চলুন পাঠক, কিছু সময়ের জন্য গোয়েন্দা হয়ে যাই। কী ধরনের কেস চাই? খুন, চুরি-ডাকাতি, প্রতারণা, নাকি নিছক গুপ্তধন সন্ধানের রহস্য? সবই রয়েছে আমাদের হাতে। আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে ছ’টি জটিল, দুর্বোধ্য, মাথা-ঘোরানো রহস্য। আর সেগুলো সমাধানের জন্যে আপনাকে সাহায্য করবেন বিশ্বসেরা দু’জন গোয়েন্দা - শার্লক হোমস ও মিস মার্পল। তা হলে আর দেরি কেন, চলুন, তাঁদের সঙ্গে ঢুঁ মেরে আসি অপরাধজগতের আনাচে-কানাচে।
বাসা- অফিস অফিস-বাসা ঠিক এভাবেই বইটা শেষ করলাম। দারুণ। ক্রিস্টি আর ডয়েলের সংমিশ্রণ এক কথায় অসাধারন। আর বরাবরের মতই আরমান ভাই অসাধারন অনুবাদ করেছেন।
সত্যি বলতে ক্রিস্টির উপর থেকে মন উঠে যাচ্ছে। না ।ক্রিস্টির বই খারাপ লাগে না। আসলে ব্যাপারটা হ্যাগার্ডের মত হয়ে যাচ্ছে। হ্যাগার্ড যেমন একই ফর্মুলা ব্যবহার করে। অচেনা দেশ যেখানে সাদা চামড়ার পা পড়েনি। আর যেখানে থাকে এক সুন্দ্রী দেবী। তেমনি ক্রিস্টির বইগুলাও একটা প্যাটার্নে চলে। আশপাশের খুনি। খুব পরিচিত কেউ। তেমন মার প্যাচ না থাকা মোটিভ ।কিন্তু শেষে গিয়ে একটা ঘরোয়া নাটক মঞ্চস্থ করে খুনিকে ধরা। রহস্য না ,প্যাটার্নের উপর বিরক্তি ধরে যাচ্ছে। শুধু এখনো পড়ে যাচ্ছি সুলেখক আরমান ভাই আর সায়েম ভাইরা অনুবাদ করেন বলে। নাইলে অনেক আগেই ইস্তফা দিয়া দিতাম।
মৃত্যু পরোয়ান একটি যুগপৎ সংকলন। অনুবাদক ঈসমাইল আরমান ভাইয়ের রহস্য সাহিত্যের দুই দিকপাল নিয়ে কাজ করার পার্টানটা আমার কাছে চমৎকার লেগেছে৷ এই সংকলনে ৫টি গল্প ও একটি নভেল দিয়ে সাজানো হয়েছে৷ মূল নভেল মৃত্যু পরোয়ানা মিস মারপল সিরিজের "A Murder Is Announced" থেকে অনুবাদ করা হয়েছে৷ সংকলন পড়ে আমার ক্ষুদ্র পাঠ্যনুভূতি না হয় শেয়ার করা যাক৷
কালনাগিনী, সন্ধি বিচ্ছেদ, লাল বরণ কেশ শার্লক হোমসের শর্ট স্টোরিজ৷ বেশ ছোটবেলায় পড়েছিলাম বিধায় মনে ছিল না ভালোভাবে৷ আবার সেবার রুপান্তর কারণে শৈশব ঝালাই করার সুযোগ পেলাম৷ বেশ চমৎকার সব গল্প, সে যুগের তুলনায় বেশ ইউনিক সব প্লট৷ আশা করি পাঠক আশাহত হবেন না৷
আজব তামাশা, আমি মার্পল শর্ট স্টোরিজ দুইটা মিস মারপল সিরিজ৷ নভেল শুরু করার আগে ওয়ার্ম আপ হিসাবে বেশ ভাল৷
এবার আশা যাক মৃত্যু পরোয়ানার ব্যাপারে৷ ক্রিস্টি প্লট মানেই ইউনিক কিছু হবে৷ তবে তারা লেখার সাথে যারা পরিচিত তাদের ধারনা আছে এক গদবাধা ছকের বাহিরে ক্রিস্টি বের হয় না৷ তার সেরা কাজ গুলো ছকের ভিতর দিয়ে বের হয়ে আসে৷ তাই ক্রিস্টির বই কখনই একটানা অনেক গুলো পড়া উচিত নয়৷ ধীরে ধীরে রসিয়ে রসিয়ে পড়া উচিত৷
এবার ও আমি সর্বাত্মক চেষ্টা দিয়ে সারা গল্পে কালপ্রিটের পিছে দৌড়লাম কিন্তু দিন শেষে এমন চমক পেলাম যেইটা আমার বুনো কল্পনায় ও আশার কথা না৷ কেমনে সম্ভব? ক্রিস্টি তাই তো রহস্যের জাদুকর৷
প্লটটা হিসাবে বেশ ইউনিক ছিল। দৈনিক কাগজে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে আসে একটি বিজ্ঞাপণ। সেই বিজ্ঞাপণ অনুযায়ি নিদিষ্ট তারিখ, নিদিষ্ট সময়ে চিপিং ক্লেগহর্নের গ্রামের লিটল প্যাডকস নামে একটি বাড়িতে খুন হবে৷ কে জারি করলো মৃত্যু পরোয়ানা?
মৃত্যু পরোয়ানা একটানে টেনে যাবার মত বই৷ অনুবাদের মান নিয়ে কোন অভিযোগ নেই৷ আর সেবার পেপাপব্যাক তার সৃষ্টির আদি থেকেই এক ধারায় চলছে৷ তাই প্রোডাকশন কোয়ালিটি না হয় এখানে উহ্য থাকুক৷
রহস্য সাহিত্যের দুই দিকপাল স্যার আর্থার কোনান ডয়েল ও আগাথা ক্রিস্টি সৃষ্ট দুই অমর গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস ও মিস জেন মার্পল বিষয়ক জমজমাট ছয়টা রহস্য কাহিনি নিয়ে সাজানো হয়েছে 'মৃত্যু পরোয়ানা' বইটা। এগুলোর মধ্যে পাঁচটা গল্প ও সর্বশেষ কাহিনিটা মিস মার্পল বিষয়ক পুরোদস্তুর একটা রহস্য উপন্যাস। এই একমাত্র উপন্যাস 'মৃত্যু পরোয়ানা'-এর নামেই রাখা হয়েছে বইটার নাম।
'শেষ যাত্রা' ও 'অপয়া অপরাহ্ন'-এর মতো এই বইয়ের কাহিনিগুলোরও রূপান্তর করেছেন সেবা'র অন্যতম পাঠকপ্রিয় লেখক ও অনুবাদক ইসমাইল আরমান। তাঁর রূপান্তর নিয়ে আসলে নতুন করে ধারণা দেয়ার কিছু নেই। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। এসব ছেড়ে বরং 'মৃত্যু পরোয়ানা'-তে স্থান পাওয়া ছয়টা রহস্য কাহিনির ওপর সামান্য আলোকপাত করা যাক। সেই সাথে পাঠকদের সাথে ভাগাভাগি করবো নিজের পাঠানুভূতিও।
কালনাগিনী - স্যার আর্থার কোনান ডয়েলঃ মিস সুজান কাশিং নামের মধ্যবয়সী এক মহিলা অদ্ভুত এক পার্সেল পেয়েছেন। প্যাকেজ খুলে তিনি বিভৎস এক দৃশ্য দেখতে পান। বাক্সের ভেতরে রাখা মানুষের দুটো কর্তিত কান। নোংরা কোন রসিকতা? নাকি, ভয়ঙ্কর কোন অপরাধের চিহ্ন? এর উত্তর পেতে চায় গোয়েন্দা শার্লক হোমস ও তার সহকারী ড. ওয়াটসনও। গল্পটা যদিও অনেক আগে একবার পড়েছিলাম, তবুও ইসমাইল আরমানের রূপান্তরে আবারো পড়তে একদম খারাপ লাগেনি।
সন্ধিবিচ্ছেদ - স্যার আর্থার কোনান ডয়েলঃ ড. ওয়াটসনের স্কুলজীবনের বন্ধু পার্সি ফেল্পস ফরেন অফিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁর দায়িত্বে থাকা একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধির দলিল হারিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন তিনি। মি. ফেল্পসের সম্মান এখন হুমকির মুখে। তাই অন্ধের যষ্টি হিসেবে তিনক আঁকড়ে ধরলেন গোয়েন্দা শার্লক হোমসকে। সন্ধির দলিল উদ্ধার করতে গিয়ে শার্লক হোমস ও ড. ওয়াটসনকে মুখোমুখি হতে হলো সুচতুর এক ষড়যন্ত্রের। মোটামুটি ভালোই লেগেছে গল্পটা পড়তে।
লাল বরণ কেশ - স্যার আর্থার কোনান ডয়েলঃ 'লালকেশী সংঘ' নামের অদ্ভুত এক সংঘের সদস্য হয়েছেন জাবেজ উইলসন নামের এক ব্যক্তি। এই সংঘের সদস্য হতে হলে আগুনের মতো উজ্জ্বল লাল চুল থাকা চাই। তা আছে বটে মি. উইলসনের। সামান্য কিছু কাজের বিনিময়ে বেশ মোটা পারিশ্রমিক পাচ্ছেন তিনি। কিন্তু এর পরেই অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটায় তিনি সাহায্য চাইলেন গোয়েন্দা শার্লক হোমসের কাছে। আর তার পরেই কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে এলো আস্ত অজগর। গল্পটা বেশ ভালো লেগেছে আমার।
আজব তামাশা - আগাথা ক্রিস্টিঃ হুলস্থুল রকমের ধনী বৃদ্ধ ম্যাথিউ মৃত্যুর আগে তাঁর সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে ঠিক করে গেলেন নাতনী শারমিয়ান স্ট্রাউড ও নাতি এডওয়ার্ড রসিটারকে। তাদের ধারণা, ম্যাথিউ দাদু অনেক সোনা কিনে রেখে গেছেন তাদের জন্য। কিন্তু সেগুলো অদ্ভুত কোন উপায়ে লুকানো আছে। খুঁজেও দেখেছে সবখানে। পায়নি কোথাও। শেষমেষ উপায় না পেয়ে দুই তরুণ-তরুণী সাহায্য চাইলো প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন বৃদ্ধা মিস জেন মার্পলের কাছে। ট্রেজার হান্ট টাইপের এই গল্পটার প্রতিটা বাঁকেই বিস্মিত হওয়ার মতো অনেক উপাদান আছে। বেশ ভালো লেগেছে গল্পটা।
আমি মার্পল - আগাথা ক্রিস্টিঃ বার্নচেস্টারের ক্রাউন হোটেলের উঠেছিলেন রোডস দম্পতি। সেখানেই নিজের রুমে বুকে ছুরি গাঁথা অবস্থায় পাওয়া গেলো মিসেস রোডসের লাশ। মহিলা মানসিক ভাবে সামান্য অসুস্থ ছিলেন। ব্যাপারটাকে শুরুতে আত্মহত্যা হিসেবে ভেবে নেয়া হলেও একসময় বোঝা গেলো ওটা খুনই ছিলো। প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই মি. রোডসের নাম সামনে চলে এলো। এদিকে তাঁর দাবি, তিনি নির্দোষ। মি. পেথেরিকের মাধ্যমে তিনি মিস মার্পলের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। আরো একবার এই সৌম্যদর্শন বৃদ্ধার প্রখর বুদ্ধিমত্তার একটা ঝলক দেখা গেলো। মিস মার্পল বিষয়ক এই গল্পটা আমার খুবই ভালো লেগেছে।
মৃত্যু পরোয়ানা - আগাথা ক্রিস্টিঃ ইংল্যান্ডের শান্ত নিস্তরঙ্গ এক গ্রাম্য এলাকা চিপিং ক্লেগহর্ন। এখানকার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকায় অদ্ভুত এক বিজ্ঞপ্তি ছাপা হলো। সেই বিজ্ঞপ্তির মূল বক্তব্য অনুসারে নির্দিষ্ট একটা তারিখে, নির্দিষ্ট একটা সময়ে চিপিং ক্লেগহর্নের লিটল প্যাডকস নামক বাড়িটাতে একটা খুনের ঘটনা সংঘটিত হবে। হলোও তাই। আহত হলেন বাড়ির কর্ত্রী মিস লেটিশিয়া ব্ল্যাকলক। বলতে গেলে, খুনটা হলো একেবারে সবার চোখের সামনেই। কিন্তু কেউ কিছুই দেখতে পেলোনা। অদ্ভুত শোনাচ্ছে, তাইনা? লিটল প্যাডকসে যখন খুনের ঘটনাটা ঘটলো, সেখানে উপস্থিত ছিলো গ্রামের অনেকেই। সবাইকেই সন্দেহের তালিকায় রেখে ঘটনার তদন্ত শুরু করলো ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর ক্র্যাডক।
ঘটনাক্রমে এসবের সাথে জড়িয়ে গেলেন মিস জেন মার্পল। আর তাঁর আগমনেই যেন ধীরে ধীরে জট খুলতে লাগলো অদ্ভুত এক রহস্যের। এমন এক রহস্য যার সাথে সম্পর্ক আছে উত্তরাধীকার, লোভ, সন্দেহ, প্রেম ও আত্মপরিচয় গোপনের মতো ব্যাপারগুলোর। একটা রহস্য উপন্যাস জমাতে আর কি চাই! রহস্য রানী আগাথা ক্রিস্টির বিখ্যাত মিস মার্পল বিষয়ক রহস্য উপন্যাস 'A Murder Is Announced'-এর চমৎকার বাংলা রূপান্তর 'মৃত্যু পরোয়ানা' আমি দারুন ভাবে উপভোগ করেছি। এই বইয়ের অর্ধেকের বেশি পরিমাণ জায়গা দখল করে রাখা এই রহস্য উপন্যাসটা এতোটাই রোমাঞ্চকর যে একটানে পড়ে যেতেও কোন সমস্যা হবেনা। শেষের ট্যুইস্টটাও দারুন লেগেছে আমার।
'মৃত্যু পরোয়ানা'-এর চমৎকার প্রচ্ছদটাও করেছেন ইসমাইল আরমান নিজেই। তাঁর কাছে অনুরোধ থাকবে স্যার আর্থার কোনান ডয়েল ও আগাথা ক্রিস্টির অমর সৃষ্টিগুলোর রূপান্তরের কাজ যেন তিনি বন্ধ না করেন। শুভকামনা রইলো তাঁর জন্য। অমর একুশে গ্রন্থমেলা'১৯-এ সেবা প্রকাশনীর স্টলে পেতে পারেন এই বইটা। চাইলে সংগ্রহ করতে পারেন। পাঠযজ্ঞ শুভ হোক।
ছোটবেলায় আব্বুর সাথে যখন প্রথম প্রথম বইমেলা এক্সপ্লোর করতে যেতাম তখন স্টলে স্টলে গিয়েই সায়েন্স ফিকশন আর ছোটগল্পের বই খুঁজে বেরাতাম। প্রায় বেশিরভাগ দোকানিরাই জাফর ইকবাল স্যারের বই আমার হাতে ধরিয়ে দিতো। একদিন পাঞ্জেরীর স্টল থেকে বেসিক আলীর কমিক কিনতে গিয়ে পাঞ্জেরী সচিত্র কিশোর ক্লাসিক সিরিজের শার্লক হোমসের অভিযান বইটা নিয়ে আসি। তারপর একদিন পড়া শুরু করার পর আমার ঘাপটি মেরে থাকা মস্তিষ্ককে শার্লক হোমসের পর্যবেক্ষণ আর থিংকিং ক্যাপাবিলিটি বিস্মৃত আর অভিভূত করেছিলো। এরই মধ্যে আমার তিন গোয়েন্দা পড়া হয়ে গিয়েছিলো। কিশোর মুসা রবিনের অ্যাডভেঞ্চার করতে করতে রহস্য উন্মোচন দিয়েই আমার গোয়েন্দা কাহিনী পাঠের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। এই তিনজন কিশোর গোয়েন্দাই আমাকে ডিটেক্টিভ উপন্যাসের দুনিয়াটা চিনিয়েছিলো। এরপর একে একে কাকাবাবু, ফেলুদা, শার্লক হোমস, এরকুল পোয়ারো, মিস মার্পলের সাথে পরিচিত হই আমি। এদের মধ্যে স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের একজন বিস্ময়কর গোয়েন্দা চরিত্র আমার মনে অন্যভাবে দাগ কেটেছিলো। পড়তে পড়তে বইয়ের জগতের ২২১ বি বেকার স্ট্রিটে বসবাসকারী সেই জ্যান্টালম্যান আমার একজন প্রিয় পাত্রে পরিণত হলেন।
সেবছর বইমেলায় সেবা প্রকাশনীর এই বইটিতে চোখ লেগে গিয়েছিলো। কয়েক পাতা উল্টে কনটেক্সট দেখেতো আর না কিনে পারলামই না! শার্লক হোমস আর মিস মার্পলের যুগলবন্দীতে পাঁচটা ছোটগল্প (ছোট গল্প না বলে উপন্যাসিকা বা নভেলা বলা ঠিক হবে বোধহয়) আর একটা ডাউস সাইজের উপন্যাস, সবমিলিয়ে মোট ছয় ছয়টা লেখা মলাটবন্দি আছে এর মধ্যে। শার্লক হোমসের তিনটা ছোট ছোট গল্প আর মিস মার্পলের দুইটা ছোট গল্প আর একটা বিশাল উপন্যাস (১৩৮-৪৩০ পৃষ্ঠা) আছে এর ভিতর।
শার্লক হোমসের গল্পগুলো পড়ার সময় ছোটবেলার মতোই মুগ্ধ হয়েছি। এই মানুষটাকে অন্যমাত্রায় প্রেজেন্ট করেছেন স্যার আর্থার কোনান ডয়েল। রবার্ট ডি জুনিয়র আর বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচের অভিনয়ে এই চরিত্রটা অসাধারণ ভাবে পোরট্রে করা হয়েছে। তিনটা গল্পের কনসেপ্ট একটার থেকে অন্যটা আলাদা। এদের মধ্যে কমন ব্যাপার হচ্ছে জনাব হোমসের বিচক্ষণ মাইন্ড। পড়ার পর বিস্মৃত না হয়ে উপায় নেই! প্রথমটা যদিও একেবারে সোজা সাপ্টা কেস তবে তিনটাই বেশ উপভোগ করেছি আমি। প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র বলে কথা!
আগাথা ক্রিস্টির লেখার সাথে পরিচিত হয়েছি খুব বেশিদিন হয়নি। উনার লেখা পড়ার আগে লেখার উপর বেইজ করে বানানো সিনেমা দেখেছিলাম। সিনেমার নাম Murder on the Orient Express. এরপর এরকুল পোয়ারোর ‘Death On the Nile’ সিনেমা দেখা হয়েছে। বইও পড়া হয়েছে। ‘And Then There Were None’ সংগ্রহে থাকলেও পড়া হয়নি এখনো। এরকুল পোয়ারো একটু আধটু পড়া হলেও এতোদিনেও মিস মার্পলের পড়িনি। এ বই দিয়ে সেটাও পূরণ হয়েছে। আগাথা ক্রিস্টির লেখার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মাঝে অনেক টুইস্ট থাকবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত না পড়লে বুঝতেই পারবেন না টুইস্ট কাকে বলে! উনি একেবারে শেষ পর্যন্ত পাঠককে ধরে রাখতে জানেন তার লেখায়। লেখিকার সব লেখার ক্ষেত্রে এই কথাটা সত্যি নাও হতে পারে। আমি যেকটা পড়েছি সেগুলোর এক্সপেরিয়েন্স থেকে বলেছি আরকি।
সবমিলিয়ে এই বইকে জমে একদম ক্ষীর বলবো আমি! অনুবাদ পড়ে মনে হলো প্রতিটা লাইনের অর্থ ভালো করেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করার কোনো কারণ আমি খুঁজে পাইনি। কিন্তু আমার কপিটায় অনেক পেইজে প্রিন্ট মিসিং পেলাম। এখানে একটুখানি হতাশ হয়েছি এই যা!
শার্লক হোমস আর মিস মার্পল । বইয়ের দুনিয়াতে কিংবদন্তীর দুই গোয়েন্দা। স্যার আর্থার কোনান ডয়েল ও অগাথা ক্রিস্টির দুই অমর সৃষ্টি।
এ বইটিতে শার্লক হোমস এর তিনটি গল্প আর মিস মার্পল এর দুটি গল্প একটি উপন্যাস স্থান পেয়েছে। উপন্যাসের নাম থেকেই বই এর নাম মৃত্যু পরোয়ানা ৷ বইয়ের প্রধান আকর্ষণও মূলত এই উপন্যাসটিই ৷ কলেবরে বাকি পাঁচটি গল্পের থেকে এটি বেশ বড় । তাই প্রথম ৫টি গল্পকে উপন্যাসটি শুরু করবার আগে হালকা স্ন্যাকসের সাথে তুলনা করা যায়। তাই বলে গল্পগুলো যে ফেলনা তা কিন্তু নয়। বরং প্রতিটিতে ভিন্নধর্মী প্লটের ফলে নানা স্বাদের অভিজ্ঞতা পাবেন। কোনোটিতে তাদের সাথে ছুটবেন লাল কেশী লোকের সন্ধানে আবার কোনোটায় আপনার সামনে থাকবে লুকানো গুপ্তধনের হাতছানি। তাদের সাথে কোনোটায় আ��ার একের পর এক খুনের সমাধানের খোঁজে নেমেছেন কোনোটায় নেমেছেন হারানো সন্ধির সন্ধানে। প্রতিটি গল্পই তাই নিজ নিজ জায়গা থেকে অনন্য।
উপন্যাসটির কথা বলতে গেলে অগাথা ক্রিস্টিকে কেন কুইন অফ ক্রাইম বলা হয় তা বুঝতে পারলাম। লেখিকা শেষে যে প্যাঁচ দিয়েছেন তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। শুধুমাত্র উপন্যাসটির জন্যই বইটিকে পয়সা উশুল বিবেচনা করা যায়।
আর অনুবাদের ক্ষেত্রে অভিযোগের কোনো প্রশ্নই আসে না। সেবার বই যে টপনচ অনুবাদ হবে তা জানা কথা। তবে অজানা কথা যেটি হলো আমার বইটির কপিটিতে বেশ কিছু পেজ মিসিং ছিল। ঐ পেজগুলোতে কি মিস করলাম তা পরের পেজগুলোতে আন্দাজ করতে গিয়ে নিজেকেই যেন গোয়েন্দা মনে হচ্ছিল।
প্রথমে বলে রাখি ‘লাল বরণ কেশ’ গল্পটি আমি সেবা প্রকাশনীরই কোন বই থেকে পড়েছিলাম আগে। নিশ্চয়ই কোন ভলিউমের ভেতরেই হবে। সেই গল্প আবার ভাঙ্গিয়ে অন্য ভলিউমে ছাপানো মানে পাঠককে ঠকানো। এই একটা কাজের জন্য থ্রি স্টার দিলাম, নইলে এটা ফোর স্টার পাবার মতো বই।
ইসমাইল আরমান ভালো অনুবাদ করেছেন প্রতিটি গল্পেরই। পড়তে পড়তে আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম শার্লক-ওয়াটসন আর মিস মার্পলের রহস্যের সমাধান খুঁজে চলা গোয়েন্দাদের মাথার ভেতরে। যাইহোক, যেটা বুঝলাম মিস মার্পল মানবচরিত্র নিয়ে বেশী জানেন, বেশী বোঝেন। তার কাজের ধরণ হিউম্যান বিহেভিয়ার - সেন্টার্ড। আর শার্লকের কাজের ধরণ পুরোপুরি সিস্টেমেটিক। পর্যবেক্ষণ তার প্রধান অস্ত্র। ওয়াটসন না থাকলেও শার্লক একাই একাই সব চালিয়ে যেতে পারতো তার এই রিগোরাস সিস্টেমেটিক আর অবজার্ভেশনাল কাজের পদ্ধতির কারণে।
শার্লক আসলে বড় সমস্যাটার সমাধান করতে চায়। সে বুঝতে চায় প্রকৃতি আসলে কি উদ্দেশ্যে পৌঁছাতে চায় মানুষের এইসব আপাতদৃষ্টিতে ‘সিলি’ আর অপ্রয়োজনীয় কাজকর্মের মাধ্যমে। তাই প্রথম গল্প ‘কালনাগিনী’র শেষে নিজেই স্বগতোক্তি করে শার্লক হোমস - ‘দুঃখ, হিংসা, আর আতঙ্কের যে চক্রে আমরা বাঁধা পড়ে আছি, এর উদ্দেশ্য কী? মহাবিশ্ব কি এসবের মাধ্যমে কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে চায়, নাকি পুরোটাই খামখেয়াল? তা-ই বা কী করে হয়? প্রকৃতি তো জুয়া খেলে না।..... চিরন্তন এই প্রশ্নের জবাব মানুষ কোনোদিন পাবে বলে মনে হয় না।’