সায়ন্তনীর গড়িয়ায় বাস। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির শখ। কবিতা ও গদ্য দুইই চর্চার বস্তু।ক্লাস সেভেনে প্রথম প্রকাশ সংবাদ প্রতিদিনের শনিবাসরীয় পাতায়'চশমা' ছোট গল্প। তারপর প্রতিদিন, বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, আর ছোটদের পত্রিকা সাহানা আর বাংলা দেশের পত্রিকা ভোরের কাগজে লাগাতার লিখে যাওয়া।
কাশ্মীরের পটভূমিতে লেখা ভিন্নধারার উপন্যাস। পড়বো বলে অনেকদিন ধরে, তক্কে-তক্কে ছিলাম। আজ সেটা করে, বেজায় বিখন্ডিত হয়ে আছি। প্রথাগত রিভিউয়ের পাড়া আর না মাড়ানোই শ্রেয়। কেবল, ভালো লাগা ও না-লাগার একটা ছোট্ট তালিকা বানিয়ে রেখে যাই।
ফিল্ম-টেলির দৌলতে, কাশ্মীরের যেই অপরূপ মনোগ্রাহী ছবি বরাবর তুলে ধরা হয়। কিছুটা তার বিরুদ্ধে হেঁটেছেন লেখিকা। গোটা বইতে কাশ্মীরকে রোমান্টিসাইজ করা থেকে বিরত থেকেছেন। গদ্য গড়তে চিনার-লিডার-ডাল লেকের বর্ণনা এঁকেছেন ঠিকই, তবে তা স্বল্প। আতস কাঁচের নিচে কেবল কাশ্মীরের গরীব কটা মানুষ। ডাল লেকের কোণে, নোংরা, পানা আবৃত জলে, অস্থায়ী কিছু বাড়ি-ঘরে, শিশমহলের বাসিন্দারা।
তাদের দুঃখ, কষ্ট, রাগের সাথেই সম্মিলিত সন্ত্রাসের সমান্তরাল হাতছানি। দারিদ্র্য ও উগ্রবাদের জোড়া প্রকোপে, লেখিকা বলেছেন এক কাশ্মীরের গল্প। যার কথা, আমরা ভুলে থাকতে ভালোবাসি। কাশ্মীরের সেই প্রতিচ্ছবি, যা বাস্তবের অনেক কাছাকাছি অবস্থিত। ডিপ্লোম্যাসির গন্ধ পেলেও, লেখিকা পক্ষপাত করেননি। ইসলামী মৌলবাদ থেকে উগ্র হিন্দুত্ববাদ, দাগিয়েছেন সবটাই। সাথে লিখেছেন, অবদমিত কাশ্মীরে ভারতীয় আর্মির ধূসর অবদান। যা সচরাচর সাদা কি কালো রঙে মাপা মুশকিল।
রোমান্টিসাইজ যদি কিছু করে থাকেন, সেটা সেই মানুষদেরই। তাদের সংকুলিত স্বপ্ন, নৈরাশ্য ও বিষাদের গাঁথাকে, বুনেছেন লালনের সুরে। কাশ্মীর নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছেন, যা বোঝা যায়। বইজুড়ে বাংলা, হিন্দি ও পাঞ্জাবির পাশে, স্থান পেয়েছে কাশ্মীরি সংলাপ। এ জিনিস, বইয়ের গতি রদ করে। বিশেষত, যখন একটি সংলাপের পরেই, শব্দকোষের ন্যায় মানে বুঝিয়ে দেওয়া হয় বারংবার। দোসর হিসেবে মেলে, শায়েরির ছড়াছড়ি। আর্মির অফিসার থেকে শিশমহলের বাসিন্দা, সবার মুখেই গালিব-বিসমিলের এপিডেমিক। ফলস্বরূপ, বইটি ভোগে গতিহীনতায়।
কাশ্মীরি ইতিহাস উপস্থাপনের জন্য এক জিহাদী চরিত্রকে বেছে নিয়েছেন লেখিকা। যা অল্প হলেও, ইনফো-ডাম্পিংয়ের পর্যায়ে এসে পড়ে। 'মানব বোমা' হয়ে, গাড়িতে বসে আর যাই হোক, ছোটবেলায় রাস্তার ধারের কোনো অচেনা ব্যক্তির মুখে শোনা ইতিহাসের পুঙ্খানুুঙ্খ স্মৃতিচারণা, স্রেফ অবিশ্বাস্য। পরে সেটা স্বপ্নদৃশ্যে রূপান্তরিত হলে, তাও কিছুটা স্বাভাবিকতা মেলে। এ ছাড়াও, বইয়ের শেষ চল্লিশ কি পঞ্চাশ পৃষ্ঠা বিস্তর সিনেমাটিক। অতিনাটকের প্রকোপে, উপন্যাসটি কোনো সূক্ষ্ম মানবিক পরিণতি থেকে বঞ্চিত হয়। শুরুর সাথে খুব একটা মেলাতে পারি না শেষটা। কোথাও যেন একটা প্রচ্ছন্ন টোনাল শিফ্ট... একটা বদল চলে আসে।
এবং এটাই বুঝি 'শিশমহল'এর সবচেয়ে বড় খামতি। একটি পূর্ণাঙ্গ ক্লাসিকের মালমশলা থেকেও, উপন্যাসটির অন্তর্নিহিত ধন্দ প্রচুর, যার ফলে ন্যারেটিভ ক্রমাগত দিকভ্রান্ত হয়। মিলিটারি ড্রামা? সামাজিক উপন্যাস? স্পাই থ্রিলার? নাকি সবটা মিলিয়েই 'শিশমহল'? হলে, এ জিনিস, আড়াইশো পৃষ্ঠার চেয়ে অনেক বড় কোনো ক্যানভাস দাবী করে।
রাজনীতি ও ধর্মের জটিল করালগ্রাসে বন্দী কাশ্মীর নিয়ে লিখতে বসে, লেখিকা কাঠগড়ায় এনেছেন পভার্টি ও দারিদ্র্যকে। মন বলে, শুধুই কি তাই? উলুখাগড়ার বনে, আম-আদমির পতন? ক্ষুদার জ্বালায় সন্ত্রাসের ধোয়া? লেখিকার এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হওয়া বা না হওয়া, পুরোটাই পাঠকের মর্জি। আমার মতামতও অগ্রাহ্য করতে পারেন সাগ্রহে। দিনের শেষে, সবটাই সাবজেক্টিভ। তবে, অমন চড়া দাগের পরিসমাপ্তিটির জেরে, কিছুটা হতাশা প্রযোজ্য। সেই নিয়েই ইতি টানছি।
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া বইয়ের নাম: শিশমহল লেখক: সায়ন্তনী পুততুন্ড প্রকাশক: আনন্দ মূল্য: ২০০ কাশ্মীর। ঘটনার প্রেক্ষাপট পাকা আপেলের লালে লাল নয়। বরং রক্তে লাল। স্বর্গীয় যে সৌন্দর্য্যে কাশ্মীর ভরপুর, ট্যুরিস্টরা তো হরদম বলেন: যথার্থই ভূ-স্বর্গ। শিশমহল সেই কাশ্মীরের কথা বলে না। সৌন্দর্য্যের পেছনে এক কলঙ্কময় ইতিহাসের কথা বলে। যেন এক 'নারকী স্বর্গ'। কাশ্মীর নিয়ে উপন্যাস শুনে পাঠক এতক্ষণে আঁচ করে নিয়েছেন ঘটনার বিষয়বস্তু কী হতে পারে। সেই তো আর্মি আর জিহাদীর ঝামেলা। এই নিয়ে হুদো হুদো বই পড়ে ফেললাম, তো এইটা আবার কেন কিনব? এমনিতেই আনন্দর দামী বই বিক্রির বদনাম আছে। কিন্তু এ বই সে গল্প বলেও বলে না। কোনোরকম রাজনৈতিক ইস্যুতে না গিয়েই বলছি, যাঁরা ভারতের কাশ্মীর অধিগ্রহণের পর কাশ্মীরিদের কথা না ভেবে আত্মপক্ষ সমর্থনে 'দুধ মাঙ্গো তো ক্ষীর দেঙ্গে, কাশ্মীর মাঙ্গো তো চিড় দেঙ্গে' বলেছেন, এ বই তাঁদের ধাক্কা দেবে। বলাই বাহুল্য, আর্মির বেশিরভাগ জওয়ান এটা বিশ্বাস করে। তার চেয়েও বড় ব্যাপার, তারা ছেলে, শিশু, বৃদ্ধ, কাউকে জেহাদি বলে দাগিয়ে দিতে ছাড়ে না। বইয়েরই চরিত্র রাঠৌরকে কোট করলে বলা যায়: 'মগজমারির সময় নেই। সিধা ঠোক দেঙ্গে।' আর যুবতীকে দাগানো হলে। একটাই শাস্তি: গণধর্ষণ। কখনও তারপর খুন করা হয়, বা ছেড়ে দেওয়া হয়। কাজেই কাশ্মীরিদের ওপর যে আর্মি খুব ভাল ব্যবহার করে, তা মোটেই না। বেচারা লোকগুলোর অবস্থা লেখিকা খুব সুন্দর করে বলেছেন: 'জিহাদি সমর্থন করলে আর্মি মারবে। আর্মি সমর্থন করলে জিহাদি মারবে। আবার কাউকে সমর্থন না করলে দু'দলই মারবে।' বুঝুন তবে ব্যাপার। এ ধরণের লেখা লিখতে গেলে অজান্তেই তার মধ্যে অল্প করে রাজনৈতিক আঁচ এসে পড়ে। এ লেখাও ব্যতিক্রম না। তবে পাকিস্তান সম্পর্কে দুটো উক্তি খুব মন ছুঁয়ে গেল। প্রথমটা শোনা যায় এক মেজরের মুখে। বিষয়বস্তু হল পাকিস্তানিদের জিহাদি হওয়ার কারণ। তিনি বলেন: 'প্রবলেমটা ধর্ম না। প্রবলেম হল পভার্টি।' পাকিস্তান কিন্তু সত্যিই খুব গরিব দেশ। আমরা পাকিস্থান বললে আমাদের চোখে ভাসে ২৬/১১ আর শোয়েব আখতার। কিন্তু কখনও দেশটার অর্থনীতি চোখে ভাসে না। একটু কল্পনা করে দেখবেন কোনোদিন। দ্বিতীয় মন্তব্যটি লেখিকা করেছেন: 'পাকিস্তান কী? পাকিস্তান কে? পাকিস্তান নামের কোনও দেশই ছিল না। একজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রনায়কের মহাত্মার মতোই 'জাতির জনক' হওয়ার শখ হয়েছিল। তাঁকেও দোষ দেওয়া যায় না। স্বাধীনতার যুদ্ধে তিনিও সমান শরিক ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা পেলেন না! সেই সুযোগের অপব্যবহার করে ক্রমাগত তীব্র হয়ে ওঠা বিদ্রোহী ভারতীয়দের শেষ কামড় দিতে চেয়েছিল কতগুলো সাদা চামড়ার লোক। সোজাসাপ্টা 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' পলিসি। কথা নেই, বার্তা নেই, ফটাফট কয়েকটা লাইন এঁকে দিল উজবুকগুলো। প্রতিহিংসাপ্রবণ রাজনীতি। স্বাধীনতা চাই? নে, দিলাম ভাগ করে। এবার তোরা নিজেদের মধ্যে মারপিট করে মর! তৈরি হল 'পাকিস্তান' নামে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের আলাদা দেশ! উক্ত দেশনায়ক নিজের দেশ পেলেন। রইল শুধু হিন্দু আর মুসলিম!' কী? মনে হচ্ছে পাকিস্তানি তোষণ করছি? না। মানুষ তোষণ হয়েছে এ বইয়ে। লেখিকা বারবার করে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন কিছু ক্ষমতাশালী ইসলামধর্মী মানুষ কিভাবে ছেলেমেয়েদের মাথা খায় জিহাদ বলে। কীভাবে ভুল শেখানো হয় এবং টাকার লোভে ফাঁদে ফ���লা হয় তাদের। সর্বোপরি, লেখিকা এখানে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। সব কিছুর উত্তর আল্লা হো আকবর বলে লাঠি দিয়ে মাথা ফাটিয়ে বা জয় শ্রী রাম বলে তরোয়াল দিয়ে কচুকাটা করে পাওয়া যায় না। অনেকসময় দুটো ভালোবেসে বলা কথা বা আন্তরিকতাও বড় বড় দ্বন্দ্বের সমাধান করে দিতে পারে। এই কাহিনী পড়তে গিয়ে পাঠক বারবার হারিয়ে যাবে গুলজার আহমেদের রহস্যময়তায়, স্বরাজের দ্বিধায়, রাঠৌরের হিংস্রতায়, আবার ক্যাপ্টেন দত্তার কর্তব্যপরায়ণতায়। সবশেষে কাহিনী যখন শেষ হবে, হয়ত অনেক কিছু মেনে নিতে পারবেন না, কিন্তু গুলজার আহমদের মুখ দিয়ে উচ্চারিত মিশন কাশ্মীর ছবির ধুঁয়া ধুঁয়া গানের দু'কলি আপনি বিড়বিড় করবেনই: ইয়ে তখত কি লড়াই হ্যায়, ইয়ে কুর্সিওঁ কি জঙ্গ হ্যায় ইয়ে বেগুনাহ খুন ভি সিয়াসতোঁ কা রং হ্যায়।
এই বইটি সম্পর্কে বলতে হলে একটাই কথা মাথায় আসে "ভয়ংকর সুন্দর"। লেখিকা তার এই বইতে কাশ্মীরের সৌন্দর্যতার পাশাপাশি তার ভয়াল রুপটাও তুলে ধরেছেন। জিহাদি, আর্মি র লোকেদের দৌরাত্ম্যে সেখানকার মানুষের বিভীষিকাময় জীবনকাহিনী শুনিয়েছেন লেখিকা। গুলজার আহমেদ পাঠান, ভরত শেরগিল, স্বরাজ, আফসানা, আরিফ, ক্যাপ্টেন দত্তা - প্রতিটি চরিত্রই নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিয়েছে। এই গল্পে কোনো বাড়তি চরিত্রের উল্লেখ নেই। যে কটি আছে সবার ভূমিকাই সমানভাবে প্রশংসনীয়। এই গল্পের শেষে একটাই শিক্ষা প্রাপ্তি হয় - " সবার উপরে মানুষ সত্য। মনুষত্বের উপরে কোনো ধর্ম নেই।"
সায়ন্তনী পূততুন্ডের লেখা পড়তে চাই শুনে আমার বন্ধু বলেছিল 'ছায়াগ্রহ', 'ভোর', 'শিশমহল' দিয়ে শুরু কর। তার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে ছায়াগ্রহ পড়ি। আর মুগ্ধ হয়ে যাই লেখিকার দক্ষতা দেখে। তাই পরবর্তী বই শিশমহল ও শেষ করে ফেললাম। এটা শেষ করার পর এটুকু বুঝলাম যে, আজ যদি ওনার লেখা পড়ার কৌতূহল না দেখাতাম তবে কত যে এমন মণিমুক্ত না পড়া হয়েই থেকে যেতো কে জানে!
কাশ্মীর এর সৌন্দর্য নিয়ে একবারও ভাবেননি বা কথা বলেননি এমন বাঙালীর অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর মানেই স্বর্গের ন্যায় সুন্দর একটা জায়গা, যাকে কোনো সৌন্দর্যের মাপকাঠি দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। কিন্তু সত্যিই কি ছবির মতো সুন্দর কাশ্মীরের বুকে কোনো কলঙ্ক নেই? শিশমহল আমাদের সামনে তুলে ধরে সেই অভাবনীয় সৌন্দর্যের নীচে চাপা পড়ে থাকা কালো অন্ধকারকে, যে অন্ধকার কোনো সেলুলয়েডের পর্দায় উঠে আসেনি আজ অবধি। এই অন্ধকারে দম বন্ধ হয়ে পড়ে আছে কত ক্ষত, হতাশা, বেদনা, নিষ্ঠুরতা, হিংসা এই বই সেগুলির কথাই বলে। এক নারকী স্বর্গের উপাখ্যান হল শিশমহল।
বইটি পড়তে গিয়ে প্রথম পাতা থেকে যে বিষয়টা আমায় একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছে তা হল, লেখিকার অসম্ভব জ্ঞান, কলকাতা নিবাসী হয়েও কাশ্মীরের প্রত্যেকটি গলিকেও পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে বর্ণনা, কাশ্মীরি ও পাঞ্জাবী ভাষায় উল্লেখযোগ্য দক্ষতা, অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং কাশ্মীরিদের দৈনন্দিন অভ্যাসকেও আয়ত্ত করে তাকে শব্দশৃঙ্খলে বেঁধে ফেলা, যা ভীষণই কঠিন আমার মতে। এছাড়াও বইয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে উর্দু শের ও শায়রি। বইটি পড়ে অনেকেরই ধারণা হতে পারে লেখিকা হয়তো কাশ্মীরনিবাসী, আমি বলব ধারণা হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ বই পড়া শেষ করে কাশ্মীরের মানুষের কথা ভেবে খুব খারাপ লেগেছে আমার। আসলে, এভাবে আমরা কখনও ভেবে দেখিনা বা আমাদের ভেবে দেখতে শেখানো হয়না। কিন্তু এই বইগুলো যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যায়, যে দ্যাখো, প্রত্যেক সৌন্দর্যের নীচে আসলে চাপা পড়ে থাকে কত হাজার রক্ত।
হয় জিহাদ নয়তো পুলিশ, মৃত্যু যেন এদের প্রতিদিনের সঙ্গী। কিন্তু লেখিকার কলমে ধরা পড়েনি এতটুক পক্ষপাত। সে কলমে ধরা পড়েছে আর্মির নৃশংস অত্যাচার, ধর্মের অন্ধ জিগির, দারিদ্র্যের হাহাকার, জিহাদ এর নামে প্রতারণা, জিহাদিদের ক্ষমতার লোভ, ক্ষমতার শোষণ আবার তেমনি আছে কিছু মানবিক মুখও। রয়েছে নিষ্ঠুর আতঙ্কবাদীর কথার পাশাপাশি অনুশোচনায় দগ্ধ হওয়া অসহায় জেহাদীর কথাও। জিহাদ আর পুলিশ এই দুইয়ের মাঝে চাপা পড়ে যাওয়া কাশ্মীরিদের কথা কেউ বলে না, অথচ এটাই বলার দরকার ছিল। প্রত্যেকটি চরিত্র মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। আর শেষটা নিঃশ্বাস কেড়ে নিতে।
বইটিকে নিছক কাশ্মীর-বিষয়ক তথ্যসম্বলিত কাহিনি বলা যায় না কোনোমতেই, বরং এটি থ্রিলার হয়ে উঠেছে গুলজার,আরিফা, আফসানার চরিত্রগুলির বিবর্তনের মাধ্যমে। নিঃশ্বাস থমকে যেতে বাধ্য কাহিনির শেষে এদের আসল পরিচয় জানলে। কিন্তু সেসব বলে দিলে বইটি পড়াই বৃথা। পড়তে পড়তে তথ্য, নানান তীব্র অনুভব আর চমক দেওয়া ঘটনা মিশ্রিত রসায়নটিতে বুঁদ হয়ে শেষে শিশমহলের ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বেদনার্ত হলে তবেই এই বইয়ের আসল উদ্দেশ্য পূরণ হবে।
💠 বর্তমানের জনপ্রিয় থ্রিলার লেখিকা সায়ন্তনী পূততুন্ড এর প্রতিটা লেখাই পড়তে অসম্ভব ভালো লাগে, কারণ সেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকে টানটান উত্তেজনা তাই উপন্যাসগুলো শেষ করতে বেশি সময় লাগেনা। লেখিকা যে প্রতিটি লেখাই যথেষ্ট পড়াশোনা ও রিসার্চ করে লেখেন তা পড়লেই বোঝা যায়। 💠কাশ্মীর অর্থাৎ 'ভূস্বর্গ' বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শ্রীনগরের ডাল লেক, শঙ্করাচার্যের মন্দির, আপেল বাগিচা,সুসজ্জিত বাগান, পহেলগাঁও এর বেতাব ভ্যালি সমস্ত জায়গার অনেইসর্গিক দৃশ্য। কিন্তু 'শিশমহল' পড়লে বোঝা যায় এর আড়ালে রয়েছে কিছু 'নারকীয় দৃশ্য'। তথাকথিত ডাল লেকের উপর একচিলতে বাসস্থান হলো শিশমহল, ওখানকার দিন আনা দিন খাওয়া মানুষেরা বাঁচতে চায় স্বাধীনভাবে, তাই নিজেদের তারা ভারতীয় বা পাকিস্তানি কোনোটাই নয় বরং পরিচয় দেয় 'কাশ্মীরি' বলে। হয় জিহাদ নয়তো ইন্ডিয়ান আর্মি, মৃত্যু যেন এদের প্রতিদিনের সঙ্গী। আর্মি তাদের রক্ষাকর্তা নয় বরং প্রতিনিয়ত জিহাদ সন্দেহে শিশমহলের বাসিন্দাদের আর্মির রোষের মুখে পড়তে হয়। অভাব চূড়ান্ত হওয়ার দরুণ শিশুশ্রম এর মত করুণ চিত্রও ফুটে ওঠে এই কাহিনীতে। কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও এই বাসিন্দাদের অতিথিবৎসলতা,একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মতো পরোপকারী মনোভাব ও লেখিকা দেখিয়েছেন। 💠উপন্যাসে, রোজগারের জন্য শৈশব হারিয়ে ফেলা কন্নু, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা তার মা গুরপ্রীত ও বাবা ভরত, জিহাদি দের দ্বারা ভুল পথে চালিত হওয়া স্বরাজ, ছোটবেলায় আর্মির ভয়ঙ্কর অত্যাচারের মুখে পড়া গুলজার ও তার বোন আরিফা এদের প্রত্যেকের জীবনযুদ্ধের কথা পড়তে পড়তে অজান্তেই চোখে জল চলে আসে। পাশাপাশি লেফটেন্যান্ট ক্যাপ্টেন দত্তার কর্তব্যপরায়ণতাও লক্ষ্য করার মতো। 💠'শিশমহল' শুধুমাত্র কাশ্মীর বিষয়ক তথ্যসম্বলিত কাহিনীই নয়, বরং গুলজার, আফসানার মতো চরিত্রদের বিবর্তনের মাধ্যমে এক অনন্য থ্রিলার হয়ে উঠেছে। পাঞ্জাবি,উর্দু ও কাশ্মীরি ভাষার প্রয়োগে লেখিকার দক্ষতা দেখার মতোও বটে। উপন্যাসের শেষ অংশটুকু পড়ে মন ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। তাই কাশ্মীরের আপাত সৌন্দর্য্যের আড়ালে থাকা মানুষগুলির জীবনযাত্রার স্বাদ পেতে পাঠকদের অনুরোধ করবো অবশ্যই 'শিশমহল' পড়তে ❤️
"যদি পৃথিবীতে কোথাও একমুঠো স্বর্গ থেকে থাকে, তবে তা এখানেই এখানেই এখানেই।"
শিশমহল কাশ্মীরের একটি জায়গার নাম । কিন্তু এ সে জায়গা না যা সেলুলয়েডের পর্দায় উঠে এসেছে বারবার। এ এক নারকীয় অঞ্চল যেখানে বাস করে কাশ্মীরের খেটে খাওয়া গরীব মানুষ, পর্যটন শিল্প না থাকলে যারা ঐ সুন্দর প্রকৃতির কাছে নিদারুণ অসহায়, ডাল লেকের আনঅফিসিয়াল সেপটিক ট্যাংক শিশ মহলের নিকটস্থ যে জলাভূমি টুকু, সেখানেই ওদের বাস। প্রাকৃতিক, আর্থিক ও মানসিক সকল প্রতিবন্ধকতা জয় করে বেঁচে আছে ভরত, গুরপ্রীত, গুলজার, নার্গিস, আফসানা, আরিফারা। অর্থকষ্ট ছাড়াও তাদের জীবনে রয়েছে নিত্যনৈমিত্তিক প্রাণের সংকট। তাদের সুস্থভাবে বাঁচার চেষ্টা করাও যেন বিলাসিতা। আর্মি আর জিহাদিদের মাঝখানে পড়ে, "দুধ মাঙ্গো তো ক্ষীর দেঙ্গে, কাশ্মীর মাঙ্গো তো চিড় দেঙ্গে " আর "সওয়াগতা হৈ জিহাদি" স্লোগানের মাঝে পড়ে কেমন আছে ঐ সাধারণ মানুষগুলো?
ওদিকে আর্মির মেজরের কাছে খবরি মারফত খবর এসেছে শিশমহল কোনো এক বড় সর্বনাশের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠতে চলেছে। ওখানে লুকিয়ে রয়েছে এমন কেউ যে এই সর্বনাশের হোতা। কে সে? সেই খবরির খবর কখনও ভুল হয়না। কি ভাবে এত সঠিক খবর ঠিক পেয়ে যায় ঐ খবরি?
এই দুটো প্রশ্নই আমাকে টেনে নিয়ে গেছে বইয়ের শেষ অবধি। এছাড়াও উপভোগ করেছি, কখনও মন খারাপ হয়েছে, কখনও ভয় পেয়েছি বইয়ের চরিত্রদের জীবনের নানান ঘটনায়। তবে উপন্যাসের গুলজার আর রাঠোর চরিত্র দুটি আমার অন্যদের তুলনায় বেশি ভালো লেগেছে। এই পছন্দ আমার একান্তই ব্যক্তিগত। কারোর সাথে বিরোধ হলে আমায় ব্যক্তিগত আক্রমণ একেবারেই কাম্য নয়। শেষ করছি উপন্যাসের অনেক প্রিয় লাইনের মধ্যে একটি দিয়ে -
"যে ঈশ্বরকে ভয় পায় না, সে কাউকে ভয় পায় না সাবজি। তার চেয়ে খতরনাক জীব আর নেই। যদি ঠিক পথে যায়, তবে ভয়ংকর ভাল হবে। আর যদি বিপথে যায়, তবে তার চেয়ে ভয়ংকর খারাপ আর কেউ হতে পারবে না।"