গান্ধারী-কুন্তি-মাদ্রী। এই তিনজনই রাজকন্যা, রাজবধু। তিনজনের জীবনই ভাগ্যবিড়ম্বিত।
মাদ্রীর জীবনকাল সংক্ষিপ্ত। জীবনসংগ্রাম তিনি সহ্য করতে পারেননি। তাই তার অকাল মৃত্যু।
গান্ধারী আবার কাটিয়েছেন এক আরোপিত ছদ্মজীবন। স্বামীর সঙ্গে মনের মিল নেই। সন্তান বলে শেষপর্যন্ত যাদের স্বীকার করে নিয়েছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন, তারাও তাঁকে এতটুকু মূল্য দেয়নি কোনদিন।
স্নেহ-মমতা-ভালোবাসার থেকে তাঁর কাছে বড় হয়েছিল ধর্ম-লোকাচার-স্বর্গপ্রাপ্তি। কুন্তির জীবন আগাগোড়াই জটিলতায় পুর্ণ। গান্ধারীর মতোই তিনি স্বামী-সাহচর্যে অতৃপ্ত। পত্নীদের দিকে তাকানোর সময় ছিল না পাণ্ডুর। একের পর এক সন্তানের জন্ম দিয়েছেন কুন্তি। কিন্তু তাঁর মনের খবর কে রেখেছে?
Bani Basu is a Bengali Indian author, essayist, critic and poet. She was educated at the well-known Scottish Church College and at the University of Calcutta.
She began her career as a novelist with the publication of Janmabhoomi Matribhoomi. A prolific writer, her novels have been regularly published in Desh, the premier literary journal of Bengal. Her major works include Swet Patharer Thaala (The Marble Salver), Ekushe Paa (twenty One Steps), Maitreya Jataka (published as The Birth of the Maitreya by Stree), Gandharvi, Pancham Purush (The Fifth Man, or Fifth Generation?) and Ashtam Garbha (The Eighth Pregnancy). She was awarded the Tarashankar Award for Antarghaat (Treason), and the Ananda Purashkar for Maitreya Jataka. She is also the recipient of the Sushila Devi Birla Award and the Sahitya Setu Puraskar. She translates extensively into Bangla and writes essays, short stories and poetry.
Bani Basu has been conferred upon Sahitya Academy Award 2010, one of India's highest literary awards, for her contribution to Bengali literature.
মহাভারত, সে তো এক আশ্চর্য আখ্যান। প্রতিটা চরিত্রকেই যে কতোভাবে বিশ্লেষণ করা যায় সেটা মহাভারত রিলেটেড অন্যান্য বই না পড়লে আসলে বুঝা যায় না। লেখকদের আসলে এই এক গুণ। তারা নিজেরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, ভাবেন তারপর লিখেন। আর আমরা সাধারণ পাঠকেরা সেটা পড়ে বলি, আরে! তাইতো! এরকমও তো হয়, হতে পারে। এভাবে তো ভেবে দেখিনি!
আমার কেন যেন মনে হয় রাজকন্যা কিংবা রাজবধূদের মতো দু:খী আর কেউ নেই। নেই তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন মূল্য, তাদের থাকতে নেই ভাবাবেগ, ওরা যেন কেবল রাজপুরুষদের ইচ্ছার দাসী। কখনও যুদ্ধের সন্ধি করবার হাতিয়ার, কখনও বা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রবিশেষ। আর পুরাণে বর্ণিত অবস্থা তো আরও ভয়াবহ (যদিও শাস্ত্রসম্মত)। ইচ্ছা না থাকলেও রাজা যদি সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হন তো উপযুক্ত উপায়ে ক্ষেত্রজ সন্তান গ্রহণ করতে তারা বাধ্য। ব্যক্তিত্ব আলাদা হলেও এই বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিন রাজকন্যা কিম্বা পরবর্তীতে রাজবধূ, গান্ধারী, কুন্তী, মাদ্রী-একটা ব্যাপারে এক। তাদের নিজস্ব কোন ইচ্ছা নেই, মতামত নেই। তারা কেবল পুরুষের আজ্ঞাবাহক। তারা যে ক্ষত্রবধূ!
বলছিলাম বাণী বসুর লেখা ক্ষত্রবধূ বইটার কথা। মহাভারতের তিন রাজমাতা গান্ধারী, কুন্তী ও মাদ্রীকে নিয়ে লেখা। প্রত্যেকেই ছিলেন রাজার কন্যা, কেউ বা রাজার ভগ্নী। ভাগ্যচক্রে হয়ে উঠলেন কুরুকুলের বধূ। বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা তিন ভাগ্যবিড়ম্বিত রাজকন্যা। আসলেই কি?
বাণী বসুর লেখনী নিয়ে আসলে বলবার কিছু নেই। অসম্ভব সুন্দর, একদম সাবলীল ভাষায় লেখেন। আর এই বইটাও মহাভারত রিলেটেড দেখে পড়ার শখ বহুদিনের। অনেক খুঁজেছিলাম কিন্তু পিডিএফ পাচ্ছিলাম না💔 থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু ইসরাত আপু। বইটা দেয়ার জন্য। ❤️
বি.দ্র. প্যাচগোজ এড়ানোর জন্য লিখে দিচ্ছি, মহাভারত টেনে লাভ নাই এখানে। এটা শুধুমাত্র এই বইয়ের রিভিউ।
৩.৫/৫ ঘটনা সামান্য।রাজশেখর বসু প্রণীত মহাভারতের আদিপর্বের ৩৫ থেকে ৩৮ পৃষ্ঠার কাহিনিকে "ক্ষত্রবধূ" ঔপন্যাসিকার পটভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাণী বসু।এর মধ্যে আছে ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর সঙ্গে গান্ধারী, কুন্তি ও মাদ্রির পরিণয়;পাণ্ডু,কুন্তি ও মাদ্রির অরণ্যবাস এবং পঞ্চপাণ্ডব ও গান্ধারীর শতপুত্রের জন্মকাহিনি। এই পুনর্কথনে লেখিকা মহাভারতের অলৌকিক উপাদান পরিহার করে সব ঘটনার লৌকিক ব্যাখ্যা প্রদানপূর্বক ক্ষত্রবধূদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করেছেন।গান্ধারী কি স্বামীর জন্য আজীবন অন্ধ সাজলেন নাকি এ ছিলো এক আরোপিত ছদ্মজীবন?পাণ্ডু কি আদৌ দেবতার অভিশাপে নির্বীর্য হলেন নাকি নিজের অক্ষমতা ঢাকতে অভিশাপের ঘটনা সাজালেন?ক্ষত্রবধূরা কি আদতেই এতো মহান পতিব্রতা ছিলেন?তাদের কি কোনো কামনাবাসনা ছিলো না? খুবই কৌতুহলোদ্দীপক বই কিন্তু একেবারেই কৃশকায়;পড়া ধরতে না ধরতেই শেষ হয়ে যায়।বাণী বসু সম্পূর্ণ মহাভারতের পুনর্কথন লিখলে আমরা সম্ভবত "মৈত্রেয় জাতক" এর মতো আরেকটা মাস্টারপিস পেয়ে যেতাম।
সপ্তম শ্রেনীতে মীনা রানী দাস নামে আমার এক বাংলা শিক্ষিকা ছিলেন, তুখোড় মেধাবী ও বুদ্ধিমতী এই মেয়েটি চাইলেই সমাজের পরিমাপকাঠি অনুসারে অন্য যেকোনো ভালো বিষয়ে নিতে পারতেন উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে, কিন্তু স্রোতের বাইরে চলতে পছন্দ করা এই বিদুষী বেছে নিলেন বাংলাকে, রেকর্ড মার্কস নিয়ে বের হলেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে।এই মেয়েটিই আমাকে একটু একটু করে আগ্ৰহী করে তোলেন বাংলা বিশেষ করে মহাভারত রামায়ন আখ্যান নিয়ে। এবং যথারীতি এই আগ্ৰহ আমি এখনো লালন পালন করছি সযত্মে।তার ধারাবাহিকতায় বহুদিন থেকেই এই বইখানা আঁতিপাঁতি করে খুঁজছিলাম এখানে ওখানে।
বানী বসুর লেখা আমার বরাবরই ভালো লাগে, সুন্দর সাবলীল ভাষাগত মাধুর্য আর একটানে পড়ে ফেলার মত সবগুলো গল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আটকে রাখবে মায়াজালে।
আর এই বইখানাতেও তার কোনো বত্যয় ঘটেনি,কুরুকুলের তিন বধূ গান্ধারী মাদ্রী ও কুন্তীকে নিয়ে আবর্তিত হয়েছে এই পরিধি। ক্ষত্রবধূ মানে কি?এর জবাব হয়ত মানুষ ভেদে এক এক রকম হবে।একালে আমাদের এই আধুনিকতার চরম উৎকর্ষের যুগে ও আমাদের পরিচয় চাপা পড়ে যায় পিতার নামের নিচে, স্বামীর গরিমার শৌর্যবীর্যে,ভাইয়ের অনুশাসনের তলে।যেন তার কোনো আর ভিন্ন পরিচিতি থাকতেই পারে না।তো সেই পৌরাণিক যুগে নারীর অবস্থান কেমন হওয়া উচিত তা তো আরো সহজেই অনুমেয় সে পাহাড়ের কোলে ঘেঁষা রাজে্য বড় হওয়া তুষারশুভ্র সুনিপনা ধৃতরাষ্ট্রের নিয়তি মেনে অনঞ্জনা নামকে হারিয়ে নিজেকে কখনো মহাসতী কখনো বির্পযস্ত গান্ধারী,কিংবা কুন্তীভোজরাজের ধীর স্থির সুলক্ষণা কন্যা কুন্তী বা মদ্ররাজের চপলা বাল্যখিলে মত্ত ভগ্নী মাদ্রীই হোক না কেন,ভাগে্যর পরিহাস কাউকেই ছাড়েনি বৈকি।
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় দিক হলো মহাভারত নিয়ে আমার জ্ঞান যে কতখানি অপ্রতুল এখনো তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় পড়তে গিয়ে চমকে থমকে উঠেছি ,চিন্তার এপারে ওপারে শুধু এটাই এসেছে যা পড়লাম আর যা জানলাম তা কি আসলেই সত্যি না এ নিছকই লেখিকার কল্পনার রং মেশানো গল্প।
সম্পূর্ণ মহাভারতের মধ্যে থেকে অল্প কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে এখানে, এবং সেই অল্পকিছু অংশের মধ্যে প্রধান তিনটি নারী চরিত্র - গান্ধারী-কুন্তি-মাদ্রী। এই তিনজনই কোন রাজ্যের রাজকন্যা এবং এর পরে তারা রাজবধু। তাদের নিজেদের নিজস্ব কোন পরিচয় নাই। পিতার নাম বা দেশের নাম জড়িয়ে তাদের পরিচয়। তিনজনের জীবনই ভাগ্যবিড়ম্বিত।
গান্ধারী বিবাহ পরবর্তী জীবন কাটিয়েছেন এক আরোপিত ছদ্মজীবন। চোখ থেকেও স্বেচ্ছায় বেছে নিলেন অন্ধকার জীবন। স্বামীর সঙ্গে তাঁর মতের ও মনের বিস্তর পার্থক্য। সন্তানদের প্রতি তাঁর স্নেহ,মমতা,ভালোবাসা থাকলেও বড় ছিল ধর্ম ওলোকাচার।
এক জটিলতা পুর্ণ জীবন কাটিয়েছেন কুন্তী।স্বামী-সাহচর্যে অতৃপ্ত এক নারী। সন্তানের জন্ম দিয়েছেন বড় করেছেন কিন্তু তাঁর খবর কেউ হয়তো রাখেনি।
মাদ্রীর জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। অকালেই প্রাণ হারালেন।
সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে নারীর এক জীবনচক্র, যা লেখিকা এই তিনজন নারীর মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।
হস্তিনাপুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র ধৃতরাষ্ট্রের জন্য পাত্রী আনা হলো সুদূর গান্ধার রাজ্য থেকে। সবাই আশা করেছিল রাজকন্যা গান্ধারী অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ছায়াসঙ্গী হবে। কিন্তু একি অন্ধ স্বামীকে অতিক্রম করবে না বলে তিনি যে চোখে পট্টি বেঁধে অন্ধের বেশ ধারণ করলেন। "শুনেছি স্বামী অন্ধ, তাঁকে অতিক্রম করব না মা— শান্ত স্ব��ে বধূ বলে।" কিন্তু একি শুধুই ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা নাকি এর পেছনে ছিল তাঁর ক্রোধ, রাগ, জেদ? ব্যাসদেবের আশীর্বাদে একদা শতপুত���রের জননী তো হলেন তিনি অথচ সন্তানরা তাঁকে কোনোদিন মূল্য দিল না। ছিল না সন্তানদের প্রতি তাঁরও সেরকম টান। কিন্তু কেন?
এদিকে পান্ডুর পত্নী কুন্তী, তাঁর জীবনও প্রথম থেকেই ছিল জটিলতায় পরিপূর্ণ। বিবাহের কিছুকাল পরই পান্ডুর দ্বিতীয় বিয়ের ফলে স্বামীর সহচর্য ব্যাহত হয়। কিন্তু পান্ডুর দ্বিতীয় পত্নী মাদ্রী, সে কি স্বামীর সহচর্য পেয়ে সুখী?
অন্যদিকে পান্ডুকে কি সত্যিই মুনি অভিশাপ দিয়েছিলেন নাকি নিজের অক্ষমতার কথা গোপন করতে তিনি এই অভিশাপের গল্প সাজিয়ে ছিলেন? কেন পাঁচটি সন্তান হওয়ার পরও তাঁর মনে শান্তি ছিল না? কোন অভিকর্ষণ মন্ত্রের কথা কুন্তী পান্ডু ও মাদ্রীকে বলেছিলেন?
মহাভারত এক সুবিশাল আখ্যান, যার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে রয়েছে ষড়যন্ত্র, কূটনীতি। কেউ রেহাই পাইনি এর থেকে, রাজবধূরাও না। পিতৃগৃহে তাঁরা গৃহকর্ম, রন্ধন, অতিথিসেবা অনেক কিছুই শিখেছিলেন, কিন্তু শেখা হয়নি রাজনীতি। আর বিবাহের পর এই রাজনীতির কবলে পড়েই তাঁদের জীবন বদলে যেতে থাকে। একরকম কাঠের পুতুলে পরিণত হয়েছিল তাঁরা। কেননা তাঁদের চালনা করছিল যে অন্য কেউ। আর তারা তাঁদের মনের খবর রাখেনি, জানতে চায়নি তাঁদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা।
সুবিশাল এই রাজপুরীতে সতীত্ব, বীরত্ব, মহামানবত্ব, জরায়ু, ঔরসের মূল্য দেওয়া হলেও, আবেগ, ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি। এই তিন রাজবধূ যে সুখের সন্ধানে রাজপুরীতে এসেছিলেন, তার তো সন্ধান পেলেনই না, বরং আমৃত্যু দুঃখের বোঝা বয়ে নিয়ে চলতে হয়েছিল।
মহাভারত এতো বড়ো আখ্যান, যার প্রতিটি চরিত্রকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। লেখিকাও এখানে তাই করেছেন। এই বইতে তিনি মহাভারতের তিন চর্চিত নারীর মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের দিক বিশ্লেষণ করেছেন। সত্যিই এই বই পড়তে গিয়ে খুব ভাবায়। সুবীর পুত্রদের জননী বলে যাঁদের চিরকাল জয়জয়কার হয়ে এসেছে, যাঁদের মহাসতীর 'মডেল' রূপে দেখানো হয়েছে চিরকাল, তাঁদের জীবন প্রকৃত অর্থে কতোটাই না বেদনাদায়ক ছিল। চিরটাকাল রাজনীতির স্বিকার হয়ে আসলেন তাঁরা। মহাভারত খুব জটিল, কিন্তু লেখিকা এতো সহজ সরল, সাবলীলভাবে কাহিনী ফুঁটিয়ে তুলেছেন, যা একটানে পড়ে ফেলা যায়। তবে মহাভারত জটিল হলেও খুব আকর্ষণীয়, তাই মহাভারত নির্ভর লেখা দেখলেই পড়তে মন চায়। হোক না সে লেখক-লেখিকার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি। যাইহোক সবমিলিয়ে লেখাটা ভালো লেগেছে, শুধু শেষটা আরেকটু হয়তো গুছিয়ে লেখা যেতো বলে আমার মনে হয়েছে।
মহাভারত নির্ভর লেখা পড়তে ভালোবাসলে পাঠকরা একবার পড়ে দেখতে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে। পাঠে থাকুন।
"মহাভারত'-এ এরকম অস্বস্তিকর নীরবতা অবশ্য অনেক আছে। খুব সম্ভবত এপিকের লক্ষ্য বড় বড় ঘটনা, যুদ্ধবিগ্রহ, বীরত্ব, মহামানবত্ব ইত্যাদি হওয়ায় ছোটখাটো ব্যাপার সম্পর্কে 'মহাভারত' কিছুই বলে না।"
মহাভারতের তিন রাজকন্যা ও রাজবধু গান্ধারী, কুন্তী ও মাদ্রীকে নিয়ে লেখা বাণী বসুর "ক্ষত্রবধূ"। গান্ধারী হস্তিনাপুরের অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী। গান্ধার রাজ্যের এই অসহায় রাজকুমারী যখন জানতে পারলো যাকে বিয়ে করতে সে বাধ্য সে একজন জন্মান্ধ, তখন সেচ্ছা অন্ধত্ব বরন করে নিলেন। চোখে বেধে ফেললেন একটুকরো কাপড়। যা তাকে মহান করে তুলেছিল। কেননা তিনি বলেছিলেন স্বামী ধৃতরাষ্ট্রের মতো জীবনযাপনের জন্য চোখ বেঁধে রেখেছেন তিনি। কিন্তু আদৌ কি তাই? নাকি এটা তার প্রতিবাদ?
কুন্তী ও মাদ্রী ছিলেন হস্তিনাপুরের রাজা পাণ্ডুর দুই স্ত্রী। নপুংশক রাজার দুই স্ত্রীর জীবন কেমন ছিল?
বইটাতে লেখিকা এই তিন ক্ষত্রবধুর মনস্তাত্ত্বিক লড়াই তুলে ধরেছেন। তবে খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে। শেষের দিকে যেন শেষ করতেই ব্যাস্ত ছিলেন লেখিকা।
তবে মহাভারতের এই তিন ক্ষত্রবধু কে জানতে বইটা খুব দরকারি।
এখানে বাণী বসু লিখেছেন মূলত গান্ধারী এবং কুন্তীকে নিয়ে, মাদ্রীর ঘটনাগুলা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। আলাদাভাবে কুরু ও পান্ডব জননীদের অন্দরমহলের প্রতিচ্ছবি আঁকাটা সহজ কথা নয়। পুরো ঘটনাটা আরো বিস্তৃত আকারে লিখলে ভাল হতো। কেউ কুন্তীর সম্পর্কে আগ্রহী হলে কালকূটের 'পৃথা' পড়ে দেখতে পারেন। সিরিজের বাকি বই ধরা হয়নি, তবে এতটুকু লেখার মধ্যেই বাণী বসুর উদ্দেশ্য এখানে স্বার্থকই বলা চলে।
'ক্ষত্রবধূ' যতটা না উপন্যাস, তার চেয়ে বেশি মহাভারতের ঘটনাপ্রবাহকে বাণী বসু'র নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা। শেষের অধ্যায় তো আর কাহিনীতে না থেকে দুই কুরু-বধূ'র তুলনামূলক বিশ্লেষণে রূপ নিয়েছে।
তবে বর্তমান সময়ের একজন লেখক, তথাপি নারী, তাঁর অন্তর্দৃষ্টিতে মহাভারতের পর্যালোচনা দেখা-টা গুরুত্ব তৈরী করেছে। লেখিকার মহাভারত-আশ্রিত সিরিজের এই বইয়ে হস্তিনাপুরের তিন বধূর (মূলত গান্ধারী এবং কুন্তী) দিকটা উপস্থাপিত হয়েছে।
তিন মুখ্য নারীচরিত্রের পার্স্পেক্টিভ থেকে মহাভারতের গল্পকে দেখা হলেও, কোথাও কোনও চরিত্রের প্রতি অন্যায় বায়াস তৈরি হয়নি। লেখিকার মহাভারত সিরিজ আমার আগে পড়া ছিল না। এখন বাকি পাঁচটা বইও পড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
মহাভারতের তিন ভাগ্যবিড়ম্বিত রাজবধূর জীবনের খন্ডাংশ আলোচিত হয়েছে বইটিতে।গান্ধারী কুরুকূলের বড় রাণী - নিজের দুর্ভাগ্যকে আর বেশি দেখতে চাননি বলে চোখে বেঁধে দেন কাপড়।অবশ্য নিজেকে উদার ও দেবীর আসনেও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন তিনি।বইয়ে গান্ধারীর জীবন নিয়ে মূলত বেশি আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে মাদ্রী ও কুন্তী উভয়েই স্বামীর দুর্ভাগ্যের সাথে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলেন। সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে পর্যন্ত তাদের স্বাধীনতা ছিল না। এই তিন রাজকন্যা স্বামীর বাড়িতে যে আশা নিয়ে এসেছিলেন তা তো পূরণই হয়নি বরং দুঃখের বোঝা তাদের আমৃত্যু বহন করতে হয়েছিল।
I cannot describe my experience in words. As a fan of Hindu mythology, I was intrigued to read the Mahabharata series of Bani Basu. Though I was aware of some perspectives (and some I had imagined while reading the epic), about Gandharari and Kunti, but there are several information which were unknown and I oved to know them.
এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে গান্ধারী, কুন্তী, এবং মাদ্রী—ক্ষত্রিয় কুলের তিন শক্তিশালী বধূ। স্পষ্টতই, এই উপন্যাসটি একটি ঐতিহ্যবাহী কাহিনী নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা নারীর অবস্থান এবং সংগ্রামের প্রতি আলোকপাত করে।
গল্পের শুরুতেই গান্ধারীর চরিত্রের গভীর বিশ্লেষণ রয়েছে। মহাভারতের একটি আইকনিক চরিত্র, গান্ধারীর নাম কখনো অর্থাৎ নারী হিসেবে সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়নি। বাণী বসু এখানে প্রশ্ন তোলে, “সে তো ক্ষত্রবধূ, তার কি আলাদা ব্যক্তিত্ব আছে?” এই প্রশ্নটি লেখিকার এক অনন্য প্রচেষ্টা, যেখানে একজন নারী চরিত্রের পেছনের ইতিবৃত্তকে নতুন করে চিহ্নিত করা হয়েছে। গান্ধারী একজন সুদর্শন, তথাপি অন্ধ স্বামীকে বিবাহের প্রতিজ্ঞা করেছে, যা তাকে জীবনের অসমানুভূতির এক দৃষ্টান্তে পরিণত করে। তাঁর চরিত্রের অন্ধত্ব শুধুমাত্র স্বামীর অন্ধত্ব পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং, এটি তাঁর আত্ম-পরিচয়ের অন্ধকারেও প্রবাহিত হয়।
একদিকে, গান্ধারী যে সংকটের মধ্য দিয়ে যায়, তা আমাদের উদ্দীপিত করে যে নারীরা কেবল সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে নিজেদের স্বেচ্ছা-আরোপিত আত্মাকে হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, কুন্তী ও মাদ্রী যথাক্রমে একটি ভিন্ন মাত্রা প্রদান করে। কুন্তী একজন সুদূরদর্শী মহিলা, যিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে বিবাহের বন্দীত্বে আবর্তিত হন। তাঁর জীবনে আকস্মিকতায় ও প্রত্যাশায় ভরা প্রতিটি মুহূর্ত লেখক গভীর চেতনায় তুলে ধরেছেন। মাদ্রী, যার চরিত্র মূলত কুন্তী ও গান্ধারীর তুলনায় কম আলোচিত, কিন্তু তাঁর সমাজে প্রবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উচ্চারণ করছে।
বাণী বসুর কলমে নারীর অধিকার, প্রতিজ্ঞা এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে এসব চরিত্রের ব্যক্তিত্বকে নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে। এই উপন্যাসে গান্ধারী, কুন্তী এবং মাদ্রী সকলেই তাদের নিজস্ব পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য সকল প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করছেন। লেখিকা কেবল তাঁদের কাহিনী বলেননি, বরং বর্তমানের নারীদের জন্য একটি আদর্শ প্রতীক হয়ে উঠতে চেয়েছেন। এর মাধ্যমে পাঠক সমাজের সংকটাপন্ন নারীবাদের সন্ধান করতে সক্ষম হন, যা প্রতিটি নারীর জন্য এক নতুন প্রেরণা।
উপন্যাসটি নারীদের স্বাধীনতা এবং সামাজিক মর্যাদার জন্য সংগ্রামের একটি ধারাবাহিকতা উপস্থাপন করে। এই উপন্যাসটির পাঠ শেষে পাঠক অনুপ্রাণিত হতে পারেন এবং উপলব্ধি করতে পারেন যে নারীরা আজও তাদের স্বকীয়তা এবং সম্মানের জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন। এটি কেবলমাত্র নারী চরিত্রের শক্তি ও দুর্বলতাকে প্রদর্শন করে না, বরং সমাজের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে, যেখানে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উপলক্ষে এখনও প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অতএব, বাণী বসুর ‘ক্ষত্রবধূ’ বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ স্থান অর্জন করেছে, যা নারী চরিত্রের নতুন নতুন দিক উন্মোচন করে এবং আমাদের সমকালীন সমাজে নারীর সমস্যাগুলোর প্রতি সচেতন করে তুলেছে।
শেষের দু এক পাতায় এসে একটু সামাল দেওয়ার চেস্টা ছাড়া এই ছোট বইটার গল্প রীতিমতো আগোছালো আর খাপছাড়া ভাবে এগিয়েছে। বাণীবসুর এই সিরিজের ছোট ছোট বইগুলো পড়তে গিয়ে লেখিকাকে রঞ্জন বন্দোপাধ্যায় এর খানিকটা পরিশীলিত আর সংক্ষিপ্ত ভার্শন মনে হয়েছে।