কিছু জিনিস আগুনে পুড়ে যায়, কিছু জিনিস বিশুদ্ধ হয়। . এই দ্বীন মহান, একমাত্র মহানেরাই একে বহনের ক্ষমতা রাখে। আর পরীক্ষার মাধ্যমেই সাধারণ আর অসাধারণের মধ্যেকার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তারা মহান হয়ে ওঠেন। হকপথের বৈশিষ্ট্যই পরীক্ষা। এই পরীক্ষা বিভিন্ন মাত্রার হতে পারে। বিভিন্ন ভাবে আসতে পারে। কিন্তু পরীক্ষা আসবেই। নিশ্চয় যে পথে চলতে গেলে বাধা আসে না, যে পথ কণ্টকাকীর্ণ নয়, সে পথ দ্বীন ইসলামের পথ নয়। . যুগে যুগে সত্যপথের পথিকেরা সবচেয়ে বেশি যে পরীক্ষাগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন তার অন্যতম বন্দিত্ব। কারাগার – জীবিতদের কবর, বিষাদের ঘর, সত্যবাদীদের জন্য অভিজ্ঞতা আর শত্রুদের আনন্দের উৎসস্থল এই কারাগার। অনেকের জন্য এ হল সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া, দ্বীনকে তুচ্ছ মূল্যে বিকিয়ে দেয়া, বিশ্বাসঘাতকতা, পরাজয় আর ইমানহারা হবার জায়গা। . আবার অনেকের জন্য কারাগার হল নবী ইউসুফের আ. পাঠশালা। এমন এক জায়গা যেখানে বান্দা অনুভব করে যুহদ ও ইবাদতের স্বাদ, ইমানের মিষ্টতা, সময়ের বারাকাহ আর আখিরাতের তীব্র কামনা। এমন এক পাঠশালা যেখানে স্বীয় প্রতিপালকের স্মরণে পাথরের মতো শক্ত হৃদয়ও কোমল হয়, প্রাণহীন, আশাহত, কলুষিত, অবাধ্য চোখেও নামে অনুতাপ আর তাওবাহর বৃষ্টি। কারাগার এমন এক পাঠশালা যেখানে মস্তিষ্কে মজুদ করা ‘ইলম হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত হয়, ‘ইলম আমলে পরিণত হয়, সত্যের পথে চলার সংকল্প দৃঢ় হয় আর বান্দা অর্জন করে রবের নৈকট্য।
শায়খ আহমেদ মুসা জিবরীলের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। তার পিতা শায়খ মুসা জিবরীল রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন মদীনার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই সুবাদে আহমেদ মুসা জিবরীল শৈশবের বেশ কিছু সময় কাটান মদীনায় । সেখানেই ১১ বছর বয়সে তিনি হিফয সম্পন্ন করেন। হাইস্কুল পাশ করার আগেই তিনি বুখারী ও মুসলিম শরীফ মুখস্ত করেন। কৈশোরের বাকী সময়টুকু তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই কাটান এবং সেখানেই ১৯৮৯ সালে হাইস্কুল থেকে পাশ করেন। পরবর্তিতে তিনি বুখারী ও মুসলিম শরিফের সনদ সমূহ মুখস্ত করেন আর এরপরে হাদিসের ৬টি কিতাব (কুতুব সিত্তাহ) মুখস্ত করেন। এরপর তিনিও তার বাবার পদাঙ্ক অনুসরন করে মদীনার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরীয়াহর উপর ডিগ্রী নেন।
আহমাদ মুসা জিবরীল শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমীনের (রাহিমাহুল্লাহ) তত্ত্বাবধানে অনেকগুলো কিতাবের অধ্যায়ন সম্পন্ন করেন এবং তিনি তার কাছ থেকে অত্যন্ত বিরল তাযকিয়্যাও লাভ করেন।
শায়খ বাকর আবু যাইদের (রাহিমাহুল্লাহ) সাথে একান্ত ক্লাসে তিনি আল ইমাম ওয়াল মুজাদ্দিদ শায়খ মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রাহিমাহুল্লাহ) ও শায়খ আল-ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যার (রাহিমাহুল্লাহ) কিছু বইও অধ্যায়ন করেন। তিনি শায়খ মুহাম্মাদ মুখতার আশ-শিনক্বিতীর অধীনে ৪ বছর পড়াশুনা করেন। আল্লামাহ হামুদ বিন উক্বলা আশ- শু’আইবীর অধীনেও তিনি অধ্যায়ন করেন এবং তাযকিয়্যাহ লাভ করেন।
তিনি তার পিতার সহপাঠি শায়খ ইহসান ইলাহি যহীরের অধীনেও পড়েছেন। শায়খ মুসা জিবরীল (শায়খ আহমেদ মুসা জিবরীলের পিতা) শায়খ ইহসানকে অ্যামেরিকায় আমন্ত্রন জানান। শায়খ ইহসান অ্যামেরিকায় কিশোর শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীলের সাথে পরিচিত হবার পর চমৎকৃত হয়ে তার বাবাকে বলেন – ইন শা আল্লাহ আপনি একজন মুজাদ্দিদ গড়ে তুলেছেন! তিনি আরও বলেন – “এই ছেলেটি তো আমার বইগুলো সম্পর্কে আমার চেয়েও বেশি জানে!”
শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল “আর-রাহীকুল মাখতুম”- এর লেখক সাফিউর রাহমান আল-মুবারাকপুরির (রাহিমাহুল্লাহ) অধীনে দীর্ঘ ৫ বছর অধ্যায়ন করেন। এছাড়াও তিনি অধ্যায়ন করেন শায়খ মুক্ববিল, শায়খ আব্দুল্লাহ গ্বুনায়মান, শায়খ মুহাম্মাদ আইয়ুব এবং শায়খ আতিয়াহ আস-সালিমের অধীনে। এদের মধ্যে শায়খ আতিয়াহ আস-সালিম ছিলেন শায়খ আল-আল্লামাহ মুহাম্মাদ আল আমিন শানক্বীতির (রাহিমাহুল্লাহ) প্রধান ছাত্র, এবং তিনি শায়খ আশ-শানক্বিতির ইন্তেকালের পর তার প্রধান তাফসির গ্রন্থ আদওয়া উল বায়ানের কাজ শেষ করেন।
শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল শায়খ ইব্রাহিম আল হুসাইনের এর ছাত্র ছিলেন। শায়খ ইব্রাহিম ছিলেন শায়খ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ বিন বাযের (রাহিমাহুল্লাহ) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর। শায়খ আব্দুল্লাহ আল-ক্বুদের (আল-লাজনাহ আদ দা-ইমাহ লিল বুহুতুল ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতাহ – Permanent Committee for Islamic Research and Issuing Fatwas– এর প্রথম দিকে সদস্য) সাথে শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল হাজ্জ করার সুযোগ লাভ করেন। এছাড়া তিনি দুই পবিত্র মাসজিদের রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে নিয়োজিত কমিটির প্রধান শায়খ সালিহ আল-হুসাইনের অধীনেও অধ্যায়নের সু্যোগ পান।
তিনি মহান মুহাদ্দিস শায়খ হামাদ আল-আনসারির রাহিমাহুল্লাহ অধীনে হাদীস অধ্যায়ন করেন এবং তার কাছ থেকে তাযকিয়্যাহ লাভ করেন। তিনি অধ্যায়ন করেন শায়খ আবু মালিক মুহাম্মাদ শাক্বরাহ-র অধীনে। শায়খ আবু মালিক ছিলেন শায়খ আল-আলবানির (রাহিমাহুল্লাহ) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। শায়খ আল-আলবানি তাঁর ওয়াসিয়্যাহতে শায়খ আবু মালিককে তার জানাযার ইমামতি করার জন্য অনুরোধ করেন। . শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল শায়খ মুসা আল-ক্বারনিরও (রাবী আল-মাদ্বখালির জামাতা) ছাত্র। ক্বুরআনের ব্যাপারে শায়খ আহমাদ ইজাযাহ প্রাপ্ত হন শায়খ মুহাম্মাদ মা’বাদ ও অন্যান্যদের কাছ থেকে। শায়খ মুসা জিবরীল ও শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীলের; ইলম থেকে উপকৃত হবার জন্য শায়খ বিন বায অ্যামেরিকায় থাকা সৌদি ছাত্রদের উৎসাহিত করেন। শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল শায়খ বিন বাযের কাছ থেকে তাযকিয়্যাহ অর্জন করেন (শায়খ বিন বাযের মৃত্যুর তিন মাস আগে)।
শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীলের ব্যাপারে মন্তব্য করার সময়ে শায়খ বিন বায তাকে সম্বোধন করেন, একজন “শায়খ” হিসেবে এবং বলেন তিনি “(আলিমদের কাছে) পরিচিত” ও “উত্তম আক্বিদা পোষণ করেন।”
শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল নিজেকে শায়খ হামুদ বিন উক্বলা আশ-শু’আইবি রাহিমাহুল্লাহ, শায়খ আলি আল খুদাইর হাফিযাহুল্লাহ, শায়খ নাসির আল ফাহদ ফাকাল্লাহু আশরাহ, শায়খ সুলাইমান আল ‘উলওয়ানসহ ফাকাল্লাহু আশরাহ ঐসব আলিমদের সিলসিলার অনুসারী মনে করেন যারা বর্তমান সময়ে শায়খ আল-ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল ইমাম ওয়াল মুজাদ্দিদ মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহ্হাব ও উলামায়ে নাজদের শিক্ষাকে সত্যিকারভাবে আকড়ে আছে, যারা প্রকৃত অর্থে উলামায়ে নাজদের উত্তরসূরী। তার সব শিক্ষকের মাঝে শায়খ আল আল্লামাহ শায়খ হামুদ বিন উক্বলা আশ-শু’আইবীকে রাহিমাহুল্লাহ তিনি তার প্রধান শায়খ মনে করেন, এবং শায়খ
ইয়া আল্লাহ যারা তোমার দ্বীনের জন্য, দ্বীন প্রচারের জন্য যুগে যুগে কালে কালে অগণিত দ্বীনের দাইয় রা নির্যাতিত হয়েছে বা হচ্ছে তুমি তাদেরকে জালিম দের অত্যাচার থেকে মুক্ত কর। যারা এই ইহকাল ত্যাগ করেছেন তাদের সকলকে জান্নাত বাসি কর। সাথে আমরা বড় গুনাহগার, তাদের মতো কঠিন জীবন যাপন করতে হয়না তবুও তোমার দ্বীন পালনে সদা অবহেলা করেই চলেছি। তুমি আমাদের ক্ষমা করে তোমার দ্বীনের পথে চলার তৌফিক দান কর। আমিন।
সুবহানাল্লাহ!! যেন শুধু একটি বই নয়!! এ যেন একটি অভিজ্ঞতা!!
আল্লাহ'র দ্বীনের উপর আপোষহীন ভাবে চলার ক্ষেত্রে কারাগারের জগৎ আরেক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। যারা ইসলামের আদর্শ লালন করেন এবং যারা তা নির্ভেজাল ভাবে প্রচারের কাজে নিয়োজিত এমন এই বাস্তবতা সম্পর্কেও স্বচ্ছ ধারণা থাকা উচিত।
এই বইটি শুধু কারাগার জীবনের অত্যাচার, নির্যাতন ও ভয়াবহতাই আলোচনা করে নি বরং সাথে সাথে আমাদের এ শিক্ষাও দেয় যদি কখনো আমরা এমন পরিস্থিতির শিকার হই (যা আমরা কক্ষনোই কামনা করবো না) তাহলে কিভাবে নিজের ঈমান রক্ষা করে পুরুষের মতো এর মুকাবিলা করতে পারি।
ইতিহাসের চার সময়ের চার জন মহান ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে (যাদের মধ্যে একজন নবী) কারা জীবনের অভিজ্ঞতা ও তা কিভাবে শ্রেষ্ঠ উপায়ে মুকাবিলা করা যায়, আমাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে এই বইটিতে। তাঁরা হলেন- সাইয়্যেদুনা ইউসুফ আলাইহিসসালাম, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইয়্যিমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ, ইমামে আযম ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ, শায়েখ নাসির আল ফাহাদ ফাকাল্লাহু আসরাহ।
যুগে যুগে আপোষহীন হ্বকপন্থীদের সাথে যালিমদের আচরণ সম্পর্কেও আমরা বইটি থেকে জানতে পারবো ইন শা আল্লাহ। কিভাবে তারা যখন হ্বকপন্থীদের আর কোনো ভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারে তখনই তাদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডা, মিথ্যে জঘন্য অভিযোগ ছড়িয়ে তারা হ্বকপন্থীদের জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে দিতে চায়।
বইটি পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম সুবহানাল্লাহ যালিমদের এই একই কর্মনীতি হাজার হাজার বছর ধরে। আর হ্বকপন্থীদেরও একই কর্মনীতি। লাশ বের হয়েছে কারাগার থেকে কিন্তু আদর্শ থেকে এক চুল পরিমাণ বিচ্যুতি কেউ ঘটাতে পারে নি। কতো নির্যাতন করা হয়েছে, কতো ভয় দেখানো হয়েছে, কতো কিছুর লোভ দেখানো হয়েছে কিন্তু না তাঁরা নিজেদের অবস্থানে অটল। আল্লাহর প্রতি তীব্র ভালোবাসা সৃষ্টি হলে আর তাঁর প্রতিশ্রুত জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা মনে সৃষ্টি হলে বুঝি এমনই হয়।
বইটির আরেকটি অসাধারণ দিক হলো পুরো বই জুড়েই শায়েখ প্রসঙ্গক্রমে নিজের কারাজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন যা বইটির সৌন্দর্য আরো হাজার গুন বৃদ্ধি করে দিয়েছে। যখন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে যিনি এই ঘটনাগুলো বর্ণনা করছেন তিনি নিজেই একজন মজলুম। তিনি নিজেও জীবনে এ ধাপগুলি অতিক্রম করেছেন। তখন বইটি পড়তে এক অন্যধরনের অভিজ্ঞতা হবে ইন শা আল্লাহ।
আল্লাহ তা'য়ালা বইটির সাথে জড়িত সকল ভাইকে উত্তম প্রতিদান দিন। যেটি মূলত শায়েখের লেকচার "university of Yusuf" এর অনুবাদ। আল্লাহ তা'য়ালা শায়েখকে ও তার পরিবারকে হেফাযত করুন। আর অন্যায় ভাবে কারাবন্দী বিশ্বের সকল মুসলমানের ও তাদের পরিবারদের যেন আমরা সর্বদা দেয়ায় স্মরণ রাখি। আল্লাহ তা'য়ালা তাদের মুক্তি ত্বরান্বিত করুন। আমিন।
ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "মুসলিমদের যা কিছু আছে তার সবটা দিয়ে হলেও মুসলিম বন্দীদের মুক্ত করা বাধ্যতামূলক। আর এ ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য নেই।"
সকল প্রশংসা বিশ্বজাহানের একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর!!
মানুষ কি মনে করে যে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদেরকেও পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যুকদেরকে। [ সুরা আনকাবুত ২৯: ২,৩ ]
যুগে যুগে যারাই আল্লাহর ওপর ঈমাণ এনেছে, হক্কের ওপর অটল থেকেছে তাদেরকেই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। রোগ, শোক, দারিদ্র্যের পাশাপাশি বাতিলের পক্ষ থেকে সীমাহীন নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সত্যের পথের পথিকদের জন্য এমনি এক পরীক্ষা 'বন্দীত্ব'।
কারাগারে বন্দীত্ব কারো জন্য হয় আশীর্বাদ, কারো জন্য উন্মোচন করে ভ্রষ্টতার দরজা। কেউ কেউ কারাগারে ঈমাণ- আমল সব খুইয়ে আসে। আবার সেখানেই কারো ঈমাণ পূর্ণতা পায়। বাতিলের কারাগারের বদ্ধ প্রকোষ্ঠ আল্লাহর জন্য যাদের অন্তরকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এমনই চারজন ব্যক্তির কারান্তরীন সময়ের অভিজ্ঞতার বর্ননা 'নবী ইউসুফের (আ.) পাঠশালা'। শাইখ আহমাদ মুসা জিবরিল।'ধূলিমলিন উপহার: রামাদান' এবং ' বিপদ যখন নিয়ামাত' বইয়ের জন্য তিনি ইতোমধ্যে এদেশের ইসলাম প্রিয় মানুষের কাছে বেশ পরিচিতি পেয়েছেন, তার 'University of Yusuf' লেকচার সিরিজের বাংলা অনুবাদ এই বইটি। অনুবাদ করেছে 'ইল্ম হাউস অনুবাদক টিম'। সম্পাদনা এবং টিকা সংযোজন করেছেন শাইখ মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির।
বইটিতে ইউসুফ আ., ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ., ইমাম আবু হানিফা রহ. এবং শাইখ নাসির আল- ফাহদ এর কারা অন্তরীণ সময়ের অভিজ্ঞতা বিবৃত হয়েছে। জালিমের সামনে সত্য উচ্চারণের কারণে তাঁরা কারাগারে বন্দী হয়েছিলেন কিন্তু তাদের অন্তরকে আল্লাহ ঈমাণের নূর দিয়ে আলোকিত করে দিয়েছিলেন। ইউসুফ আ. যেমন অন্যায় থেকে বাঁচতে নিজের জন্য কারাগারকে বেছে নিয়েছিলেন আর সেখানেই তাঁর নবুয়তির পূর্ণতা পেয়েছিল তেমনি বাকি তিনজনও তাঁদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় পার করেছেন কারাগারে। কারাগারের ভয়ানক যুলুম, নির্যাতন তাঁদের সত্য থেকে এক চুল পরিমাণও সরাতে তো পারেইনি বরং সে সময়ে তাঁরা অসংখ্যা কালজয়ী বই লিখেছেন, অসংখ্যা মানুষকে হক্কের পথে এনেছেন। সর্বোপরি কারাবন্দিত্ব তাঁদের ঈমাণকে আরো মজবুত করেছে।
বইটা পড়তে গিয়ে প্রথমেই যেটা মনে হলো তা হচ্ছে, যালিম এবং হক্কপন্থীদের কর্মপন্থা সব যুগেই একই রকম। শাইখ জিবরিল যে চারজনের কথা লিখেছেন তাঁদের জীবনকালের সময়ের মধ্যে বিস্তর ব্যাবধান ছিল কিন্তু তাঁরা একই পন্থায়, একই কারণে যুলুমের শিকার হয়েছেন। যালিম শাসকেরা তাদের সত্য প্রচার থেকে নিবৃত্ত করতে না পেরে মিথ্যা প্রচার,প্রোপাগান্ডা, নির্যাতনের আশ্রয় নিয়ে মানুষের সামনে তাঁদের অসম্মানিত করার সর্বোচ্চ প্রয়াস চালিয়েছে। কিন্তু একইভাবে সত্যের ওপর অবিচল থেকে, আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে তাঁরা চিরস্মরণীয় হয়েছেন। মুক্ত জীবন, দুনিয়ার চাকচিক্যময়তা থেকে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করেছেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে প্রসঙ্গক্রমে শাইখ জিবরিলের নিজের কারাজীবনের বিভিন্ন ঘটনাও বর্ননা করেছেন। সেটা ছিল ভীষণ একটা দু:সময়, সবাই শা��খের পরিবারকে ত্যাগ করেছিল। স্বজাতির লোকেরাই হয়েছিল বিশ্বাসঘাতক। তারপরও তিনি, তার সহবন্দী বাবা বা তার পরিবার কেউ আল্লাহর রহমত নিরাশ হননি। কারাবন্দীত্ব তাদের জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। যুলুম,নির্যাতন,মিথ্যা অপবাদ, বন্দীত্ব মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়, বরং দু:খ-কষ্টের আগুনে পুড়েই এসব মহান মানুষদের ঈমাণ এতটা দৃঢ় হয় যার সামনে বাতিলকে এক সময় মাথা নত করতেই হয়। তাঁর এ অনুভূতি ভুক্তভোগীদের মনোবলকেই উন্নত করে। বন্দীদের পরিবারের অন্য মুসলিম ভাইদের দ্বায়িত্বও শাইখ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কারণ এ সময় সেই পরিবারটির জীবন নরকতুল্য অবস্থার মধ্যে থাকে। তাদের কে সবাই এড়িয়ে চলে।
নবী ইউসুফের (আ.) পাঠশালার ছাত্রদের মহিমান্বিত জীবনকে অনুভব করতে আপনিও হাতে নিতে পারেন 'নবি ইউসুফের (আ.) পাঠশালা'। ১০৮ পৃষ্ঠার ছোট্ট পেপারব্যাকটির নির্ধারিত মূল্য ১০০ টাকা।
একটি রত্ন। এই বই নিয়ে কিছু বলতেও ভয় হয়,দ্বিধা জাগে। এর ভেতরের বিষয়বস্তুকে ফুটিয়ে তোলার জন্য নিজের সমস্ত অর্জনের দিকে হাত বাড়াতে হয়। শব্দ খুঁজতে হয়। তবুও যেন যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হচ্ছে না এমন ধারণা আসে।
...একজন মুসলিম,একজন দাঈ হিসেবে আপনাকে সব সময় এই সত্য পথের ওপর অটল থাকতে হবে।অন্যরা যে চোখে দুনিয়াকে দেখছে,আপনি সেভাবে দুনিয়াকে দেখতে পারবেন না। ওদের জীবন হলো প্রাইমারি,জুনিয়র,হাইস্কুল,কলেজ শেষ করা। এরই মধ্যে বা এর পর হয়তো বিয়ে করা,বাচ্চা জন্ম দেওয়া,তাদের বড় করে তোলা,চাকরি বাকরি করা। সবশেষে রিটায়ারমেন্ট,রকিং চেয়ারে দোল খাওয়া। কোনো সমুদ্রসৈকতে কিংবা নিরিবিলি রিসোর্টে স্ত্রীর সাথে বসে নাতি-নাতনিদের খেলা দেখা আর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা। ওদের কাছে এই হল জীবনের উদ্দেশ্য। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য সমীকরণটা আলাদা। একজন মুসলিম জানে,তার জীবনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে। এসব পার্থিব বিষয়াদি কখনোই আমাদের বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য হতে পারে না।
(যখন হৃদয় কলুষতায় ছেয়ে যায় দুনিয়ার চাকচিক্য তীব্র আকর্ষণ জন্মে আর আত্নপরিচয় ভুলতে বসি... সে জঘন্যতম মুহুর্তে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিতে 'কে তুমি'...)
বইঃনবী ইউসুফ (আঃ)-এর পাঠশালা লেখকঃশাইখ আহমাদ মুসা জিবরিল অনুবাদঃইলমহাউস অনুবাদক টিম প্রথম সংস্করণঃ মে ২০১৮ প্রকাশকঃ ইলমহাউস পাবলিকেশন উৎসর্গঃ সারা বিশ্বের মুসলিম বন্দী ও তাঁদের পরিবারের প্রতি... মুদ্রিত মূল্যঃ১০০/= পৃষ্টা সংখ্যাঃ ১০৮
অসাধারন একটি বই। শায়েখ আহমেদ মুসা জিবরিলের কথা বরাবরই ভাল লাগে। এই বইটিও তার কিছু লেকচার থেকে নেওয়া। এই বইয়ে আছে ইসলামের পথে চলতে হলে, তাওহীদের বাণী প্রচার করতে গেলে যে বাধা আসবেই- তারই কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের বর্ণনা। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইমাম আবু হানিফা এবং শাইখ নাসির আল ফাহদ এর জীবনে চলার পথে কিভাবে তারা বারবার শাসকদের রোষানলে পড়ে কারাগার জীবন গ্রহণ করেছেন কিন্তু ঈমান থেকে পিছু হটেননি তারই প্রানঞ্জল বর্ণনা। সতি ঈমান জাগানিয়া একটি বই।