বনস্পতির বৈঠক সুসাহিত্যিক প্রবোধকুমার সান্যাল এর আত্মজীবনীমূলক বই। বইটি দুই খন্ডে প্রকাশিত। লেখক তার জীবনের প্রথম দিকের ঘটনাগুলো এই বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন।১৯০৫-১৯৩৫ সাল পর্যন্ত সময়ের ঘটনাগুলো এই বইয়ে স্থান পেয়েছে। ধারাবাহিকভাবে লেখাটি দেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো।
Sanyal, Prabodh Kumar (1905-1983) litterateur, journalist and traveller, was born on 7 July 1905 at his maternal uncle’s house at Chorbagan in Kolkata. During 1937-1941 he worked as editor of the Sunday literary magazine of Jugantar. While working as editor of the Swadesh he was once accused of sedition. He also edited the Bijli and Padatik. Prabodh Kumar loved travelling, and travelled six times all over India, going to many inaccessible areas in the Himalayas. Apart from India and Nepal, he also travelled to other places in Asia as well as Europe, the Americas and Russia. He enriched the travel literature of Bengal by writing books such as Mahaprasthaner Pathe (1937), Russiar Diary, Debatatma Himalaya (2 vol) and Uttar Himalaya Charit. Mahaprasthaner Pathe was immensely popular. In 1960 he established the Himalayan Association in Kolkata. In1968 he was made president of the Himalayan Federation. In 1978 he went to Norway via the North Pole. Prabodh Kumar is primarily known as a novelist of the ‘Kallol era’. Apart from the Kallol, he used to write regularly in journals such as the Bijli, Swadesh, Dundubhi, Padatik, Forward, and Banglar Katha. His first novel Jajabar was published in 1928. This was followed by Priyabandhabi (1931), Agragami (1936), Ankabanka (1939), Puspadhanu (1956), Bibagi Bhramar, Hasubanu, Banahansi, Kanch Kata Hire and Nishipadma. In his novels and short stories he laid more emphasis on friendly human relationship between man and woman than on physical sex. His love for travelling significantly influenced his novels, which describe a variety of characters living diverse lives by preference to solitary characters living confined, sedentary lives. He used simple but effective language to describe the complex life stories of his characters. In recognition of his literary achievements, Prabodh Kumar was awarded a gold medal by Calcutta University (1911), the Shishir Kumar and Motilal prizes (1910) and the Sharat and Ananda prizes (1980). Prabodh Kumar Sanyal died on 17 April 1983
ছোটোবেলায় টাকা চুরি করতেন প্রবোধকুমার সান্যাল। মামা নিয়মিত আফিম ও গাঁজা খেতো। সেই নেশার পয়সার জন্য প্রতিদিন নানির সাথে ঝগড়া করতো। বাবা মারা গিয়েছিল লেখকের মাত্র চারমাস বয়সে। তাই বিধবা মায়ের সঙ্গে নানিবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রবোধকুমার সান্যাল। সেখানেই বড়ো হন। বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। মানবচরিত্রের মহত্ত্ব অল্পবয়সেই তাকে আলোড়িত করেছিল। আবার, মানুষের প্রচণ্ড নির্দয় মানসিকতার সাক্ষী হয়েছেন ছোটোবেলাতেই।
প্রবোধকুমার সান্যালের আত্মজীবনীর পহেলা খণ্ড 'বনস্পতির বৈঠক'-এর প্রথম দেড় শ পাতার মতো মোহজাগানিয়া আত্মকথা খুব কম লেখা হয়েছে। পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল ম্যাক্সিম গোর্কির 'আমার ছেলেবেলা'র বাঙালি সংস্করণ বুঝি এই বই! এতটাই মনোমুগ্ধকর লেখা। অথচ এরপর হোঁচট খেলাম। হঠাৎ গান্ধীজির আগমন ও রাজনীতির আবির্ভাবে তাল কেটে গেল। এরপর কাহিনিতে আর ছন্দ ফিরে আসেনি।
জীবনীগ্রন্থ বা আত্মজীবনী নয়, পুরো জীবনের একটা খন্ড সময়কে এখানে তুলে ধরেছেন লেখক। জন্মের পরপর বাবকে হারিয়ে মামার বাড়ীতে বিশাল এক পরিবারে বেড়ে ওঠা। পরিবার ও সমাজের টুকরো টুকরো ঘটনা ছাড়াও সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামজিক অবস্থা নিয়েই এই উপন্যাস বনস্পতির বৈঠক। লেখক প্রবোধকুমার সান্যাল খুব ছোট বয়সে বাবাকে হারিয়ে সংগ্রাম করে টিকে থেকেছেন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা পেশায় নিজেকে জড়িয়েছেন মিশেছেন বিখ্যাত অনেক মানুষের সাথে, বন্ধু হিসেবে পেয়েছেন খ্যাতিমান অনেকেই। সেই সব টুকরো টুকরো স্মৃতি নিয়ে ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতা পূর্ব অখন্ড বাংলাদেশর সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যের ধারা নিয়েই দুই খন্ডের বই " বনস্পতির বৈঠক "।
বেশিরভাগ লেখকদের আত্মকথায় তাঁদের শৈশব আসে সুন্দর হয়ে। এই আত্মকথায় শৈশব তত সুন্দর নয়, অনেক বেশি বাস্তবঘেঁষা। জন্মের সাড়ে তিন মাসের মধ্যে বাবাকে হারিয়ে পরিবারসহ লেখকের মাকে আশ্রয় নিতে হয় মামাবাড়িতে। আর সেখানে আফিমখোর অর্ধেক পাগল মামার নির্যাতন কমবেশি সবাইকেই সইতে হয়েছে। নানা ভালো মন্দ অভিজ্ঞতায় শৈশব বয়ে গেছে লেখকের। আস্তে আস্তে বড় হয়েছেন, কিন্তু স্বভাবে ঘরছাড়া, ছন্নছাড়া। অসংখ্য অ্যাডভেঞ্চার করেছেন, লিখেছেন, ইচ্ছেমতো চাকরি করেছেন আবার যে কাজ ভালো লাগে তাই করেছেন পয়সার তোয়াক্কা না করে৷ অত্যন্ত আকর্ষণীয় জীবন।
একদা,মানে সেই ১৯০৫ সালে কলকাতার এক ভাড়া বাড়িতে জন্ম নিয়েছিলো এক ছেলে। সে বছরই বাংলা ভাগ হয়, স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়। জন্মের ৩ মাস পরেই সে হারালো তার বাবাকে। বিলাসী, উড়নচন্ডী, রগচটা মানুষটি সঞ্চয় করে যান নি এতোটুকু। তাই একসময়ের উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারটি প্রায় পথে বসে। আশ্রয় দেন দিদিমা।তার আরও কয়েকটি বিধবা মেয়ে আর তাদের পরিবারের সাথে এদের ভার তুলে নেন। বনস্পতির মতো তাদের আগলে রাখেন ভট্টাচার্য্য বাগানের সেই দোতলা বাড়িতে।হ্যা একটা মামাও ছিলো, আফিং এর নেশায় জর্জরিত, স্ত্রীর প্রতি সন্দেহবাতিকগ্রস্থ, ঝগড়াটে এক মামা। সব মিলিয়ে বাড়ির পরিবেশটা কোন মানুষের বেড়ে ওঠার পক্ষে সুস্থ, স্বাভাবিক ছিলো না।তবু সেই বাড়িতে বেড়ে ওঠে সেই শিশুটি, তাকে কেউ ডাকে রাম, কেউ বা খোকা, কেউ রামখোকা, কারো কাছে সে আবার বিভূতি, সেই আমাদের প্রবোধ কুমার সান্যাল। বছরে কাপড় জুটতো মোটে একটি, স্কুলের বই ধার করে বা পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে কিনে আনতে হতো। পড়াশোনা, ঐ কলেজ পর্যন্ত। তবে পাঠ তার পৃথিবী থেকে, বাড়ি ভাড়ার টাকায় দিদিমার সংসার চলতো, কয়েকবছর নিজেরা অন্যের ছোট বাড়িতে কম ভাড়ায় থেকে নিজেরা ভাড়া দিয়ে সংসার চালিয়েছেন। সেই সুবাদে দেখা হয়েছে আরও অনেক মানুষ, কতো রকমের মানুষ তারা, জীবনের পাঠ তো এভাবেই। কতো বন্ধু জুটলো, কতো মানুষের কদর্যরূপ দেখলেন। ছোট বেলার নন্টু, সুলতা, কৃষ্ণদাসী এদের দিয়ে নারী চরিত্রের পাঠও হলো কিছুটা।স্বদেশী আন্দোলনে কিছুটা জড়িয়ে যাওয়ায় ভালো কলেজে পড়া হলো না।সেই কলেজ এর পড়াও বোধহয় শেষ করেন নি। মাঝে শুরু করলেন মাছের ব্যবসা, সেখানে জেলে পল্লীতে সুযোগ এলা ধর্ম ব্যবসারও, পেয়েছিলেন দেবদাসী লাভের সুযোগও। কিন্তু অর্থ বা নারী লোভ তাকে বাধতে পারলো না। তারপর শখের থিয়েটার, গল্প লেখা, পত্রিকা ব্যবসা, সাহিত্যের আড্ডা, ধোঁকা খেলেন বড় রকমের। এরপর জুটে গেলো পোস্ট অফিসে কেরানীর চাকরী। দরিদ্র পরিবারের জন্য সেটাও অনেক। কিন্তু মন টিকলো কৈ? তারপর কাশীযাত্রা সেখানে সাহিত্য চর্চা, আড্ডা, অবশেষে কাশীতেও চাকরী জীবন। এর মধ্যে ঘুরে এসেছেন উত্তর, মধ্য, পশ্চিম আর দক্ষিন ভারতের প্রায় সব তীর্থ। আবার চাকরী বদল, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সামরিক বিভাগে কেরানীর চাকরী। সেই চাকরীর সুবাদে মারী, রাওয়ালপিন্ডিতে থাকা, কাশ্মীর আর পাঠান মুল্লুকে ঘুরে বেড়ানো। আবারও চাকরী ছাড়া।নিশ্চিন্ত কেরানীর জীবন তাকে বাধতে পারেনি। সুশ্রী কন্যার কন্যাদায়গ্রস্থ পিতারা তাকে আটকাতে পারেননি, চাকরীর নিশ্চিত উন্নতিও আকর্ষন করেনি। স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছেন দারিদ্র্যের, বাউন্ডেলেপনার জীবন বারবার। সাহিত্যিক বন্ধুও ছিলো প্রচুর, কল্লোল যুগের লেখক তিনি। কল্লোল, কালিও কলম, ভারতবর্ষ লিখেছেন অনেক কাগজেই। আরও পরে তো লিখেছেন মহাপ্রস্থানের পথে, বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের সেরা এক বই। এত নিরাসক্তভাবে তীর্থভ্রমণ কাহিনী লিখতে আর কাউকে দেখিনি। এই আত্মজীবনীতেও লেখকের নির্লোভ, নিরাসক্ত চরিত্র বারবার ফুটে উঠেছে। প্রথমপর্ব ভালো লেগেছে, দ্বিতীয় পর্ব পড়ার অপেক্ষায়।