বিষয়: দুরূহ। দ্বারকানাথ ঠাকুর কিংবদন্তির বিষয় হলেও তাঁকে নিয়ে প্রামাণ্য কাজের সংখ্যা বড়োই কম। সেই অবস্থায় তাঁর জীবনালেখ্য উপন্যাস আকারে লেখা মোটেই সহজ নয়।
সাফল্য: আংশিক। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত-র প্রবাদপ্রতিম কাজ "পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ" যে লিখনশৈলী মেনে চলেছিল, সেই নন-লিনিয়ার ফর্ম্যাট পুরোপুরি মানা হয়নি এই বইয়ে। কিন্তু দ্বারকানাথের জীবনের ঘটনা, অনুভূতিমালা, এমনকি চিন্তনকেও নাটকীয় আকারে পেশ করার ব্যাপারে এই বইটিও বাঙালির চিরন্তন ক্লাসিকটিকে অনুসরণ করেছে। তাহলে কেন আংশিক বলছি? কারণ দ্বিবিধ। প্রথমত, এই বই দ্বারকানাথের আংশিক জীবনকথা মাত্র, কিন্তু সেটি প্রথমে বলা হয়নি। শেষে গিয়ে সেটা বুঝে যারপরনাই হতাশ হতে হয়। দ্বিতীয়ত, যে সময়ের পটভূমিতে এই বর্ণময় চরিত্রটি ঘাত-প্রতিঘাতে বিকশিত হচ্ছেন, সেই সময়ের দাবি মেনে এই বই দ্বারকানাথের পাশাপাশি উক্ত যুগসন্ধির যথাযথ তথ্যনিষ্ঠ বিবরণ দিতে পারত। কিন্তু লেখক তা করেননি। হয়তো তাঁর 'ম্যান্ডেট' ছিল স্রেফ এটুকুই লেখা বা দেখানোর। কিন্তু আমি, হয়তো লেখকের কাছে প্রত্যাশা বেশি বলেই, আর একটি 'সেই সময়' চেয়েছিলাম।
বইটি সুমুদ্রিত ও সুশোভন। তাই সেদিক দিয়ে কিছু বলার নেই। পরবর্তী খণ্ডের অপেক্ষায় রইলাম।
এই লেখাটা বই-রিভিউ, নাকি পাঠ প্রতিক্রিয়া, সেই নিয়ে আমার নিজেরই দ্বিমত আছে। কোনও একটা বই পড়া শেষ করে এরকম অনুভূতি আমার আগে হয়নি, তাই মনে হল সকলের সাথে এই অভিজ্ঞতা শেয়ার না করলে কয়েকটা মানুষের প্রতি অবিচার করা হবে।
|| কেন কিনলাম এই বই? ||
বর্তমান লেখকদের মধ্যে রাজা ভট্টাচার্য দার নাম জানে না এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া শক্ত। আমরা যারা এখন কিঞ্চিৎ লেখালেখি করার চেষ্টা করি, তাদের এই পথ দেখিয়েছেন রাজা দা আর তারপরে অভীক সরকার দা। বেশ কিছুটা সময় বিদেশে থাকার দরুণ নতুন নতুন বাংলা বইগুলোর লোভনীয় বিবরণ আর কভার দেখেই নিজেকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। ফেবু তে "ভারতবর্ষ"-র অংশবিশেষ পড়ে বিদেশে থাকাকালীনই সেটা পড়বার ইচ্ছে সত্ত্বেও কিছু কারণে তা হয়ে ওঠেনি। তাই মনস্থ করলাম দেশে ফিরেই আগে রাজা ভট্টাচার্যের লেখা "প্রিন্স দ্বারকানাথ" আর "চলাচল" পড়ব, তারপর "ভারতবর্ষ" সিরিজ। যেমনি ভাবা, তেমনি কাজ। বইচই.কম থেকে অর্ডার করার একদিনের মধ্যেই সুন্দর প্যাকেজে চলে এল বই দুখানা। এই সূত্রে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে প্রথম অর্ডারেই প্রেমে পড়ে গেলাম এই অনলাইন বইয়ের দোকানের, এবার ফ্লিপকার্টের ন্যায় একটা সুদীর্ঘ শপিং হিস্ট্রি তৈরি করার প্ল্যান রইল এই সাইটেও।
|| প্রথম দেখা আর স্পর্শ ||
পার্সোনালি বই এর সুন্দর গেট আপ আর কভার আমাকে বরাবর হাতছানি দেয়। অনলাইনে অবশ্য স্পর্শ বা পাতা উলটে দেখার সুযোগ না পাওয়া গেলেও এই বইয়ের ক্ষেত্রে ঠকলাম না। পেপারব্যাক বইয়ের এত মজবুত বাঁধাই আর মোটা কভার আমি কোনও বাংলা বইতে কমই দেখেছি। কভারের নতুন সাইড ফোল্ডিং ট্রেন্ড টা আমার খুব পছন্দের, এতে কোণগুলো মুড়ে যায় না, বা মলাট দিয়েও পড়তে হয় না। সুব্রত রায়ের ডিজাইনে কভারের ছবি বেশ ছিমছাম, দ্বারকানাথের আউটলাইন স্কেচ দেখে সম্ভ্রম জাগে মনে। সাধারণত বইয়ের দোকানে হাতে বই নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেই আমরা মাঝের একটা পাতা খুলি। সুন্দর পরিস্কার ফন্ট আর ঝকঝকে পাতা, এই দুটো জিনিস পড়ার ইচ্ছেটাকেও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। খোয়াবনামার এই বই প্রথমবার হাতে নিয়েই কিন্তু ঠিক এমনই একটা ফিলগুড এল। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব অবশ্যই Raja Podder দার। এই প্রকাশনীর আরও বই পড়ার ইচ্ছেটা বেড়ে গেল।
|| শুরুতেই আকর্ষণ ||
"খুব যত্ন করে দ্বারকানাথ ঠাকুরের বহুবর্ণ জীবনকে মুছে দিয়েছিলেন তাঁর উত্তরপুরুষেরা।"
এই লাইন পড়ার পর বইটা হাত থেকে নামাবার আগে আপনি দুবার ভাববেন। এর থেকে যথারীতি "কেন" প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আপনি ঝাঁপিয়ে পড়বেন, আর এই বইও আপনাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবে নিজের সাথে যতক্ষণ না আপনি শেষ করে উঠছেন। প্রথমেই রাজা দার লেখা ভূমিকা আপনার এই অভিযানে কিক স্টার্ট দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
"যেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস শুরু হয় বিশ্ববন্দিত রবীন্দ্রনাথের পিতৃদেব কে দিয়েই। বহু যত্নে রচনা করা হয়েছে এক মায়াজাল। বাধ্য হয়েই আমাদের ভুলে যেতে হয় সেই মানুষটিকে - যাঁর স্পর্শ রয়ে গেছে ১৮১৫ থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে চলা সমস্ত মহান কর্মে।"
লেখক চেয়েছেন এই বিস্মৃত রাজপুত্র "দ্বারকানাথ" মানুষটাকে স্পর্শ করতে। আর তাঁকে কেন্দ্র করে সাবলীল ভাবে এঁকেছেন সেই সময়ের কলকাতার পটচিত্র আর সাথে যোগসূত্র তৈরি করেছেন আর এক মহাপুরুষের সঙ্গেও।
"ওই যে, কলকাতার ঘুটঘুটে অন্ধকার বড় রাস্তা দিয়ে ঘড় ঘড় শব্দে ছুটে আসছে দ্বারকানাথের গাড়ি। ঘোড়ার পায়ের শব্দে গরাণের ঝোপে লুকোচ্ছে শেয়াল আর বাঘরোল, সরে দাঁড়াচ্ছে হাড়গিলে। চলুন, তাঁর পিছু নেওয়া যাক।"
এভাবেই শুরু হয়েছে প্রিন্স দ্বারকানাথের জীবনের পিছু নেওয়া অনুসন্ধিৎসু এক লেখকের অপূর্ব লেখনীর কাজ।
|| এ শুধু জীবনী নয় ||
এই বইকে শুধু জীবনী বললে খুবই বড় ভুল হবে। সাধারণত জীবনী বা বায়োগ্রাফি বললেই মনে পড়ে রসহীন প্রবন্ধের আকারে লেখা কোনও মহাপুরুষের জন্ম থেকে শুরু করে তাঁর শিক্ষা ও কর্মজীবনের বর্ণনা। অনেকসময় তাতে উদ্ধৃত থাকে সমকালীন আরও কিছু মনিষীর সেই মহাপুরুষকে নিয়ে লেখা গুণগান বা সমালোচনা।
এই বই উপরোক্ত কোনও ক্যাটেগরিতেই পড়ে না। বরং এখানে আপনি ছোট্ট দ্বারকার সাথে প্রথমেই ঢুকে পড়বেন ওর নিজের ঘরে যেখানে ও রাতে বিছানায় শুয়ে দাসীর মুখে রাজপুত্র-রাজকন্যা-সোনার কাঠি-রূপার কাঠির গল্প শুনতে শুনতেও ঘুমায় না। কারণ সে বিশ্বাস করে "গল্প ভালো লাগলে তো বরং বালকদের জেগে থাকা উচিৎ, যাতে গল্পের শেষে কি ঘটবে তা জানা যায়।"
এই দ্বারকা কলকাতা দেখতে চায়, কিন্তু ঠাকুরবাড়ির কঠোর নিয়মের মধ্যে বাধা পড়েও কিভাবে সেই পথ খুঁজে নেওয়ার আকুল চেষ্টা করতে থাকে, তা আমরা বুঝতে পারি যখন পাঠশালায় তার পাশে গিয়ে আমরা বসি, বা বাবার হাত ধরে যখন সে শিক্ষকের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, তখন তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে। এখানেই এই বইয়ের সার্থকতা, পড়তে পড়তে কখন যে সেই পুরনো কলকাতায় চলে যেতে হয় বোঝাই যায় না। পড়বার পরেও সেই রেশ রয়ে যায়।
তবে ঘটনার মোড় ঘোরে যখন দ্বারকা বড় হতে শুরু করে। তার বিচক্ষণতা ও উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় মেলে যখন তাকে শুনতে হয়, "ইউ আর নেভার গোইং টু শেয়ার দিজ উইথ এনিবডি এলস্ - আরন'ট ইউ! অর আই'ল কিল ইউ!" এইসময়ে এক নতুন দ্বারকা কে আমরা পাই, যাকে আগলে রাখতে ইচ্ছে করে, যার কথা আরও জানতে ইচ্ছে করে।
এই বই আপনি একটানা পড়তে চাইলে আনুমানিক ৪ ঘন্টায় শেষ করে ফেলতে পারেন। আমি একটু রসিয়ে রসিয়ে পড়ি, সেই অনুপাতে আপনার সময় হিসেব করে নেবেন। আমি চেয়েছিলাম একদিনেই শেষ করতে, কারণ একবার শুরু করলে আর রাখতে মন চাইবে না, এই গ্যারান্টি দিলাম।
|| কিছু সাজেশন ||
বইটার সম্বন্ধে সব ভালো ভালো কথা লিখলে পাঠকের বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না। তাই এবার সেইদিক গুলোর উল্লেখ করছি যাতে আর একটু দৃষ্টি দেওয়া যেত বলে আমার মনে হয়।
বইয়ের বেশ কিছু জায়গায় প্রিন্টিং মিসটেক চোখে পড়ল। এতে বানান ভুল, শব্দ মিস, বা শব্দ রিপিট সবই পেলাম। যদিও সেগুলো সহজেই উপেক্ষা করা যায় এমন দুর্দান্ত কন্টেন্টের জন্য, তবুও আরও নিখুঁত কাজ হবে ভবিষ্যতে এই আশা ও বিশ্বাস রইল।
বইটা পড়ার পর দ্বারকানাথ নিয়ে আরও জানতে মন চায়। যদিও এটা প্রথম পর্ব, এবং আরও দুই পর্ব প্রকাশিত হবে, তবুও তথ্যসূত্র দেওয়া থাকলে আগ্রহী পাঠকরা আরও উপকৃত হতেন বলে মনে হল।
|| বইয়ের ডিটেলস ||
নাম ~ প্রিন্স দ্বারকানাথ - পরাধীন দেশের এক রাজপুত্র লেখক ~ রাজা ভট্টাচার্য প্রকাশক ~ রাজা পোদ্দার (খোয়াবনামা) মূল্য ~ ২২৫/- টাকা (প্রিন্টেড) প্রকাশ ~ কলকাতা বইমেলা, ২০১৮
সবশেষে আমার ধন্যবাদ ও প্রণাম জানাই দুই রাজা দা কেই। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে রইলাম "রাজায় রাজায় সন্ধি" তে আরও নতুন নতুন বই প্রকাশের। :)
বই: দ্বারকানাথ, পরাধীন দেশের রাজপুত্র লেখক: রাজা ভট্টাচার্য মূল্য: ৩৪৯/- প্রকাশক: পত্রভারতী আলোচক: দীপাঞ্জন দাস
বইটির নাম থেকেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এই বইটি দ্বারকানাথ ঠাকুর সম্বন্ধীয়। দ্বারকানাথ ঠাকুরের মত একজন ব্যক্তিত্বকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার ঘৃণ্য প্রয়াসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই লেখনীকে তুলে ধরা কম কষ্টসাধ্য নয়।
রামমনি ও মেনকার পুত্র হলেন দ্বারকানাথ যাকে দত্তক নেন রামলোচন। রামলোচন ও অলকাসুন্দরীর পরিচয় বড় হতে থাকেন দ্বারকানাথ। ছোটবেলায় বাড়িতে পন্ডিত রেখেই তার আরবি ও ফারসি ভাষায় শিক্ষা শুরু হয়। এরপর ইংরেজি শিক্ষার নিমিত্তে তাকে ভর্তি করা হয় শেরবোর্ন স্কুলে। জমিদারির কাজ চালানোর মতো শিক্ষা সম্পন্ন হলেও তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পিতা রামলোচনের আকস্মিক মৃত্যুতে দ্বারকানাথের দায়িত্ব বাড়ল। বিরাহিমপুরের জমিদারি হাতে-কলমে পর্যালোচনা করতে গিয়ে ইংরেজ সাহেব উলসবিকে উচিত শিক্ষা দিতেও পিছপা হননি তরুণ দ্বারকানাথ। দিগম্বরীকে বিয়ে করলেন তিনি। পিতা রামলোচনের মৃত্যুই হোক বা নিজের প্রথমা কন্যার মৃত্যু, দ্বারকানাথের শপথ ছিল - "চিকিৎসা চাই! চিকিৎসক চাই!" পাথুরিয়াঘাটা জমিদারবাড়িতে যে দেওয়ানজীর সাথে পরিচিতি, সেই অসম বয়সি প্রবল প্রতাপশালী ব্যক্তি তথা রামমোহন রায় সান্ত্বনা দিচ্ছেন তাকে-
জমিদারি দেখতে গিয়েই সতী প্রথার কদর্য নিদর্শন যখন স্বচক্ষে দেখলেন দ্বারকানাথ, তখন তার হৃদয়বিদারক অনুভূতি- "বহুিমান চিতা থেকে যেন লাফিয়ে আসছে উন্মত্ত কালীমূর্তি..." সিদ্ধান্ত নিলেন এই প্রথার বিরোধিতা করার। লেখক এই দৃশ্যের হৃদয়বিদারক ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার এই বইয়ে। বৈষ্ণব আচার পালনে অভ্যস্ত দ্বারকানাথের বাড়িতেও হয়েছিল তান্ত্রিক পূজা, লেখক যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুচারুভাবেই। প্রথম ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে ও দশ সহস্ত্র টাকা দানের প্রতিশ্রুতি দেন যুবক দ্বারকানাথ। "হিন্দু কলেজ", "সংস্কৃত কলেজ" প্রতিষ্ঠায় ও তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। প্রথম জাহাজ "রেজুল্যুশন"-এ বুয়েন্স এয়ার্সে পাঠান তিনটি পণ্যদ্রব্য - মৌরি, জাই ফল ও জাতীয় মদ্য রাম। সঙ্গী হলেন ইংরেজ ব্যবসায়ী লনডিন সেন্ডার্স। গতানুগতিক ভাবে শুধু জমিদারি দেখাশোনাই নয়, এই বহুমুখী ভাবনাই দ্বারাকানাথকে অন্যদের থেকে পৃথক করেছিল। রামমোহনের পরামর্শে তিনি গ্রহণ করেন কোম্পানি বাহাদুরের "সল্ট এজেন্ট"-এর পদ। বাস্তবিক পরিচিতি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই পদে মনোনিবেশ করেন সৎ দ্বারকানাথ। এর পূর্বে ব্যারিস্টার রবার্ট ফার্গুসনের সান্নিধ্যে দ্বারকানাথ আইন বিষয়ে হয়ে উঠেছেন বিশেষ পারদর্শী। তার সাথে মেলামেশার চিত্র অসম্ভব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। যশোরের রাজা বরদাকান্ত কে সাহায্য করা থেকে যে কাজের সূচনা দ্বারকানাথ করেছিলেন, সেইরূপ কার্যে তারাই বৃদ্ধি হয়েছে বহুগুণ। তিনি "বেঙ্গল হেরাল্ড" ও "বঙ্গদূত" পত্রিকার ব্যয়ভার বহন করতে এগিয়ে আসেন। "সল্ট এজেন্ট" থেকে সমগ্র দপ্তরের দেওয়ান পদেও আসীন হন। হিন্দুস্তান ব্যাংক ও কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে যখন "ইউনিয়ন ব্যাংক" গঠনের প্রস্তাব পেশ হচ্ছে তখন স্বভাবতই এক পরাধীন দেশের প্রজা ওরাজ কর্মচারী সভার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন এবং শাসক শ্বেতাঙ্গরা তার তীব্র পর্যবেক্ষণ আর বিবেচনার সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হচ্ছেন। ভয়ঙ্কর মন্দার সময়ে কমার্শিয়াল ব্যাংকের সমস্ত দায় তিনি গ্রহণ করেছিলেন খানিকটা উপযাজক হয়েই। পরেরদিন সংবাদপত্রে প্রকাশ পেল, কমার্শিয়াল ব্যাংক অধিগ্রহণ করছেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। ইতিমধ্যেই সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হয়েছে যাতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন দ্বারকানাথ। কিছু সময় পর ব্রিষ্টলে দেহ রাখলেন তার পরম শ্রদ্ধার দেওয়ানজী। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে ব্রাহ্মসমাজের পাশে থাকার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন দ্বারকানাথ। ব্যক্তিগত জীবনে তাকে মুখোমুখি হতে হলো বৃহৎ সমস্যার। ইংরেজ সঙ্গে এক পত্রে পানাহার করতে দেখে স্ত্রী দিগম্বরী স্বামী-সেবা পালনে প্রতিজ্ঞ হলেও ত্যাগ করলেন স্বামী-সহবাস। মন্দির চত্বরে প্রবেশ করাও বন্ধ করলেন তিনি। রামমোহনের অতি প্রিয় পাত্র হলেও আজীবন ব্রাহ্মধর্মে দিখানা নিয়ে দূর থেকে পালন করেছেন তার ধর্মাচরণ। প্রথম মেডিকেল কলেজ স্থাপনেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই মানুষটির বিরুদ্ধে ও দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের হয়, যা স্বভাবতই খারিজ হয়। এর অব্যহতি পরেই "নিমকি বোর্ড" পরিত্যাগ করে প্রতিষ্ঠা করেন "কার টেগর এন্ড কোম্পানি"। "ইন্ডিয়া গেজেট" পত্রিকার সমস্ত শেয়ার ক্রয় করে তাকে মেশালে "বেঙ্গল হরকরা" পত্রিকার সাথে। একাধিক রেশম কুঠি, চিনির কল অধিগ্রহণ করে নিজের ব্যবসার বিস্তার ঘটানো তিনি। অর্থোপার্জন ও দান এই দুই ক্ষেত্রেই তারকনাথের নাম ছিল প্রথম সারিতেই। প্রায় সমস্ত তাই তিনি করতেন তাঁর মাতা অলকারসুন্দরীকে উৎসর্গ করেই। অথচ তার অনুপস্থিতিতে সঠিক বিলাতি চিকিৎসা না হয় তার মায়ের মৃত্যু ব্যথাতুর করে তোলে তাকে। একে একে মারা যান তাঁর স্ত্রী দিগম্বরী ও পুত্র ভূপেন্দ্রনাথ। এর কিছু পরেই তাদের জাহাজ সমুদ্রে ডুবে লক্ষাধিক টাকার লোকসান যেমন হয়, তেমনই ব্যাংক কোষাধ্যক্ষের দুর্নীতিতে লক্ষাধিক টাকার লোকসান হয় ব্যাংকের। দ্বারকানাথ ব্যক্তিগতভাবে সেই টাকা মিটিয়ে দেন। ব্যবসার বিস্তারের জন্য তিনি বিদেশ যাত্রা করেন। মাদ্রাজ, কলম্বো, কায়রো, আলেক্সান্দ্রিয়া, নেপলস, রোম, ভেনিস, ফ্রান্স হয়ে পৌঁছান ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডের রানীর বাসভবন বাকিংহাম প্যালেসে পান মধ্যাহ্নভোজনের আমন্ত্রণ। এছাড়া ওজান স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে। এই বিদেশযাত্রার বর্ণনাটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। এর পূর্বে আইনগত ভাবে তার চারটি বৃহৎ ভূ-সম্পত্তি তুলে দেন ট্রাস্টির হাতে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অকর্মণ্যতা লক্ষ্য করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। এই ব্যাপারে কেবল অবগত হন তাঁর স্নেহাস্পদ কনিষ্ঠ ভ্রাতা প্রসন্নকুমার। একে একে তিনি অধিগ্রহণ করেন "চৌরঙ্গী থিয়েটার" ও "রানীগঞ্জ কয়লাখনি"। এডিনবরাই তিনি পান সাম্মানিক নাগরিকত্ব। হৃদ্যতা পেলেন ফ্রান্সের রাজা, মহারানী, বেলজিয়ামের রাজদম্পতি ও অন্যান্য রাজন্যবর্গদের। কালাপানি অতিক্রম করলেই মৃত্যু - এই চিরাচরিত কুসংস্কারকে ভুল প্রমাণিত করলেন তিনি। ইংল্যান্ডে গিয়ে সেখানকার ছাপাখানা, রেল, কর্ম ব্যস্ততাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লক্ষ্য করলেন ও পরবর্তী ব্যবসায়িক কর্মসূচি মনস্থির করে ফেললেন। প্রতিষ্ঠা করলেন "ইন্ডিয়ান জেনারেল স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি"। কিন্তু তার কয়েক মাসের অনুপস্থিতিতেই ইউনিয়ন ব্যাংকের অবস্থা হলো তথৈবচ। দেবেন্দ্রনাথ দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। রামমোহন রায়ের ব্রাহ্ম সমাজের দায়িত্ব দেবেন্দ্রনাথ গ্রহণ করেছেন এতে তার পিতার কোনদিন আপত্তি ছিল না। কিন্তু রামমোহন রায় যে ধর্মীয় আন্দোলনের সাথে বিষয়-সম্পত্তি রক্ষার্থে ও সমানভাবে কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিলেন তা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়ে ছিলেন তার পুত্রকে। তবে এক্ষেত্রে দেবেন্দ্রনাথের মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে তিনি ব্যর্থ হলেন। এরপর ইউনিয়ন ব্যাংক এর দায়ভার থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করলেন। পুনরায় বিদেশযাত্রা করে সম্পূর্ণ নিজ খরচে দুই ছাত্রকে নিয়ে গেলেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য। নেপলস বন্দরে পেলেন তোপধ্বনির মাধ্যমে উষ্ণ অভ্যর্থনা। অত্যন্ত বৈভব শালি এই ব্যক্তি বিদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় মানুষ হিসেবেই পরিগণিত হলেন। ইংরেজদের একটি উপনিবেশ থেকে আগত কোন ব্যক্তি যে এইরূপ সম্ভ্রম আদায় করতে পারেন দ্বারকানাথ বুঝেছিলেন সমগ্র বিশ্বকে। বিলাস ব্যসনে অত্যধিক ব্যয় তাকে অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন করলে তিনি বাধ্য হলেন ঋণ নিতে। এই বিদেশযাত্রা তেই তার শরীরের অবস্থা খারাপ হতে থাকে এবং অবশেষে সেন্ট জর্জেস হোটেলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বিপুল ঋণের বোঝা রেখে গেলেও তার সাথে রেখে যান বিপুল সম্পত্তি। তার পরবর্তী প্রজন্ম সেই সম্পত্তির উপর নির্ভর করেই জীবনযাপন করেছেন এবং ঋণ পরিশোধ করেছেন। অথচ বিস্মৃত হয়েছেন দ্বারকানাথ!
একটি অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে লেখক এর এই প্রয়াস পাঠককে তৃপ্তি দেবে। তবে দ্বারকানাথের বিষয়ে দেবেন্দ্রনাথ বা পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন সামান্যতম স্মৃতিচারণটুকুও করেননি, এমনকি ভস্মীভূত করেছেন একাধিক দলিল ও চিঠিপত্র - তার উত্তর মেলে না। অথচ তিনি ছিলেন পরাধীন ভারতের প্রথম রাজপুত্র, যার পিতা রাজা ছিলেন না। হাসিমুখে যিনি মৃত্যুর পথে যাত্রা করেছেন তেপান্তর পার হয়ে। আরো অজস্র পরিকল্পনার বাস্তব রূপ দিতে না পারলেও মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে মৃত্যুর পূর্বে ঠাকুরবাড়িকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন, সেই বিষয়ে জানতে হলে এই বইটি পড়া আবশ্যক বলেই আমার মনে হয়েছে।