পৃথিবীর ইতিহাসে ওমর এমন একজন শাসক যার চরম শত্রুরাও তার সুশাসনের প্রশংসা করতে দ্বিধা করেন নি। কোনো রাষ্ট্রে যখন স্বৈরশাসন কায়েম হয়, শাসক ফ্যাসিবাদি হয়ে উঠে, প্রতিষ্ঠিত হয় লুঠতরাজের রাজত্ব তখন সাধারণ মানুষ ওমরের মত একজন সুশাসকের কথা কল্পনা করে মনে প্রশান্তি পায় যেভাবে তৃষ্ণার্ত মরুচারির চোখের একমাত্র স্বপ্ন হয় নীল নদের মিষ্টি পানির ধারা।
ইতিহাসকে পুঁজি করে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমরকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের আখ্যান তৈরী হয়েছে। এই উপন্যাসে শুধু ওমর নয়, কবি হুতাইয়া, সুন্দরী উনায়যা , জারির ও ছারির, মহাবির খালিদ বিন ওয়ালিদসহ আরো অনেক চরিত্র গল্পের আবরণে উপন্যাসের এই মঞ্চে এসে হাজির হয়েছে। ওমর উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যয় এক একটা রোমঞ্চকর গল্প।
মাঝে মাঝে এমন হয় কোনো বই-ই পড়তে ভাল লাগেনা। আবার বই পড়তে পারছিনা এটা ভেবে একধরণের অস্থিরতা কাজ করে মনের মধ্যে। গত বেশ কিছুদিন ধরেই এমন একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। অনেকগুলো বই শুরু করে কিছুদূর পড়েই রেখে দিচ্ছি। ভাল লাগছে না। অথচ প্রত্যেকটা বই ভাল লাগার মতো। অস্থিরতার সাথে যোগ হলো হতাশা। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি এ ধরণের অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে এমন কোনো বই যেটার মধ্যে ডুব দেয়া যায়,যে বইটা বিভোর হয়ে পড়া যায়। কিন্তু এমন বই কোনটা? না, এমন অসংখ্য বই অবশ্যই আছে। কিন্তু ঐ যে বললাম, তৃপ্তি পাচ্ছিলাম না কোনো বই পড়ে। ঠিক এরকম একটা অবস্থায় অনেক ভেবে "ওমর" বইটা হাতে নিলাম। একেবারেই অপরিচিত লেখক। তবে ভরসার জায়গা এটা যে, বইটা পড়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বেশ আবেগঘন দেখেছি পাঠকদের।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর রাঃ। বইয়ে ওমরকে প্রথম দেখতে পাই কৃষক রূপে। সত্যি কথা বলতে তাঁর আচরণে একটু অবাক হই। কিন্তু ভুল ভেঙ্গে যায় কিছু পরেই। বাইরে কথায় কথায় রূদ্রমূর্তি ধারণ করা মানুষটার অন্য রূপগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে। খলিফা হবার পর ওমরের অন্য এক রূপ সামনে চলে আসে। পড়তে পড়তে মুগ্ধ হয়েছি, অবাক হয়েছি, আপ্লুত হয়েছি। আর হ্যাঁ, নিজের অজান্তেই মন থেকে বের হয়ে এসেছে দীর্ঘশ্বাস, আহা শাসক! শাসন এতো সুন্দর হয়, এতো কোমলতা থাকে শাসনে! আজ এতো শত বছর পরে দাঁড়িয়ে এমন শাসনের কথা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনা আমরা। ছোট ছোট গল্পে ওমরের সাথে সাথে হেঁটেছি মদিনার পথে পথে। কল্পনায় দেখেছি এক দরদী শাসকের পথচলা। ছোটবেলায় আম্মু কিংবা মামার মুখে গল্প শোনার ছলে শুনে এসেছি ওমরের অনেক কাহিনী। কিন্তু তখন তো ছোট ছিলাম। বড় হবার পর আরেকবার এই খলিফাকে দেখলাম একেবারে নতুন চোখে। অনেক গল্পই ছোটবেলায় শোনা। তারপরও পড়তে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়েছি। পড়তে পড়তে চোখ ভিজে গেছে অসংখ্যবার। নাহ্, এমন কান্নায় শান্তি আছে!
বইটার নাম ওমর ঠিকই কিন্তু শক্তিশালী রূপে এসেছে আরো কয়েকটি চরিত্র! প্রথমেই আসে ইসলামের প্রথম খলিফা আবুবকর রাঃ। বইয়ে তাঁর উপস্থিতি অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও পাঠকের মনে জায়গা করে নেবার জন্য ঐটুকুই যথেষ্ট। বারবার শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসছিল এই মহান শাসকের কার্যকলাপে। আছেন ইসলামের এক বীরযোদ্ধা খালিদ বিন ওয়ালিদ। স্বয়ং মহানবী (সাঃ) যাকে উপাধি দিয়েছিলেন সাইফুল্লাহ্ মানে আল্লাহর তরবারী। তাঁর নামে কেঁপে উঠত শত্রুশিবির। খালিদ আসছে শুনলেই পিছু হঠত শক্তিশালী সব বাহিনী। খালিদ যেখানে বিজয় সেখানে। পরাজয়ের স্বাদ পাননি কখনো তিনি। এমন এক বীরের দুর্ধর্ষ সব অভিযানের গল্প পাঠককে নিয়ে যাবে মরুভূমির সেই তপ্ত রণাঙ্গনে। উপন্যাস ছাড়িয়ে বইটা তখন এ্যাডভেঞ্চার মনে হয়। আছে কবি ইমরুল হারেছ আর সুন্দরী উনায়যার প্রেম কাহিনী। আরেকটা রোমাঞ্চকর প্রেম কাহিনী শুরু হচ্ছে হচ্ছে করেও হলোনা।
শেষের দিকে মনে হলো, আরে আর তো মাত্র কয়েক পাতা আছে।কতো কিছু জানা বাকী! শেষ হয়ে যাচ্ছে কেন? শেষের পাতায় ছোট্ট করে লিখা "প্রথম খন্ড সমাপ্ত"! কি আর করা! অপেক্ষা দ্বিতীয় খন্ডের!
লেখকের প্রশংসা না করলেই নয়। এমন একটা বই দিয়েই পাঠকের হৃদয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিতে পারবে যেকোনো লেখক। বইয়ের সহজ,প্রাঞ্জল ভাষা পাঠককে সহজেই আকর্ষণ করবে। আর লেখনীর আবেগ ছুঁয়ে যাবে পাঠককেও।
কিছু বইয়ের রেশ থেকে যায় দীর্ঘ সময়। রফিক হারিরির "ওমর" ঠিক তেমনি একটি বই। এখন অপেক্ষা দ্বিতীয় খন্ডের!
‘ওমর’ বাংলা সাহিত্যে, বিশেষতঃ ঐতিহাসিক উপন্যাস ঘরানায় এক অনবদ্য সংযোজন।
'ওমর'র লেখক আরবি সাহিত্যের ছাত্র, বিশ্ববিখ্যাত অনেক আরবি উপন্যাস অনুবাদ করে এরই মাঝে নাম কামিয়েছেন বেশ। 'ওমর' তার মৌলিক সাহিত্য কর্ম হলেও পাতায় পাতায় প্রাচীন আরবি কবিতার উদ্ধৃতি লেখকের অ্যাকাডেমিক পরিচয়কেই মনে করিয়ে দেয়, যদিও উদ্ধৃতিগুলো খাপছাড়া নয় মোটেই। এসকল উদ্ধৃতি বাঙালি পাঠকের মনে সে সময়ের আরবি সাহিত্য-সংস্কৃতির ছবি কিছুটা হলেও আঁকতে পারবে বলে মনে হয়-- আরবি সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে এটাই হয়তো লেখক চেয়েছিলেন। উপন্যাসের অন্যতম পার্শ্বচরিত্র আবুল হারেছ ওরফে ইমরুল হারেছের মুখেই কবিতাগুলো শোনা যায়, ইনি কবি হলেও নিজের কবিতার চেয়ে অন্যদের কবিতাই বেশি আওড়ান, এ জন্যে তাকে আরেক প্রবীণ কবি হুতাইয়ার কাছ থেকে ভণ্ড কবি উপাধিও পেতে হয়েছে অবশ্য। প্রেম ছাড়া উপন্যাস ঠিক জমে না, অথচ মূল নায়ক (ওমর রা.)কে দিয়ে প্রেম করানোও সম্ভব না, এজন্যই বোধ হয় লেখক এই দায়িত্ব চাপিয়েছেন উল্লিখিত ইমরুল হারেছ আর সুন্দরী উনায়যার কাঁধে। শেষ মুহূর্তে প্রেমের পরিণতিতে মূল নায়কের সহযোগিতার মাধ্যমে উপন্যাসের সাথে এই প্রেম কাহিনীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর বাইরে উল্লেখ করার মতো আর আছেন প্রাচীন আরবি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান মহিলা কবি খানসা আর তার মেয়ে আনসা। এই মা-মেয়ের সাথে ওমর উপন্যাসের কী সম্পর্ক সেটা পুরোপুরে স্পষ্ট নয়, হয় তো পরবর্তী খণ্ডে স্পষ্ট হবে। ও হ্যাঁ, বইয়ের প্রচ্ছদে কিছু লেখা না থাকলেও শেষ পাতায় ইশারা দেওয়া হয়েছে যে গল্প এখনো শেষ হয় নি, পরবর্তী খণ্ড আসতেও পারে। এছাড়াও গল্পের প্রয়োজনে আরো অনেক পার্শ্ব চরিত্রের দেখা মিলে, সে সব চরিত্র সম্পর্কে আলাদা আলোচনার দরকার মনে করছি না। আশপাশের কথা হলো, এবার মূল ঘটনায় প্রবেশ করা যাক। মূলত ওমর রা.'র জীবনের নানা ঘটনাই গল্পের আকারে বিভিন্ন অধ্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে। আবু বকর রা.'র খেলাফতের শেষভাগ থেকেই গল্পের সূচনা, ওমরের খলিফা নির্বাচিত হওয়ার প্রেক্ষাপট উপস্থাপনই সে আলোচনার উদ্দেশ্য বলে মনে হয়েছে। এর আগের ওমরের জীবন কাহিনী এই উপন্যাসে স্বভাবতই স্থান পায় নি, স্থান পেয়েছে শুধুই খলিফা ওমরের কাহিনী— তবে তাঁর খেলাফতের শেষ অবধি এই বইয়ে পৌঁছা সম্ভব হয় নি, সম্ভতবত পরবর্তী অংশে সেটা হবে। পাশাপাশি সমসাময়িক রোমান সম্রাট ও তার সেনাপতি, গুপ্তঘাতক, সেনাবাহিনী প্রভৃতি চরিত্রও প্রাসঙ্গিকভাবেই উপন্যাসে প্রবেশাধিকার লাভ করেছে। সাহিত্য সমালোচকের চোখে বইটি সফল উপন্যাস কি না, সে প্রশ্ন থাকতে পারে, কেননা পুরো উপন্যাস জুড়ে কোন কেন্দ্রীয় গল্প নেই, ওমরের জীবনের নানা বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়েই সাজানো হয়েছে পুরো উপন্যাস। তবে খলিফা ওমরের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা যেভাবে লেখক তুলে ধরেছেন গল্পে গল্পে, তা এক কথায় অনবদ্য। উপন্যাসটি খলিফা ওমরের জীবনের নানা ঘটনার পাশাপাশি তৎকালীন আরবের জীবনশৈলী, সমাজ, সংস্কৃতি ও মননশীলতাও পাঠকের সামনে মোটামোটি ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। উপন্যাস মূলত ফিকশন হলেও 'ওমর' উপন্যাসটিকে সেই অর্থে পুরোপুরি ফিকশন বলার সুযোগ নেই, কেননা এ উপন্যাসের বেশির ভাগ ঘটনাই ঐতিহাসিক সত্য, এবং ইসলামের ইতিহাসের পাঠক মাত্রই সেগুলো বিভিন্ন ইতিহাসের বইয়ে পড়ে থাকারই কথা। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে কুরআনের উদ্ধৃতি আর ইসলামের ইতিহাসের নানা ঘটনার বর্ণনা, সর্বোপরি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খলিফার জীবনকে কেন্দ্র করে লেখার ফলে 'ওমর' হয় তো ইসলামি উপন্যাসের তালিকায় ঢুকে পড়েছে, তবে তাতে সাহিত্যের স্বাদ বিন্দুমাত্র কমে নি, ইতিহাসের প্রতি শতভাগ সৎ থাকা সত্ত্বেও, এটা নিঃসন্দেহে লেখকের কৃতিত্ব। এক বসায় পড়ে ফেলার মতো ঝরঝরে গদ্যে লেখা এ উপন্যাসের বানান ও ভাষারীতি খুব সতর্কতার সাথে নিরীক্ষণ করা হয়নি বলেই মনে হয়েছে, তবে এতে মূল কাহিনীর সাহিত্যমানের খুব একটা ন্যূন হয়নি। সমকালীন বাংলা সাহেত্যে এ ধারার উপন্যাস খুব একটা নেই বললেই চলে, হুমায়ুন আহমদের 'বাদশাহ নামদার' ছাড়া উল্লেখযোগ্য উপন্যাস বোধ হয় এটিই। সে হিসেবে লেখক যদি এ ধারার উপন্যাসে থিতু হন, তাহলে আরো উন্নতমানের ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবে, এমনটি আশা করা যায়। শেষ পৃষ্ঠার একদম শেষ লাইনে 'প্রথম অংশ সমাপ্ত' কথাটি সে আশা করার সাহস জোগায়, মনে হয় আরো এক বা একাধিক অংশ হয়তো ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যে সংযুক্ত হবে।
২। এবার কিছু ছোটখাট বিষয় নিয়ে কথা বলা যাক, যেগুলো বই সম্পর্কে মূল আলোচনায় স্থান পাওয়ার কথা না। বইয়ের কয়েক জায়গায় বানানের ভুল চোখে লেগেছে, প্রুফ রিডার আরেকটু সচেতন হলে হয়তো সেটা এড়ানো যেত। সাধারণত বাংলা একাডেমির নিয়ম মেনে আরবি শব্দের প্রতিবর্ণায়নে ঈ/ঊ কার এড়িয়ে গেলেও 'রাসূল' শব্দে 'ঊ কার'ই আছে, আবার 'নবি'তে ঠিকই 'ই কার' দেওয়া হয়েছে, সুনির্দিষ্ট বানান রীতি অনুসরণ না করার ফলেই এমনটা হয়েছে। এছাড়া আলি রা.র উপনাম 'আবুল হাসান' যখন সম্বোধিত পদ হয়েছে, তখন প্রায়ই 'আবাল হাসান' লেখা হয়েছে, আবার কখনো সম্বোধিত পদেও আবুল হাসান লেখা হয়েছে। আরবি বাক্যগঠন রীতির নিয়ম বাংলায় প্রয়োগ না করলেও চলত, বাংলায় 'আবাল হাসান'র তুলনায় 'আবুল হাসান' শ্রুতি মাধুর্যে এগিয়ে বলে মনে হয়। আরেকটি কথা— একই চরিত্রের নাম কোথাও 'আবুল হাসান', আবার কোথাও 'আলি' উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত আলি রা.'র উপনাম আবুল হাসান হলেও অনেক পাঠকের এ তথ্য জানা না থাকার ফলে 'আলি' আর 'আবুল হাসান'কে ভিন্ন দুই চরিত্র মনে করার সুযোগ থেকে যায়। শেষের দিকে এক স্থানে অবশ্য এক সাথে 'আবুল হাসান আলি' এভাবে নাম লেখা হয়েছে, এতে কারো কারো বিভ্রান্তি নিরসন হতেও পারে। তবে কয়েকটি ফুটনোট যেহেতু আছে, কাজেই এই বিষয়টিও ফুটনোটে স্পষ্ট করা যেত। ২৬৮ পৃষ্ঠায় একবার খানসার বদলে আনসার নাম এসেছে ভুলে, পরবর্তীতে সেটা সংশোধিত হবে আশা করি। মহাবীর খালিদের নাম কোন স্থানে 'খালিদ', আবার কোনস্থানে 'খালেদ' লেখা হয়েছে, প্রুফ রিডারের উচিত ছিল যে কোন এক বানান নির্ধারণ করা। অনুরূপ 'ইমরুল কায়েস' আর 'ইমরাউল কায়েস' দুই বানানে একই চরিত্রের নাম এসেছে, অভিন্ন বানান হলে ভালো হতো। 'সাখার', 'ছাখার' আর 'ছখর'র ক্ষেত্রেও একই কথা। একাডেমির বানান রীতিতে সাখারই হওয়ার কথা, তবে নামবাচক বিশেষ্য 'ছাখার' লিখলেও খুব অন্যায় নয়, কিন্তু ভিন্ন বানান লেখাটা খুব ভালো দেখায় নি। 'হারেছ', 'ছারির' 'ছালেহ', 'আল আছিম' প্রভৃতি নামে 'ছ' বর্ণের ব্যবহার করাটা মহা অন্যায় কিছু না, তবে আধুনিক রীতিতে 'স' লিখলে আরো সুন্দর হতো। ২০৯ পৃষ্ঠায় এক স্থানে 'গাজাল হরিণী'র উল্লেখ আছে। মূলত হরিণের আরবি প্রতিশব্দ গাজাল, কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে গাজাল বোধ হয় বাংলায় হরিণের কোন প্রজাতির নাম-ধাম হবে। পুরো বইয়ের এরকম টুকিটাকি আলোচনা করতে গেলে বিশাল প্রবন্ধ ফাঁদতে হবে, কিন্তু সেটা তো সম্ভব না। এখানে মূলত বইটি পড়ার পর যে অসঙ্গতিগুলোর কথা বারবার মনে পড়ছিল, শুধু সেগুলোরই উল্লেখ করা হলো, খুঁজে খুঁজে অসঙ্গতি বের করে আলোচনা না করে। সর্বোপরি, এরকম একটি বইয়ে যে মানের প্রুফ রিডিং দরকার ছিল, সে মানের প্রুফ রিডিং ছাড়াই বইটি প্রকাশিত হয়েছে বলে মনে হয়েছে। পরবর্তী সংস্করণে এসকল অসঙ্গতি থাকবে না, এমনটাই আশা করি। ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮।
মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা ওমর । তার জীবনী ভিত্তিক উপন্যাস ওমর লিখেছেন রাফিক হারিরী । এটা প্রথম খন্ড । দ্বিতীয় খন্ড আগামীতে আসার কথা । এখানে ওমরের সময়কাল । ওনার রাষ্ট্র পরিচালনা । ন্যয় নীতি আর মহানুভবতার দীক্ষা সম্পর্কিত আলোচনা পাশাপাশি ইতিহাস ঐতিহ্যের অনন্য বহু ঘটনা আর আরব কবিদের বেশ কিছু কবিতার সাবলীল বর্ণনা উঠে এসেছে ।
ভালো মন্দ বিচারে এখানেও কিছু সমস্যা দেখা গেছে । কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি তো থেকেই যায় সব জাগাতেই আমি ওসব এখানে টানতে চাই না । পজেটিভ ভাবেই বিষয়টা দেখতে বলবো আপনাদের । যাদের আগ্রহ হয় বইয়ের ভেতরটা উল্টে দেখতে পারেন ।
বইয়ের কভার করেছেন দেশের নামি শিল্পী ধ্রুব এষ । এখানে তার অন্যান্য কভারের তুলনায় আলাদা একটা বিষয় আছে খেয়াল করার মতো । তিনি ওমর নামটাতে বেশ অভিনবত্ব নিয়ে এসেছেন নামলিপিতে । যদ্দরুন অনেকের বিষয়টা বোধগম্য হয়না সহজে । কিন্তু খেয়াল করলে একটু কষ্ট হলেও বোঝা যাবে । এবং বিষয়টা আনন্দের কারণ হবে । তিনি এখানে আরবি অক্ষর দিয়ে বাংলায় ওমর লিখেছেন । সাথে সাথে আরবিতেও ওমর লিখতে যে অক্ষর গুলো ব্যবহার হয় সেগুলো চলে এসেছে । অর্থাৎ একসাথে আরবি এবং বাংলা দু ভাবেই ওমর লেখাটা ফুটে আছে । এবং এটা এই বইয়ের বিশেষ সৌন্দর্যের কারণ ।
অনেক দিন পর এরকম কোন বই পড়া হলো। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফার জীবন যাপন আর তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কমবেশি জানতাম। কিন্তু বিস্তারিত কখনো জানা হয় নি। আগ্রহবোধ ও করি নি। খলিফা আবু বকর জেনেশুনে বিষ দেয়া খাবার খেয়েছিলেন তাও জানতাম না। উনার মৃত্যুর পর কে খলিফা হবে তা নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনা হলেও আবু বকর মোটামুটি ঠিক করে ফেলেন এরপর খলিফা হবে বদমেজাজী ওমর। ওমর সিধেসাধা একজন ব্যবসায়ী মানুষ। তিনি খলিফা হয়ে পড়লেন এক মহা বিপদে। সে দোকানে বসলে খলিফার দায়িত্ব পালন করবে কে! আর খলিফা হিসেবে থাকলে দোকান খুলবে কখন! সংসার চলবে কিভাবে এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতে ওমর মসজিদে বসে ঝিমায়। ঝিমুনির মধ্যে খন্ড খন্ড স্বপ্নে মাঝেমধ্যে সে সমস্যার সমাধান পায়। সুতরাং ঝিমানো উত্তম। অন্তত ওমরের তাই ধারনা। বই পড়তে পড়তে যতই সামনে আগানো যায় ওমরের কর্মকান্ডের প্রতি কৌতূহল ততই বাড়ে। লেখনীও সুন্দর।
সুখ পাঠ্য। একটানা পড়ে শেষ করা গেছে। ওমরের চরিত্র খুব ভালো ভাবেই একছেন লেখক। কি চমৎকারঃ " আপনি মানুষের উপর যত না কঠোর তার চেয়ে ও বেশি কঠোর নিজের উপর " (পাতা ৯৯) তবে কিছু বাক্য আমার কাছে একটু অন্য রকম লেগেছে। হতে পারে এটাই সঠিক। আমার কাছে একটু... । যেমনঃ " তার কথার ধরন বড্ড নাটুকে আর জ্ঞানগর্ভে পূর্ণ" সব মিলিয়ে ভালো বই।