বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৯-নং সেক্টরের কমান্ডার এবং অবিভক্ত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মেজর (অবঃ) এম এ জলিল কর্তৃক লিখিত এই পুস্তিকার মূল কলেবর মাত্র ২৫ পৃষ্ঠা হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। একজন সৈনিক কী করে প্রথমে একটি 'জাতীয় সমাজতান্ত্রিক' দলের সভাপতি এবং তারপর ইসলামী বিপ্লবের সৈনিকে পরিণত হন তার একপ্রকার বয়ান এখানে আছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা দিনে দিনে পরিবর্তিত হতে হতে কীসে পরিণত হতে পারেন তাও এখানে জানা যাবে। পুস্তিকাটির মূল উদ্দেশ্য জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতাকর্মীদের কাছে দলত্যাগের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করা হলেও লেখক এখানে তাঁর নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কসবাদী রাজনীতির সীমাবদ্ধতা এবং ইসলামী রাজনীতির শ্রেষ্ঠতাও বর্ণনা করেছেন।
বাহাত্তরের ৩১ অক্টোবর জাসস্পতি স্টার করার পর ১৩ বছর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, প্রেসক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে নিজের পদত্যাগ এবং দল থেকেই ইস্তফা দেন তিনি ইসলামী আন্দোলনে যোগ দেন , তারই কৈফিয়ৎ মূলত এই বই।
মুক্তিযুদ্ধের সাবেক সেক্টর কমান্ডার মেজর (অবঃ) এম এ জলিলের লেখা এই পুস্তিকার বিস্তারিত সমালোচনা লিখতে গেলে, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধ ও মার্কসবাদ নিয়ে তিনি যা বলেছেন তার সমালোচনা লিখতে গেলে ২৫ পৃষ্ঠার বইয়ের বিপরীতে ১০০ পৃষ্ঠার বই লিখতে হবে। সে’কাজ করা রিসোর্সের অপচয় ছাড়া আর কিছু হবে না। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাস আলোচনায় মেজর (অবঃ) এম এ জলিল আবশ্যক হলেও বর্তমান বা ভবিষ্যতের বাংলাদেশের যে কোন প্রসঙ্গে তাঁকে নিয়ে আলোচনা করার কিছু নেই, প্রয়োজনও নেই।
তবে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা, মৌলবাদ প্রসঙ্গে মেজর (অবঃ) এম এ জলিল এই পুস্তিকায় যা কিছু বলেছেন তার কিছু এখানে তুলে রাখি। তাহলে এই রিভিউটির পাঠকের পক্ষে এই বইয়ের কনটেন্ট ও মেজর (অবঃ) এম এ জলিল সম্পর্কে কিছুটা ধারণা হবে।
“আমার সেয়ানা বন্ধুরা তাদের নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষার্থে পিছিয়ে থাকবে কেন? তাই ‘Give the dog a bad name and hang it’ যেন এই নীতির অনুসরণ করার মধ্য দিয়েই তারা হাতের কাছে পেয়েছে ‘মৌলবাদ’কে। ব্যাস! আর যায় কোথায়! ঝুলবি তো ব্যাটা মোল্লাই ঝুলে যা!
দেশের রাজনীতির অঙ্গনে এহেন বিবেকবর্জিত প্রয়াস নিজের অজান্তেই নিজের পায়ে কুড়াল মারার সমান বলে আমি মনে করি। দেশ-জাতির মধ্যে যারা জোর করে ‘মৌলবাদ’ আবিষ্কার করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তারাই প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দিতে যাচ্ছে এবং এর বিষাক্ত পরিণতির জন্য তারাই আগামী দিনের ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
স্বাধীনতা অর্জনের ১৭ বছর পরেও আজ যারা নতুন করে পুনরায় স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ কিম্বা মৌলবাদ-এর ভূত নিয়ে খেলা করতে আগ্রহী, তাদের একটি সত্য জেনে রাখা প্রয়োজন যে, জাতির আজ প্রয়োজন স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, এ স্বাধীন মাটিতে বসবাসকারী প্রত্যেকটি মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। এই অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠা করার পথে আজ যে সকল সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে প্রকৃতপক্ষে তারাই চিহ্নিত হবে দেশ ও জাতির শত্রু হিসেবে। সেই ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনই কেবল সর্বকালের দেশপ্রেম-এর সনদপত্র হতে পারে না। যদি কেবল তাই-ই হ’ত, তাহলে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরে যাদের জন্ম, তারা দেশ-প্রেমিকদের সারিতে দাঁড়ায় কিসের ভিত্তিতে?
তাছাড়া সেই ’৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই যদি দেশ-জাতির শত্রু এবং মিত্রের চিহ্নিতকরণ স্থায়ী রূপে হয়েই গিয়ে থাকে, তাহলে এই স্থায়ী শত্র-মিত্র একটা নির্দিষ্ট কাল-সীমার পর তো ধরার বুক থেকে এমনিতেই বিলীন হয়ে যাবে, সে ক্ষেত্রে দেশ-জাতির মধ্যে কি কোনই শত্রু-মিত্র থাকবে না? মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষদের মৃত্যুর পরে দেশ-জাতি শোষণমুক্ত হয়ে যাবে? হয়ে যাবে শত্রুমুক্ত? এমনটি তো হতে পারে না। তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি কেবল একটা বিশেষ সময়সীমার গন্ডীর মধ্যে সীমিত থাকতে পারে? না, এটি হচ্ছে সম্পূর্ণভাবেই ভ্রান্ত ধারণা। মুক্তিযুদ্ধ কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিম্বা কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের সম্পত্তি হতে পারে না, তেমনিভাবে মুক্তিযুদ্ধ বিশেষ কোন সময়ের চেতনা হতে পারে না।”
“শোষণ মুক্তির চেতনা যখন যেথায় যে ভাবে যার মধ্যে ঊন্মেষ ঘটবে, সে-ই নিজ নিজ পরিসরে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের শুরু আছে শেষ নেই। সুতরাং সুনির্দিষ্ট কোন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষই শোষিত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের স্থায়ী পক্ষ-বিপক্ষ রূপে বিবেচিত হতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট মুক্তিযুদ্ধে কেউ এর পক্ষ অবলম্বন না করে থাকলে সে আর কোনদিনই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হতে পারবে না এমন ধারণা বা যুক্তি সঠিক নয়।
সময়ের সাথে সাথে প্রত্যেকটি মানুষেরই সামাজিক অবস্থান ভিন্নতর হতে থাকে এবং আজ যে শোষিত মানুষের মুক্তির পক্ষে, আগামী দিনের শোষণ মুক্তির লড়াইয়ে পক্ষের শক্তিটির সামাজিক অবস্থান শোষকের মধ্যেও অন্তর্ভূক্ত হয়ে যেতে পারে এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছেও তাই।
এ প্রকৃত সত্য উদঘাটন করার মধ্য দিয়েই কেবল আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য মুক্তিযুদ্ধের নতুন পক্ষ-বিপক্ষ চিহ্নিত করতে হবে। সুতরাং সেই ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি ’৮৯ সনে এসে আর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যে নেই এটাই বাস্তব এবং এই বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থ হলে, অথবা স্বেচ্ছায় এড়িয়ে যেতে চাইলে দেশ-জাতির প্রকৃত শত্রু-মিত্র নিরূপণ করা সঠিক হবে না। এ সত্যটি জেনেশুনেই যারা সেই ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী কতিপয় চিহ্নিত সংগঠন এবং ব্যক্তিকেই স্বাধীনতার ১৭ বছর পরেও প্রধান শত্রু হিসেবে ঠেকাতে চাচ্ছে, তারা দেশ-জাতির বর্তমান পরিস্থিতির যুদ্ধে অনেক পিছিয়ে রয়েছে, তারাই প্রকারান্তরে দেশ ও জাতিকে বোঝাবার চেষ্টা করছে যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৭ বছর পরেও দেশে কোন নতুন শোষক বা শত্রু জন্ম নেয়নি। এ ধরনের প্রবণতাই প্রকৃত পক্ষে দেশ ও জাতির মূল শত্রুকে আড়াল করে রাখে। এবং দেশ ও জাতির মূল শত্রুকে সঠিকভাবে চিহ্নিত না করণই হচ্ছে আমাদের জাতীয় ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। প্রকৃত শত্রু সঠিক রূপে চিহ্নিতকরণ না হলে জনতার ঐক্য গড়ে উঠবে কিসের ভিত্তিতে? যারা দেশ ও জাতির আসল শত্রুকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আড়াল করে রাখতে চায়, তারাই জাতির প্রধান শত্রু নয় কি?
তাই দেশ ও জাতির সম্মুখে প্রধান কর্তব্যই হচ্ছে – দেশের প্রকৃত সমস্যাবলী এবং প্রধান শত্রু চিহ্নিত করা। মৌলবাদের মত কোন মস্তিষ্কপ্রসূত বিষয়কে উপরে টেনে আনলে প্রকৃত সমস্যা ও শত্রুর ছোবল থেকে ১১ কোটি বাঙালীর কেউই রক্ষা পাবে না।“
পাকিস্তানে দাওয়াত খেতে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী এই সাবেক সেক্টর কমান্ডারের মৃত্যুর মাত্র ৬ মাস আগে এই বইটা প্রকাশিত হয়েছে একটি জামায়াতী প্রতিষ্ঠান থেকে। আজও শিবিরের সাইটগুলো এই বইয়ের প্রচারণা চালায়।
'কৈফিয়ত ও কিছু কথা' একজন সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্র চিন্তকের জীবনের অনুধাবন ও উপলব্ধির সরল বয়ান। বাংলাদেশের আলোচিত শীর্ষ বাম রাজনৈতিক দল জাসদ এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মেজর জলিলের দীর্ঘ পলিটিকাল বোঝাপড়া ও এক্টিভিজমের সারসংক্ষেপ এ গ্রন্থটি। জীবন ও চিন্তার বাঁক পরিবর্তনের কারণকে কৈফিয়ত সংজ্ঞায়িত করে তাকে দিয়েছেন দারুন দায়বদ্ধতা। বাংলাদেশের গণমানুষের জীবন ও যাপন অভিজ্ঞতার সাথে বাম রাজনীতি ও আদর্শের বিচ্ছিন্নতা এবং মানুষের বিশ্বাস-সংস্কৃতির সাথে বাম রাজনীতির অচ্ছুৎ অবস্থানের বিপরীতে ইসলামের সাম্য ও ন্যায়ের বয়ান ও চর্চা কিভাবে দেশের সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামগ্রিক কাঠামোকে কল্যাণ ও সুরক্ষার দিকে পথ দেখাবে তার সংক্ষেপ কিন্তু গভীর অথচ সরল আলাপ এ গ্রন্থ। এটাকে গ্রন্থ না বলে পুস্তিকা বলাই শ্রেয়- আকার বিবেচনায়।
An absolute veritable treasure trove of information pertaining to one of the most seminal yet underappreciated figures in the political annals of Bangladesh. Delving quite deep into his later views and ideologies, specifically his critiques of Marxism and his embrace of Islamism. These perspectives are sure to pique the curiosity of any reader with even a passing interest in the political history of Bangladesh, regardless of whether they concur or dissent with the views espoused within the pages of this book.