আত্মকথার সার্থকতার বিষয়টি মাথায় রেখেই জর্জ অরওয়েল লিখেছিলেন,
"Autobiography is only to trusted when it revels something disgraceful. "
প্রবীণ রাজনীতিবিদ শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন ৬৩৭ পাতার এক সুবৃহৎ আত্মস্মৃতি লিখলেন। তারই নাম " বলেছি বলছি বলব"। জেলহত্যা মামলার আসামি হিসেবে শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম টার্মে আবারও আশ্রয় জোটে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে। তখনই কারাপ্রকোষ্ঠে বসে লিখতে শুরু করেন সুদীর্ঘ জীবনের উত্থান-পতনের নানা কাহিনি। পেশা এবং নেশা দু'টোই রাজনীতি শাহ্ মোয়াজ্জেমের। এই আত্মজীবনী বাংলাদেশের এমন এক রাজনীতিবিদের যিনি একাধারে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি, বঙ্গবন্ধু আমলের চিফ হুইপ, মোশতাকের মন্ত্রিসভার সদস্য, মোশতাকের দলের নেতা, জাতীয় পার্টির নেতা, এরশাদের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং সর্বশেষ অবস্থান করছেন বিএনপিতে।
একেই বোধহয় বলে পেশাদার রাজনীতিক! ভাষা আন্দোলনের সময় স্কুলছাত্র মোয়াজ্জেমের প্রথম জেলগমন। এরপর জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। মূলত, শাহ্ মোয়াজ্জেম পুরো আত্মস্মৃতি রাজনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত। পাকিস্তান আমলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। সেই আমলের আন্দোলন, সংগ্রামে অংশগ্রহণের কথা লিখতে গিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক পুরোধা ব্যক্তিত্বের কথাও প্রসঙ্গক্রমে লিখেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সান্নিধ্য পেয়েছেন। একই সেলে জেল খেটেছেন। দেখেছেন পাকিস্তান আমলে বড় বড় নেতাদের ছোট ছোট কাজ। শাহ্ মোয়াজ্জেম কট্টরভাবে দক্ষিণলবির সমর্থক। তাই অন্যান্যদের অবস্থানকে বরাবরই ক্ষীণভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চোখে পড়েছে। আর পুরোটা সময় নিজেকে যেভাবে বড় করে দেখিয়েছেন তাতে মনে হয় তিনি ভুগেছেন Megalomania তে।
মুক্তিযুদ্ধে মোশতাক গংয়ের অশুভ প্রয়াস অজানা নয়। শাহ্ মোয়াজ্জেমের সাথে নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের সাথে তখন ভালো সম্পর্ক ছিল বলে লিখেছেন। নিজের যুদ্ধকালীন ভূমিকাকে বৃহৎ পরিসরে বর্ণনা করেছেন। কতটা গৌরবময় তা পড়তে গিয়ে টের পেয়েছি। তা পড়লে মনে হবে মোশতাককে তিনি চেনেনই না। তাহে ঠাকুরের নামই শোনেন নি। তাই জনাব শাহ্ মোয়াজ্জেমের লেখার সততা নিয়ে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে মনে। বঙ্গবন্ধু শাসনামলে শাহ্ মোয়াজ্জেম গণপরিষদের সদস্য, চিফ হুইপ ছিলেন।সেই আমলের কঠোর সমালোচনা করলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ও নেতাকর্মীদের লোভ দলকে ও দেশকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলেছিল তা বেশ বর্ণনা করলেন। অথচ নিজে দলের চিফ হুইপ ছিলেন। তিনি তার ভূমিকা সেইসময়ে ঠিক ছিল নাকি বেঠিক ছিল সেদিকে নজর দিলেন না। রাজনৈতিক অস্থিরতার দায় জাসদসহ অন্যান্যদের ঘাড়ে চাপালেন। কিন্তু তৎকালীন রক্ষীবাহিনীর কর্মকান্ড নিয়ে বিশেষ কিছুই নেই। আবারও মনটা খচখচ করতে লাগলো শাহ্ সাহেবের ঘটনা বর্ণনে সততা নিয়ে।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর জাতীয় চারনেতা ব্যাতীত বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার প্রায়সব সদস্যই মোশতাকের মন্ত্রিসভা অলঙ্কৃত করেছিল। চিফ হুইপ মোয়াজ্জেম দাবি করেন তাকে জোর করে প্রতিমন্ত্রী বানানো হয়! অবশ্য তার সেইসব যুক্তি ধোপে টেকেনা যখন তিনি মোশতাকের সহচর হয়ে ডেমোক্রেটিক লীগ নামে দল গঠন করেন। পরিষ্কার হয়ে যায় তিনি আর যাইহোক রাজনৈতিক আদর্শিক প্রশ্নে শুদ্ধ নন। তখন থেকেই তার বর্ণিত ঘটনাসমূহের সত্যতানির্ণয় নিয়ে ভাবতে থাকি।
সবচেয়ে হাস্যকর যুক্তি ও কথাবার্তা দেখি সেনাপতি এরশাদের সামরিক শাসন ও তার দলে যোগ দিয়ে মন্ত্রিত্বের টোপ গিলে তা হালাল করার প্রচেষ্টা দেখে। মূলত, এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের কট্টর এক সমর্থক শাহ্ মোয়াজ্জেম। উর্দিওয়ালার হঠাৎ রাজনীতিবিদ হয়ে যাওয়া এবং এদেশের বড়সড় সব নেতাদের সেখানে ভিড় জমানোর ইতিহাসকে সুন্দর ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনে শাহ্ মোয়াজ্জেমের জুড়ি নেই। তার মুখে এরশাদের শাসনের কথা শুনলে মনে হবে লোকে অনর্থক ভদ্র, গণতন্ত্রী এবং ছাত্রবান্ধব এরশাদকে তাড়িয়েছে। 'উন্নয়নই গণতন্ত্র' তত্ত্বকে সেনাশাসক এরশাদ তার গদির মূলভিত্তি ভাবতেন এবং এরশাদের উপ-প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা এতো উন্নয়ন হল তবুও লোকে কেন এরশাদের বিরোধীতা করে?
এরশাদ বরাবরই রাজনীতির মজার ক্যারেক্টার।তার চিরাচরিত কিছু বয়ান শাহ্ মোয়াজ্জেমের লেখাতেও আছে। আছে পদ-পদবির লোভেই কিভাবে দলকে বারো রঙের মানুষে ভর্তি করেছিলেন এরশাদ তার বর্ননা। কাজী জাফর, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নাজিউর মঞ্জু, মিজানুর রহমান চৌধুরীরা এই বইতে বিশেষ জায়গা দখল করেছেন। রওশন এরশাদের চে' জিনাত মোশাররফের জন্য পৃষ্ঠা বেশি খরচ করেছেন শাহ্ মোয়াজ্জেম। আর বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব নিয়ে নিঃসন্দেহ হতে পাঠককে সহায়তা করেন শাহ্ মোয়াজ্জেম।
বারবার জাতীয় পার্টির ভাঙন একথার দিকেই ইঙ্গিত করে, ''জাতীয় পার্টিতে আওয়ামী লীগপন্থী আছে, বিএনপির সমর্থক আছে। কিন্তু এরশাদপন্থী নেই।" কেন নেই তার প্রেক্ষাপট ১৯৯১,১৯৯৬ সালের নির্বাচনের জাতীয় পার্টির সেইসময়কার ভূমিকা স্পষ্ট করে লিখেছেন শাহ্ মোয়াজ্জেম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'এরশাদ ফ্যাক্টর' এর বিষয়টিও পরিষ্কার হয়ে যায়। একইসাথে জেলহত্যা মামলার আসামি হয়ে জেলে আসার প্রেক্ষিতে আত্মকথা লিখতে বসেছিলেন শাহ্ মোয়াজ্জেম তাও শেষ হয়।
নিজের দোষত্রুটি কোনোভাবেই চোখে পড়ে নি শাহ্ মোয়াজ্জেমের। বারবার দল পালটানো ও সেনাশাসকের সহচরের ভূমিকা যে তাকে বিতর্কিত করে তুলবে তা মানতে রাজি নন এই লোক। রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে আগ্রহ থাকলে বইটি পড়া চলে। গতিও আছে। কিন্তু যে বস্তুটি নেই তা হল আত্মজীবনী লেখকের শুদ্ধতা এবং তাতেই শাহ্ মোয়াজ্জেম যেসব ঘটনা লিখেছেন রাজনীতির প্রতিষ্ঠিত প্রভু,মহাপ্রভুদের নিয়ে তা অনেকাংশেই বাতিল হয়ে দোষ শাহ্ সাহেবের নিজের ঘাড়েই বর্তায়। সে হিসাবে এই আত্মকথা খুবই বিতর্কিত তো বটেই, ব্যর্থও। সেই পরাজয় পেশাদার রাজনীতিবিদ শাহ্ মোয়াজ্জেমের নয়, এই ব্যর্থতার ভার শতভাগ লেখক শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেনের।
বইয়ের অনেকখানি ছেঁদো কথা আর আত্মপ্রশংসায় ভর্তি। নিজের কুকর্মের স্বপক্ষে তিনি যেসব যুক্তি দেখিয়েছেন সেসব ধোপে টেকার মতো না, বিশেষ করে মুজিব শাসনামলে তার চিফ হুইপ থাকাকালীন কিছু কাজকর্ম।
আত্মজীবনীমূলক বই, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো টাইমলাইন নেই। দিন, তারিখ, মাস দূরে থাক - কোন সালের ঘটনা বর্ণনা করছেন সেটাও উল্লেখ নেই। ঘটনা পরম্পরা দেখে আইডিয়া করে নিতে হবে কখনকার ঘটনা বলছেন উনি! তাতেও সমস্যা আছে। এই ৭৩ সালের কাহিনি বলেন তো এই চলে যান ৭৫ এ! 😅
মোয়াজ্জেম হোসেনের আদর্শের মতো এই লেখাটাও খুব ছন্নছাড়া এবং বড্ড একপেশে। তিনি সঠিক, বাকিরা সবাই ভুল।
আত্মজীবনীমূলক বই পড়ে শেষবার বিরক্ত হয়েছিলাম আনিসুজ্জামানের "বিপুলা পৃথিবী" পড়ার সময়ে।
বাংলাদেশে যে কয়জন ভিলেন টাইপ রাজনীতিবিদের নাম শোনা যায়, শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন তার অন্যতম । তার নিজের মতে দীর্ঘদিন বিএনপি, আওয়ামীলীগের বাইরে রাজনীতি করার কারনেই এই অবস্থা । স্বাধীনতার আগের থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক জীবন নিয়েই এই বই । তার ভাষণ শোনা হয় নি, কিন্তু বইটা পড়লেই বুঝা যাবে তার সাহস আছে । রাখ-ঢাক না রেখে তিনি যেমন ভাবে রাজনীতিবিদের সমালোচনা করেছেন, তাদের খারাপ দিকগুলি তুলে ধরেছেন, মনে হয় না, এরকম লেখা আর কেউ লেখতে পারবে ।
তবে আমার মনে হয়, কিছু বিষয় তিনি যেমন এড়িয়ে গেছেন, কিছু বিষয় আবার বাড়িয়েও বলেছেন । এই বই হয়তো তার সমালোচনা পুরোপুরি দূর করতে পারবে না, কিন্তু কিছুটা ধাক্কা অবশ্যই দিতে পারে ।