প্রতিটা দিন কীভাবে কাটে ফিলিস্তিনে বসবাসরত মানুষের? প্রতিদিন ধরপাকড়, বুলডোজার, রকেট হামলা, মৃত্যুর মিছিল, লাশ নিয়ে প্রতিবাদী মানুষের ঢল--এসব নিত্যঘটনার আড়ালে একটা জীবন তো তাদের আছে। যে জীবনে খাওয়া-পরার জন্য ভাবতে হয়, কাপড় পরিষ্কার থেকে শুরু করে ঘরদোর ঝাড়-মোছ করা, বিয়ে-সন্তান-ভালোবাসা; ধ্বসে পড়া দালানের নিচ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াতে হয় খাবারের দোকানের সামনে--কিছুক্ষণ পরই শুরু হয়ে যাবে কারফিউ।
ফিলিস্তিনে এই জীবনটা কেমন? ফিলিস্তিনি লেখিকা সুয়াদ আমিরি রামাল্লা শহরতলীর এক পুরোনো দালানের জানালা দিয়ে আমাদের দেখিয়েছেন ফিলিস্তিনের সেই জীবন, যা আমরা কল্পনা করতে কোশেশ করি। সংগ্রামরত ফিলিস্তিনের বিক্ষুব্ধ একটা সময়কে তিনি মলাটবদ্ধ করেছেন তাঁর ডায়েরির পাতায়। তিনি নিজে সেই সময়ের কেবল একজন সাক্ষীই নন, তিনি ইসরাইলি তা-বের বিরুদ্ধে রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়ে থাকা এক অকুতোভয় যোদ্ধাও; পাঠকমাত্রই যার পরিচয় পাবেন বইয়ের অন্দরে।
ফিলিস্তিন নামটা শুনলেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে আল আকসা, মৃত্যুর মিছিল, বুলেট-বুলডোজার আর ইসরায়েলি দখলদারিত্বের মহামারিতে ধুকে ধুকে মরা একখণ্ড পরাধীন ভূখণ্ডের টুকরো টুকরো চিত্র। এই টুকরো চিত্রগুলোর উৎস বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন সংবাদপত্রের হেডলাইন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কিছু ভিডিও ক্লিপ। একজন ফিলিস্তিনির চোখ দিয়ে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব দেখার সুযোগ(বা কুযোগ) আমাদের হয়ে ওঠে না। ফিলিস্তিনি লেখিকা সুয়াদ আমিরি ফিলিস্তিনের রামাল্লা শহরতলীর এক পুরোনো দালানে বসে তার লেখনীর মাধ্যমে আমাদের তার চোখ দিয়ে ফিলিস্তিনের দখলদারিত্বের পরোক্ষদর্শী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। ‘রামাল্লা থেকে বলছি’ মূলত লেখিকার ১৯৮১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত লেখা দিনলিপির সংকলন। সে সময়ের লেখিকার নিত্যদিনের জীবনের কাহিনীই ফুটে উঠেছে এই বইয়ের পাতায় পাতায়।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
আমি যদি এক শব্দে বইটা সম্পর্কে আমার অনুভূতি প্রকাশ করি তাহলে বোধহয় শব্দটা হবে ‘ফালতু’। লেখিকা বোধহয় তার ডায়েরির পাতাগুলো কোনোরকম সম্পাদনা না করেই ডিরেক্ট পাবলিশ করে দিয়েছেন। কিছু জায়গার লেখা হয়তো শুধু লেখিকাই বুঝবেন আবার কিছু জায়গায় এমন কিছু চরিত্রের আবির্ভাব ঘটেছে যাদের সাথে লেখিকা পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিতে ভুলে গিয়েছেন। কোনো কোনো জায়গায় কোনো ঘটনা একেবারে অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছে, ঘটনাপ্রবাহ কোনোরকম সামঞ্জস্য ছাড়াই এগিয়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে।
অনুবাদও খুব একটা ভালো হয়নি, অনুবাদ আরও সাবলীল হওয়া প্রয়োজন। হয়তো অনুবাদের কারণেই বইটা পড়ার সময় বইয়ের প্রতি আমার কোনো অনুভূতিই সৃষ্টি হয়নি।
যদি মনে করে থাকেন বইটা পড়ে ফিলিস্তিন সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পারবেন তাহলে ভুল ভাবছেন। এই বই পড়ে শুধু লেখিকার তার শাশুড়ি সম্পর্কে করা অভিযোগ আর লেখিকার পাশের বাসার ভাবির ‘দ্য বোল্ট অ্যান্ড দ্য বিউটিফুল’-এর ফিলিস্তিনি সংস্করণ ছাড়া তেমন বিশেষ কিছু জানা যাবে না। ফিলিস্তিন নিয়ে আরো অনেক ভালো বই আছে সেগুলো পড়ুন, এটা পড়ে আমার মতে শুধু সময় আর অর্থ নষ্ট ছাড়া আর কিছু হবে না।
সত্যি কথা বলতে, ফিলিস্তিনের মানুষের দুঃখ, দুর্দশা আর নির্যাতিত হওয়ার বর্ণনা এই বইতে যেভাবে পাবো ধারনা করেছিলাম তা হয়নি। লেখিকার কলমের ধারও ততটা তীক্ষ্ণ মনে হয়নি। যার কারণে দুর্দশার বর্ণনা যাওবা এসেছে তা কোন অনুভূতির সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্য এর পেছনে যেটা কারণ হতে পারে তা হোল, লেখাগুলি আত্নজীবনী বা বই হিসেবে লেখা হয়নি, লেখা হয়েছে ডায়েরী হিসেবে। তাই একেকটা খন্ডচিত্রের মধ্যেও বুনন ততটা জোরালো হয়নি। তবে অনুবাদকের প্রশংসা করতে হয়। প্রথম অনুবাদ হিসেবে তিনি বেশ ভালোই করেছেন বলতে হবে।