের উপরও। হিন্দুস্তানে কচু কাঁ টা হচ্ছে মুসলিম। আর পাকিস্তানে ম র ছে হিন্দু। শত নি র্যা ত নে র পরেও পূর্ব পাকিস্তানের ফেনীর মাটি ছাড়তে নারাজ মুরলী। তার ভাষায়, ❝অ্যার দেশের মাটি, ফেনীর মাটি ছাড়ি যাইতন ন❞। গান্ধীর মতাদর্শে বিশ্বাসী অশ্বিনী মাস্টার আশঙ্কা প্রকাশ করে। থাকতে পারবে তো নিজের দেশে? নাকি সংখ্যালঘু হিসেবে বিদেশ বিভূঁইয়ে পাড়ি জমাতে হবে? স্বাধীন পাকিস্তান পাবার পরে সুধীনের বাবা অম্বিকা কর স্বপ্ন দেখেন স্বাধীন পূর্ববাংলার। ৪৭ এর সেই ১৪ই আগস্ট ❝পাকিস্তান জিন্দাবাদ❞ ধ্বনির সাথে তিনি হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন স্বাধীন পূর্ববাংলার স্বপ্ন। সুধীরের কন্যা সত্যবতীও দাদা অম্বিকার সুরে সুর মিলিয়ে বলে, ❝দাদু, আঁর সোনার বাংলা জিন্দাবাদ!❞ স্বপ্ন পূরণ হবে কি? সংখ্যালঘু হয়ে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবে কি মুরলী, সুধীন, অশ্বিনীর মতো পাকিস্তানী সংখ্যালঘুরা? সুধীরের স্বপ্ন মেয়েকে তিনি ডাক্তার বানাবেন। স্বপ্ন কি পূরণ হবে এই জীবনে? ধর্ম কি নৃশংস হতে শেখায়? ধর্মের আসল শিক্ষা কি অন্য ধর্মাবলম্বীদের র ক্তে নিজেকে রাঙানো? হিন্দুর হাতে মুসলিমের র ক্ত বা মুসলিমের হাতে হিন্দুর র ক্ত এই কি ছিল দেশভাগের সুফল? মাইগ্রেশনের একটা কাগজ-ই কি জন্মভূমির আকাশ, বাতাস, মাটি, স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে যথেষ্ঠ? জন্মভূমির শেকড় ছেড়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে নতুন শেকড় গড়লেই কি সেই ভিত শক্ত হয়? পাঠ প্রতিক্রিয়া: ইতিহাসের অন্যতম বিষয় ১৯৪৭ এর দেশভাগ। একসাথে এত লোকের উদ্বাস্তু বনে যাওয়ার ইতিহাস, শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের ইতিহাস হয়তো আমাদেরই। একদিনের ব্যবধানে দুইটি স্বাধীন দেশের জন্ম। লেখক যে আবেগ দিয়ে ২০৮ পৃষ্ঠার বইটি লিখেছেন সে আবেগ শুধু নিজে প্রত্যক্ষ না করলে লেখা সম্ভব না। দেশভাগের নামমাত্র সুফলে অ ত্যা চা র ভোগ করা পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন। ইতিহাসের বর্ণনার পাশাপাশি নিজ দেশ নিজ মাটির প্রতি গভীর টান, মমত্ববোধ অনুধাবন করা সংখ্যালঘুদের দুঃখের কথা লেখক অসাধারণভাবে বর্ণনা করেছেন। পাকিস্তানে হিন্দু নি ধ ন, উল্টোদিকে হিন্দুস্তানে মুসলিম নি ধ ন চলছে। কতটা অসহায় ছিল সে সময়কার সংখ্যালঘুরা, সে চিত্রই লেখক কলমের খোঁচায় তুলে ধরেছেন। হিংস্র সাম্প্রদায়িক মানুষের ভীড়েও সৈয়দ, সোনা মিঞা, টুক্কুর মতো মেজরিটির খুব প্রয়োজন। সেরকম লোক ছিল বলেই শত দুঃখের মাঝেও একটু ঠাঁই ছিল। মুরলীর মতো কতশত তালুকদারের এক আইনে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, সুনীতি-সুহাসের পরিণতি, সুধীরের মেয়ে সত্যবতীর পরিণতি সবকিছু যেন বুক ভাঙ্গা কষ্টের উদ্রেক করছিল। বিশাল ইতিহাসের প্লটে রচিত উপন্যাস ❝বিয়োগপর্ব❞। ইতিহাসের বহুল বর্ণনা, রান্নার কৌশল শেখানো, পথের পাঁচালীর কথার ভীড়ে উপন্যাসের চরিত্রগুলো নিজেদের পরিপূর্ণ ভাবে মেলে ধরতে পারেনি। মুরলীর মাঝেও কিছুটা গোড়ামি ছিল। সুধীর, সোনা মিঞা চরিত্র দুটো আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। ইতিহাস ভালো না লাগলে বইটা পড়তে ভালো নাও লাগতে পারে। ইতিহাস নিয়ে আমার অতি আগ্রহের কারণে ইতিহাসের বহুল বর্ণনায় রচিত বইটা আমার ভালো লেগেছে।