Jump to ratings and reviews
Rate this book

কালচক্র

Rate this book
সেই কালপর্বে সেখানে থমকে যেতে থাকে শিল্পের চাকা। সৃষ্টি হয় ধসের। তাতে ঘটে যায় বহু বাস্তুচ্যুতি, দেখা দেয় বিবিধ মৃত্যু। স্বপ্নগুলো চলে যায় বাস্তবের গ্রাসে। কেউ কেউ তা রুখে দিতে চায়, জীবনের বিনিময়ে। কেউ-বা আবার খুঁজে নেয় বাঁচার উপায়।

200 pages, Hardcover

First published February 1, 2017

Loading...
Loading...

About the author

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
4 (20%)
4 stars
9 (45%)
3 stars
7 (35%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 4 of 4 reviews
Profile Image for Bibi Rasheda Afrin Rumi.
19 reviews16 followers
December 13, 2018
"কালচক্র" বহমান জীবন চক্রের ইতিবৃত্তঃ

জীবন স্রোতস্বিনী নদীর মত বহমান। কখনো সরল গতিতে, কখনো বিভিন্ন বাঁকে বয়ে চলে। ক্ষণস্থায়ী এই জীবনে রয়েছে কত রূপ, রং, কত বৈচিত্র্য। সংক্ষিপ্ত এই জীবনের গল্পও কি কম থাকে? থাকে কত গল্প, কত স্বপ্ন, থাকে উত্তান-পতন।
কালচক্র এমনই নানান বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের উপাখ্যান।

গল্প টা ভৈরব নদীর তীরে ছবির মত দেখতে সুন্দর একটি গ্রাম ভবানীপুরের গল্প। যেখানের অধিকাংশ মানুষই নয়নতারা পাটমিলের শ্রমিক। সেই পাটকলের মাধ্যমেই তারা তাদের জীবন নির্বাহ করে থাকে। গল্পটা সেখানের মানুষের সুখ-দুঃখ, উত্তান-পতনের গল্প।

ঠাকুরবাড়ির রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারের শান্তশিষ্ট, বিনম্র মেয়ে মহুয়া। যার আত্মহত্যা সারা গ্রামে হৈচৈ ফেলে দেয়। মহুয়ার এমন আত্মহত্যা নিয়ে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়ে যায়। এটা নিয়ে মানুষের কৌতুহলের যেন শেষ নেই। এই আত্মহত্যার ঘটনায় রাতারাতি পাল্টে যায় ঠাকুর বাড়ির পরিস্থিতি। পাল্টে যায় দুটি কিশোর - কিশোরীর জীবন। তবে কি মহুয়ার আত্মহত্যার সাথে সাথে তাদের স্বপ্নেরও ইতি ঘটবে? কেন আত্মহত্যা করতে গেলো মহুয়া? কি এমন ঘটেছিল যার কারণে নিজের জীবনটাই শেষ করে দিলো?

গল্পটা আমজাদ প্রেসিডেন্টের। যে কিনা বেশ কয়েকবছর ধরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়নতারা মিলের প্রেসিডেন্ট হয়ে আসছে। এখন আর তাকে শুধু আমজাদ বললে কেউ চিনে না। নামের সাথে প্রেসিডেন্টও যোগ করতে হয়। ক্ষমতা এমন এক জিনিস যেটার জন্য যুগ যুগ ধরে কতশত যুদ্ধ বিগ্রহ হয়ে আসছে। সবাই ক্ষমতা চায়। যেটার জন্য মানুষ প্রাণ দিতে বা নিতেও দ্বিধা করে না। কেউ যদি একবার ক্ষমতা পেয়ে যায় তাহলে আর সেটা ছাড়তে চায় না। ক্ষমতা একটা নেশার মত। একবার পেয়ে বসলে ছাড়া বড় কঠিন। আমজাদ প্রেসিডেন্টকেও সে নেশায় পেয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করেই তার এই ক্ষমতার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ওই মিলেরই এক শ্রমিক রাজু। তবে কি এবার শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষমতার চাবি আমজাদ প্রেসিডেন্ট এর হাতছাড়া হয়ে যাবে? নাকি ক্ষমতায় বহাল থাকার জন্য প্রেসিডেন্ট অন্যকোন চাল দিবেন?

গল্পটা সোলায়মান মিয়ার। যিনি সারা সপ্তাহ মিলে কাজ করে যখন বৃহস্পতিবার চেক পায়, তখন আর হুঁশ থাকেনা। গান পাগল মানুষটি গানের আসরে গিয়ে বুঁদ হয়ে থাকে। টাকা ওখানেই খরচ করে আসে। যার ফলে পুরো সপ্তাহ টা খুব হিসেব করে চলতে হয়। মাঝরাতে যখন বাড়ি ফিরে তখনো তার বউ ভাত নিয়ে পথ চেয়ে থাকে। সোলায়মান মিয়ার তখন নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হয়। বউকে প্রতিশ্রুতি দেয় আর এমন হবে না। সোলায়মান মিয়ার স্ত্রীর খুব ইচ্ছা হয় স্বামীর প্রতিটা কথা বিশ্বাস করতে। কিন্তু সে জানে সপ্তাহ শেষে সোলায়মান মিয়া প্রতিশ্রুতির কথা বেমালুম ভুলে যাবে। সোলায়মান মিয়া কি এভাবেই প্রতিনিয়ত দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন?

আচ্ছা হারুনের চোখে মিষ্টি বউদি যা দেখতে পায়, সেটা কি নিছকই কৌতুহল? নাকি অন্যকিছু?

জগলুর বাচ্চার প্রতি তার মালিক আমজাদ প্রেসিডেন্টের যে টান ভালোবাসা, সেটা পিছনে কারণ কি?

গল্পটা পলাশ ও চন্দ্রলেখার গল্প। যারা ভিন্ন ধর্মের হয়েও একই প্রান্তে এসে মিশে গিয়েছিলো। একজন মুসলমান এবং দরিদ্র পরিবারে ছেলে, অন্যজন কঠোর রক্ষণশীল সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের মেয়ে। সমাজের কোন বাঁধা, বিধি নিষেধ যাদের কাছে পরাজিত হতে পারেনি। কি হবে তাদের ভবিষ্যৎ? তারা কি পারবে সমাজের সকল কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে এক হতে?

ভৈরব নদীর তীরে ভবানীপুরে গড়ে উঠা নয়নতারা পাটমিল। যেখানে রয়েছে অসংখ্য শ্রমিক। যাদের একমাত্র আশা ভরসা এই পাটমিলের চাকরি। যেটার মাধ্যমে তারা হাজারো সুখের স্বপ্ন বুনে। কিন্তু একদিন সেই পাটকল নেমে এলো চরম বিপর্যয়। শেষ পর্যন্ত কি হবে সেই শ্রমিকদের?
গল্পটা মহুয়া পিসির আত্মহত্যা দিয়ে শুরু হলেও কাহিনীর পরিক্রমায় আসে নানান চরিত্র। যাদের আকুতি, পাওয়া, না পাওয়া ফুটে উঠে এই উপন্যাসে।

জীবন একটি ঘূর্ণায়মান চক্র। এই চক্রটি প্রতিনিয়ত ঘুরতে থাকে। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মত মানুষের জীবনেও রয়েছে দুটো দিক। এগুলো হলো সুখ ও দুঃখ। কথায় আছে দুঃখের পর সুখ আসে, সুখের পর দুঃখ। সত্যিই কি তাই? সবার জীবনেই কি সুখ ধরা দেয়? নাকি কারো কারো জীবনে সুখেরা অধরা থেকে যায়?
এমনই সব পাওয়া, না পাওয়া, বাস্তবতা নিয়েই এই উপন্যাসের কাহিনী এগিয়েছে।
পাট আমাদের দেশে একটি অন্যতম প্রধান শিল্প। বাংলাদেশে যে পরিমাণে পাট উৎপাদনে সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর আর কোথাও তেমন সম্ভাবনা নেই। পাটকে আমাদের দেশের সোনালি আঁশ বলা হয়। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে।
বাংলাদেশে পাট শিল্পকে কেন্দ্র করে একটি পরিপূর্ণ উপন্যাস হয়েছে কিনা আমার জানা যায়। লেখককেরা কেন যেন এই বিষয়টা এড়িয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আজকের এই সময়ে এসে, এই উপন্যাসের মাধ্যমে লেখক আবদুল্লাহ আল ইমরান আমাদের সেই শিল্পকে সাহিত্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন পাট কলের শ্রমিকদের জীবন ধারণ, সুখ-দুঃখ ও নানান অজানা কথা। এটা পড়ে তাদের সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পেয়েছি। উপন্যাসটি নানান আবর্তনে পরিবর্তন হলেও মূলত একটা পাট মিলকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে পুরো কাহিনী। যে ঐতিহ্য একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের থেকে, লেখক সেটাকেই তার উপন্যাসের মাধ্যমে আবদ্ধ করেছেন।

পলাশ কি জানে পৌষের রাতেরা বড় দীর্ঘ হয়! জীবনের সব চাওয়া-পাওয়ার হিসেব কি মিলবে? পলাশ ও চন্দ্রলেখা, মিষ্টি বউদি ও হারুনের মাধ্যমে লেখক নিখাদ এক ভালোবাসা ফুটিয়ে তুলেছেন। যে ভালোবাসা সমাজের সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। যে ভালোবাসা সমাজের নিষ্ঠুরতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দেয়।
"রাজনীতি বিষয়টাই বেঈমানির। যে যত বেশি বেঈমানি করতি পারব, সে তত বেশি ওপরে উঠব, বড় নেতা হইব।" কথাগুলো আমজাদ প্রেসিডেন্টের।
ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মানুষ ঠিক কি কি করতে পারেন, সেটা আমজাদ প্রেসিডেন্ট এর মাধ্যমে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজনীতি যে ঠিক কেমন হতে পারে, তা আমরা আমজাদ প্রেসিডেন্ট এর কথাগুলোা থেকেই বুঝতে পারি।
প্রতিটি উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্র থাকলেও, কিছু নির্দিষ্ট চরিত্র থাকে যেগুলো কেন্দ্রীয় চরিত্র। কিন্তু এই উপন্যাসে নির্দিষ্ট কিছু চরিত্রকে কেন্দ্রীয় চরিত্র বললে বড্ড ভুল হয়ে যাবে। কারণ এই উপন্যাসে প্রতিটি চরিত্রই সমান গুরুত্ব বহন করে। লেখক প্রতিটি চরিত্রকেই পরম যত্ন ও মায়া দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।
আমার কাছে এটি একটি চরম মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বলে মনে হয়েছে। বইয়ের প্রতিটি লাইনে রয়েছে গভীর ভাবপূর্ণ কথা। পুরো উপন্যাস জুড়ে লেখক অসংখ্য উপমা দিয়েছেন। যা খুব ভালো লেগেছে। বইটা পড়ার সময় পাঠকেরা একটা ঘোরের মধ্যে চলে যেতে বাধ্য।

"শর্তহীন মনের কথা খুলে বলতে প্রতিটা মেয়েই একটা নির্ভরতা খোঁজে। সংসারে বহুবিধ টানাপোড়নে, অপ্রাপ্তির হতাশায় ডুবে যেতে যেতে মনে অসংখ্য বেদনা জন্মায়। সেইসব স্পর্শকাতর বেদনার গল্প শোনার মানুষ থাকেনা। এ এক অদ্ভুত একাকীত্ব।"
লাইনগুলোর মাধ্যমে লেখক একটা নিঃসঙ্গ মেয়ের মনের তীব্র আকুতিকে ফুটিয়ে তুলে ধরেছেন।

"বাগানবাড়ির মস্ত লিচু গাছের ডালে সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো দুলছেন মহুয়া পিসি। একবার ডানে, একবার বাঁয়ে।" এভাবে নাটকীয়তার মাধ্যমেই শুরু হয় এই উপন্যাস। প্রথম দুই লাইনেই পাঠক মনোযোগ দিতে বাধ্য। হুমায়ূন আহমেদের একটা বইয়ে পড়েছিলাম, একজন লেখকের সবচেয়ে বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়ায় কোন বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা লিখতে। শুরু টা করতে পারলে পরে সবগুলো নিজ থেকেই এগুতে থাকে।
সাধারণত অধিকাংশ উপন্যাসেই শুরুটা হয় অত্যন্ত সাদামাটা ভাবে। এই বইয়ে লেখক প্রথম লাইনেই পাঠকদের চমকে দিয়েছেন।
উপন্যাসের শুরুতেই মহুয়া পিসি আত্মহত্যা করলেও, পুরো বইয়ে মহুয়া পিসির আবেদন এতটুকু কমে যায়নি। কথায় আছে, "সে মরে গিয়ে প্রমাণ করলো যে সে মরেনি।" মহুয়া পিসির ক্ষেত্রেও এই কথা খাটে। পুরো উপন্যাস জুড়েই তিনি নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিলেন।

বিষয়বস্তু উপস্থাপন ও ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে লেখক দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছেন।

পুরো বইয়ে আমি একটা শব্দ ভুল পেয়েছি। আর সেটা হলো ১৭০ পৃষ্ঠায় "টানাপড়েনে", এটা খুব সম্ভবত টানাপোড়ন হবে। আর আছে কিনা জানিনা। হয়তবা পড়ার ঝোঁকে ছিলাম বলে আমার নজর এড়িয়ে গেছে।
Profile Image for Ashikur Khan.
Author 4 books8 followers
February 28, 2023
কালচক্র ঃ কালের বিবর্তনে জীবনের চক্রের গল্প

অজস্র ধারার অজস্র গল্প যখন অদৃষ্ট স্রষ্টার হাতে প্রাণ পায়, তখন তার নাম হয় জীবন। নানা স্বাদের, নানা ঢঙের বিপুল বৈচিত্র্যতায় ঠাসা সেসব গল্পের সমন্বয়ের নামই জীবন। বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়েই তার যতো কাজকারবার। একেবারেই ক্ষণস্থায়ী বর্তমান ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে যখন ইতিহাসের বুকে গিয়ে মুখ লুকোয়, তখনই তার নাম হয়ে যায় অতীত। এমন সময়ের আবর্তন নিয়েই জীবনের পথচলা। বহু বৈচিত্র্যের ডালা সাজিয়ে বসে থাকা এক জীবনের মানুষ ভেদে কতো যে রূপ-রস, তা ভাবলে অবাক না হয়ে পারা যায় না।

এমনই বৈচিত্র্যে ভরপুর জীবনের গল্প নিয়ে লেখা উপন্যাস "কালচক্র" নিয়ে পাঠক সমাজে হাজির হয়েছেন হালের বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক আবদুল্লাহ আল ইমরান। শাশ্বত গ্রাম বাংলার প্রবাহমান জীবনের চিত্রকে সুনিপুণ কথাশিল্পীর কলমের ছোঁয়ায় বইয়ের পাতায় তিনি তুলে এনেছেন৷ নাগরিক সমাজ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক লেখা হলেও তুলনামূলকভাবে গ্রামীণ সমাজের কথা বাংলা সাহিত্যে কমই আলোচিত হয়েছে। এতোদিনের সে অভাবকে কিছুটা হলেও দূর করবার প্রয়াসে হাতে কলম তুলে নিয়েছেন এই শব্দযোদ্ধা। গ্রামীণ সমাজে আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বিষয়টিকে অত্যন্ত সুচারুভাবে বইয়ের পাতায় তুলে এনেছেন। এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতি, জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে নরনারীর চিরাচরিত মিলন— কোনো কিছুই তার লেখাতে বাদ পড়েনি। অর্থাৎ গ্রামের আবহে চলমান জীবনের নানা দিক তার লেখাতে উঠে এসেছে।

এবার আসি উক্ত উপন্যাসের কাহিনী সংক্ষেপের আলোচনায়৷ ভৈরবের অববাহিকায় গড়ে ওঠা গ্রাম ভবানীপুরের ঠাকুরবাড়ির মতো হিন্দু রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়ে মহুয়ার আত্মহত্যার ঘটনা দিয়ে উপন্যাসের কাহিনীর সূত্রপাত হয়। এই আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে নানা রসময় গল্প সমাজে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ঠাকুর পরিবারের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের সকল সম্পত্তি দখল করবার পায়চারি শুরু করে স্থানীয় চেয়ারম্যান সিরাজ মোল্লা। অপরদিকে, এই কাহিনীর পাশাপাশি ঠাকুর পরিবারের কিশোরী মেয়ে চন্দ্রলেখার সাথে ভিন্ন ধর্মের কিশোর পলাশের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের এই ভালোবাসায় কোনো খাদ না থাকলেও, নির্মম বাস্তবতা যে তাদেরকে এক হতে দেবে না কিংবা এই সম্পর্ক যে কখনোই আলোর মুখ দেখবে না, তা তারা আগে থেকেই খুব ভালো করেই জানতো। ভবিষ্যত অনিশ্চিত জেনেও তাদের এক জীবনের প্রতীক্ষায় সময় কাটতে থাকে। ঔপন্যাসিকের ভাষায়, "অনন্ত প্রতীক্ষার নাম জীবন। দূরে থাকা সেও তো কাছে আসারই প্রতীক্ষা মাত্র।" আচ্ছা, পরিবারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মেয়ে মহুয়ার এমন আকস্মিক আত্মহত্যার রহস্য কি জানা যাবে শেষ পর্যন্ত? কিংবা চন্দ্রলেখা কি শেষ পর্যন্ত তার পলাশকে আপন করে নিতে পারবে? পাঠকের মনে জন্ম নেওয়া এমন হাজারো প্রশ্নের জবাব কেবল আপাদমস্তক রহস্যে ঢাকা এই উপন্যাসটি পুরোপুরি পড়লেই পাওয়া সম্ভব।

এবার আসি উপন্যাসের চরিত্র ভিত্তিক বিশ্লেষণের গল্পে। এই আলোচনা শুরু করবার আগে যে কথাটি না বললেই নয়, তা হচ্ছে— এখানে কোনো একক কেন্দ্রীয় বা মূল চরিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। গল্পের সামঞ্জস্য বজায় রাখবার জন্য এখানে ঔপন্যাসিককে অনেকগুলো চরিত্রের আশ্রয় নিতে হয়েছে। গল্পে সেসব চরিত্রের গুরুত্বের কিছুটা তারতম্য থাকলেও কোনো চরিত্রই একেবারে ফেলনা বা গুরুত্বহীন নয়। গল্পের প্রবাহ ধরে রাখতে একেক চরিত্র একেক সময় একেকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে বটে; তবে সার্বিক বিচারে কোনো একক চরিত্র কেন্দ্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি কোথাও। যা হোক, এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের কথা বলতে গেলে শুরুতেই বলতে হয় আমজাদ প্রেসিডেন্টের কথা। কাগজে-কলমে শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হলেও ভবানীপুর গ্রামের নয়নতারা পাটকলের অলিখিত সম্রাট তিনি। সত্যি বলতে, পুরো ভবানীপুর গ্রামেই তার প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাব এতোটাই যে খোদ উক্ত এলাকার চেয়ারম্যান সিরাজ মোল্লা পর্যন্ত সমীহ করে চলে। স্থানীয় পাটকল শ্রমিকেরাই তার এই ক্ষমতার উৎস। এ কারণেই তাকে শ্রমিকদের আবেগ-অনুভূতি বুঝে পা বাড়াতে হয়। রাজনীতির মাঠের সেয়ানা খেলোয়াড় বলে পরিচিত আমজাদ প্রেসিডেন্ট নামক চরিত্রটির মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক আবদুল্লাহ আল ইমরান এক সুবিধাবাদী নেতার চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন। শ্রমিকবান্ধব নেতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক স্বার্থান্বেষী মানুষের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে তার মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি তাকে একজন আদর্শ পিতা হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই উপন্যাসে। নানা রকম অবৈধ কাজকর্মের মধ্য দিয়ে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া এই মানুষটির মধ্যেও যে একজন ভালো মনের পিতার ছায়া লুকিয়ে থাকতে পারে, তা পাঠকের কাছে বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন ঔপন্যাসিক। এক্ষেত্রে তিনি যে দারুণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, তা আলাদা করে বলাই বাহুল্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রাখা হয়েছে পলাশকে। একেবারে শৈশব থেকেই ভবানীপুরে বেড়ে ওঠা কিশোর পলাশ নয়নতারা মিলের স্থায়ী শ্রমিক সোলায়মান মিয়ার ছেলে। বন্ধুপ্রিয় হলেও পরিবারের কিছু দিক তাকেই দেখভাল করতে হয় তার মায়ের পাশাপাশি। কারণ তার সঙ্গীতপ্রেমী সংসারধর্মে একেবারেই মন নেই। এর পাশাপাশি একদিন হঠাৎ করেই তার সহপাঠিনী চন্দ্রলেখার সাথে প্রেম হয়ে গেল। শুরুতে ধর্মীয় বাধার কারণে পিছিয়ে আসতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তারা কেউই পিছিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু এই সম্পর্ক কি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে? এই চরিত্রের ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক এক গ্রাম্য কিশোরের প্রতিচ্ছবি এঁকে চলেছেন। উঠতি বয়স; তাই আবেগটাও স্বভাবতই বেশি অন্যদের তুলনায়। নির্মম বাস্তবতাজ্ঞান সমবয়সী অন্যদের তুলনায় বেশি হলেও তা যথেষ্ট নয় এখনো। এখনো তার মনোজগৎ আবেগে টইটুম্বুর। চঞ্চলতা যে এখনো তার পিছু ছাড়েনি! যা হোক, এক্ষেত্রেও ঔপন্যাসিক তার নিজস্ব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

উপর্যুক্ত দুইটি চরিত্র ছাড়াও এই উপন্যাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পাঠক হিসেবে চোখে পড়েছে। সে চরিত্রের নাম "মিষ্টি"। এলাকার সবার কাছে " মিষ্টি বৌদি" নামে পরিচিত এই মহিলা নিজের নামের সার্থকতা ধরে রেখেছেন। গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ হলে কী হবে? নিজের মায়াময় চেহারা ও মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে অল্পদিনেই জয় করে নেন সকলের মন। তবে এ ব্যাপারটা একসময় তার জীবনে সাপে বর হয়ে আসে। নিজের সুন্দর চেহারা, অটুট যৌবন ও সুন্দর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে এলাকার পুরুষেরা নানা অজুহাতে তার বাড়িতে আসতে শুরু করলে অন্য মহিলাদের চক্ষুশূলে পরিণত হতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি তার। এলাকার অনেকেই তার দিকে কামুক দৃষ্টিতে তাকালেও তার ভালো লাগে সদালাপী হারুনকে। অত্যাচারী, মাতাল স্বামী বিষ্ণুর অত্যাচার সইতে না পেরে একসময় মিষ্টি সাক্ষাৎ দেবীর মতো রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন। এর মাঝে ঘটতে থাকে অনেক ঘটনা। ক্ষণে ক্ষণে রঙ পাল্টানোর সে গল্প জানতে চাইলে পড়তে হবে এই বইটি। এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে আবদুল্লাহ আল ইমরান এক সদালাপী, মিষ্টভাষী অথচ সতিসাধ্বী নারীর চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন, যিনি কিনা জীবনের প্রয়োজনে মমতাময়ী মা কিংবা প্রেমময়ী স্ত্রী যেমন হতে পারেন, তেমনি অসুর বধকারিণী দেবী দুর্গা-ও হয়ে উঠতে পারেন। এক্ষেত্রে ঔপন্যাসিকের চরিত্র চিত্রণের দক্ষতা সত্যিকার অর্থেই প্রশংসার দাবি রাখে।

উপরে আলোচিত তিনটি চরিত্র ছাড়াও উপন্যাসে আরো বেশকিছু চরিত্র চোখে পড়ে। উপর্যুক্ত তিনটি চরিত্রের মতো অধিক গুরুত্বপূর্ণ না হলেও গুরুত্বের বিচারে কেউ কারো চাইতে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। এসব চরিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু চরিত্র হচ্ছে— চন্দ্রলেখা, মন্টু, নাজিমউদ্দিন, রাজু, কাঞ্চন, ছাইদুল, মকবুল, জগলু, সোলায়মান মিয়া, বিষ্ণু, হারুন, নরেশ ঠাকুর, পরেশ, মহুয়া, অতনু, আশালতা দেবী, অতসী রাণী, শম্পা, সিরাজ মোল্লা, রকিব, ফাতেমা, গণেশ, সুরেশ প্রমুখ। উপন্যাসের গল্পে নতুন কোনো দিক যুক্ত করবার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট এসব চরিত্র উপন্যাসের মূলগল্পে কোনো রকম ব্যাঘাত ঘটায়নি; বরং তাতে এক নতুন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হয়েছে। এসব চরিত্রের সংযোজন প্রসঙ্গক্রমে উপন্যাসের কাহিনীকে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, গল্পের প্রয়োজনে চিত্রিত এসব চরিত্র উপন্যাসের সাহিত্যগুণে কোনো রূপ অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি বা সৃষ্টি করেনি কোথাও। আশা করি, এই ব্যাপারটি কোনো পাঠকের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে না।

এবার আসি বইটির ভাষাগত বিশ্লেষণের আলোচনায়। মূলত বইটিতে বাংলা ভাষার চলিত রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। অত্যন্ত সহজবোধ্য ও প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা বইটি কোনো পাঠকের কাছেই কঠিন লাগবে না বলে আমার বিশ্বাস। কোথাও কোথাও সংলাপের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হলেও তাতে বইটির মূল ভাবগাম্ভীর্য একটুও বিনষ্ট হয়নি। বরং তাতে গল্পের আকর্ষণ আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। শব্দচয়নের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্যতা সহজেই একজন পাঠকের চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপমার যথাযথ প্রয়োগ বইটির সাহিত্য মান বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এর পাশাপাশি জীবন ঘনিষ্ঠ দর্শনের কথা একে আরো সমৃদ্ধ করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বিষয়বস্তুকে ধরা ও সঠিক শব্দচয়নের মধ্য দিয়ে তাকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ আল ইমরানের দক্ষতার প্রশংসা করেছেন। যা হোক, সবমিলিয়ে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে ভাষাগত কোনো ত্রুটি আমার নজরে পড়েনি। আশা করি, অন্যদেরও ভালো লাগবে।

এতক্ষণ তো শুধু বইটির নানান ভালো লাগা বিষয় নিয়ে কথা হলো। এবার একটু মন্দলাগা নিয়েও কথা হোক! কেননা, কোনো বিষয়ে রিভিউ করতে গেলে ভালোলাগা বিষয় নিয়ে যেমন কথা বলতে হয়, তেমনি মন্দলাগা বিষয়েও কথা বলতে হয়; নইলে সে আলোচনা পূর্ণতা পায় না। যাই হোক, মূল কথায় ফিরে আসি। বইটির কিছু কিছু বিষয় আমার কাছে তেমন ভালো লাগেনি। যেমন, গল্পের প্রয়োজনে সৃষ্ট হলেও চরিত্র সংখ্যার আধিক্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে গল্পের ধারা বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে। এক প্রেক্ষাপট থেকে আরেক প্রেক্ষাপট দ্রুত পাল্টে যাবার ফলে এ কাজটা তেমন সহজ মনে হয়নি আমার কাছে। এছাড়া কিছু কিছু জায়গায় শব্দের ভুল বানান চোখে পড়েছে, যা স্বাভাবিকভাবেই ভালো লাগেনি আমার কাছে। পরবর্তীতে এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ আরো সতর্ক হবেন বলে আশা করি।

সবশেষে বলা যায়, গ্রামীণ সমাজের নানাদিক তুলে ধরা এই উপন্যাসে বাংলার আপামর জনতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। যেভাবে এখানে গ্রামীণ সমাজ ও প্রকৃতির আবহ তুলে ধরা হয়েছে, সেদিক দিয়ে এটিকে কালিদাসের "মেঘদূত" কাব্যগ্রন্থের সাথে তুলনা করা চলে। অন্যদিকে যেভাবে গল্পের ঘটনাবলী এগিয়েছে, তাতে এটিকে কোনো থ্রিলার বা রহস্য উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে তাতেও খুব একটা ভুল হবে না বলে আমার ধারণা। এক কথায় সার্বিক অর্থে বেশ ভালো লেগেছে বইটি। আশা করি, অন্য পাঠকদের কাছেও বইটি ভালো লাগবে।

পাঠ অনুভূতি সুখের হোক!

বই সংক্রান্ত তথ্যঃ
বইয়ের নামঃ কালচক্র
লেখকঃ আবদুল্লাহ আল ইমরান
বইয়ের ধরণঃ সামাজিক উপন্যাস
প্রকাশনাঃ অন্বেষা প্রকাশন
প্রথম প্রকাশঃ অমর একুশে বইমেলা, ২০১৮
প্রচ্ছদঃ সানজিদা পারভীন তিন্নি
আইএসবিএন নম্বরঃ ৯৭৮-৯৮৪-৯৩২৩৬-২-৪
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ২০০
মুদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা

Profile Image for Rehnuma.
482 reviews23 followers
Read
July 8, 2025
❛জীবন নানা রঙের সমাহার। কেউ জীবনের সকল রং উপভোগের সুযোগ পায়। আবার কেউ বেদনার নীল রং ছাড়া কিছুই ভাগে পায় না। হয়তো একজনের জীবন রঙিন করতেই আরেকজনের জীবনের রঙিন দিনগুলো ত্যাগ করতে হয়!❜

ভৈরব নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা গ্রাম ভবানীপুর। এই গ্রামের অধিকাংশ লোকের রুটি রুজির জোগান দেয় নয়নতারা মিল। পাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই মিলেই দিন এনে দিন খায় হাজারো শ্রমিক। সপ্তাহের শেষে দেয়া মিল স্লিপ দিয়ে টাকা তুলে গরীব ঘরগুলো দিনাতিপাত করে। সপ্তাহের শেষ যেন এই গরীব মানুষগুলোর জন্য ঈদ-পুজোর মতো।
তবে কালের আবর্তে পাটের চাহিদা কমছে। নানা সমস্যায় জর্জরিত হতে হচ্ছে। বন্ধ হবার উপক্রম হচ্ছে মিল। এই এক মিল ঘিরেই যেখানে এক গাঁয়ের লোকের জীবিকা সেই মিল বন্ধ হলে কতগুলো পেটে লা থি পড়বে?

হেমন্তের শেষ বিকেলের একদিনে গাছে ঝুলে রইলো মহুয়ার নিথর দেহ। ঠাকুরবাড়িকে মাতিয়ে রাখা মহুয়ার মনে কী এমন দুঃখ ছিল যে তাকে জীবনটাই শেষ করে দিতে হলো?
চারদিকে রি রি পড়ে গেছে এই সংবাদে। পাড়াপড়শি তো আছেই সেই সাথে সুযোগসন্ধানী কেউ কেউ এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে নিজের ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছে।
ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা প্রায় লোকের সম্মুখে আসা বন্ধই করে দিয়েছে এ ঘটনার পর। বাড়ির কর্তা নরেশ কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন কাউকে বাড়ির বাইরে যেতে।

এই নিষেধাজ্ঞায় মুষড়ে গেছে বাড়ির কন্যা চন্দ্রলেখা। মহুয়া পিসির এইরকম চলে যাওয়া তাকে এমনিতেই থমকে দিয়েছে। সেই সাথে জুড়েছে বাবার এই ঘোষণা। অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া চন্দ্রের মনটা তাই অস্থির। এই অস্থিরতার কারণ অনেকটাই পলাশকে ঘিরে। কতদিন যোগাযোগ হয়না তার সাথে।

পলাশও অষ্টম শ্রেণীতে পড়া উচ্ছ্বল বালক। বাবা সোলায়মান কাজ করে মিলে বদলি শ্রমিক হিসেবে। মোটের উপর তাদের চারজনের এক পরিবার চলে অনেক কষ্টে। বাবা উপার্জন করলেও সে উদাসীন। সোনাদিয়ায় সব খুইয়ে তিনি ঘর বেঁধেছিলেন এখানে। কিন্তু সংসারী হয়ে আর ওঠেননি। মিলে সপ্তাহের টাকা পেয়েই চলে যেতেন হরিহরণের গানের আসরে। খরচ হতো অনেকগুলো টাকা। বাকি সপ্তাহের দিনগুলো কত কষ্টেই না মা সাজিয়া চালিয়ে নেন!
এই অভাবের জীবনে হেমন্তের হাওয়ায় মতো চন্দ্রলেখা এলো পলাশের জীবনে। সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের মেয়ের সাথে শ্রমিক ঘরের পলাশের সম্পর্ক আদতেই কোনো ভবিষ্যত আছে কি? কিন্তু মনের উপর তো বাঁধ নেই কারো।
একটা জীবন কি পলাশ পারবে চন্দ্রের হাত ধরে কাটাতে? পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

আমজাদ প্রেসিডেন্ট মিলের নেতাগোছের লোক। গত দশ বছরে তাকে নির্বাচনে হারাতে পারেনি কেউ। তুখোড় বুদ্ধির আমজাদ বেশ রাজনীতি করেই নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে। নিত্য নতুন ফন্দি করে নিজের লাভ করে নিচ্ছে। তার কাছে কাজ করা জগলুর ছেলের প্রতি অমোঘ এক টান তার। সদা নিজের স্বার্থের দিকে থাকা লোকটার এমন গরীবের সন্তানপ্রীতির কারণ কী?

মিষ্টিকে সকলে ❛মিষ্টি বৌদি❜ নামেই চেনে। বিষ্ণুর ঘরে এমন টগবগে, রূপবতী বউ আসবে কেউ ভাবেনি। এ যেন, ❛বাঁদ রের গলায় মুক্তোর হার!❜
পাড়ার ব্যাটাদের চোখ মিষ্টির দিকে আছে। সে চোখের কাম কোনটা আর ভালোবাসা কোনটা মিষ্টি বোঝে। কিন্তু নিজেকে বাঁচিয়ে চলে। যার জন্য ভবানীপুর পা গল তার জন্য টান নেই ঘরের পুরুষেরই। এর থেকে দুঃখের আর কী হতে পারে?
তবুও হারুনের দৃষ্টি তার ভালোলাগে। সে চোখে চাহিদার থেকে বেশি দেখেছে মায়া।

সিরাজ মোল্লা তক্কে তক্কে আছে। ঠাকুরবাড়ির লোকেদের এই বিপদে নিজের সুবিধা যদি করতে পারে। সেজন্য ফন্দি ফিকির করছে। গাঁয়ের লোকেদের হাত করা ব্যাপার না। অন্যের বিপদে নিজের সুবিধা হাসিল করতে তার জুড়ি নেই।

পাটকলে সপ্তাহের মিল দেয়া বন্ধ। কথা শোনা যাচ্ছে বন্ধ হয়ে যাবে। ভর্তুকি দিয়ে আর চালানো যাবে না। এক সপ্তাহে টাকা বন্ধ তাতেই ভবানীপুরের অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে গেছে। একেবারে বন্ধ হলে এতগুলো শ্রমিকের পেটের দায় কে নেবে?
শ্রমিক অসন্তোষ, টাকা না পাওয়া এইসব ঘিরে ইতোমধ্যে থমকে গেছে রকিবের মতো কিশোরের জীবন। ভিটেমাটি বিক্রি করে ছুটতে হয়েছে শিকড়ের উদ্দেশ্যে। স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে পলাশেরও। লেখাপড়া করে বড়ো হওয়ার স্বপ্নটা ক্রমেই পরিবারের জন্য কিছু করার টানের কাছে হিমশিম খাচ্ছে।
এরইমধ্যে এক পরিকল্পনা করছে প্রেসিডেন্ট আমজাদ। নিজের ফায়দা তো হবেই সেইসাথে যদি লাভ কিছু একটা হয়ে তো সোনায় সোহাগা।
কী ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে চন্দ্রলেখার জন্য? পলাশের জীবনের চাকা কি স্বপ্নের দিকে ঘুরবে নাকি সেই স্বপ্নের চাকাই স্বপ্নগুলোকে পিষে ফেলবে সেটা কালচক্রে জানা যাবে।
এটাই জীবন আর এটাই নিয়তির লিখন। খণ্ডানো বড়ো দায়!


পাঠ প্রতিক্রিয়া:

❝কালচক্র❞ আবদুল্লাহ আল ইমরানের লেখা সামাজিক উপন্যাস।
গ্রামীণ জীবনের ভিত্তিতে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জীবনের টানাপোড়নের গল্প উঠে এসেছে উপন্যাসে।
পাট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একে ❛সোনালী আঁশ❜ বলা হয়। কালের বিবর্তনে পলিথিনের ব্যবহার, পাটশিল্পের প্রতি অনীহা, মিলগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি আর বেখেয়ালি স্বভাবের কারণে এই শিল্পের ভঙ্গুর দশাকে লেখক অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন। মিল শ্রমিকের জীবন, তাদের অসহায়ত্ব, নেতাদের ফায়দা হাসিলের কুটিল বিষয়গুলো এসেছে।
চোখের সামনে স্বপ্নভঙ্গ, অভাবের তাড়নায় নিজেদের জীবনের সুখগুলোকে ভুলে যাওয়া, শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য কী সংগ্রা ম করতে হয় তার বাস্তব চিত্র এসেছে উপন্যাসের প্রতিটি পাতায়।
এসেছে দুটো ভিন্ন ধর্মের কিশোর-কিশোরীর অবুঝ প্রেমের গল্প। যেখানে মন দেয়া-নেয়া ছিল, কিন্তু ছিলনা পঙ্কিলতা। ছিল অনেক বাঁধা পেরিয়ে তাদের ভবিষ্যতে এক হওয়ার আশা। কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। আচানক ঝড়ে সব ওলটপালট করে দেয়। তবুও এক আকাশ আশা নিয়ে তারা বাঁচে।
❛হয়তো কোনোদিন পূরণ হবে অধরা সেই স্বপ্ন!❜

লেখকের লেখার গতি ভালো। মেদহীন ঝরঝরে লেখা পড়তে সময় লাগে না। শব্দচয়ন, গল্পের বর্ণনার ধরন ভালো বিধায় খেই হারাতে হয় না।
উপন্যাস কল্পনার আশ্রয়ে লেখা হয়। এখানে আমরা সবশেষে একটা সুখী সমাপ্তি আশা করি। কিন্তু বাস্তবতা তো তেমন না। সবাই কি জীবনে একটা সুখী সমাপ্তি পায়? বিশেষ করে যাদের প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে লড়া ই করে টিকে থাকতে হয়। যাদের জন্য একবেলা খাবার আসলে পরেরবেলা জুটবে কি না সেই নিয়ে চিন্তা করতে হয় তাদের জীবনে সুখ কতটুক? সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোকেদের নিয়ে লেখক উপন্যাসে দারুণ উপস্থাপন করেছেন।

লেখকের লেখায় নারীরা প্রাধান্য পায়। বিশেষ করে গৃহিণী সমাজকে লেখক মন উজাড় করে উপস্থাপন করেন। উপন্যাসের সাজিয়া বেগম তারই বহিঃপ্রকাশ। শত ঝঞ্ঝা পেরিয়েও সংসারের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিনশেষে তাদের জীবনটা শুন্যই থেকে যায়।

ভালোবাসা প্রকাশ ছাড়াও ভালোবাসা যায়। মনের গহীনে লুকিয়ে রাখা ভালোবাসার মায়াময় এক চিত্র ছিল উপন্যাসে। সংসারে উদাসীন হলেও সোলায়মানের মনের গহীনে সাজিয়ার জন্য অপ্রকাশ্য ভালোবাসার মতো সুন্দর জিনিস আর হয়না।
পুরুষের কোমল, কঠিন আর ধূসর দিকগুলো একেকটা চরিত্রের মাধ্যমে লেখক এনেছেন।

ধর্মীয় বিষয়গুলো এসেছে বেশ করুণ এবং কঠোর ভাবেই। যদিও একপাক্ষিক ধর্মীয় জোরালো বিষয়টা আমার কেন জানি ভালো লাগেনি। এর আগে পড়া আরেকটা উপন্যাসেও প্রচ্ছন্নভাবে এই বিষয়টা ছিল। উপন্যাসের ঘটনার সময়কাল হিসেবে যৌক্তিক হলেও একই কাহিনি কেন জানি ভালো লাগেনি।
মারফতি, আত্মিক গানের প্রতি লেখকের টান আছে মনে হয়। উপন্যাসে সেগুলোর খুব সুন্দর ব্যবহার করেন। এই বিষয়টা ভালো লেগেছে।

এখানেও ❛চোখটা কি একটু ভিজে এলো, গলা কেঁপে উঠলো❜ জাতীয় বাক্যের প্রয়োগ ছিল। একইসাথে দুটো পড়ায় হয়তো আমার ভালো লাগেনি।

মোটের উপর সমাজের নিম্নশ্রেণীর দুর্দশা আর তার মধ্যেই সুখ খুঁজে নেয়া মানুষগুলোর জীবনের গল্প উপভোগ্য।

চরিত্র:

উপন্যাসে কাউকে মূল চরিত্র হিসেবে মনে হয়নি।
অনেকগুলো চরিত্রের সমাগম ছিল। ভালো-মন্দ, সরল, সুযোগ সন্ধানী চরিত্রের মিশেল ছিল।
অনেকগুলো চরিত্রের সমাবেশ হয়েছিল। যার যার জীবনে তার গল্পটাই মুখ্য।

❛জীবন বহমান। এই জীবনে ঝড়ঝাপটা আসবে। হয়তো শিকড় ছুটে যাবে। নতুন জায়গার সন্ধান করবে। তবুও জীবন চলবে। প্রতীক্ষা দীর্ঘ হবে পৌষের রাতের মতো। তবুও জীবন টিকে থাকার এই দৌঁড়ে কেউ থেমে থাকবে না।❜

Profile Image for শোয়েব হোসেন.
198 reviews14 followers
February 23, 2023
৪.৫/৫
বেশ ভালো লাগছে। পাটকল শ্রমিকদের হাসি, কান্না, রাজনীতি, বেঁচে থাকা সব মিলিয়ে গল্প। যারা নতুন লেখকদের সমকালীন গল্প খোঁজেন কিন্তু পান না, তারা ট্রাই করতে পারেন।
Displaying 1 - 4 of 4 reviews