১৯৭৫ সালে সাংবাদিক আবু আল সাঈদ দৈনিক সংবাদের সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে কর্মরত ছিলেন । ১৫ আগস্টের পর তার বঙ্গভবনে তার 'ডিউটি' থাকায় খুব কাছ থেকে দেখেছেন মোশতাকের শাসনকালকে । মোশতাকের ৮১ দিনের শাসন নিয়েই এই বই ।
আবু আল সাঈদ বঙ্গভবনের ৮১ দিনের 'রাজা' মোশতাকের সময়কে শুধু সাংবাদিকের চোখ দিয়েই দেখেননি ; একজন প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিতেও বিস্তারিত লিখেছেন 'বঙ্গভবনে ৮১ দিন' বইতে। মানীগুণী অনেকেই মুজিব হত্যার পর রাতারাতি আমূল বদলে যান৷ নেতা বদল করে ফেলেন, দীর্ঘদিনের লালিত রাজনৈতিক মতাদর্শকে স্থিরচিত্তে জলাঞ্জলি দিয়ে দেন। বহাল তবিয়তে আঁকড়ে ধরেন নতুন 'কাণ্ডারি'।সেইসব মানুষদের ইতিবৃত্ত লিখেছেন আবু আল সাঈদ।মোশতাকের ৮১ দিনকে শুধু দিন কিংবা মাসের গন্ডিতে বাঁধা যাবে না। তমসাচ্ছন্ন সেই সময়কে বন্দি করতে হবে ইতিহাসের ফ্রেমে। সেই ফ্রেমের রঙ সোনালি নয়, হবে হত্যা, ষড়যন্ত্র, ক্যু এবং পাল্টা ক্যু'য়ের মতো নিকষ কালো রঙের বর্ডার দিয়ে ঘেরা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।১৯৯২ সালে প্রকাশিত বইটিতে এম আর আখতার মুকুলের চমৎকার মুখবন্ধ নিঃসন্দেহে পাঠকের জন্য বাড়তি পাওয়া।
আবু আল সাঈদ 'সংবাদ' এ কাজ করতেন। বঙ্গভবনের সকল সংবাদ সংগ্রহ করাই ছিল তাঁর প্রধান দায়িত্ব। যদিও ১৬ জুন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ৪টি রেখে বাকিসব সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবুও সংবাদে কর্মরত আবু আল সাঈদ খবরাখবর রাখার চেষ্টা করেছিলেন বলেই মনে হয়।
১৫ আগস্টের বর্ণনা দিয়ে লেখা শুরু। না, বঙ্গবন্ধুর হত্যার ঘটনা নয়। এই হত্যাকান্ডের পরবর্তী সময়কালই মুখ্য। ১৫ আগস্টের কথা,
' কারফিউ ঘোষণা করা হলেও মানুষজন রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছিল, মিলিটারীর গাড়িগুলো টহল দিচ্ছিল। বঙ্গভবনের সামনে ট্যাংক জড়ো করা হয়েছে। বিহারীরা অলিতে-গলিতে বাজি ফোটাচ্ছিল। কোথাও কোথাও 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ ' ধ্বনি। দুপুরের মধ্যে স্বাধীনতা বিরোধী লোকজন পথে নেমে এসেছিল। '
সংবাদের স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করা হলে গুজবই হয়ে ওঠে প্রকৃত সংবাদ। তেমনটাই ঘটেছিল ঢাকার ক্ষেত্রে। লোকের ভয় ছিল,
' ইন্ডিয়া যেকোন সময় আমাদের আক্রমণ করতে পারে। '
১৯৭৪ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তির অন্যতম ধারা ছিল শত্রুপক্ষ কর্তৃক আক্রান্ত হলে একদেশ অপরদেশকে সরাসরি সাহায্যে এগিয়ে আসবে। সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের কারণ কী এই চুক্তি? নাকী ভারতীয় আধিপত্যবাদের চরমতম আঘাতের দিকে ইঙ্গিত করছিল এই গুজব? যেই ভারত নিয়ে এতো শঙ্কা, সেই ভারতের হাইকমিশনার সমর সেন তখন ঢাকায় নেই। ভারতের ভূমিকা,
' ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ভারত থেকে ফিরে এসে বলেছেন, শিগগির স্বীকৃতি আসছে...। '
এদিকে খন্দকার মোশতাক জাতির উদ্দেশে ভাষণকাণ্ডে ফেরত গেলেন পেয়ারা পাকিস্তান রীতিতে 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' বলে বক্তব্য শেষ করার আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী 'সত্যিকার বীরের মতো অকুতোভয় চিত্তে' এগিয়ে আসার জন্য তাদের মোবারকবাদ জানাতে ভুললেন না।
মওলানা ভাসানী মুজিব হত্যাকান্ডের পর মোশতাকের দায়িত্ব গ্রহণকে 'ঐতিহাসিক পদক্ষেপ' বলে অভিহিত করলেন তাঁর পাঠানো টেলিগ্রামে। শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হলেন না মওলানা, তিনি মোশতাক ওপর 'আল্লার রহমত বর্ষিত হোক ' এমন প্রার্থনাও করলেন।
ওসমানী সাহেবের বসে থাকার সুযোগ নেই। কারণ, ' ওসমানী ক্যান্টনমেন্টের জেনারেল ও বঙ্গভবনে অবস্থানরত মেজর কর্নেলবৃন্দের যারা ক্যু'য়ের নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের মধ্যে সেতুর কাজ করছেন '
তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া)র দুই সুপুত্র ব্যারিস্টার মইনুল এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ভূমিকা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই দুইভ্রাতা এবং তাদের প্রতিষ্ঠান ইত্তেফাকের তৎকালীন অবস্থান না লিখলে হয়তো পুরো ইতিহাসকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণে পাঠক সুযোগ পেতেন না। সাংবাদিক আবু আল সাঈদের জবানিতে অনেকবার ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষের মোশতাকপন্থি চরিত্রের কথা এসেছে। ব্যারিস্টার মইনুল বাকশাল থেকে পদত্যাগ করে সেই সময় প্রশংসিত হয়েছিলেন বিভিন্ন মহল থেকে। অথচ, ' তাঁকেও কয়েকদিন বঙ্গভবনে আসতে যেতে দেখা গেছে। '
বঙ্গভবন তখন সরগরম।শেখ সাহেবের মন্ত্রিসভার প্রায় সকলেই অলংকৃত করছেন মোশতাকের মন্ত্রণাসভা। তাজউদ্দীন আগেই বাদ পড়েছিলেন মন্ত্রিসভা থেকে। মনসুর আলী, কামারুজ্জামান এবং সৈয়দ নজরুলকে বাগে আনা গেল না৷ পাঠিয়ে দেওয়া হলো ঢাকা জেলে।
জাসদ প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছে না। সর্বহারাসহ অন্যান্য বামপন্থি আন্ডারগ্রাউন্ড দল সমর্থন করছে মোশতাককে। চীনপন্থি দলগুলোর মধ্যে ফূর্তিভাব লক্ষ করেছেন লেখক। জামাতও খুশি।
বঙ্গভবনে মোশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তৎপর হতে চাইলেন। চলতে লাগল মিটিংয়ের পর মিটিং। সমর্থনের জোয়ার এল বুঝি। লেখকের বয়ানে,
' ইতিমধ্যে ঢাকা শহরটা আবার সচল হয়ে উঠেছে। চাল ব্যবসায়ী সমিতি থেকে শুরু করে রিকশা মহাজন, মৎসজীবী সমবায় সমিতি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি কোনটাই বাদ নেই যারা মোশতাকের সরকারকে সমর্থন জানিয়ে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন। '
লক্ষণ সেনের সভাকবি ধোয়ী সদামুখর থাকতেন সেন মহাশয়ের কীর্তনে। সকাল-সন্ধ্যা কাব্যে গালাগাল করতেন যবনদের। লক্ষণ সেনের পতনের পর সেই কবি ধোয়ী সাহেব এক লম্বা-চওড়া কবিতা নিবেদন করে ধন্য হয়েছিলেন। কবি তার স্তুতিকাব্য উৎসর্গ করেন বখতিয়ার খলজির উদ্দেশে। অবস্থাবিচারে মনে হয় বাঙালি সবসময়ই কবি ধোয়ীর দলে।
পরিচালক,অভিনেতা কেউ পিছিয়ে নেই অভিনন্দিত করতে। যেমন:
' খান আতাউর রহমান একটা নয়া গান লিখে সুর করে সমবেত কন্ঠে রেডিও টেলিভিশনে প্রচার করছেন। ১৯৬৫-এর যুদ্ধের সময়কার কিছু দেশাত্মবোধক গান পুনঃপ্রচারিত হচ্ছিল। এসব করার জন্য একদল লোক আগে থেকেই স্ব স্ব স্থানে বসেছিল এমনটাই মনে হতো। '
ভারতের বিশেষ তৎপরতা দেখা যায়নি। সোভিয়েট ইউনিয়নের চার্জ দ্য এফেয়ার্স এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি ছিল নয়া মন্ত্রিসভার দপ্তর বন্টন অনুষ্ঠানে। চীন, ইরানসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের স্বীকৃতি মিলতে লাগল৷ পাকিস্তানের সাথে দোস্তি ঝালাই করে নেওয়ার কথা সমস্বরে শোনা যাচ্ছিল৷ পাকিস্তানের হাইকমিশন স্থাপনের জন্য মতিঝিলে জায়গা প্রায় ঠিকঠাক। ভুট্টো বাংলাদেশের নয়া সরকারের সাথে দোস্তির নজরানা পাঠালেন ১০ হাজার টন চাল এবং কাপড়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মার্কিনমুলুকে গেছেন নিক্সনকে বশে আনতে। সেখান গিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমদের সাথে সাক্ষাৎ করে দোজাহানের অশেষ নেকি হাসিল করলেন৷ অর্থমন্ত্রী জনাব এ আর মল্লিক বিদেশ সফর থেকে বেশি বেশি ভিক্ষার আশ্বাস পেয়ে ফিরলেন। খুশিয়াল গলায় সাংবাদিকদের ব্রিফ করলেন।
আওয়ামী লীগের এককালীন সভাপতি মওলানা তর্কবাগীশ অসুস্থ শরীর নিয়েও মোশতাকের জন্য দোয়া না করে পারলেন না। হাজী দানেশ, মওলানা মতিনরাও এগিয়ে এলেন মোশতাকের কল্যাণের লক্ষ্যে।
এদিকে সেনাবাহিনীতে মেজরগং বনাম সিনিয়র কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্ব বাড়ছিল। এই বিভেদের কথা খুব বেশি বিস্তারিত আনতে পারেননি লেখক। বরং বঙ্গভবন এবং ক্যান্টনমেন্টের বাইরে সারাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থির চিত্র অনেকটা স্বচ্ছভাবে আনতে পেরেছেন৷
চার নেতাকে জেলে হত্যার খবর প্রথমে বাইরে প্রকাশিত হয়নি। শহরে নানা অর্ধসত্য, মিথ্যা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। মিগ চক্কর দিচ্ছে মাথার ওপর।ঢাকা যেন আতঙ্কের জনপদ। খালেদ মোশাররফের পাল্টা ক্যু পরিস্থিতি ঘোলাটে করে দিল। জাসদের ছেলেদের আলাদা গোপন প্রস্তুতি লক্ষ করেছেন আবু আল সাঈদ। খালেদ মোশাররফ পুরো পরিকল্পনা না করেই ক্যু করেছিলেন বলে ধারণা লেখকের।
আওয়ামী লীগের এমপিদের সিংহভাগ মোশতাকের সমর্থন করছেন।মোশতাকবিরোধী এবং স্থানীয় নেতা-কর্মীদের স্থান কারাগার।
খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান হলেন। জিয়া গেলেন অবসরে। সব খবরের উৎস বাসস। আর সবাই অন্ধকারে।খুনিরা বিদেশে পালিয়েছে। ৮১ দিনের প্রতিনায়ক জেলে।সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় সায়েম রাষ্ট্রপ্রধান। এদিকে ষড়যন্ত্র আর ক্যু, প্রতিক্যু'য়ের খেলা আরো জমে উঠেছে। তবে, গদিচ্যুত হয়েছেন মোশতাক। আর সেইসাথে শেষ হয়েছে সাংবাদিক আবু আল সাঈদের স্মৃতিচারণধর্মী রাজনৈতিক ইতিহাসগ্রন্থ 'বঙ্গভবনে মোশতাকের ৮১ দিন'।
লেখক পেশায় সাংবাদিক। কিন্তু এই বইয়েই তিনি স্বীকার করেছেন একসময় ছাত্রলীগ করতেন।সাংবাদিক হয়েও ছিলেন বাকশালের কৃষক লীগের কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য। তাই ঘটনার বর্ণনায় খানিকটা একদেশদর্শিতা এসেছে। রাষ্ট্রনায়ক হত্যার পর তাঁর দলের লোকদের পালিয়ে যাওয়া, কারো ভোজবাজির মতো নেতা বদল কিংবা নিস্ক্রিয়তার কারণ নিয়ে একেবারেই আলোকপাত করেননি লেখক। আবার, সাধারণ জনতার মনোভাব কেন বিরূপ হলো তারও বিশ্লেষণ কিংবা ন্যূনতম ইঙ্গিত পাইনি বইতে। সাংবাদিক হলেও লিখবার ধরনটি যুতসই নয় ভদ্রলোকের। গোছাতে পারলে আরো ভালো লাগত। মন্দ হতো না যদি আবু আল সাঈদ তাঁর দেখবার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করতেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ধূর্ত ক্যারেক্টার ছিল মোশতাক আহমেদ। তার ক্ষমতা দখল এবং পরবর্তীতে ক্ষমতায় বসে অপকর্ম, নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন অনিয়ম এছাড়াও বহু অজানা তথ্য বইটি পড়ে জানতে পারি। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগল জেল হত্যার ঘটনা নিয়ে, কতটা কাপুরুষ হলে, জেলে বন্দী কয়েদিকে জেলের মাঝেই গুলি করে হত্যা করতে পারে। দিন দিন যত বই পড়ছি, ততই অনেক কিছু জানতে পারছি।
মোশতাকের শাসনামলের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বর্ণনার পাশপাশি লেখক তার নিজস্ব বিশ্লেষণ এবং মতামত বইটিতে উল্লেখ করেছেন। মোটাদাগে বাংলাদেশের প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান থেকে দ্বিতীয় সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যবর্তী সময়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে বেশ কাজে দেবে।
ইতিহাস, এক নির্মম সময়ের সাক্ষী। যার যা প্রাপ্য, সময়ের নীতি অনুযায়ীই সে তা ভোগ করে যায়। ক্ষমতার পালাবদলে নিরীহরাই হয় শুধু ক্ষতিপূরনের মাধ্যম। দিনশেষে স্বার্থহীনরাই স্বার্থপরদের উদর পরিপূর্ণ করে যায়।
এক "ঐতিহাসিক প্রয়োজনে" স্বাধীন বাংলাদেশ হলো নয়া পাকিস্তান। বাংলাদেশ বেতার "রেডিও পাকিস্তান" এর আদতে নাম নিলো "রেডিও বাংলাদেশ", জাতীয় স্লোগান "পাকিস্তান জিন্দাবাদ" এর আদলে হলো "বাংলাদেশ জিন্দাবাদ"। পরদিনই হুট করে চাল, ডাল, তেল সবকিছুর দাম কমে এলো। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতিরা জানায় দরকার পড়লে তারা লস করে হলেও বাজারে পণ্য ছাড়বে! বের হয়ে এলো একের পর এক স্বাধীনতা বিরোধীর চেহারা। ততক্ষণাৎ এলো পাকিস্তান আর চীনের স্বীকৃতি। স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি চীন ও পাকিস্তান থেকে আসছে ত্রাণ। কি লজ্জা! কি লজ্জা!
A shame of a period for an "independent nation"
এই তথ্য গুলো পৃথক কিছু বইতেও পাওয়া যায়। কিন্তু লেখক, সাংবাদিক আবু আল সাঈদ সংক্ষিপ্ত কিন্তু তথ্যবহুল আকারে ৮১ দিনের বর্ণনা দিয়েছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে, যা এই বইটিকে অন্য বই গুলির থেকে আলাদা গ্রহণযোগ্যতার স্থানে রাখবে।
২ মাস হলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ১৬ বছর পর প্রবল জনরোষের মুখে ক্ষমতাচ্যুত। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলেন, আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মী আত্মগোপনে, নইলে দেশ ছাড়া অথবা জেলে।
বাংলাদেশ জন্মের পর দুইবার এমন পরিস্থিতির স্বীকার হলো আওয়ামী লীগ, দুইবার ই তাদের এই পতন ক্ষমতার চূড়া থেকে।
মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কেন?
না, এই বইয়ে সেসব প্রশ্নের উত্তর নেই।
তবে প্রশ্ন আরো আছে।
আচমকা এমন ক্ষমতার পালাবদলের পরিণতি কী?
যথানিয়মে ক্ষমতার হস্তান্তর না ঘটলে যে 'পাওয়ার ভ্যাকুয়াম' তৈরি হয় তার পরিণতি কী? এর ফায়দা কার ঘরে যায়? দেশের স্বার্থ তখন কতটুকু রক্ষা হয়?
ক্ষমতার কেন্দ্রে শূন্যতা না থাকলে রাষ্ট্রের সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের মাঝে ভালো হোক বা মন্দ, এক ধরণের ভারসাম্য থাকে। পাওয়ার ভ্যাকুয়াম হলে সবাই নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করতে থাকে। এতে জনগণের লাভ না ক্ষতি?
আওয়ামী লীগের বিদায়ে নির্দিষ্ট কিছু শক্তি ই সব সময় বেশি রকমের মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এর উৎস কোথায়? উদ্দেশ্য ই বা কি?
যারা ২০২৪ এর ৫ আগস্ট এর আগের এবং পরের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের মনে নিশ্চয়ই আরো প্রশ্ন আছে। এই বইয়ে উত্তরগুলো সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাবেন।
এটা একাডেমিক কিংবা তথ্য ভারাক্রান্ত কোন বই না, থিওরী ও কপচানো নেই। ভদ্রলোক আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক। ১৫ আগস্টের পরে মোশতাকের ক্ষমতায় থাকার দিনগুলিকে সাংবাদিকের চোখে ডায়েরির পাতায় লিপিবদ্ধ করেছেন। কারো সাফাই গান নি, তবে সব দিক নিয়ে কথাও বলেন নি। তবে চেষ্টা করেছেন নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকেই বর্ণনা দেয়ার।
বইয়ে এমন কোন যুগান্তকারী নতুন কোন তথ্য নেই যাতে আপনার চোখে ইতিহাসের নতুন কোন সত্য ধরা পড়বে। তবে, ক্ষমতার পালাবদলের ধরণ এবং তার পরের ঘটনা প্রবাহের মাঝে একটা প্যাটার্ন আছে। বইয়ে উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবেন, তবে সরাসরি না, ওই প্যাটার্নগুলোর মাঝেই।
যেহেতু বই বিষয়ক আলোচনা, বইয়ের একটা চুম্বক অংশ তুলে ধরা যাক। অংশটুকু লেখকের সাথে হাজী দানেশের কথোপকথন থেকে নেয়া। আমি শুধু মাত্র হাজী দানেশের বক্তব্যের একটা অংশ তুলে ধরছি।
"চীন কবে বাংলাদেশকে 'রিকগনাইজ' করবে?
জানিনা।
আমি জানি খুব শিগগির। বুঝলে, মোশতাক আর সেই মোশতাক নেই। পাকিস্তানের সাথেও যোগাযোগ করছে। ফুল সুইমে যেন কূটনৈতিক বাণিজ্যিক রিলেশন চালু হয়। বঙ্গবভনে আরো কথা হয়েছে। পাবলিকের ব্লাক মানি কি করে কাজে লাগানো যায়। ব্যারিস্টার মইনুল অনেক কিছুই জানেন। আলাপ করো। অর্থাৎ বড় রকম একটা ওলট পালট হচ্ছে। তোমরা তো নজর রাখছো শুধু ক্যান্টনমেন্টের উপর আর সংবিধানের কি রদবদল হলো। ও সব কোন ঘটনাই নয়।
তোমাদের শেখ সাহেবকে হত্যা করার জন্য যেমন নিখুঁত প্ল্যান তৈরী হয়েছিল, তার চেয়েও সাংঘাতিক প্ল্যান তৈরী হচ্ছে দেশ ও জাতিটা নিয়ে। যেমন ধরো সংবিধানে থাক না ধর্মনিরপেক্ষতা কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বত্র এমনভাবে ইসলাম ধর্মের প্রাধান্য দেয়া হবে, যাতে করে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ক্���মেই বিবর্ণ হতে হতে এক সময় পুরনো ডাস্টবিনের কাগজের মত ঘূর্ণি হাওয়ায় উড়ে উড়ে কোথায় চলে যাবে। ধরো চীন এসে গেল। আলপিন থেকে শুরু করে বলপেন সব গছিয়ে দেবে আমাদের দেশে। ভারতের বাণিজ্য হালে পানি পাবে না। সেটা কিছু না। চীন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেছে সরাসরি প্রকাশ্য দিবালোকে পাকিস্তানকে অস্ত্র দিয়ে। অবশ্যই চীনের পক্ষে যুক্তিযুক্ত তত্ত্ব আছে। সেই চীন যখন আমাদের রাজনীতিতে আসবে তখন এ দেশের কয়েক ডজন চীনপন্থী রাজনৈতিক দল প্রকাশ্য পোগন থেকে তারা বেরিয়ে আসবে এবং সৌদি আরব যেহেতু অলরেডী স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছে সুতরাং আল্বদ��� রাজাকাররাও বেরিয়ে আসবে। এরা মুক্তিযুদ্ধের ভাবমূর্তি তাদের নিজেদের মত করে সাজিয়ে নেবে। দেখবে এরাই স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব নেবে। সেই সাথে ব্লাক মানি বেরিয়ে আসা মানে তোমাদের সমাজতন্ত্রের চিচিং ফাঁকের প্রথম সূচনা। অর্থাৎ ফি পোর্টের মত অবাধ বাণিজ্য ব্যবস্থা।"
বইয়ের ভূমিকা এম আর আখতার মুকুলের লেখা। ২০২৪ এর আগস্টের পর এই ভূমিকাটুকুও বেশ প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ।
বইয়ের নাম:বঙ্গভবনে মোশতাকের ৮১ দিন লেখক: আবু আল সাইদ প্রকাশনী: সাগর পাবলিসার্শ প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর, ১৯৯২
১৯৭৫ সালের ১৫-ই আগষ্ট ভোরে এক সেনা অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নি হ ত হওয়ার পর দেশের প্রসিডেন্ট হিসেবে দ্বায়িত্ব নেন আওয়ামিলীগ নেতা খন্দকার মোশতাক।
এই মোশতাক-ই ১৪ আগষ্ট নিজ বাসা থেকে হাঁসের মাংস রান্না করে নিয়ে গিয়েছিলেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর জন্য। শেখ কামালের বিয়ের উকিল ছিলেন তিনি। শেখ মুজিবের বাবা শেখ লুৎফুর রহমানের মৃত্যুতে মুজিবের চেয়ে বেশি কান্না করেছিলেন তিনি, দাফনের সময় নেমেছিলেন কবরেও। শেখ মুজিব তার সন্তানদের বলেছিলেন কোন বিপদে পড়লে সোজা মোশতাক কাকুর কাছে চলে যেও।
খন্দকার মোশতাক যখন প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেন তখনও শেখ মুজিবের লা শ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে পড়ে ছিলো! জাতির উদ্দেশ্য ভাষণ দিতে গিয়ে অভ্যুত্থানকারীদের "সূর্যসন্তান" বলে আখ্যা দিলেন! "জয় বাংলা" স্লোগান পাল্টে "বাংলাদেশ জিন্দাবাদ" স্লোগান চালু করলেন!
কেবলমাত্র মোশতাক-ই নয় মুজিব সরকারের মন্ত্রীসভার বেশিরভাগ সদস্যও মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিলেন। মোশতাকের আনুগত্য স্বীকার না করায় কারাগারে যেতে হয় তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, এম মনসুর আলী সহ আরও অনেক আওয়ামীলীগ নেতা কে।
সেই অস্থির সময়ে দৈনিক সংবাদের একজন সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত আবু আল সাইদ খুব কাছ থেকেই পর্যবেক্ষণা করেছেন খন্দকার মোশতাকের শাসনামল৷ সেগুলোই অনেকটা দিনলিপি লেখার মতো বই আকারে প্রকাশ করেছেন তিনি।
আবু সাইদ নিজে বাকশালের সদস্য ছিলেন তাই তার লেখনিতে একপাক্ষিকতাই আমার কাছে বেশি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে ইতিহাসের সেই অজানা অধ্যায় সম্পর্কে জানতে প্রকাশিত সব ধরণের বই পড়া উচিত বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশ:রক্তের ঋণ, তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও না বলা কিছু কথা বই দুটি পড়ে ওই সময় ক্যান্টনমেন্ট ও বঙ্গভবনের যে চিত্র পাওয়া যায় সেই তুলনায় কম বিষয়াদি রয়েছে বইটিতে। আবু সাইদ মূলত মাঠ পর্যায়ে খন্দকার মোশতাকের শাসনামলের নানা চিত্র তুলে ধরেছেন। "স্বনির্ভর বাংলাদেশ" নামক কর্মসূচী গ্রহণের মধ্য দিয়ে গ্রাম পর্যায়ে মোশতাক সরকারের ভীত গড়ে নেওয়ার প্রয়াসের কথা বইতে বলা হয়েছে।
দেশের সাধারণ মানুষ, শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ব্যবসায়ীরা খন্দকার মোশতাকের সরকারকে সমর্থন জানিয়ে কিভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন সেসব ঘটনা ই উঠে এসেছে বইতে।
মওলানা ভাসানী, আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সব খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেমন আওয়ামীলীগ, জাসদ, সর্বহারা পার্টি সহ অন্যান্য তাদের কার্যক্রম কিভাবে পরিচালনা করছে তার বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে বইতে।
মোশতাক সরকারের সফলতার নানা দিন তুলে ধরে আবু সাইদ দেখাতে চেয়েছেন এগুলো মূলত মুজিব সরকারের ই গৃহীত পদক্ষেপ ছিলো। অর্থাৎ '৭৪ এর দূর্ভিক্ষ সহ নানা সমস্যা গুলো মুজিব সরকার কেবল ঘুছিয়ে নিয়ে এসেছিলেন তবে এর সফলতা জনগনকে দেখানোর সময়টুকু তিনি পাননি।
রেডক্রিসেন্টের ত্রাণ নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফার দূর্নীতির তথ্যও না-কি মোশতাক সরকার খুঁজে পায়নি এমন তথ্যও তিনি বইতে দিয়েছেন।
এছাড়া মোশতাকের পদত্যাগ, পদত্যাগের প্রাক্কালে কৌশলে কারাভ্যন্তরে জাতীয় নেতাদের নৃ শ ং শ ভাবে হত্যায় মোশতাকের ভূমিকার বিষয়টিও বইতে উঠে এসেছে৷
৭৫ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সেই উত্তাল সময়ের কথা আওয়ামীলীগ বিরোধী এবং নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের লেখা বই পড়লেও আওয়ামীপন্থীরা আসলে কি ভাবছিলেন সেই দিকটা আমাদের জানা উচিত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না প্রতিটি মুদ্রার-ই দুইটা দিক থাকে এবং মুদ্রার দুই দিক একে অপরের পরিপূরক। তাই সঠিক তথ্য জানতে হলে দুই দিকের বই-ই আমাদের পড়তে হবে। তবেই সঠিক ইতিহাস আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে।
"বঙ্গভবনে মোশতাকের ৮১ দিন" বইটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর, খুনি মোশতাক আহমেদের ৮১ দিনের অবৈধ ক্ষমতাকালের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরে।
একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক হিসেবে, আবু আল সাঈদ এই বইয়ে তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহের জীবন্ত চিত্র তুলে ধরেছেন। এ বইয়ে তিনি শুধু একজন সাংবাদিকের দৃষ্টিকোণ থেকেই মোশতাক আহমেদের ৮১ দিনের অবৈধ শাসনামলের ঘটনা তুলে ধরেননি। তিনি একজন প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতাও স্পষ্ট করে তুলেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর অনেকেই রাতারাতি তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তন করে নতুন "কাণ্ডারি"দের সাথে সহযোগিতা শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে লালিত মতাদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে তারা নতুন শাসকদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে। লেখক এইসব মানুষের আচরণ ও পরিবর্তনের বিবরণ তুলে ধরেছেন।
তবে লেখকের রাজনৈতিক পটভূমি, ছাত্রলীগের সাথে তার সম্পৃক্ততা এবং বাকশালের সদস্য হিসেবে অভিজ্ঞতা, তার লেখায় কিছুটা পক্ষপাতপুষ্টতা এনেছে।
বইটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের পালিয়ে যাওয়া এবং নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা নেই। জনসাধারণের মনোভাব, যা তৎকালীন ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, তাও বইটিতে উপেক্ষিত।
সামগ্রিকভাবে, "বঙ্গভবনে ৮১ দিন" বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে একটি তথ্যপূর্ণ বিবরণ প্রদান করে।