জীবনে সফল হবার কত উপায়ই না চারদিকে শুনতে পাই। কত সেলিব্রেটি, কত মোটিভেশনাল স্পিকার আমাদের সফল হবার পথ বাতলে দেয়। সেই পথ ধরে চলতে চলতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে আমরা বুঝতে পারি আসলে এসব সফল হবার উপায় ছিল না মোটেই, বরং অসফল হবার ফাঁদ ছিল। কেমন হয় যদি সফল হবার উপায় বাতলে দেয় স্বয়ং বিশ্ব জাহানের অধিপতি?
"সেসকল মু'মিনরা সফল হয়েছে যারা নিজেদের সলাতে বিনয়ী"। [সূরা মু'মিনূন, আয়াতঃ ০১-০২]
অসাধারণ একটি বই। নিজের প্রাণহীন নামাজের কথা ভেবেই বইটি হাতে নেয়া। গোনাহগার বান্দা যদিও পুরোপুরি ফায়দা হাসিল করার ধারেকাছেও যেতে পারি নি তবুও আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ্ তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছেন...বান্দা তাঁর দিকে এক হাত অগ্রসর হলে তিনি তার দিকে এক বাহু অগ্রসর হন,বান্দা তাঁর দিকে হেঁটে অগ্রসর হলে তিনি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হন।
"নিশ্চয়ই নামায অন্যায় এবং অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে" ( সূরা আনকাবূত)--- স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা বলেছেন এই কথা। কিন্তু আমাদের নামায আমাদেরকে অন্যায় থেকে, অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখে কি? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই না। কেন আমাদের নামায আমাদেরকে সৎ ও শুদ্ধ রাখতে পারে না! অথচ এই নামাযই সাহাবায়ে কেরাম এবং পরবর্তী পূণ্যাত্মা বান্দাদের তৈরি করেছে পবিত্রতম মানুষ হিসেবে। নিয়ম- পদ্ধতিতে আমাদের নামাযও তো তাদের অনুরূপ। নামাযের আহকাম আরকান থেকে শুরু করে খুঁটিনাটি বিষয় নিখুঁতভাবে পালনে আমরা সদা সতর্কতা দেখাচ্ছি। এতো কিছুর পরেও কেন আমাদের নামায আমাদেরকে অন্যায় থেকে দূরে রাখছে না, কেন প্রশান্তি দিচ্ছে না হৃদয়ে?
"খুশূ খুযূ" ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহর "আসরারুস সলাহ" বইটির অনুবাদ। বইটির উপপাদ্যই হলো নামায। নামাযের অভ্যন্তরীণ বিশুদ্ধতাই মূল আলোচ্য বিষয়। নামাযের জন্য অজু করা থেকে শুরু করে নামাযের শেষ অব্দি প্রতিটি মুহূর্তের, প্রতিটি ক্রিয়াকলাপের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। নামাযের প্রতিটি কাজের সাথে আত্মিক যোগাযোগের গুরুত্ব কতোখানি সেটা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে বইটা। নামাযে মনোযোগী হবার গুরুত্ব এবং উপায়ও বলে দেয়া হয়েছে। নামাযে একাগ্রতার সাথে গান বাজনার যে বৈরিতা তা নিয়েও স্বল্প পরিসরে আলোচনা করেছেন লেখক।
"খুশূ খুযূ" বইটা নামাযে একাগ্র হবার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করবে পাঠককে। মাসউদুর রহমানের অনুবাদ বেশ ঝরঝরে। তারপরেও বারবার মনে হয়েছে মূল বইটা পড়তে পারলে হয়তো আরো বেশি উপভোগ্য হতো। ৮৪ পৃষ্ঠার ছোট একটা বই কিন্তু গভীরতা অনেক বেশি। মনে হবে জানা বিষয় সব, তারপরও যেন নতুন করে উপলব্ধি করতে শেখায়, একাগ্র হতে সাহায্য করে। একবার নয় সময় নিয়ে একাধিকবার পড়ার মতো একটা বই।
আজকে যদি আমার সাথে রাষ্ট্র প্রধানের দেখা হয় তাহলে তার সামনে কতোটা বিনয়ী ভাবে দাড়াবো? তিনি যখন একান্তের আমার সাথে কথা বলবেন তখন কি অন্য মনস্ক থাকবো? এদিক ওদিক তাকাবো? এতে তিনি কতোটা রাগান্বিত হবেন?
অথচ সালাতে আমরা আল্লাহর সামনে দাড়াই, আল্লাহর সাথে কথা বলি, আল্লাহ সালাতে আমাদের কথার জবাব দেন। তাহলে সালাতের মধ্যে আমাদের আল্লাহর সামনে কতোটা বিনয়ী হওয়া প্রয়োজন! বলা হয়, যে নামাজ পড়ে না সে মুসলিম না। নামাজের মাধ্যমে বান্দা তার রবের সাথে কথা বলে। সালাতে আল্লাহর সামনে দাড়িয়ে আমরা যদি দুনিয়ার চিন্তা করি, অন্য দিকে আমার মন পরে থাকে তাহলে তা কতো ভয়াবহ অপরাধ! তাই সালাতে মনোযোগী হওয়া, সালাত কে সুন্দর করা তত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যখন সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করি তখন আল্লাহ আমাদেরকে তার জবাব দেন। এভাবেই সালাতে অনেক সূক্ষ বিষয় রয়েছে যা জানলে আমারা সালাতে আরও মনোযোগী হতে পারবো ইনশাআল্লাহ। আমরা সালাতে যেসকল তাসবীহ পাঠ করি তার অর্থ যদি আমরা শিখে নেই, সালাতে উচ্চারণ করা প্রতিটি শব্দ যদি আমরা শিখতে পারি তাহলে ইনশাআল্লাহ আমাদের সালাত আরও সুন্দর হবে। মনোযোগ আরও দৃঢ় হবে এবং আমরা সালাতের স্বাদ আরও ভালোভাবে আস্বাদন করতে পারবো। যে ব্যক্তি সালাতে উচ্চারিত শব্দ গুলোর অর্থ বুঝে না তার তুলোনা অন্ধ ব্যক্তির সাথে করা হয়েছে। তাই আমাদের সকলের উচিত অন্তত নিজের সালাত টাকে সুন্দর করা। আর সালাত কে সুন্দর করার জন্য এবং বোঝার জন্য এই বইটি খুবই কার্যকর হতে পারে।
খুবই ছোট একটা বই। বইটিতে আযান থেকে শুরু করে ওযু এবং সালাতের নানান সূক্ষ বিষয়বস্তু এবং এর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। খুবই সহজে পড়ে ফেলা যায় বইটি। এই ধরণের বই সাধারণত কেতাবী কথার কারণে খুবই দুর্বোধ্য এবং কঠিন মনে হয়। পড়তে কষ্ট হয়। কিন্তু এখানে এমন কমই মনে হয়েছে। আশা করি বইটি পড়লে আমাদের নামাজ আগের তুলোনায় একটু হলেও সুন্দর হবে।
বই পড়তে না চাইলে ইউটিউব বা অনলাইনের মাধ্যমেও অন্তত নামাজে উচ্চারিত শব্দ গুলোর অর্থ জেনে নিলেও আশাকরি নামাজটা একটু হলেও আগের চেয়ে সুন্দর হবে।
গত দেড় বছরে কম করে হলেও পাঁচবার বইটি প্রথম থেকে শুরু করেছি। খুব কষ্ট করে মাঝ বরাবর পৌঁছি, এরপর আর এগুতে পারি না। শত চেষ্টা করেও পারি না। বইটির প্রচ্ছদ সুন্দর। পৃষ্ঠা বিন্যাস নজরকাড়া। অন্তত প্রথম দেখাতেই পড়ে ফেলতে ইচ্ছে করবে, এমন গুণ বইটির আছে। তাছাড়া ফেসবুকে এই বইটির এতো এতো পজেটিভ রিভিউ দেখেছি যে, পড়া না শুরু করে পারলাম না। কিন্তু ঐ! পড়া শুরু করলে আর এগুতে পারি না। জোর করে কয়েক পৃষ্ঠা পড়ি, এরপর ঘুম পায়!
শেষমেষ এ বছর অনেকটা পণ করেই শেষ করলাম। অল্প অল্প করে, অনেক সময় নিয়ে। হয়তো বলবেন, এতো কথার কী দরকার! ভালো না লাগলে রেখে দাও। শেষ পর্যন্ত পৌঁছতেই হবে, এমন কোনো কথা কি আছে!
উঁহু, নেই। তবুও করলাম। কারণ হচ্ছে বইটির ‘বিষয়বস্তু’। বইয়ের বিষয়বস্তুই বাধ্য করেছে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে।
অনুবাদ কখনো মূল বইয়ের স্বাদ দিতে পারে না, এটা সত্য। কিন্তু এই বইটির অনুবাদে আরও যথেষ্ট প্রাঞ্জলতার সুযোগ ছিল বলে মনে করি। বইটি পাঠ্য, তবে সুখপাঠ্য নয় মোটেই। পরিপূর্ণ বোঝার জন্য প্রত্যেক প্যারা কয়েকবার করে পড়তে হয়। সহজ কিছু বিষয় ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে শুধু শুধু কঠিন করা হয়েছে। অতিরিক্ত সুন্দর করতে গিয়ে অযথা গুরুগম্ভীর শব্দ যোগ করা হয়েছে, যা রচনাতে আরও কাঠিন্য এনেছে; পড়তে গেলে মনে হয়, যেন কঠিন কোনো সংজ্ঞা পড়ছি—সহজে বুঝে আসে না।
যাহোক, আমি খুব করে চাইবো, অনুবাদক ভাইয়ের চোখে যেন এই লেখাটি না পড়ে। তাঁকে সমালোচনায় বিদ্ধ করে অনুৎসাহিত করা কিংবা তাঁর মনোবল ভেঙে দেওয়া আমার মোটেই উদ্দেশ্য নয়।
বরং আগ্রহী পাঠকদের আমি বইটি পড়তেই পরামর্শ দেবো। সেটা কষ্ট করে হলেও। কারণ লেখা একটু কঠিন হলেও বিষয়বস্তু কিন্তু অনন্য—নামাযের খুশু খুজু!
বইটি ছোট। আলোচনা মোটামুটি বিস্তৃত হলেও অপূর্ণতা থেকে যায়। আরও বড় হলে পারতো।
আমার মতো সলাতে উদাসীন কাউকে বইটি সাজেস্ট করবো। সলাতে দুনিয���ার কোনো ঘটনা মনে ঘুরতে থাকে, বন্ধুর সাথে খেলা গেমটি কিংবা প্রিয় গানের দৃশ্য দেখতে পান, কোনোভাবেই 'মন বসে না'। সলাতের নাম করে নিছক শারীরিক ব্যায়াত তো আছেই।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাহলে কেন সলাতকে চোখের প্রশান্তি বলেছেন? কেন সাহাবিরা মনের তৃষ্ণা নিবারণ করতেন সলাতের মাধ্যমে। কিছুতো ঘাপলা আছেই! বইটিতে এমন কিছু আছে যা আপনার শারীরিক ব্যায়াম আর 'সলাত শেষ করে শান্তি'র সংজ্ঞাটা পাল্টে দেবে, ইনশা আল্লাহ।
লেখক তো আল্লাহর দরবারে চলে গেছেন। উনাকে মহান রব জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
নামাজ তো আমরা অনেকেই আদায় করি। কিন্তু সেই নামাজে কি আমাদের অন্তর উপস্থিত থাকে? সত্যি বলতে, নামাজে আমরা বেশিরভাগ মানুষই শুধু দৈহিকভাবে উপস্থিত থাকি। যে কারণে নামাজ আদায় করেও আমরা অন্যায় অপকর্ম এবং অশালীন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে পারছি না। নামাজের প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে খুশু-খুযুর সাথে নামাজ আদায় করতে হবে। সহজ লেখনীর ছোট্ট এই বইটি পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন আযানের সময় থেকে শুরু করে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মের প্রকৃত গুরুত্ব, খুশু-খুযুর উপকারিতা, নামাজে মনোযোগ বাড়ানোর উপায়। সূরা ফাতিহার প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কেও একটা ধারণা পাবেন। সর্বোপরি বইটি আপনাকে খুশু খুযুর সাথে নামাজ আদায়ের পথ দেখাবে।