মওলানা আবুল কালাম আজাদের ব্যক্তিগত সহকারী ,ভারতের শিক্ষাসচি ও মন্ত্রী হুমায়ুন কবির বেশ হাইপ্রোইাফাইলের মানুষ৷ ছাত্র হিসেবেও ছিলেন কৃতি।তাই তাঁর বাছাইকৃত প্রবন্ধের সংকলন বিশেষ আকর্ষণের দাবি রাখে । কিন্ত পাঠক হিসেবে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ শতভাগ হয়েছে এমন কথা বলতে পারিনা । হুমায়ুন কবিরের প্রবন্ধগুলোকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে- ১.সমাজ ও ধর্ম ২. সাহিত্য ও সংস্কৃতি ৩. শিক্ষা ও দর্শন এবং ৪. রাষ্ট্র ও রাজনীতি হুমায়ুন কবিরের সাহিত্য কিংবা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রবন্ধের সিংহভাগ রচিত হয়েছে দেশভাগ পূর্ববতী সময়ে ।তাই অবিভক্ত ভারতের হিন্দু-মুসলমান সমস্যায় কংগ্রেসশিবিরের হুমায়ুন কবির জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্প্রদায়িক বিভেদের সমাধানের পথ খুঁজেছেন ।নারীকে পর্দার অন্তরালে রাখলে ভারতীয় মুসলমানের উন্নতি অধরাই থেকে যাবে তা সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট থেকে বর্ণনা করতে চেয়েছেন । ভারতীয় মুসলমান সমাজের উদ্দেশ্যে লিখেছেন , " ভারতবর্ষ আত্মবিস্মৃত জাতির দেশ ; কিন্ত সে দেশেও বোধ হয় মুসলমানের মত আত্মবিস্মৃত আর কোন জাতি নাই ।" সাহিত্য নিয়ে জবরদস্ত একটি প্রবন্ধ আছে এতে । বাঙালি মুসলমান তখনও সাহিত্যে হাতযশ করে উঠতে পারেনি ।সাতশো বছর ধরে বাঙালি হিন্দু মুসলমান একসাথে বাস করছে ।অথচ সাহিত্যে, " হয়তো দুয়েকজন কখনো কোন জায়গায় মুসলমানের নামোল্লেখ করেছেন , কিন্তু মাঝি খানসামা ছাড়া কি বাংলাদেশে মুসলমান নাই ?" ঘোর কংগ্রেসির কলম যখন একথা স্বীকার করে ,তখন সাহিত্যে বাস্তবতাকে কতটা মূল্য দিতেন , কতখানি মুক্তমনার পরিচয় দিতেন দেশভাগপূর্বের নামিদামি সাহিত্যিকরা সে প্রশ্ন তোলাই যায়। বড় মানুষ হুমায়ুন কবির বড়বড় সব সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন।তারই লিখিতরূপ প্রবন্ধাকারে স্থান পেয়েছে এই বইতে। শিক্ষা নিয়ে প্রবন্ধগুলোর মূলসুর বুদ্ধির চর্চা ,জ্ঞানের সাধনা । এই বইয়ের অন্যতম সেরা প্রবন্ধ " মির্জা আবু তালিব খাঁ" এই খান সাহেব প্রথম ভারতীয় যিনি ১৭৯৯ সালে ইংল্যান্ড গমন করেছিলেন এবং সেকালের ব্রিটেনকে রীতিমত খুঁটিয়েখুঁটিয়ে দেখেছিলেন ।যার সাক্ষ্য তাঁর রচিত ভ্রমণকাহিনি । হুমায়ুন কবিরের বদৌলতে খাঁ সাহেবের ভ্রমণকথা অবশ্যপাঠ্যে পরিণত হল । বাংলাদেশে ৪৭% স্নাতকই বেকার ।( প্রথম আলো , ০৫ জুলাই, ২০১৮) । বিশ্ববিদ্যালয় কি তবে বেকার উৎপাদন কারখানা? এই প্রসঙ্গে বহু আগেই হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য, " বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নিতে আসে ছাত্ররা পরে ভাল চাকরি পাবার আশায় । বিশ্ববিদ্যালয়ী শিক্ষার প্রথম যুগে এ শিক্ষা নিত খুবকম লোকই । তাই তারা পেত ভাল ভাল কাজ।কিন্তু এখন যে বহুছাত্র পাশ করে বেরোচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ী শিক্ষা পেয়ে । এখন আর অত ব্যক্তিকে চাকরি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না । ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ী শিক্ষা হচ্ছে তীব্র সমালোচনা আর নিন্দার বিষয় । কিন্ত একথা মনে রাখতে হবে যে , এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কে দায়ী করলে ঠিক হবে না , করতে হবে অর্থনীতিক অবস্থাকে ।" দর্শন কিংবা শিক্ষা নিয়ে যেসব প্রবন্ধ বইটিতে স্থান পেয়েছে তা যথেষ্ট দুর্বল । হুমায়ুন কবির মূলত ,মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন কংগ্রেস ও বাটোয়ারাপূর্ব মুসলিম লীগের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখা করতে রচিত প্রবন্ধগুলোতে । আর এখানেই কবির সাহেবের ব্যর্থতা । মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমালোচক জাতীয়তাবাদী হুমায়ুন কবির ভারতীয় রাজনীতির পথচলাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রকারান্তরে স্বীকার করেছন কংগ্রেসের কিছু কিছু সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক অবস্থানই লীগকে শক্তিশালী করেছিল । ষাটের দশকে ওয়াশিংটন ও মস্কো ভ্রমণ করেছিলেন ।এই দুইমেরুর দুইদেশকে নিয়ে বৃহৎ কলেবরের দুই প্রবন্ধ আছে । ষাটের দশকের শুরুতে ভারত তখন মস্কোপন্থী হচ্ছে,হবে করছে তাই বুঝতেই পারছেন হুমায়ুন কবিরের কলম ডানে দৌড়েছ নাকি বামে । ৩ শ' ৩৬ পাতার বইটি বিশেষ সুখপাঠ্য তা বলব না ।বরং একঘেয়েই বেশি ।কিন্ত ভারতীয় রাজনীতি নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো অনেকেই কাছেই অন্যরকম মর্যাদা পেতেই পারে।