বই : রিথিংকিং ইসলাম ইন পোস্টমডার্ন টাইমস লেখক : মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত প্রকাশক : বইকেন্দ্র পাবলিকেশন
১ একটি বই, অনেক বইয়ের মতো। প্রচুর পড়াশোনার অভিযাত্রিক, অভিমুখী ও অভিনিবেশী বই। ব্যাপক প্রস্তুতিতে প্রস্ফুটিত একটি বই। আয়তন বিশাল নয়, দেড়শো পৃষ্ঠার ছোট কলেবর। তবে, এই দেড়শো পাতায় দেড় হাজার বই, দেড় হাজার বর্ষ ও দেড় হাজার চিন্তার সারাৎসার ছড়ানো পাবেন।
বই মূল্যবান সম্পদ। ভালো বই আরও দামি সঞ্চয়। নতুন দিশারি বই অমূল্য রত্ন। আর মাস্টার পিস বা মেগা বই তো লাইব্রেরির সমকক্ষ; সমগোত্রীয়। রিথিংকিং ইসলাম ইন পোস্টমডার্ন টাইমস বাংলা ভাষায় চিন্তা ও পাঠচর্চা— উভয় দিক দিয়ে মাস্টার পিসের আদর্শ নমুনা। রিথিংকিং ইসলাম ইন পোস্টমডার্ন টাইমস বাজারের অন্যান্য বইয়ের মতো নয়; আমাদের পড়া, জানা ও শোনা বইপত্তর থেকে এটি একেবারে আলাদা জাতের বই। রিথিংকিং ইসলাম ইন পোস্টমডার্ন টাইমস-এর ভাষা ও ভাষণ, বিষয়ের প্রকরণ ও ব্যাকরণ এবং উৎস ও উৎসাহ ব্যতিক্রমের সাথে মৌলিক।
২ রিথিংকিং ইসলাম ইন পোস্টমডার্ন টাইমস কী বিষয়ক বই? এটি ইসলামের পুনর্বিশ্লেষণের বই। প্রচলিত ইসলামের বই নয় রিথিংকিং। ইসলামকে উপলব্ধি করা ও পুনরোপলব্ধির ব্যাকরণ ও অভিধানের দিকে অভিযানের বই রিথিংকিং ইসলাম ইন পোস্টমডার্ন টাইমস। পুনর্চর্চা কেন জরুরি? তার জবাব বইয়ের নামকরণে আছে। পোস্টমডার্ন টাইমস মানে কী? উত্তরাধুনিক সময়। অর্থাৎ চলমান সময়ে অজস্র কারণে ইসলামকে নবরূপে বুঝতে হচ্ছে ও বোঝাতে হচ্ছে। মডার্নিটির আবহাওয়ায় ইসলামের উপর অনেক কাঙ্ক্ষিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। সেসবের যুতসই, যথার্থ ও যুক্তিশীল জবাবের জন্য রিথিংকিং জরুরি। এটা অনেকটা আল্লামা ইকবালের রিকনস্ট্রাকশনের মতো। সম্ভবত বইয়ের লেখক ইকবালের পুনর্জাগরণ ও পুনর্পাঠের তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত ও আপ্লুত।
বইটি রিথিংকিং-এর কথা বলে। ইসলামের রিথিংকিং-এর জন্য লেখক ইতিহাস-ছোঁয়াচ দার্শনিক রীতির প্রয়োগ করেছেন। অর্থাৎ, দর্শনের পাপড়ি ছড়িয়ে জ্ঞান, তথ্য, তত্ত্ব, অনুভূতি ও মননশীলতাকে বিশ্লেষণ করেছেন। বইটির প্রথম অধ্যায়, যা কিছুটা দীর্ঘ, তা একেবারে প্রামাণ্য দর্শনের কলকব্জা, কলিজাসহ গুরুগম্ভীর দার্শনিক ইসলামায়নের সুদীর্ঘ তত্ত্বগাঁথা। এবং এই প্রথম প্রবন্ধই এই বইয়ের মূল। প্রবন্ধটি কিছুটা জটিল। বিশাল, বিশদ ও বিশেষ-বিশেষ তথ্য, উপাত্ত ও অনুসিদ্ধান্তে টইটম্বুর। কয়েকবার পড়ে মর্মবাণী হৃদয়ঙ্গম করতে হয়। ইসলামের ইতিহাসের বরণীয় বিদ্বানদের আলোচনা তো আছেই, সাথে আছে পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত চিন্তকদের গবেষণার নির্যাসের পুনর্পরিচর্যা। এই যুগপৎদ্বারার তত্ত্বতালাশ করে ইসলামের সৌকর্য-সৌন্দর্য বিকশিত করার বিরল খেদমত করেছেন শ্রদ্ধেয় লেখক।
৩ লেখক দর্শনের বই লেখেননি; তবে, লেখকের মজ্জায় দর্শনের স্বভাব থাকায় তার লেখার পরতে পরতে ফুটে উঠেছে দার্শনিক প্রতিমূর্তি। এটা ইসলামিয়াতের কিতাব নয়, টোটাল ইসলামের একটা আবক্ষ আকৃতি এই বইয়ে এসেছে। ইসলামের আলোচিত ও চর্চিত প্রায় মূল প্রসঙ্গ এই বইয়ের পরশ পেয়েছে। বিশেষত চিন্তাশীলতার জায়গায় ইসলামের বক্তব্য কী হতে পারে, তার একটা মুখবন্ধ বইটিতে এসেছে। ইসলাম নিয়ে আধুনিক শিক্ষিতদের মানসে বিরাজমান বিভিন্ন কৌতূহল মিটানোর প্রয়াস পেয়েছে রিথিংকিং। ইসলাম-দীক্ষিতদের মনের কতিপয় প্রশ্নাবলীর গোছানো ও তাত্ত্বিক জবাবও দিয়েছে এই বই। যেহেতু মান খুবই উন্নীত, ভাবনা উন্নত ও উচ্চাঙ্গের গবেষণার ফসল রিথিংকিং, তাই গভীর মনোযোগ ও নিবিড় পাঠ ছাড়া এই বইয়ের প্রকৃতি উপভোগ অসম্ভব প্রায়।
এরকম বই বাংলা ভাষায় আমি আর পড়িনি। ইসলামের যুগোত্তর বিশ্লেষণের শাণিত এরকম প্রজ্ঞা ও স্বজ্ঞার আকরগ্রন্থ সত্যি বলছি, বাংলা ভাষায় বিরল। বইটির প্রথম অধ্যায় সকলের পড়া উচিত। বুঝে-সুঝে পড়া উচিত। মুসলমানদের মতানৈক্য নিয়ে তিনি যে সুপারিশ পেশ করেছেন, তা অসাধারণ। যে ঐতিহাসিক কনফারেন্সের আলোচনা করেছেন, তা প্রশান্তিকর। সর্বোপরি অনৈক্যের মাঝে একতার যে সুর তিনি সৃষ্টি করেছেন, তা চোখে জল আনার মতো। জাগতিক, পারলৌকিক ও তাদের শাখাগত বিজ্ঞানকে যে পদ্ধতিতে তিনি সমন্বয় করেছেন, তা অভিনন্দন-যোগ্য ও অভিনব সুন্দর। আলহামদুলিল্লাহ। পরের প্রবন্ধগুচ্ছ সহজ, সরল ও সাবলীল। প্রথম প্রবন্ধের শাখা পল্লবের মতো তা ছড়ানো, ছিটানো। প্রথম অধ্যায় আলিঙ্গন করতে পারলে বাকিসব তরতর করে পড়ে ফেলা যাবে। বাকি প্রবন্ধগুলো ছোট ছোট। তাতেও লেখকের ইসলাম-চিন্তার সামগ্রিক বিষয়টা পরিষ্কার। সংস্কৃতি হতে ভাষা, শব্দ হতে দৃশ্যকল্প সর্বত্র লেখক ইসলামের পটভূমিতে আঁকতে সচেষ্ট। নিজস্বতায় সবকিছু উচ্চকিত রাখার উচ্চারণ যেন প্রবন্ধসারি।
৪ লেখক অতি উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাতীয় পরিমণ্ডলের সদস্য। লেখকের মস্তিষ্কের ভাষা ইংরেজি হওয়ায় তিনি পুরো বইতে ইংরেজি শব্দ ও ভাবের আরোপ করেছেন। সেটি বাংলা ভাষার জনগোষ্ঠীর জন্য একটু অমসৃণ লাগবে। যদিও তিনি বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দের তর্জমা করে গেছেন। লেখকের সাথে অজস্র বিদগ্ধ বিদ্বানের বইপুস্তক, চিন্তা ও কাজের পরিচয়ের কারণে বিপুল উদ্ধৃতি দিতে বাধ্য হন। তাতে আমাদের মতো সাধারণ পাঠক মাঝেমাঝে খেই হারিয়ে ফেলি। পড়ুয়াদের জন্য এই বই জীবনজিজ্ঞাসার অপরূপ নাক্ষত্রিক উত্তরপত্র।
এই বইটি বাংলা ভাষার কাছে একটি উপহার। আপনি যে চিন্তারই পক্ষপাতি হোন না কেন, এই বই আপনি না পড়লে অপূর্ণতা রয়ে যাবে বলতে দ্বিধা করি না। বইটি নতুন এক জাহান সৃষ্টি করেছে, যাতে আপনি বিমুগ্ধ ও বিভোর হবেনই। ইনশাআল্লাহ। "রিথিংকিং ইসলাম" পড়ুন। আজ, কাল বা পরশু। আলোকিত হবেন। পুলকিত হবেন।
- রুকন ইনাম লুবান আরবি অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)