পড়ে শেষ করলাম নাইট মার্চ নকশালপন্থীদের অন্দরমহলে। লেখিকা আল্পা শাহ নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক। নৃতাত্ত্বিক গবেষণার কাজে আদিবাসীদের সমাজ-সংস্কৃতির ধারা তাদের সাথে থেকে বোঝার জন্য তিনি ঝাড়খন্ডের লালগাঁওতে ২০০৯/১০ সালের দিকে প্রায় দু বছরের মতো সময় কাটিয়েছেন। স্থানীয় এক আদিবাসী নারীর বাসায় থেকে সেখানকার ভাষা শিখে তিনি চেষ্টা করেছেন তাদের একজন হয়ে তাদের সমাজব্যবস্থা বোঝার। সেখানে থাকার সময়ই তিনি দেখেছেন আদিবাসীদের সঙ্গে নকশালপন্থীদের পারস্পারিক বোঝাপড়া এবং সম্পর্ক। আদিবাসী এই গ্রামগুলো মূলত নকশালপন্থী বা মাওবাদীদের দিয়েই পরিচালিত। আদিবাসীরা মাওবাদীদের বলে জঙ্গল সরকার। এই জঙ্গল সরকারের সাথে তাদের সম্পর্ক মূলত পারস্পারিক । মাওবাদীরা যেমন তাদের জন্য স্কুল, হাসপাতাল গড়ে দিচ্ছে, নানা সেবামূলক কাজে সহযোগিতা করছে, আদিবাসীদের অন্যতম আয়মূলক কাজ বন থেকে কেন্দু পাতা সংগ্রহ করার কাজে নায্য মজুরী নির্ধারন করে দিচ্ছে, খনিতে কাজ করা আদিবাসীদের মজুরি বৃদ্ধি করতে এবং নির্ধারন করতে সহায়তা করছে, ঠিক সেভাবেই আদিবাসীরাও মাওবাদীদের খাবার যোগান দেওয়া, রান্না করে দেওয়া, তাদের অনুষ্ঠান সমাবেশে অংশগ্রহণ করা, সর্বোপরি তাদের ইনফরমার হিসেবে কাজ করছে। প্রচুর পরিমান আদিবাসী তরুণ, তরুণী ইচ্ছে হলেই চলে যাচ্ছে মাওবাদী গেরিলা প্ল্যাটুনে যোগ দেওয়ার জন্য। আবার কিছুদিন পরে ফিরেও আসছে। আল্পা শাহের কাছে এ যেন অনেকটা মামাবাড়ি বেড়াতে যাওয়ার মতো। মাওবাদীদের সাথে আদিবাসীদের এই সম্পর্ক তার কাছে নানা কারণেই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয় ওঠে। মূলত, কেন এই সংগ্রাম, নিসের জন্য ঘড়বাড়ি ছেড়ে এই জীবন, সে কি শুধু এক কাল্পনিক সমাজের জন্য নাকি আরও কিছু -এসবই নকশালন্থীদের ভিতরে থেকে বোঝার জন্য তিনি তাদের এক প্লেটুনের সঙ্গে দুশো পঞ্চাশ কিলোমিটার যাত্রাপথের সঙ্গী হয় ওঠেন। ২৫০ কিলোমিটারের এই যাত্রা পথ, সাত দিনে বিহার থেকে ঝাড়খন্ডের লালগাঁও-এ হেঁটে আসা। দিনে নয়, রাতে রাতে হাঁটা। সমগ্র প্লেটুনে তিনিই একমাত্র নারী, তবে পুরুষের ছদ্মবেশে, গেরিলাদের জলপাই রঙের পোশাক পরে তিনি যাত্রার সঙ্গী হয়েছেন তাদের সাথে। খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম, প্রাতঃকৃত্য সবই উঠে এসেছে তার বর্ননায়। সেই সাথে ফাঁকে ফাঁকে প্ল্যাটুন কমান্ডার তিনি বয়স্ক মাও নেতা, একসময় মূল নকশাল আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন তার সাথে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করেছেন তাদের আন্দোলনের মূল সুর। নানা রকম প্রশ্নে বুঝতে চেয়েছেন কোন স্বপ্ন তাদের টেনে এনেছে বা ধরে রেখেছে এই কঠিন সংগ্রামে। সেইসব প্রশ্ন এবং উত্তর পড়তে পড়তে সুমনের গানের কথাই মনে পড়ে-"প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।" স্বপ্ন, ব্যর্থতা আর চ্যালেঞ্জগুলো আগেও যেমন পড়েছি ঠিক তেমনই। যাইহোক, লেখিকা নিজে তাদের সাথে থেকে চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার চেষ্টা করেছেন। সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে গেরিলা যুদ্ধ, তাদের হাত থেকে পালিয়ে বেড়ানো ছাড়া অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও কম না। সামরিক কাজে এতো মনোযোগ তাদের দিতে হয় যে নতুন সদস্যদের সঠিক রাজনৈতিক শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়না, কিংবা বলা যায় ত্বাত্ত্বিক রাজনীতি পাঠের সুযোগ কম। সেকারণে দল ছেড়ে চলে যাওয়া, সুযোগ পেলে অর্থ আত্মস্যাৎসহ আরও অনেক ব্যক্তিস্বার্থের কাজের সাথে যুক্ত হয়ে যায় গেরিলারা। সঠিক রাজনৈতিক শিক্ষার অভাবে স্থানীয় আদিবাসী যারা যুক্ত হয় আন্দোলনের সাথে তারা নিজস্ব বঞ্চনা বা শোষনের ধারণার জায়গা থেকে বের হয়ে এই আন্দোলনকে সমগ্র সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন হিসেবে ভাবতে পারেনা। সর্বপরি মাওবাদীরা ব্যক্তিগত ও দলগতভাবে যে সংগ্রাম বা কঠিন জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে যায় সেটাকে শেষতক টেনে নেওয়ার জন্য প্রত্যেককে সন্ন্যাসীদের মতো সাধনার জীবন যাপন প্রয়োজন। যেটা আসলে সকলের জন্য মানা কঠিন। তার জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ রাজনৈতিক শিক্ষা, চোখের সামনে শোষণহীন সমাজের এক পরিষ্কার চিত্র। এইসব আলোচনার পাশাপাশি এই সময়ে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত নেতৃত্ত্ব , সমর্থক , নারী গেরিলাদের নারী হিসেবে চিরাচরিত টানাপোড়েন এবং পিছনে ফেলে দেওয়ার রাজনীতি, খনিতে কাজ করা কন্ট্রাকটর ও মাওবাদী আন্দোলনের গিভ এন্ড টেকের সম্পর্ক , দুর্নীতি , সাংস্কৃতিক দূষণের কথাও এই বইতে আলোচিত হয়েছে। লেখিকা বায়াস না হয়ে নির্মোহ হয়ে তার অভিজ্ঞতা লেখার চেষ্টা করেছেন বলে ভিন্ন চোখে এই আন্দোলনকে দেখার সুযোগ হয়েছে।