দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সার্থক নাটক বলা যেতে পারে। কেননা নাটকের ভাষা ও সংলাপ সহজবোধ্য এবং সুস্পষ্ট। কোনরূপ জটিলতা দেখা যায় না। পুত্রস্নেহ ও আহত সম্রাটের গর্বের দ্বন্দ সংলাপে সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সুতারাং, বলা যেতে পারে যারা নাটক পড়তে ভালোবাসেন ও নাট্যপ্রেমী তাঁদের জন্যে নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার বই।
“সাজাহান”দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি। ঐতিহাসিক ও পারিবারিক নির্মম ট্র্যাজেডি “সাজাহান” নাটকের প্রধান উপজীব্য বিষয়। ১৬৬৮ সালের শেষের দিকে সম্রাট সাজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর পুত্রদের মধ্যে যে দ্বন্দের সৃষ্টি হয় সেখান থেকেই নাটকের কাহিনীর সূত্রপাত ঘটে। যে পত্নী প্রেমে মশগুল হয়ে তার প্রাণ হতে তাজমহলের রূপ-সঙ্গীত উৎসারিত হয়, সেই পত্নীর গর্ভজাত সন্তানগণ নির্মম আত্মঘাতী হয়ে সংগ্রামে লিপ্ত হয়। কিন্তু তিনি থাকেন নিশ্চুপ-অসহায়। তাঁর করার কিছুই থাকে না। তাঁর পুত্র আওরঙ্গজিব যে কিনা তাঁর নিজের ভাইদের সাথে নির্মম ব্যাবহার করে, বাবাকে করে রাখে পরাস্থ ও কারারুদ্ধ। সম্রাট সাজাহানের জীবনের শেষ দিনগুলোতে তার কন্যা জাহানারা ছিলেন তাঁর একমাত্র সঙ্গী। যে কিনা বাবার চরম মুহূর্তে তাকে ছেড়ে যায়নি।
জাহানারার শ্রেষ্ঠ সংলাপ যা সকল বাবা-মার জন্যে আজও অনুকরণীয় “পুত্র কি কেবল পিতার স্নেহের অধিকারী? পুত্রকে পিতার শাসনও করতে হবে”।
সম্রাট সাজাহান এবং প্রেমিক সাজাহানের চেয়ে পিতা সাজাহান যে ইতিহাসে কোন অংশে কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়, তা এই ঐতিহাসিক নাটকটা পড়ে বুঝলাম। শুধুমাত্র দিল্লীর সিংহাসন না, এ যেন একটা রুদ্ধশ্বাস ফ্যামিলি ড্রামা!
দুর্দান্ত!
অচিরেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা বাকি নাটকগুলো পড়ে ফেলার আশা রাখি।
বেশ চমৎকার নাটক। সম্রাট সাজাহানকে জোরপূর্বক সিংহাসন চ্যুত করে তার পুত্র আওরঙ্গজেব। আওরঙ্গজেব তার অপর তিনভাইকেও ছাড় দেয় না, নৃশংসভাবে হত্যা করে দারা ও মোরাদকে ও সুজার পিছু লাগে। এমনকি নিজের পুত্র মহাম্মদকেও ছাড় দেয় না আওরঙ্গজেব।
অতি পাষাণ ও একই সাথে অতি চালাক আওরঙ্গজেবের একের পর বেইমানী, নিষ্ঠুরতা ও চালাকির ঘটনা নিয়ে কাহিনী এগিয়েছে। সাজাহানের বিলাপ ও পাগলামি, সাজাহান কন্যা জাহানারার ক্ষোভ, দারার কল্যাণে মুক্তি পাওয়া জিয়ন আলী কর্তৃক দারার হত্যা, যশবন্তর মত শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের লোভের কাছে পরাজয়, সুজার স্ত্রী পিয়ারার পাগলামি, পার্শ্বচরিত্র দিলদার ওরফে বিখ্যাত বিজ্ঞ নিয়ামত আলীর বিদগ্ধ ও চৌকষ সংলাপ নাটকের সার্থকতা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
পঞ্চকবির অন্যতম দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এর ভেতরে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন "আত্মবিশ্বাসের একটি অবাধ সাহস"। মুলত গান আর কবিতায় তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকলেও তার রচিত নাটকগুলো বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে। বিশেষ করে তাঁর ঐতিহাসিক নাটক একাধারে শিল্পমূল্য আর জনপ্রিয়তায় ইর্ষনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। মোগল শাসনকে উপজীব্য করে তিনি ৫টি নাটক রচনা করেছেন। এর মধ্যে আলোচ্য 'সাজাহান' ও 'নূরজাহান' ট্র্যাজেডি নাটক হিসেবে দারুণ সাফল্য পায়। এই দুটি নাটকই মোগল পরিবারের ক্ষমতার দ্বন্দ আর ব্যক্তিত্বের সংঘাতের কাহিনী।
যে সময়ে তিনি নাটক রচনা করেছেণ, তখন সাধারণ দর্শকের মাঝে ট্র্যাজেডি নাটক গ্রহনের মানসিকতা ছিল না বললেই চলে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সেই প্রাথমিক 'থ্রেশোল্ড' ভেঙে দেন তাঁর দারুণ শক্তিশালী চরিত্র আর সংলাপ নির্ভর নাটক রচনা মাধ্যমে। শুধু শিল্পের স্বার্থ চরিতার্থ না করে বরং সাধারনের বিনোদনের যোগান দিয়েছেন তাঁর নাটকে। সাজাহান নাটকটি এর এক চমৎকার উদাহরণ। এই নাটকে একই সাথে অনেকগুলো শক্তিশালী চরিত্রের সমন্বয় ঘটেছে এক নিদারুন দুর্বিষহ বাস্তবতার মাঝে। বৃদ্ধ মোগল শাসক সাজাহানকে গৃহে অন্তরিন করেছেন তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেব, ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে বিভোর। সাথে যোগ দিয়েছেন আরেক ছেলে মুরাদ। সুবে বাংলা থেকে বিদ্রোহ করেছেন সুজা। কেবল জ্যেষ্ঠ পুত্র দারাশুকো রয়েছেন পিতার পাশে। সাজাহানের দুই নাতি মোহাম্মদ আর সোলেমান নিজেদের পিতার আদেশ শিরোধার্য মেনে যোগ দিয়েছেন লড়াইয়ে। চলছে পিতার বিরুদ্ধে পুত্র, ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই এর অবিশ্বাস্য এক লড়াই। একের পর এক যুদ্ধে আওরঙ্গজেব জিতে চলেছেন। টানা পাঁচ বছর যুদ্ধ চলার পর পিতাকে বন্দী আর ভাইদের হত্যা করে আওরঙ্গজেব দিল্লির অধীশ্বর হন। এই সময়ের ঘটনাবলি নিয়েই আলোচ্য নাটক।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নাটকের জন্য ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চেয়েছেন। মূল রসদ ও ছোটখাটো অনেক ঘটনা তিনি সংগ্রহ করেছেন আওরঙ্গজেবের ফরাসি চিকিৎসক ফ্রাসোয়া বার্নিয়ের এর ডায়েরি থেকে। নাটকের নাম সাজাহানের নামে হলেও অন্যান্য চরিত্র, বিশেষ করে আওরঙ্গজেব চরিত্রটি অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। পাশাপাশি সাজাহানের প্রিয় কন্যা জাহানারা পুরো নাটক জুড়ে পিতার সাথে থেকে বিবেকের চেতনাকে বারবার জাগরিত করেছেন। আওরঙ্গজেবের সাথে তাঁর দৃশ্যগুলো উল্লেখযোগ্য। তেজস্বি সংলাপ আর মায়াময়তায় তিনি নিজ ব্যক্তিত্বগুনে ভাস্বর। পুরো নাটকের সিংহভাগ জুড়ে অবশ্য ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ রয়েছে। তাতে অনেক অনেক পার্শ্ব চরিত্রের দেখা মেলে। রাজপুত রাজা যশোবন্ত সিং, জয়সিংহ নিজ নিজ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মোহাম্মদ ও সোলেমান দুইজনেই অনুগত পুত্রের প্রতিচ্ছবি। তবে আনুগত্যের চেয়ে সত্য আর বিবেকের চাবুক বড়- এই সত্য প্রকাশ পায় মহাম্মদের মাঝে। ইতিহাসে শায়েস্তা খাঁ জনপ্রিয় শাসক হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর চরিত্রের ভয়ানক কুটিল ও খল দিকের পরিচয় পাই নাটকের এক পর্যায়ে। দিলদারের চরিত্রটি বিবেকের প্রতিচ্ছবি।
এই নাটককে শেক্সপিয়র রচিত 'কিং লিয়র'এর সাথে তুলনা করা হয়। কিং লিয়র অবলম্বনে আকিরা কুরোসাওয়া নির্মিত Ran ছবিতে বৃদ্ধ রাজার প্রতিচ্ছবি আমাদের সাজাহান। বৃদ্ধ, ক্ষমতাহীন, আপনজন কর্তৃক প্রতারিত এক সময়ের প্রবল প্রতাপের রাজা। আওরঙ্গজেবের প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতার মাঝেও উঠে আসে দারাশুকো আর সাজাহানের প্রতি সাধারণ জনতার প্রবল ভালবাসা আর আবেগ। এমন এক সময়ের বর্ননা সারা নাটকে পাই যাতে দেখা যায় বিরামহীন কপটতা, ষড়যন্ত্র, নিষ্ঠুরতার ছবি। এর মাঝে সন্তান বৎসলতার মূর্ত প্রতীক যেন সাজাহান। জাগতিক লাভের কাছে যে মাঝে মাঝে সকল মানবিক সম্পর্কের বুনন ম্লান হয়ে যায় তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ সাজাহানের শাসনক্ষমতা হারানোর ঘটনাবলি।
নাটকের কাহিনি মূলত সাজাহানের সাম্রাজ্য���ে দখল করা নিয়ে চার ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব। সাজাহান গল্পে উপস্থিত থাকলেও খুবই কম পরিমাণে। তারপরেও নাটকের নাম সাজাহান কেন রাখা হয়েছে, জানতে হলে বইটি পড়ার দরকার হবে। শেষের দিকে এসে ঘটনাক্রম একটু দ্রুতই আবর্তিত হচ্ছিল, সাথে স্থানকালও। এইসব বাদ দিয়ে বইটি অতুলনীয়।