বিংশ শতকের প্রথম কয়েক দশক বাংলার অগ্নিযুগ। সেই সময়, যখন বঙ্গভঙ্গ অনুঘটক হয়ে দেখা দিয়েছে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের উন্মেষে, একাধিক বিপ্লবী সংগঠন যখন ব্রিটিশরাজের দমনপীড়নের প্রত্যুত্তর দিতে চাইছে সহিংস প্রত্যাঘাতে। সেই সময়, যখন বাংলায় বিপ্লবীদের স্বদেশব্রতে তীব্র আঘাত হানতে তৎকালীন ইংরেজ প্রশাসনের অন্যতম ভরকেন্দ্র লালবাজার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেই সময়, যখন চার্লস নেতৃত্বে কলকাতা পুলিশ সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে সশস্ত্র লড়াইয়ে বিশ্বাসী বঙ্গজ তরুণদের গ্রেফতারে-নির্যাতনে-শাস্তিদানে। সে এক অন্য লালবাজার, অচেনা লালবাজার। এই বইয়ে অভিজ্ঞ আই পি এস অফিসার সুপ্রতিম সরকার কলকাতা পুলিশের মহাফেজখানার দলিল-দস্তাবেজ থেকে তুলে এনেছেন সেই অচেনা লালবাজারের কাহিনি। তুলে এনেছেন ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষিত অনামী-অজানা-অচেনা তরুণ বিপ্লবীদের ভয়ডরহীন আত্মবলিদানের বীরগাথা। অভিনব উপায়ে রডা কোম্পানির অস্ত্রলুঠ, বা বই-বোমার মাধ্যমে নির্দয় ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যার চক্রান্ত, বা সেনেট হলে বড়লাটকে গুলিবিদ্ধ করার অকুতোভয় চেষ্টা একুশের তরুণীর, বা বিশ্বাসঘাতক সতীর্থকে জেলের মধ্যেই হত্যা করে সহাস্যে ফাঁসিকাঠকে বরণ করে নেওয়া দুই নির্ভীক যুবকের। পাশাপাশি ঠাঁই পেয়েছে বিনয়-বাদল-দীনেশের ঐতিহাসিক রাইটার্স অভিযানের প্রামাণ্য দিনলিপিও। এ বই মূলত তাঁদেরই উদযাপন, যাঁরা বিস্মৃত 'কত প্রাণ হল বলিদান' - এর সমষ্টিতে, 'ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান' -এর বহুবচনে। এ বই তাঁদেরই স্মৃতিতর্পণ, এক অন্য ভঙ্গিমায়। তথ্যের ভারে ক্লিষ্ট নয়, আবেগের আতিশয্যে আক্রান্ত নয়, স্বাদু গদ্য এবং টানটান লিখনশৈলীর মধ্যস্থতায় এ বই উত্তীর্ণ থ্রিলারধর্মী ইতিহাসযাপনের এক নতুন আঙ্গিকে।
সুপ্রতিম সরকারের জন্ম কলকাতায়, ৩০ মে ১৯৭১। আশৈশব কৃতী ছাত্র। ছাত্রজীবন কেটেছে সেন্ট লরেন্স হাই স্কুলে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণির স্নাতক। আনন্দবাজার পত্রিকায় স্বল্প দিনের সাংবাদিকতার পর ১৯৯৭ সালে যোগ দেন ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসে। কর্মজীবনে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এবং কলকাতায় নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলেছেন। বর্তমানে কলকাতা পুলিশে অতিরিক্ত কমিশনার পদে কর্মরত। কর্মক্ষেত্রে প্রশংসনীয় দক্ষতার জন্য ২০১৫-য় সম্মানিত হয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল’-এ, ২০১৭-য় ভূষিত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রদত্ত বিশেষ সম্মানপদকে।পেশায় আই পি এস অফিসার, নেশায় আপাদমস্তক ক্রিকেটানুরাগী। লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই ‘গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার’।
ইংরেজদের নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে-এই ভাবনা থেকে কিভাবে দলে দলে ছেলে মেয়েরা হাসতে হাসতে প্রাণ দিয়ে দিতো। ৯৫% সুইসাইডাল মিশন আর ৫% ফিরে আসার সম্ভাবনা তাতেও কারও কোন অসুবিধা নেই। মিশনে যেতে না পারলে উলটো মন খারাপ এখনও হয়তো যথাযথ প্রস্তুত হতে পারেনি এই ভেবে। বিপ্লবীদের বয়স কতো আর বড়জোর ২০/২৫ বা এর কাছাকাছি। মাঝেমাঝে চিন্তা করি, ঐরকম উত্তাল সময়ে জন্ম নিলে কি করতাম? কনভোকেশনের মতো অনুষ্ঠানে জনতার মাঝখান থেকে রাজ্যপালকে লক্ষ্য করে যেভাবে নির্ভয়ে গুলি চালিয়েছিলেন বীণা দাস তার মত হতাম? নাকি শ্রীরামপুরের জমিদার বাড়ির ছেলে নরেনের মতো হুজুগে বিপ্লবী হয়ে পিঠটান দিতাম? নাকি যা হচ্ছে হোক না... এই ভেবে খুব সাধারণ জীবন কাটিয়ে দিতাম জানি না। এই রকম ক্ষ্যাপাটে পাগলা বিপ্লবী কিংবা স্বাধীনতাকামী মানুষদের সম্পর্কে কোন কিছু পড়লে মাঝে মাঝে অবাক লাগে, কী শান্ত নিরুপদ্রব একটা জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি আমরা।
দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপারটা আসলেই অদ্ভুত। যে পাশ থেকে যে যেভাবে দেখে। সেজন্য ইংরেজদের কাছে স্যার চার্লস টেগার্ট কিংবা কিংসফোর্ড সাহেব যতই পূজনীয় হোক না কেন স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের কাছে শত্রু বৈ আর কিছুই না। ঠিক একই রকমভাবে বাঙ্গালীদের চিরকালের হিরো বিপ্লবী সুশীল, অরবিন্দ ঘোষ, কানাইলাল দত্ত, বিনয়কৃষ্ণ বসু, বাদল কিংবা দীনেশ নেহায়েত বিপ্লবী বা দেশকে অস্থিতিশীল রাখতে পারদর্শী একদল পথভ্রষ্ট যুবক ছাড়া আর কিছুই নয়।
মুক্তির মন্দির সোপান তলে, কত প্রাণ হল বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে
ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে বলতে গেলে স্বভাব বশেই লোকে গান্ধী, নেহেরু, নেতাজি, ভগত সিং এর বৃত্তেই বিচরণ করে। ইতিহাসের পাঠ্যবইও এর বাইরে জানার অবকাশ রাখে খুব কম। হাজার হাজার সেই বিপ্লবীদের নাম ইতিহাসের পাতায় হারিয়েই গেছে, যারা দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে, মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রাণ দিতেও পিছপা হননি, ফাঁসির মঞ্চের দিকে স্মিতবদনে হেঁটে গেছেন দৃপ্ত কদমে, বন্দে মাতরম এর ধ্বনি যাদের কণ্ঠে ছিল বিরাজমান শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
কলকাতা পুলিশকে এবং সর্বোপরি সুপ্রতিম সরকারকে বিনীত ধন্যবাদ জানাই এই বইটির জন্য। 'স্বাধীনতা যুদ্ধে চেনা অচেনা লালবাজার' বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে নিজের অজান্তেই চোখের কোণে পঞ্জীভূত হচ্ছিল একরাশ দুঃখ, অশ্রুধারায় এই বীরবঙ্গজদের জানাচ্ছিল শ্রদ্ধা। ছোটবেলা থেকে স্কুলের বইতে গান্ধী, নেহেরু, ভগত সিং কে যতটা জেনেছি, ক্ষুদিরাম, বিনয়-বাদল-দীনেশ, কালাইলাল ভট্টাচার্য্য, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বীণা দাসদের জানা হয়নি ততটা। বাড়িতে মায়ের মুখে গল্প শোনাই সার। তাই এই বইটা পড়ে আত্মগ্লানিই বেশি অনুভব করেছি।
বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা যথেষ্ট আত্মবিস্মৃত। নিজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা ফেলে মরীচিকার পেছনে ছুটে চলেছি ক্রমাগত। হিন্দি আগ্রাসনের মুখে জাতিগত এক সংকটের মুখে আমরা। সেমতাবস্থায় সুপ্রতিম বাবুর লেখা এই বইটা বাঙালি হিসেবে গর্ব করার আরও অবকাশ দিল। ওনার লেখনি যে কতটা তীক্ষ্ণ তা কলকাতা পুলিশের ফেসবুক পেজে রবিবারের রহস্য কলামের শেয়ার সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায়। হায়, ইতিহাসের পাঠ্যবইগুলো যদি এরকম রোমহর্ষক হত।
'শেষ হইয়াও হইল না শেষ' - ছোটগল্প সম্বন্ধে একসময় বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৫০ পাতার এই বইটা শেষ হওয়ার পর মন চাইছিল আরও এরকম গল্প পড়তে। অবিভক্ত বাংলার গ্রামে গ্রামে যত ক্ষুদিরাম, প্রফুল চাকী কিংবা বিনয় গুপ্ত আছে, সবার কথা জানতে ইচ্ছে করছে। এই বই বাংলার স্কুলে স্কুলে আবশ্যিক পাঠ্য হয় উচিত।
ভিয়েতনাম থেকে সিরিয়া - সারা বিশ্বের নানা ঘটনাই এখন আমাদের নখদর্পণে, মুঠোফোনের সৌজন্যে। আর কতদিন নিজেদের ইতিহাসকে ভুলে থাকব?
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান, আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান?
সুপ্রতিম সরকারের “অচেনা লালবাজার” নিছক ইতিহাসের বই নয় — এটি সময়ের পাতায় অবহেলিত, বিস্মৃত বিপ্লবীদের এক সাহসী পুনরাবিষ্কার।
কলকাতা পুলিশের মহাফেজখানার ধুলোধূসরিত কাগজপত্রে যাদের নাম কেবল “অপরাধী” হিসেবে থেকে গেছিল, এই বই সেইসব তরুণদের আবার ফিরিয়ে আনে আলোয়, জ্বলন্ত হৃদয়ের সম্মানে।
‘থ্রিলারধর্মী ইতিহাসযাপন’— এই শব্দবন্ধ যেন বইটির প্রকৃত রূপ। পাতা উল্টালেই চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে অস্ত্রোপচার নিখুঁত দৃশ্যপট: রডা কোম্পানির অস্ত্রলুঠ, বীণা দাসের জনসমক্ষে রাজ্যপালকে গুলি ছোঁড়া, বা লালবাজারে বিশ্বকবির পদার্পণের মতো ঘটনার ডকুমেন্টেড অথচ নাটকীয় উপস্থাপন। বিনয়-বাদল-দীনেশের রাইটার্স অভিযান তো এমনভাবে লেখা, যেন সাদা-কালো সিনেমার মতো পাঠককে নিয়ে চলে সময়ের করিডরে।
লেখকের তথ্যনিষ্ঠতা ও গদ্যের নাটকীয়তা এক অপূর্ব ব্যালান্স তৈরি করেছে। ইতিহাস বিকৃত না করেও তিনি গল্পের বুনটে পাঠককে স্থির থাকতে দেন না। স্কেচ, চিঠিপত্র, অস্ত্রের ছবি—সব মিলে বইটি যেন এক মোবাইল টাইম মেশিন।
আমরা যারা স্কুলে একপাক্ষিক ইতিহাস পড়ে বড় হয়েছি, তাদের কাছে এই বই এক ধরনের আত্মগ্লানির পাঠও বটে। সুশীল সেন, বীরেন দত্তগুপ্ত, কানাইলাল দত্ত—এসব নাম ভুলে যাওয়া নয়, অস্বীকার করা।
এই বই শুধু ইতিহাস নয়, আত্মপরিচয়ের সন্ধান। আর তাই, “অচেনা লালবাজার” আসলে আমাদের চিরচেনা জাতিস্মারক হয়ে উঠতেই চায়।
Untold stories of unsung heroes of Indian struggle for independence. The narration could have possibly been more coherent but still it keeps you riveted. The incident about the loss of pen of Gurudev was interesting but does not gel with other stories.
গোয়েন্দাপীঠ লালবাজারের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর এবার সুপ্রতীম সরকার লিখেছেন আরেক অচেনা লালবাজারের কথা, সেটা হচ্ছে ব্রিটিশ আমলের লালবাজার, যখন দোর্দন্ড প্রতাপ ইংরেজরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল স্বদেশী আন্দোলনকে রুখে দিতে।
বঙ্গভঙ্গ, স্বদেশী আন্দোলন বা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নিয়ে অল্পবিস্তর আমরা সবাই জানি বা পড়েছি। ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্যসেন, বা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারদের কথা কে না জানে! কিন্তু লেখক এখানে সেসব অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কথা তুলে এনেছেন, যারা মুক্তির মন্দিরের সোপানতলে বিস্মৃত হয়েছিলেন এতদিন।
মোট দশটি কাহিনী আছে বইতে, এরমধ্যে একটি ব্যতীত সবগুলিই বিপ্লবীদের কোনো না কোনো অভিযানের ঠাসবুনোটে ভরা। একটি কাহিনীতে তৎকালীন ঢাকার ইন্সপেক্টর জেনারেলকে খুনের কথা আছে, যা করেছিলেন তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল স্কুল( পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ) এরই একজন ছাত্র, বিনয়কৃষ্ণ মজুম��ার।
ইতিহাস পড়তে সবার হয়তো ভাল লাগেনা। কে যায় অত ভারী ভারী বর্ণনা, অতসব সন তারিখ পড়তে? কিন্তু এখানেই লেখক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়��ছেন। গল্পের আদলে লেখা এই কাহিনীগুলোতে উঠে এসেছে নাম না জানা বিপ্লবীদের ত্যাগ, দেশের জন্য তাদের ভালোবাসা, এবং তাদের শ্রম, যার বিনিময়ে এসেছিল স্বাধীনতা।
#পাঠকের_চোখে বই ~ ♦#স্বাধীনতা_যুদ্ধে_অচেনা_লালবাজার♦ লেখক ~ সুপ্রতিম সরকার প্রকাশক ~ আনন্দ পাবলিশার্স মূল্য ~ ২৫০ টাকা
মাননীয় অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকার বাবুকে প্রথমেই জানাই আমার একটা বিনীত অনুরোধ। যদি কোনওদিন আমি অপরাধী হিসেবে আপনার হাতে আসি, তাহলে লক আপে নিয়ে টর্চার করার জন্য প্লিজ অন্য কোনও অফিসারকে ডেকে নেবেন। কারণ, আপনার লাঠির আঘাত আমি হাসিমুখে সহ্য করে নেব। গর্ববোধ করব আপনার ওই হাতের স্পর্শে, তা সে যত যন্ত্রণাদায়কই হোক না কেন। ওই কঠিন হাত দিয়ে যে সাহিত্য আপনি সৃষ্টি করে চলেছেন অবিরত, তা যে পাঠকের কাছে এক একটা অমূল্য সংগ্রহ হয়ে উঠছে, এই কথা আশা করি সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবেন।
"গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার" বেস্টসেলার হওয়ার পর থেকেই আগ্রহ বাড়ছিল সুপ্রতিমবাবুর পরের বইয়ের জন্য৷ গত বছর ফেসবুকে কলকাতা পুলিশের পেজে "পুরনো সেই দিনের কথা" সিরিজ পড়েই বুঝতে পেরেছিলাম কী পরিমাণ রিসার্চ করে লেখক আমাদের সামনে তুলে ধরছিলেন প্রাক স্বাধীনতা আন্দোলনের সমকালে বাংলার বিপ্লবীদের গৌরবগাথা। সেই লেখা যে একদিন বই হয়ে আসবে, এই ইচ্ছাপূরণের জন্য সুপ্রতিমবাবু, ওঁর টীম ও প্রকাশককে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ। ১৪ই অগস্ট লেখকের প্রোফাইলে এই বইয়ের ছবি দেখেই মনস্থির করে ফেলি যত শীঘ্র সম্ভব অর্ডার করতে হবে। বইচই থেকে অবশেষে হাতে পেলাম "অচেনা লালবাজার"।
আনন্দ পাবলিশার্সের বই মানেই পাতার ভাঁজে সুন্দর গন্ধ, রয়্যাল বাইন্ডিং, আকর্ষণীয় কভার, সুস্পষ্ট ফন্ট - সব মিলিয়ে একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। সাথে উপরি পাওনা পুরো বইতেই গ্লসি পেপার ফরম্যাট, সাদা কালো অরিজিনাল ছবি, আর সারা বই জুড়ে ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অসাধারণ সব স্কেচ। শুধু বিষয় নয়, ছবিগুলোও যেন টেনে নিয়ে গেল সেই সময়ে। প্রচ্ছদের ছবি এঁকেছেন জেমস বেইলি ফ্রেজার। বই পড়লাম, নাকি সাদা কালো একটা সিনেমা দেখলাম, বুঝতে পারলাম না।
"থ্রিলারধর্মী ইতিহাসযাপন"। এই শব্দবন্ধ খুব আক্ষরিক অর্থেই বর্ণনা করে এই বইয়ের বিষয়বস্তুকে। প্রাক স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলায় স্বদেশীদের একের পর এক প্রত্যাঘাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ লালবাজার। "চার্লস টেগার্টের নেতৃত্বে কলকাতা পুলিশ সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে সশস্ত্র লড়াইয়ে বিশ্বাসী বঙ্গজ তরুণদের গ্রেফতারে-নির্যাতনে-শাস্তিদানে। সে এক অন্য লালবাজার, অচেনা লালবাজার।" সুপ্রতিম বাবুর নিখুঁত লেখনীতে ধরা পড়েছে সেই অশান্ত পরিবেশে ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষিত, অজানা অচেনা তরুণ বিপ্লবীদের নির্ভীক আত্মবলিদানের বীরগাথা। মোট ১০টি গল্পের মধ্যে ৯টি তে রয়েছে বিপ্লবীদের সঙ্গে সেকালের লালবাজারের সম্মুখ সমরের আখ্যান। আর একটিতে আছে চমক, যার সঙ্গে বিপ্লবের সম্পর্ক না থাকলেও আছে নাড়ির টান, লালবাজারে বিশ্বকবির পদার্পণের ঘটনা।
বইয়ের সূচীপত্রে গল্পগুলোর নাম দেখলেই পড়ার আগ্রহ বেড়ে যেতে বাধ্য। প্রত্যেক গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাতায় পাতায় অজস্র ছবি ও স্কেচ উৎসাহ বাড়িয়ে দিয়েছিল আমার। বিপ্লবীদের লেখা চিঠি, তাদের ব্যবহৃত মাউজার পিস্তল, কলকাতা পুলিশের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত কোনও ঘটনার বিবরণ, বই বোমার ছবি, বন্দেমাতরম পত্রিকায় প্রকাশিত খবর - এইসব ছবি দেখে গায়ের রোম খাড়া হতে বাধ্য। সুপ্রতিম বাবু চেষ্টা করেছেন ইতিহাসকে এক থ্রিলারের রূপ দিতে, কিন্তু তাকে সামান্যতম বিকৃত না করেই। এতে গল্পের বিল্ড-আপ, ক্লাইম্যাক্স, সবই মন ছুঁয়ে যায়। কখনও মন ভারাক্রান্ত হয়, কখনও বা রাগ চেপে বসে।
বিনয় বাদল দীনেশের রাইটার্স অভিযান ছাড়া বাকি অনেক গল্পই হয়তো আমাদের অজানা।ইতিহাসবিদ বা গবেষকরা হয়তো জানবেন, কিন্তু আমরা কখনও শুনিইনি সুশীল সেনের নাম, চিনেছি ক্ষুদিরামকে। মানিকতলা বোমা মামলা বা আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় ব্যারিস্টর চিত্তরঞ্জন দাসের চেষ্টায় অরবিন্দ ঘোষের বেকসুর খালাস হওয়ার কথা আমরা পড়েছি, কিন্তু জানতে পারিনি সেই মুক্তিপ্রাপ্তির নেপথ্যে কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বোসের ভূমিকার কাহিনী, যাদের দশদিনের ব্যবধানেই ফাঁসিকাঠে প্রাণ দিতে হয়েছিল। বাঘা যতীন বিখ্যাত হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়, কিন্তু পুলিশের প্রবল অত্যাচারের কাছেও নতিস্বীকার না করে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মুখ না খোলার ঘটনায় বীরেন দত্তগুপ্তকে আমরা মনে রাখিনি। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন আমরা পড়েছি, কিন্তু অভিনব উপায়ে রডা কোম্পানির অস্ত্রলুঠের গল্প আমাদের কেউ শোনায়নি।
বাংলার "অগ্নিযুগ"-এর ইতিহাস আমাদের থ্রিলারের ছলে জানাবার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিলেন সুপ্রতিমবাবু। গল্পগুলো পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে এল। বিনয় বাদল দীনেশের রাইটার্স অভিযান পড়ে সত্যি বিভোর হয়ে গেলাম। চোখের সামনে ফুটে উঠল সেদিনের সমস্ত ঘটনা। কোট প্যান্ট পরিহিত ও হাতে বন্দুক নিয়ে বিপ্লবীত্রয়ের সঙ্গে যেন হাঁটলাম রাইটার্স বিল্ডিং-এর করিডর ধরে৷ চোখের সামনে দেখতে পেলাম পুলিশের হাতে আত্মসমর্পণ এড়াতে পটাশিয়াম সায়ানাইডের শিশি খুলে নিমেষে গলায় ঢেলে দেওয়ার সাহস। শ্রদ্ধায় মাথানত হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় আমার ছিল না।
এই বই নিয়ে কোনও নেগেটিভিটি খোঁজাই একটা অপরাধ। তবে খুঁজলেও যে পাবেন না, তার গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি। সব মিলিয়ে আমার বইয়ের সংগ্রহে একটি রত্ন স্থান পেল, এইটুকু বলতে পারি। শেষে তুলে দিচ্ছি বই থেকে উদ্ধৃত একটি অংশ।
"ইউরোপীয় সাজে সজ্জিত হয়ে তৈরি বাদল-দীনেশ৷ একটু পরেই রওনা হওয়ার কথা মৃত্যুযাত্রায়, অথচ ভ্রুক্ষেপহীন দীনেশ পাঠ করছেন রবীন্দ্র-কবিতা। বাদল শুনছেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে।
'যে মস্তকে ভয় লেখে নাই লেখা, দাসত্বের ধূলি আঁকে নাই কলঙ্কতিলক। ... তার পরে দীর্ঘ পথশেষে জীবযাত্রা-অবসানে ক্লান্তপদে রক্তসিক্ত বেশে উত্তরিব একদিন শ্রান্তিহরা শান্তির উদ্দেশ্যে দুঃখহীন নিকেতনে।' "
"এক মিনিটের মনোরঞ্জন"-এর যুগে পাঠকের মনোযোগ দীর্ঘ সময়ের জন্যে কিভাবে ধরে রাখতে হয় সেটা সুলেখক সুপ্রতিম সরকারের ভালোই জানা আছে। এর প্রমাণ আগেও পেয়েছি ওনার গোয়েন্দাপীঠ সিরিজ থেকে। তাই এই আইপিএস-কাম-সাহিত্যিক ভদ্রলোকের লেখা বই হাতে এলেই চট করে পড়ে ফেলি।
"স্বাধীনতা যুদ্ধে অচেনা লালবাজার" বইটিও ব্যতিক্রম নয়। চিত্রনাট্যের স্টাইলে লেখা দশটি কাহিনী পাঠককে নিয়ে যাবে এক উত্তাল সময়ে যখন অভিভক্ত বঙ্গ পথ দেখাতো সারা দেশবাসীকে, স্বপ্ন দেখাতো পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত, নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ, উন্নত এক ভারতবর্ষের। আমাদের আজকের স্বাধীনতা সুদীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পথ পেরিয়ে পাওয়া। তাই বর্তমান এবং আগামী সমাজ যদি সেই সংগ্রামের কাহিনী জানার চেষ্টা না করে, সেই বিপ্লবীদের দূর হতে সশ্রদ্ধ প্রণাম না জানায়, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারেনা।
লেখক এই বইয়ের মাধ্যমে সেই শ্রদ্ধাঞ্জলিই জানিয়েছেন। অসংখ্য "বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা" কাহিনী থেকে বেছে নিয়েছেন সেইগুলি যেখানে ঘটনাস্থল ব্রিটিশ আমলের লালবাজার। আর্কাইভ ঘেটে বের করেছেন কিছু অপেক্ষাকৃত "স্বল্পচর্চিত" বিপ্লবীদের গৌরবগাথা, আবার কিছু ইতিহাসের পাতায় সোনার জলে লেখা কাহিনীও পুনরায় জেগে উঠেছে লেখকের কলম ধরে। শুধু একটা গল্প একটু আলাদা যেখানে "নায়ক" স্বয়ং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!
অবশ্যপাঠ্য এই বইয়ে আমার অভিযোগ শুধু একটাই, বেশ কিছু ফটোপ্রিন্ট খুবই আবছা, তাতে বিশেষ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
পাঠক যদি এবিষয়ে আরো জানতে ইচ্ছুক হন তবে archive.org এ একবার ঢুঁ মেরে দেখতে পারেন, অগ্নিযুগের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বই সেখানে আপনার জন্যে অপেক্ষা করে বসে আছে। জয় হিন্দ।
বইটার নাম লালবাজারের নথিতে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম জাতীয় কিছু হলে ভাল হতো। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধে অচেনা লালবাজার, এই নামটা শুনে মনে হতেই পারে যে, বিপ্লবীদের ব্যাপারে লালবাজারের কোন সাহায্য-সহযোগিতার কথা বলা হচ্ছে (অবশ্য লেখক-প্রকাশক দাবী করতে পারেন যে, এটা সম্পূর্ণই পাঠকের কল্পনা, তারা মোটেই এমন কিছু বোঝাতে চাননি। তবে কিনা, পাঠকের পারস্পেকটিভ নানারকম হতে পারে, সেজন্য ঐতিহাসিক বয়ানের বেলায় দ্ব্যর্থবোধক নাম বা বক্তব্য না দেয়াই সম্ভবত উচিত)। কিন্তু বইটা আসলে বিপ্লবীদের বীরত্ব এবং তাদেরকে নানা সময়ে কিভাবে লালবাজারি গোয়েন্দারা পাকড়াও করে ঠেঙিয়েছে বা হেনস্থা করেছে (এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দ্বীপান্তর বা ফাঁসিকাঠে চালান করেছে) তারই ঐতিহাসিক বয়ান। উপমহাদেশের পুলিশ (ব্রিটিশ আসার আগে কোতোয়াল) চিরকালই শাসকের ঠ্যাঙারে বাহিনীই ছিল, এখনও সেই চরিত্রের কোন পরিবর্তন হয়েছে এমন দুর্নাম তাদের অতি বড় শত্রুও দেবে না।
এমন অনেক বিপ্লবী স্বাধীনতার যুগে আত্মাবলিদান দিয়েছেন যাদের সন্বন্ধে খুব কম তথ্য সাধারণ এর গোচরে রয়েছে। তাদের বীরত্বের গল্প গুলো রোমাঞ্চকর ভাবে তুলে ধরতে সফল লেখক।
One of my favourite books on the Indian Independence struggle is 'India Cried That Night' by Supratim Sarkar. It's a collection of short stories that gave me a glimpse of the immense sacrifices made by the freedom fighters. The ten stories each tell a different tale, and the way all the facts have been gathered up to give it a beautiful narration astounded me. 'India Cried That Night' was originally written in Bengali language and later translated into English by Yajnaseni Chakraborty. The book's about the bloody history of the independence strife, some we know and many we don't. This is a book I'd love to re-read again, for it's a walk through the battle for freedom and identity that the people of this country valiantly fought for.
P.S. This book has an old map of Calcutta (when India was under the British Rule) as a part of it's extended cover, and I absolutely loved the details in it. It's something I wanna keep forever.
Stories from the journey of India’s independence is always captivating and emotional. Hence the moment I looked at the new releases stand, this book grabbed my attention. There were thousands of contributors to this strenuous, bloody and memorable journey but we only know a very few of them by there name. Hundreds of unknowns and unsung heroes laid there lives for the great cause but history defaulted on paying them their due homage. Supratip Sarkar’s work accounts for the efforts and contributions of few such silent heroes who laid their lives without much expectation of seeing the light at the end of tunnel. The book talks about freedom fighters who were instrumental in designing the face of new India one brick at a time. The accounting style connects each of these unsung heroes to major events from the historical struggle of independence. Hence, is an interesting read. I knew the events but didn’t recognise the names of the people involved, this book bridges those gaps for me.
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে পরাধীন ভারতের স্বাধীনচেতা অচেনা সংগ্রামীদের অজানা ১০টি কাহিনী লিপিবদ্ধ হয়েছে। কাহিনীগুলো মূলত ইতিহাসের পাতায় অনুপস্থিত। অনেক চেনা কাহিনীর নেপোথ্যে আরো কত কাহিনী আছে, আর সেই কাহিনীগুলো বাস্তবায়িত করার পিছনে যে আরো কত নাম না জানা সংগ্রামীদের অবদান আছে, তার কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে। তখনকার লালবাজার অবশ্য ব্রিটিশ শাসনাধীন। তাই এই বইতে লালবাজার মূলত anti-hero।
This entire review has been hidden because of spoilers.
I must say I had moist eyes when I read these untold tales of Valor. We not only use non violence but we also used the gun. If the British had not left when they did it would have been a repeat of 1857. They left as they had no choice left. But these revolution minded young men and women. They lived in horrible conditions in jails yet congress men lived in great luxury as compared to them. I wonder why
Absolutely short of words for these unsung hero's of Bengal, who gave their life for our motherland. Besides, written very well by the author. All the stories start with few dialogues and then it goes into the flashback of the whole story, and makes it thrilling at the end.