কিছু বই থাকে অন্তরে আলোড়ন আর মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়ার মত। আমার তেমনই এক অত্যন্ত পছন্দের বই "যেমন ছিলেন তাঁরা"।
বইটির লেখক শাইখ খালিদ আল- হুসাইনান রহি.। তাঁকে অনেকেই চিনে থাকবেন তাঁর আরেক বিখ্যাত বই "দৈনন্দিন সহস্রাধিক সুন্নাহ" বইটির মাধ্যমে। "যেমন ছিলেন তাঁরা" বইটি অনুবাদ করেছেন হাসান মাসরুর; সম্পাদনা করেছেন আলী হাসান উসামা।
আমাদের বর্তমান যুগ এক ফিতনাহর যুগ। চারদিকে ভুলের ছড়াছড়ি। এমতাবস্থায় কাকে যে অনুসরণ করতে হবে তা আমাদের মত সাধারণ মানুষদের জন্য বোঝা মুশকিল হয়ে যায়। তবে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে উপায় বলে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছেন, "সর্বোত্তম মানুষেরা হলো আমার সাহাবিরা। এরপর তাঁরা যাঁরা আমার পরে আসবে। এরপর তাঁরা, যাঁরা তাঁদের পর আসবে।" (বুখারী, মুসলিম)
আর তাঁরাই হলেন আমাদের সালাফ-সালেহীনগণ। তাঁদের দেখিয়ে দেয়া পথেই রয়েছে আমাদের প্রকৃত মুক্তি।
মাঝেমাঝে বিভিন্ন জায়গায় সালাফদের বিভিন্ন উক্তিগুলো, ঘটনাগুলো পড়লে মনে হত, ইশ, তাঁদের এ কথাগুলো যদি এক মলাটে পেতাম! আলহামদুলিল্লাহ, বইটির মাধ্যমে মনের সে আশা অনেকটুকু পূরণ হয়েছে৷
সালাফদের পবিত্র মুখ নিঃসৃত বাক্যের মাধ্যমে যে কেউ তার ঈমানের অবস্থা যাচাই করে নিতে পারবে। তাঁদের চিন্তাধারা, জীবনযাপন সবকিছুতে রয়েছে আমাদের জন্য গভীর শিক্ষা। তাঁদের তাকওয়া, দুনিয়াবিমুখিতা, আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা, তাঁর প্রতি ভরসা, ভয়, ভালোবাসা, নিজেদের ওপর অন্য ভাইদের প্রাধান্য দেয়া, তাঁদের নিফাকির প্রতি ভয়, সুন্নাহর প্রতি আমল করার আগ্রহ, পরকালের প্রতি ভাবনা, লৌকিকতাকে ঘৃণা করা, সবকিছু একজন মু'মিনকে অবাক করবে, নতুন করে ভাবাবে, উৎসাহ দিবে তাঁদের মত জীবন গড়ার, ইনশাআল্লাহ। বইটি আরো একবার আপনাকে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করাবে।। বইটি বিভিন্ন সময় অন্তরকে নরম করার জন্য এবং ডিপ্রেশন থেকে রেহাই পাবার জন্যও আমাকে সাহায্য করেছিল। আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল 'আলামীন।
পুরো বইটি ছোট ছোট শিরোনামের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে, যা বইটির পাঠকে আরো সহজ সাবলীল করে দেয়। এছাড়াও প্রতিটি অধ্যায় শুরু হয়েছে কুর'আনুল কারীমের বিষয়ভিত্তিক আয়াত নিয়ে। এরপর কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা, কখনো সাহাবী (রদ্বীআল্লাহু 'আনহুম) দের কথা, কখনো বিভিন্ন সালাফদের ঘটনা, তাঁদের সেই আয়াতের উপর আমল, সালাফদের অভ্যাস, আবার কখনো শাইখ খালিদ আল-হুসাইনানের অমূল্য কথা নিয়ে প্রতিটি অধ্যায় সাজানো হয়েছে৷
হাসান বসরী রহ., ইবনুল কায়্যিম রহি., শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহি., আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রহি., উমার বিন আব্দুল আযীয রহি.,সুফিয়ান রহ., ইবনুল মুবারাক রহি., বিশর আল-হাফি রহি., - সহ আরো অনেক সালাফদের মুক্তাসম বাণী ও ঘটনা রয়েছে বইটিতে৷।
এই অমূল্য বইটি প্রকাশ করেছে রুহামা পাবলিকেশন। রুহামা পাবলিকেশন আমার অতি প্রিয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে অন্যতম। আমি কিন্তু একটুও বাড়িয়ে বলছি না। তাদের বইয়ের কন্টেন্ট, পৃষ্ঠাসজ্জা, প্রচ্ছদ সবকিছুই মনোমুগ্ধকর, মাশাআল্লাহ। আল্লাহ আরো বরকত দিক তাদের কাজে, আমিন।
পরিশেষে এই বইয়ের অজস্র মণিমুক্তোর মধ্য থেকে শাইখের দুটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি-
"মুনাফিকই কেবল নিফাক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়। আর মুমিনই কেবল নিফাকির আশঙ্কা করে।" (পৃ: ১৩৮)
“আল্লাহর শপথ! আল্লাহর কোনো বান্দা এমন নেই যে, সে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করেছে, কিন্তু অবশেষে সে এ সম্পর্কে ব্যর্থ হয়েছে৷ আর যাকেই আল্লাহ বিপদে তাঁর নিকট দুআ করার তাওফীক দান করেন, তার দুআ অবশ্যই কবুল হবে এবং তাকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে।" (পৃ: ১৪২)
তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে তাযকিয়া। বইটিতে তাযকিয়া সম্পর্কে সালাফে সালেহিনদের ধারণা, তারা কীভাবে কুরআন ও হাদীস মোতাবেক তা পালন করেছেন তার সহজ সরল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ দুনিয়া ও আখিরাতে মর্যাদা কি, কীসে তা অর্জিত হয়, কীভাবে ধৈর্য্য সহকারে একাগ্রচিত্তে আল্লাহ্ তা’আলার সাহায্য কামনা করা যায়, জিহাদের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা এবং মর্যাদা, নফসের নিয়ন্ত্রন সহ অনেক বিষয় বইটিতে স্থান পেয়েছে যা জানা একজন মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য। যারা ঈমান মজবুত করা নিয়ে ভাবেন, অন্তরের মুনাফেকী দূর করা নিয়ে ভাবেন, ইবাদাতে পরিতৃপ্তি লাভ করতে চান, অন্তরকে আল্লাহর সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত করতে চান তারা অবশ্যই পড়বেন বইটি। পাতায় পাতায় উপলব্ধি করবেন ঈমানের তাড়না যা আপনাকে আখিরাতমুখী হতে সচেষ্ট করবে ইন শা আল্লাহ্।
বই : যেমন ছিলেন তাঁরা মূল : শাইখ খালিদ আল হুসাইনান (রাহিমাহুল্লাহ) অনুবাদ : হাসান মাসরুর সম্পাদনা : আলী হাসান উসামা প্রকাশনা : রুহামা পাবলিকেশন
ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ায় আমাদের অবস্থান যেন আরও ক্ষণস্থায়ী! এই অতি ক্ষুদ্র সময়ে আমাদের জীবনের যাপিত চলাফেরা, আচার-ব্যাবহার এবং প্রতিটি মুহূর্ত কাদের মতো করে হবে? কাদের পায়ের ছাপের উত্তরসূরি হব আমরা? অবশ্যই আমাদের সালাফে সালেহীনদের।
তো সালাফে সালেহীনদের দ্বীন মেনে চলার দৃষ্টিভঙ্গি,আল্লাহভীতি, সুন্নাহ অনুসরণ এই সবকিছু মিলিয়ে-ই বক্ষ্যমাণ এই বইটি যেন এক অসংখ্য সুভাসিত পুষ্পের বাগান। যেখান থেকে শুধু পুষ্পের ঘ্রাণ নিলেই চলবে না প্রাপ্ত সেই ঘ্রানকে হৃদয়ের গহীনে প্রোথিত করে জান্নাতের দিকে বাকিটা পথ হাটতে হবে ইন শা আল্লাহ্। . বইটির বিষয়বস্তু : একজন মুসলিম হিসেবে কি কি ভাল আমল করতে হবে এবং সেই আমলগুলোর উপর আমাদের পূর্বসূরীদের অবস্থান কেমন ছিল তা নিয়ে কতগুলো অংশে বিভক্ত করা হয়েছে বইটি। প্রতিটা পার্টের মূল নির্যাস উঠিয়ে আনার জন্য ছোট-বড় কিছু পরিচ্ছেদ আছে। দ্বীনের মূল ভিত্তি তাকওয়া থেকে নিয়ে ইবাদতে বিনয়, সত্যই মুক্তি,আল্লাহর ইবাদতে অটল থাকা, তার প্রতি সুধারণা, তার কাছেই সাহায্য চাওয়া-ধৈর্যধারণ করা এই সবকিছুর উপর আলোকপাত করা হয়েছে বইয়ের শুরুর পাতাগুলোতে।
সুন্নাহর উপর আমল, হৃদয়ের স্বচ্ছতা, জিহাদ, আল্লাহর ওলীগণ কারা, তাওবা যে জীবনের নিয়মিত আমল এই বিষয়গুলোরও সংক্ষিপ্তাকারে সাবলীল আলোচনা এসেছে। এই বিষয়গুলো আমরা আমাদের জীবনে কিভাবে প্রয়োগ করব সেগুলোও লেখক পয়েন্ট আকারে বাতলে দিয়েছেন।
শেষ অংশগুলোতে সালাফদের নিফাকের আশঙ্কা, জুহদ, ইবাদতে কৃত্রিম ও লৌকিকতা, ইছার, তাদের উপদেশ-বৈশিষ্ট্য, আল্লাহর প্রশংসা, কিভাবে আমরা দীর্ঘ সিজদা করব এই খুব খুব প্রয়োজনীয় টপিকগুলোর আলোচনা করা হয়েছে। . পাঠ্যানুভূতি : বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে লেখক কত যত্নের সাথে প্রত্যেকটি বিষয় আমাকে বুঝাচ্ছেন। পরতে পরতে যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে অসংখ্য মনি-মুক্তো! আমার শুধু দরকার মুনিমুক্তা গুলো কুড়িয়ে অন্ধকার,নিষ্পেষিত,পাপে জরাজীর্ণ এই জীবনটাকে আলোকিত করার।
বক্ষ্যমাণ বইটি যেন এক অনুপ্রেরণা! যা জান্নাতের পথে চলতে পাঠকের পায়ে বিধে যাওয়া কাঁটাকে সহজেই অপসারণ করতে শক্তি যোগাবে। ইন শা আল্লাহ্। জীবনে বন্ধুর পথগুলোতে হতাশায় বসে পরলে উঠে দাঁড়াতে সক্ষম করবে; এমনটা আশা রাখি।
সমালোচনার প্যারায় বলব, বইটিতে পাঠকের জন্য বরাদ্দ কোন পৃষ্ঠা ছিল না। অনুভূতি লিখতে পারি নি তাই! প্রচ্ছদ, ফন্ট, স্পেসিং, বানান বিন্যাস ভালো লেগেছে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে একদম। এক কথায় বইটি মন ভাল করার একটা যন্ত্র মনে হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। . কেন পড়বেন বইটি : সালাফদের প্রকৃত উত্তরসূরি হতে। রাব্বকে সন্তুষ্ট করতে। নিজের ডিপ্রেশন কিংবা হতাশা ঠ্যাকাতে তৎক্ষণাৎ হাতে তুলে নিতে পারেন বইটি। ইন শা আল্লাহ।
আল্লাহ বইটির সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।