অনেক গরিব দেশ জিডিপি ম্যানিয়াতে আক্রান্ত। অর্থাৎ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বেশি মানে দেশ উন্নয়নের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু অমর্ত্য সেন মনে করেন, উচ্চ জিডিপি উন্নয়নের সমার্থক নয়। জিডিপির হার দেখে উন্নত-অনুন্নত বোঝা যায় না। দেশে কতজন মা-শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, কয়জনের স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতের পাশাপাশি দারিদ্র্য এবং দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাসকারী মানুষের হারের ওপর নির্ভর করছে দেশটির অর্থনীতির ভালো-মন্দ। যেমন, সাব-সাহারান দেশগুলির চাইতে ভারতের জিডিপি ভালো, শিল্পে বহুগুণ বেশি অগ্রসর। অথচ আফ্রিকার সেইসব রাষ্ট্রগুলোর চাইতে ভারতে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা তিনগুণ বেশি। সোজাকথা এককভাবে জিডিপিকে একটি সংখ্যা ছাড়া আরকিছুই ভাবতে রাজি নন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।
আবার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার অর্থ কেউ দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করছে না বা সবাই তিনবেলা খেতে পাচ্ছে তা বলা যাবে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতে ১৯৯৮ সালে ১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন খাদ্য মজুদ ছিল। বর্তমানে তা শত মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। কিন্তু ভারতে ক্ষুধার্ত মানুষ কমেনি বরং বেড়েছে।
ইদানীং গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এবং মুক্ত গণমাধ্যমকে উন্নয়নের শত্তুর হিসেবে দেখবার ডিক্টেটরি ট্রেন্ড চালু হয়েছে। এই উন্নয়নভক্তদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন অমর্ত্য সেন। চীনের এবং '৪৩ সালের দু্র্ভিক্ষের নজির স্মরণ করিয়ে দিয়ে লিখেছেন, গণতন্ত্র এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রকৃত উন্নয়নের বড় সহযোগী। এগুলো না থাকলে টেকসই উন্নয়ন মুখে হবে, দলীয় গলাবাজিতে হবে সত্যিকারের উন্নয়ন থেকে যাবে অধরা৷
শুধু ভারত নয়, তৃতীয় বিশ্বের যেকোনো দেশ আদতে ফার্স্ট বয়দের দেশ। কেননা এইসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজকাঠামোতে যাঁরা ভালো ফলাফল করে শুধু তাঁদেরকে মূল্যায়ন করে। বাকিরা হয়ে পড়েন অপাংক্তেয়। তাঁরা কোনো দক্ষতা অর্জন করেন না। তাই দেশের বাইরে গিয়ে শ্রমিকের কাজ ছাড়া উপায় থাকে না। কিংবা দেশেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু করার সুযোগ পান না। অমর্ত্য সেন মনে করেন, ফার্স্ট বয়দের নয়, সকল শিক্ষার্থীকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে হবে। নতুবা অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না।
ভারত শুধু হিন্দুর দেশ নয়। মুসলমানরা ভারতবর্ষে আসার আগে সনাতনধর্ম ছাড়াও বৌদ্ধ, জৈন, পারসিক প্রভৃতি ধর্মের, মতবাদের ছড়াছড়ি ছিল। তাই আজকে ভারতে যে হিন্দুত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তা ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যের পরিপন্থী বলে মনে করেন অমর্ত্য সেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম লেখক। তিনি আজীবন এখানে প্রাসঙ্গিক থাকবেন। আমরা বাঙালিরা তাঁকে নিয়ে গর্ব করি, করব। তবে পাশ্চাত্যে নোবেল পাওয়ার মাত্র বিশ বছরের মাথায় বিস্মৃতপ্রায় হয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। ইয়েটস, গ্রাহাম গ্রিন এবং রাসেলের মতো মানুষ পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের অপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। অমর্ত্য সেন রবীন্দ্র সাহিত্যের মনোযোগী পাঠক। গান্ধি এবং রবীন্দ্রনাথের মতাদর্শিক অমিল নিয়ে চমৎকার লিখেছেন অমর্ত্য সেন।
এই প্রবন্ধসংকলন মূলত ভারতের প্রেক্ষাপটে রচিত। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে এই বইয়ের রচনাগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমান সময়ের গরিব দেশগুলির চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবিলার পথনির্দেশ এই গ্রন্থে রয়েছে।
সবগুলো প্রবন্ধ সহজপাঠ্য এবং সুলিখিত নয়। দু'একটি একদম মনে ধরেনি৷ লেখা মোটামুটি ভালো লেগেছে।