রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৮৫–১৯৩০) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ, অভিলেখ বিশেষজ্ঞ এবং সাহিত্যিক। তার জন্ম মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে। ১৯১০ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। প্রথমে তিনি কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে কাজ শুরু করেছিলেন এবং পরে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণে যোগ দেন। ১৯২২ সালে মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করার কৃতিত্ব প্রকৃতপক্ষে তাঁর ছিল। এ ছাড়া তিনি পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার ও মন্দির খনন করেছিলেন এবং মহাস্থানগড়, ঘোড়াঘাট ও তেজপুরের দহ পার্বতীয়া এলাকায় প্রত্নবস্তু আবিষ্কার করেছিলেন। ভারতের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের ওপর নতুন তথ্য আহরণ করেছিলেন তিনি। তাঁর স্বল্প জীবনে তিনি বাংলা ও ইংরেজি ভাষা মিলিয়ে প্রায় চোদ্দোটি তথ্যসমৃদ্ধ পুস্তক, নয়টি উপন্যাস এবং তিনশোর বেশি প্রবন্ধ লিখেছেন।
বাংলা অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি। কারা এই অঞ্চলে প্রথম এসেছিল কিংবা কারা এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা; তা নিয়েও কাদা ছোঁড়াছুড়ি এখনো বর্তমান। গন্ধমাদন পর্বতের ইতিহাসকে নিয়ে কাজ করতে লেখকদের কী পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয় তা এই অখণ্ড সংস্করণ হতে ধারণা পাওয়া যায়। বাংলা অঞ্চলের প্রাচীনযুগ হতে শুরু করে মধ্যযুগের সময়কালকে দুই মলাটে তুলে এনেছেন লেখক।
আর্যদের আগমন ও অনার্যদের সাথে দ্বন্দ্ব মূলত বর্তমান সময়ের শ্রেণি বৈষম্যকেই মনে করিয়ে দেয়। বিভিন্ন সময়ে এই শ্রেণি বৈষম্য বাংলা অঞ্চলে প্রকট আকার ধারণ করেছিল। মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, মুসলিমদের বিজয়, দিল্লিতে সুলতানি শাসনের পালাবদলের ইতিহাসকে স্থান দেওয়া হয়েছে বইটিতে। তবে একটা ব্যাপার যা হিন্দু লেখকদের মধ্যে লক্ষ করা যায়, তা হলো মুসলিমদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই দোষ হতে বের হতে পারেন নি। অবশ্য ইতিহাস লিখতে গিয়ে অধিকাংশ লেখকেরাই নিজস্ব পক্ষের মতামতকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে; সেই বক্তব্য ইতিহাসকে অনুসরণ করুক বা না করুক। বইটিতে বিভিন্ন সময়ে খনন করে প্রাপ্ত শিলালিপি ও মূর্তির ছবিগুলো প্রাচীন শাসনামলের উপস্থিতি জানান দেয়।
আসলে কেউ যদি সিরিয়াস কোনো ইতিহাসের বই পড়তে চায় তাহলে এই বইটি পড়বেন। কারণ বইটির ভাষা অনেকটা জটিল এবং অনেক তথ্যে ঠাসা। বাংলা অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে এই বইটির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। হ্যাপি রিডিং।
প্রথমেই বলে রাখা এই বই সবার জন্য চোখ বন্ধ করে সাজেস্ট করার মতো না। লেখনী বেশ জটিল। কাহিনী বিন্যাসও ঠিক গোছানো না। তবে ইতিহাসের মোটামুটি ভালো একটা ধারণা পাবেন। কোথায় কার মুদ্রা, শিলালিপি পাওয়া গেছে, আর তা দিয়ে কি বোঝায় এসব ব্যাখাতে বইয়ের বেশিরভাগ অংশ গেছে। সময়ের সাথে অনেক তথ্য এখন পরিবর্তন হয়ে গেছে, তা বইটার উপযোগিতা কমিয়েছে বৈ কি!! হিন্দুদের বীরত্ব তুলে ধরতে কি লেখক একটু বেশিই মনোযোগী ছিল না? আর বাংলাদেশী বইপত্র প্রকাশনীর প্রকাশিত সংস্করণে এতো বেশি ভুল মনে হয় তাদের প্রুফরিডার নেই।
গুরুত্বের বিচারে এই গ্রন্থ যে অসামান্য, তা আমার মতো সামান্য কলমচির বলা সাজে না; কিন্তু ভাষাগত প্রকরণ ও বাক্যগঠনের অলিগলিতে এই গ্রন্থটি পাঠের সুখ নানা সময় হারিয়ে যেতে পারে। দুটি খণ্ড একসঙ্গে এই অখণ্ড সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছে। কেউ যদি বাঙলার ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানচর্চা করতে পরিশ্রমী হন, তবে এই বইটি তাঁর অবশ্য পাঠ্য। এরপর দীনেশচন্দ্র সেনের "বৃহৎ বঙ্গ" দুই খণ্ড ও তারপর নীহাররঞ্জন রায়ের বইটি পড়লে বেশ উপকার পাবেন। তবে কিছুক্ষেত্রে ভাষা ও বানানগত ভিন্নতা গ্রন্থপাঠের হাল আমেজকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই শখের পাঠে এই বইটি না পড়াই ভালো।
প্রণম্য এই লেখক যে পরিশ্রম করে গ্রন্থ দুটো রচনা করেছেন, তা প্রবাদপ্রতিম বললেও কম বলা হবে। বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত প্রত্মনিদর্শন ও গ্রন্থের আলোকে তিনি ইতিহাস বিচার করেছেন। বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থ ও জীবনীর আলোকে যেমন ইতিহাসের তুলনামূলক ছবি মূর্ত করেছেন, তেমনি নিজের সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন তথ্য প্রমাণাদির ওপর নির্ভর করে। সে অর্থে "বাঙ্গালার ইতিহাস" বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লেখা বাঙলার ইতিহাস- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।