ফেলুদার গল্পে সিধুজ্যাঠা ছিলেন সবজান্তা। শুধু তিনিই নন এই গুগল বিশ্বের আগে, যখন সবকিছু মাউসের একটা ক্লিকেই জানা যেত না, তখন এইসব সবজান্তা মানুষরাই সময়ে অসময়ে নানা জ্ঞান বিতরণ করতেন আমাদের। এখন তো আর সে দিন নেই। তাহলে এই বইয়ের দরকার কোথায়? এই বই নতুন কিছু জানানোর জন্য নয়, বরং সেইসব ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য, যা আমরা ছোটবেলা থেকে ভুলভাবে জেনে এসেছি, বিশ্বাস করছি, ধ্রুবসত্য বলে মেনেছি। আমাদের প্রচলিত সাধারণ জ্ঞান বই আমাদের শিখিয়েছে, গোটা রোম যখন আগুনে পুড়ছে তখন সম্রাট নিরো বেহালা বাজাচ্ছিলেন; আমেরিগো ভেসোপুচির নামে আমেরিকার নামকরণ হয়েছে; স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন কিংবা ইলেকট্রিক বাল্বের আবিষ্কর্তা টমাস আলভা এডিসন। অবাক লাগলেও প্রতিটাই ভুল তথ্য। তাহলে সত্যিটা কি? আর সেটা কেনই বা মেনে নেব? কিভাবে জানব ডিম আগে না মুরগী? অ্যাস্টেরিক্সের জাদুপানীয় কি কি দিয়ে তৈরি হত? ফেলুদা অবসরে কি কি বই পড়ত? অথবা একটা ঘুড়ি কিভাবে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিল? এমনসব অদ্ভুত তথ্য আর গল্প এই প্রথমবার বাংলাভাষায় দুই মলাটে গ্রন্থিত হল।
জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৮১, কলকাতা। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পি. এইচ. ডি. তে সেরা ছাত্রের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া Bacillus sp. KM5 এর আবিষ্কারক। বর্তমানে ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত এবং হাবড়া মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর কমিকস ইতিবৃত্ত (২০১৫), হোমসনামা' (২০১৮),মগজাস্ত্র (২০১৮), জেমস বন্ড জমজমাট (২০১৯), তোপসের নোটবুক (২০১৯), কুড়িয়ে বাড়িয়ে (২০১৯),নোলা (২০২০), সূর্যতামসী (২০২০), আঁধার আখ্যান (২০২০) ও নীবারসপ্তক (২০২১) এই সব দিনরাত্রি (২০২২), ধন্য কলকেতা সহর (২০২২), আবার আঁধার (২০২২), অগ্নিনিরয় (২০২২), হারানো দিনের গল্প (২০২৪), সিংহদমন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪), আরও একটি প্রবন্ধ সংকলন (২০২৫) সুধীজনের প্রশংসাধন্য। সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঝাঁকড়া চুলো পিটার (২০২১)। বাংলাদেশের আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ম্যাসন সিরিজের বাংলাদেশ সংস্করণ (২০২২, ২৩), মৃত্যুস্বপ্ন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪) । সম্পাদিত গ্রন্থ সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১৭, ২০১৮) ফুড কাহিনি (২০১৯), কলকাতার রাত্রি রহস্য (২০২০) সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবর্ষে একাই একশো (২০২২), কলিকাতার ইতিবৃত্ত(২০২৩), বিদেশিদের চোখে বাংলা (২০২৪) এবং কলিকাতার নুকোচুরি (২০২৫)
গেম অফ থ্রোনস যারা দেখেছেন, সার্সেই'র গোটা সেপ্ট অফ বেইলর উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য তারা নিশ্চিত ভুলেননি। এরকম একটা ঘটনা কিন্তু সত্যিই হতে পারত, প্রায় চারশো বছর আগে। ইংল্যান্ডে ক্যাথেলিকরা প্রোটেস্টান্ট রাজা জেমসকে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল রাজসভাসহ। হাউস অফ লর্ডের নিচে জড়ো করা হয়েছিল প্রচুর বারুদ। কিন্তু ক্যাথেলিকরা সার্সেই'র মতো সুচতুর ছিলেন না বোধহয়, তাই রাজার কাছে বেনামি চিঠিতে চলে গেল সতর্কবার্তা। বারুদের স্তুপের সামনে থেকে ধরা পড়লেন হারিকেন আর লণ্ঠন হাতে যুবক, ইতিহাসের কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডটা ঘটতে গিয়েও ঘটলো না।
বিবর্তনবাদের জনক ডারউইনের নাকি অদ্ভুত সব খাদ্য চেখে দেখার অভ্যাস ছিল। ইঁদুর, পেঁচা, আর্মাডিলো, এমনকি পাহাড়ি চিতাও তার রসনা বিলাস থেকে রেহাই পায়নি। বাদুড় টাদুড় খেয়ে তার ভাইরাস সংক্রমণের রেকর্ড আছে কি না অবশ্য জানি না।
তবে অজানাকে জানার আগ্রহে প্রাণত্যাগ করার নজিরটাও কম নেই ইতিহাসে। গবেষণাগারে যা পেতেন সবই জিভে ঠেকাতেন সুইডেনের বিজ্ঞানী কার্ল শীলে, মৃত্যুটাও হয়েছিল তার বিষাক্ত রাসায়নিক খেয়ে। অটো লিলিয়েন্থাল যখন গ্লাইডার ভেঙ্গে মারা যান, শেষ বাক্য ছিল 'সামান্য আত্মত্যাগ তো করতেই হবে, তাই না?'
সবাই যে কেবল আত্মত্যাগের জন্যই জান লড়িয়ে দিয়েছেন তাও না। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল যে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের অফিসে চাকরি করতেন, সেখানে অ্যান্টোনিও মেউট্টি টেলিফেরনোর পেটেন্টের খসড়া পাঠিয়েছিলেন। অদ্ভুতভাবে সেইসব কাগজপত্র ও মডেল সবই চুরি হয়ে যায়। তার পাঁচ বছর পর গ্রাহাম বেল টেলিফোনের পেটেন্টটা করে নেন। আরেক আলেকজান্ডার, ইনি ফ্লেমিং, পেনিসিলিনের খোঁজ পেয়েছিলেন দৈবক্রমে ঠিক। তবে তার আগেই আর্নেস্ট দুসেন পেনিসিলিয়াম ছত্রাক আবিষ্কার করেন। উইলিয়াম গ্রোভ আর জোসেফ সোয়ানের মডেল অনুসরণ করে এডিসন তো রাতারাতি বালবের আবিষ্কর্তা হয়ে বসলেন।
অকরুণ ইতিহাসের এমন কিছু ভুল, কিছু ভুলে যাওয়া আর চমকপ্রদ অনেক তথ্য নিয়ে সাজানো বই 'মগজাস্ত্র'। কৌশিক মজুমদারের লেখার ঢঙ্গের সাথে পরিচিত যারা, তারা জানেন মজাদার করে তথ্যবহুল বই লিখতে তার জুড়ি নেই। কিশোরদের উদ্দেশ্য করে লেখা বইটি বুড়োদের জন্যও সমান সুখপাঠ্য।
আপনাকে যদি বলা হয় "পেনিসিলিন এর আবিষ্কারক ফ্লেমিং নন অথবা হ্যালো শব্দটির আবিস্কারক টমাস আলভা এডিসন,তাহলে কি অবাক হবেন! আমি তো অবাক হয়েছি,এমন কিছু তথ্য আমি পেয়েছি,যা এতোদিন আমি ভুল জেনে এসেছি। এই বই লেখক কৌশিক মজুমদার অনেকগুলো জানা বিষয়কে নতুন করে এবং অজানা অনেক কিছু নিয়ে ছোট ছোট প্রবন্ধের মতো করে লিখেছেন।
এই ছোটদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলেও,সবাই পড়তে পড়তে পারবে। এই বই পড়ার ক্ষেত্রে আমি যে ভুল করেছি,সেটা হচ্ছে এক সাথে পুরোটা পড়ে ফেলেছি। এক বসায় বা একটানা যদি পুরো বইটা পড়েন,তাহলে পুরো স্বাদ টা পাবেন না। প্রতিদিন একটা একটা করে টপিক পড়লে,সবচে চমৎকার হয়। কৌশিক মজুমদারের লেখাও চমৎকার, খুব সরল ভাষায় সহজ ভাবে তিনি লিখেছেন,ফলে সহজেই পুরো জিনিসটা বোঝা যায়।
পেনিসিলিন কে আবিষ্কার করেন? না, আলেক্সান্দার ফ্লেমিং নন কিন্তু। কিংবা ডারউইন এর খাদ্যপ্রীতি এর কথা কজনই বা জানেন। বা হ্যালো শব্দের জনক আসলে এডিসন! নানান পরিচিত তথ্য আসলে যেগুলো ভুল, সেগুলোর উৎস সহ সঠিক তথ্য জানার পাশাপাশি সাহিত্য থেকে প্রাণিজগৎ পর্যন্ত বিস্তৃত জ্ঞানের রাজ্যে হেঁটেছেন লেখক। উসকে দিতে চেয়েছেন কৈশোরের আগ্রহকে। নন ফিকশনে ইদানীংকালে কৌশিক মজুমদার প্রিয় হয়ে উঠছেন। আগ্রহোদ্দীপক লেখনশৈলী আর অভিনব তথ্যে ঠাসা বেশ মজার এক বই। ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৫/৫
কৌশিক দা'র লেখার একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, খুব সহজ সরল ভাষায়, অল্প পরিসরে পুরো ব্যাপারটা উপস্থাপন করেন। জটিল কোনো ব্যাপারও সহজ উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারেন। সে ওনার বইতে হোক বা ফেসবুকে নিজের লেখা হোক। এই বইটা সাধারণ জ্ঞানের বই। বইতে বিখ্যাত আবিষ্কারের ইতিহাস আছে, বিজ্ঞানের জানা অজানা আছে, সাহিত্যের আনাচকানাচ, ঐতিহাসিক ভুল, ভূগোল বিষয়ের কিছু কথা, প্রাণীজগৎ এর হালহকিকত, বিখ্যাত সব দিনের কথা, খেলাধুলোর গল্পগাছা আছে। কিছু বিখ্যাত ভুল , বা মিথ যেগুলো ঠিক বলে জেনে এসেছি সেগুলো কোথায় ভুল সেটা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ধরুন - আলেকজান্ডার ফ্লেমিং কিন্তু মোটেই পেনিসিলিন আবিষ্কার করেননি। পেনিসিলিন আবিষ্কার হয়েছিল তাঁর বহু আগে। একই ভাবে টেলিফোন আবিষ্কার গ্রাহাম বেল করেননি। গোটা রোম যখন আগুনে পুড়ছে সম্রাট নিরো তখন বেহালা বাজাচ্ছিলেন - এটা ভুল কথা। কারণ তখন বেহালা তৈরীই হয়নি। এইরকম আরও প্রচুর তথ্য আছে। ছাপাখানা কী ভাবে এলো, ছবি তোলার আদি কথা, ইলেকট্রিক বাল্বের ইতিকথা, টাইপ যন্ত্রের অক্ষরকথা, নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার, আলফ্রেড নোবেলের কৃতী, Aspirin ঔষধ আবিষ্কার, বিসিজি টিকা, জল পদার্থ না অ-পদার্থ, শেক্সপিয়ার ইংরেজি অভিধানে ২০৩৫টি নতুন শব্দ যোগ করেছেন, লিয়বের লিমেরিক কী ভাবে লেখা শুরু হয়েছিল.... এইরকম প্রচুর জিনিস আলোচনা করা হয়েছে। যেগুলো আমরা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করি বা শুনি কিন্তু তার পেছনের ইতিহাস জানি না। প্রতিটি লেখাই ২ পাতার মত, সঙ্গে চমৎকার চমৎকার সব। ছোট বড় সব বইয়ের পাঠকদের জন্য পড়ার মত বই।
কাশীতে বিশ্বশ্রীর ট্রাইসেপের বহর দেখে জটায়ু বলেছিলেন, "সত্যিই, আমরা কত কম জানি মশাই!" আসলে জানা, অজানা আর ভুলজানা - এই তিন ধরণের জানার গোঁতাগুঁতিতে আমাদের জ্ঞানের জগৎ দিনের পর দিন ভরে উঠছে। লেখক কৌশিক মজুমদারের লেখা 'মগজাস্ত্র' বইটিতে লেখক আমাদের এই জানা-অজানার ব্যাপ্তির ওপর বেশ সুন্দর করে প্রশ্নচিহ্ন তুলেছেন। এই বইটিতে প্রধানত বর্ণিত হয়েছে আবিষ্কারের কথা, সৃষ্টির কথা বা আরও ভালো করে বললে একেবারে গোড়ার কথা। লেখক গল্পের আকারে বেশ সুন্দর করে সামনে এনেছেন এতকাল ধরে আমাদের বিশ্বাস করা ঘটনার পিছনের আসল সত্যিটা। সেইসব ঘটনার মধ্যে যেমন আছে ছাপাখানা, রেলগাড়ি, তাইপ্রায়াইর ও টেলিফোনের কথা, তেমনই উঠে এসেছে পেনিসিলিন,এস্কিমো,মমি ও বার্বিদলের কথাও। কোথাও আবিষ্কারের কথা, কোথাও স্রষ্টার কথা আবার কোথাও বা একেবারে গোড়ার কথা। নানারকম ভাবে সাজিয়ে অনেকগুলো পর্বে ভাগ করা হয়েছে মজাদার এই বইয়ের বিষয়বস্তু। তাই পাঠক যদি তাঁর নিজের মগজাস্ত্র শানিয়ে নিতে চান, তাহলে কৌশিক মজুমদারের 'মগজাস্ত্র'-এর দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই।
নন ফিকশনে কৌশিক মজুমদার আমার পছন্দের লেখক হয়ে উঠেছেন আগেই। এ বইটাও তার কাছ থেকে চাওয়াকে পাওয়াতে রুপান্তরিত করেছে। অনেক তথ্য যেগুলো আমরা জানি কিন্তু ভুল জানি, সেগুলোর সাথে আমাদের প্রতিনিয়ত জানা না জানা অনেক তথ্যের ভান্ডার এই বই। কিশোরদের পড়ার জন্য দারুণ একটা বই।