ইংরেজীতে যাকে বলে জোকস্ বুক্, বাংলায় যাকে বলা যায় চুটকি বা খোশগল্পের বই- ‘রহস্যালাপ’কে পুরোপুরি তার সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। একাধারে এ-বই রঙ্গকৌতুকের সোনার খনি, আবার তার থেকেও বেশি কিছু, দামী কিছু। ‘রহস্য’ শব্দটির একটি অর্থ ‘গূঢ় তথ্য’, আরেক অর্থ ‘রঙ্গকৌতুক’। ‘রহস্যালাপ’ দু-অর্থেই সার্থকনামা। গূঢ়-তথ্যে ও রঙ্গকৌতুকে টইটুম্বুর রম্যরচনা। সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় যখন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়, সর্বস্তরের পাঠকমহল হাসতে-হাসতেও তখন চমকে উঠেছিল, ‘রহস্যালাপ’-এর পরিবেশনভঙ্গির অভিনবত্বে, উপাদান-সংগ্রহের বিপুলত্বে। আসলে, যে-ইন্দ্রমিত্র হাসির গল্প লেখেন, আর যিনি লেখেন প্রবল গবেষণাসাধ্য বিদ্যাসাগরজীবনী কি বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিকথা, সেই দুজনে একজোট হয়ে যেন কলম ধরেছেন এই বইতে। ‘রহস্যালাপ’ তাই শুধুই ফুরফুরে আড্ডার বই হয়ে হাসায় না, হাসতে হাসতেই জানিয়ে দেয় বহু অজানা তথ্য। যেমন, বাংলা ভাষাতে তো দূরের কথা, হাল আমলের ইংরেজী ভাষাতেও চীনদেশের রঙ্গকৌতুক দুষ্প্রাপ্য। অথচ চীনের রঙ্গকৌতুক অতি উচ্চস্তরের। ইন্দ্ৰমিত্র এ-বইতে শুধু চীনের অজস্র রঙ্গকৌতুকই উদ্ধার করেননি, সেইসঙ্গে শুনিয়েছেন চীনের ইতিহাস এবং চীন সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য। ঠিক এইভাবেই তিনি নতুন তথ্যময় চরিতালেখ্য উপহার দিয়েছেন হাস্যরসস্রষ্টা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ও আলেকসাঁদর দুমার, একত্র করেছেন মার্ক টোয়েনের বিশ্বখ্যাত রঙ্গকথার অভাবনীয় সম্ভার, অধুনালুপ্ত বহু সাময়িকপত্রের ধূসর পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধার করে এনেছেন চিরন্তন একগুচ্ছ রঙ্গকৌতুক, যার সঙ্গে রয়েছে সংশ্লিষ্ট পত্রাদির ইতিবৃত্ত।
অরবিন্দ গুহের জন্ম ১৯২৮ সালে। বরিশালে। যে বরিশাল রাজনৈতিক হিসেবে অধুনা বিদেশ (বাংলাদেশ), তবু তাঁর নিজের ভাষায়, “আমার মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত বরিশাল আমার স্বদেশ থেকে যাবে। ”
পিতা : স্বর্গত সত্যপ্রসন্ন গুহ।
বাল্য, কৈশাের ও আই, এস-সি পর্যন্ত পড়াশােনা বরিশালে। বরিশাল ব্রজমােহন স্কুল ও কলেজে। ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৪৭-এ ইন্টারমিডিয়েট। দেশভাগের পর চলে আসেন কলকাতায়। ১৯৪৯ সালে কলকাতার আশুতােষ কলেজ থেকে ডিস্টিংশন নম্বর পেয়ে পাশ করেন বি. এস-সি । কলেজের পাঠ সাঙ্গ হতেই যােগ দেন চাকরিতে । কেন্দ্রীয় সরকারের একটি দপ্তরে। কবিতা দিয়ে লেখার হাতেখড়ি। স্কুলজীবনেই কলকাতার ‘শিশু সওগাত' নামে ছােটদের একটি মাসিকপত্রে প্রথম কবিতা ছাপা হয়। পরবর্তীকালে কবি হিসেবেই প্রাথমিক প্রতিষ্ঠা। একাধিক কাব্যগ্রন্থ : ‘দক্ষিণ নায়ক’, ‘নিবিড় নীলিমায় অলক্তৃত’ ইত্যাদি। ছােটদের রচনাতেও সিদ্ধহস্ত। ছােটদের জন্য প্রকাশিত গল্পসংকলন, “মামাবাড়ি”।
‘ইন্দ্রমিত্র'—এই ছদ্মনামে একদিকে লিখেছেন সরস গল্প ও উপন্যাস, অন্যদিকে রচনা করেছেন গবেষণাধর্মী দুটি অসামান্য গ্রন্থ। গবেষণাধর্মী সাজঘর' গ্রন্থের জন্য ১৯৬২ সালে পেয়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহদাস পুরস্কার, করুণাসাগর বিদ্যাসাগর' গ্রন্থটি ১৯৭২ সালে বৃত রবীন্দ্র পুরস্কারে।
সম্পাদিত গ্রন্থ : Unpublished letters of Vidyasagar. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আমন্ত্রণে রাজা রামমােহন রায় স্মারক বক্তৃতামালা দেন ১৯৭৩-এ। ধুতি-পাঞ্জাবি একমাত্র পােশাক। বাকপটু । নিরহঙ্কার। অনাড়ম্বর জীবনযাত্রায় বিশ্বাসী।
সদ্য শেষ করলাম রঙ্গকৌতুকের উপর এই বইখানা। বইটাকে ঠিক চুটকির বই বলা যাবেনা বরং গবেষণামূলক লেখা। পুরোনো বাংলা পত্রপত্রিকায় কৌতুক চর্চা নিয়ে বিস্তর তথ্য পাওয়া যাবে সেই সাথে কয়েকজন বিখ্যাত লেখকের রসিকতার কথাও। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার মতো নয় তবে ভারী মন অনায়াসে হালকা করে দেয়। চীন দেশীয় রসালাপের সাথে প্রথম পরিচয় হলো সেই সাথে লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কেও অনেক কিছু জানলাম।