‘পৃথিবীর পথে হেঁটে’ গ্রন্থটি অলকনন্দা প্যাটেলের ছেলেবেলার স্মৃতিকথা। এর কেন্দ্রে রয়েছেন তাঁর পিতা অর্থনীতিবিদ-অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্ত (১৯০৩-৯২)। আর সে-সূত্র ধরেই অনেকটা সাংগীতিক-গড়নে, নানাভাবে নানারকম মানুষকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা। সেইসঙ্গে জীবনের বিচিত্র ঘটনা ও তার অভিঘাতের বিবরণ। এককথায় তাঁর ছেলেবেলার ওপর ভর দিয়ে অলকনন্দা প্যাটেলের গোটা জীবনের একটা পরিচয় পাওয়া যাবে এ বইয়ে। অলকনন্দা তাঁর স্মৃতিকথার শুরুতেই জানিয়েছেন, ‘দুটি জিনিস মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পদ, কেউ তা কেড়ে নিতে পারে না। যতদিন মানুষ জীবিত থাকে। অনুভূতি ও স্মৃতি।’ তাঁর স্মৃতিকথায় আমরা ঘটনার বিবরণের পাশাপাশি এই অনুভূতি আর স্মৃতির নানা পরিক্রম দেখতে পাই। স্মৃতি তো কখনো-কখনো বেপথু হয়। সেইটি জানতেন বলেই অলকনন্দা নিজের অন্তর্গত তাগিদ থেকেই এ-বিষয়ে তাঁর ‘মায়ের চিঠির ঝাঁপি ও ডায়েরির পাতা’র সহায়তা নিয়েছেন। তুলে ধরেছেন ‘১৯৩৩-এর পর থেকে অন্তত ষাট বছরের ইতিহাস।’ যার কেন্দ্রে রয়েছে শহর ঢাকা। একেবারে নিজের কথা, নিজেদের পরিবারের কথাই তিনি বলেছেন, সেইসঙ্গে এমনটিও আশা করেছেন যে, ‘আমাদের নিজস্ব কথা থেকে ঢাকা শহরের একটি সমাজের কিছুটা ছবি পাওয়া যাবে।’ হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ব্যাপারটিও অলকানন্দার স্মৃতিকথায় নানাভাবে উঠে এসেছে। এছাড়া সে সময়ের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা এবং তার অভিঘাতে দেশভাগ, দেশছাড়ার যে বেদনার্ত ছবি তাও উঠে এসেছে তাঁর সাবলীল লেখনীতে।
অর্থনীতিবিদ ড. অমিয় দাশগুপ্তের কন্যা অলকানন্দা প্যাটেল, যিনি জন্মেছেন ঢাকায়, যার সঙ্গে দেশভাগপূর্ব ঢাকার সম্পর্ক আত্মিক এই বই তারই অনবদ্য স্মৃতিকথা। প্রথমদিকে পড়তে আনন্দ পেলেও শেষদিকে লেখার গতি যেন অস্বাভাবিক কমে গিয়েছিল। তাই পড়তেও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না৷ তবে এটুকু বলব অলকানন্দা প্যাটেলের লেখার হাত ভালো। বিশেষকরে খুঁটিনাটি বর্ণনার গুণ অতি উচ্চমানের। সামাজিক ইতিহাস বিবেচনা করলে এই বইটির মূল্য অপরিসীম।
যতটা আগ্রহ নিয়ে শুরু করেছিলাম ততটা পেলাম না। প্রথম লাইনেই বইটাকে বাতিল করে দিচ্ছি না। অর্থনীতির শিক্ষক অমিয় দাশগুপ্তের কন্যা, নিজেই অর্থনীতিবিদ অলকা প্যাটেলের এই বইটি আত্মজীবনী নয়। আমার ভুল ছিল আমি আত্মজীবনী হিসেবে পড়তে শুরু করেছিলাম। বইটা মূলত স্মৃতিচারণ মুলক। লেখিকা এখানে তার জীবনের ভিন্ন পর্যায়ের বিভিন্ন মানুষ, বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন। স্মৃতিচারণের ক্ষেত্রে লেখিকা ঘটনার চেয়ে মানুষের দিকে বেশি নজর দিয়েছেন। যেমন বইয়ের অর্ধেকটাই তার পিতা অমিয় দাশগুপ্তর কথা বলে। তার জীবনের কথা বলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ইতিহাস, ঘটনাও বলে। কিন্তু শব্দ বাক্যে সে সব অনেকটা প্রতিবেদনের মতো আমার কাছে প্রতিভাত হলো। ঘটনায় প্রবেশ করা হলো না। বইয়ে ঘুরে ফিরে বারবার অশোক মিত্রর কথা এসেছে এবং আমি খেয়াল করে দেখলাম অশোক মিত্রর 'আপিলা চাপিলা' এবং 'পৃথিবীর পথে হেঁটে' বইয়ে একটা মিল হচ্ছে অশোক মিত্রও ঘটনার চেয়ে মানুষের (নিজের গণ্ডির মানুষ) কথা বেশি বলেছেন। আত্মজীবনী পড়ার ক্ষেত্রে বা স্মৃতিচারণের ক্ষেত্রেও অনেকের লেখা পাঠককে নস্টালজিক হতে বাধ্য করে। আমি এ বইয়ে সে জিনিসটা পাইনি। এমনকি অলকা যখন বরিশাল এবং গৈলার কথা লিখেছেন সেখানেও এলাকা বা সময়ের চেয়ে তিনি মানুষের কথাই বেশি লিখেছেন। নিজের গণ্ডির মানুষদের কথা। জনমানুষ নয়। তবে দাঙ্গা, দেশভাগ বা ঢাকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যেটুকু কথা আছে তাতে একে অনেকে 'সময়ের সামাজিক ইতিহাস' বলতে পারেন। তবে সেটাও খুব বেশি মনে হয় না।
একটা ছোট্ট রসিকতা করার লভ সামলাতে পারছি না। সেটা হলো লেখিকা তার পরিবারের খরচের একটা লিস্ট তুলে দিয়েছেন বইয়ে। একেকবারে পারফেক্ট অর্থনীতিবিদ সংসার।
পুরো লেখাটি মূলত স্মৃতিচারণমূলক রচনা যার শুরু হয়েছে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানার গৈলা গ্রাম থেকে ঢাকার গেন্ডারিয়া, পুরোনো পল্টনে। একটা পরিবারের গল্প যে পরিবারের কথা শুনে শুধু মুগ্ধতাই পাড়ে। তন্ময় হয়ে পড়বার সময় খেয়াল করছিলাম যেন এক্ষনি শেষ না হয়ে যায়। লেখার ধরণ এমন যে পড়া শেষ করবার পরেও অনেকক্ষন চুপ করে বসেছিলাম।
লেখিকার জীবন, দিন যাপন এবং পারিবারিক বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনায় তার চোখ দিয়ে পূর্ব বাংলার সেই সময়, মানুষজন, পরিবেশ আর ইতিহাস দেখা হল অনেকখানি। তিনি পরিবারের অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ও তুলে ধরতে ভুলেননি। লেখাতে লেখিকার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক প্রবাদপ্রতিম ড: অমিয়কুমার দাশগুপ্তসহ আরো অনেক গুণীব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
একটা পরিবারের নিজস্ব ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে একটা দেশ এবং দেশভাগের নিদারুন যন্ত্রণার ইতিহাস! দেশভাগের এই দুখ যন্ত্রনার ভাগিদার ছিল এপার-ওপার বাংলার মানুষই।