“মহাভারতের কৃষ্ণ মুষলপর্বে অসহায় চোখে যদুবংশ ধ্বংস হতে দেখেছিলেন। এটা ইতিহাস নয়,কাব্যকথায় যদিও বলা হয়ে থাকে,যা নেই মহাভারতে তা ভারতে নেই। তাই ইতিহাসে না থাকলেও ইতিহাস হয়ে গেছে মহাভারতের অনেক ঘটনা। সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি না তা আগামীকাল বলতে পারবে। ”- মৌষলকাল উপন্যাসের শেষ অংশ এটি। অনেকেই এই উপন্যাসটি পড়ার পর মনে করেছেন সিরিজটি হয়ত শেষ হয় নি। কিন্তু বাস্তবিক অবস্থা বিবেচনায় এই সিরিজটির পরবর্তী কিস্তি বের হওয়ার সম্ভাবনা কম, কিভাবে? সেটা আলোচনার একদম শেষে বলছি।
সমরেশ মজুমদারের টেট্রালজি বা চতুষ্কের সর্বশেষ কিস্তি ‘‘মৌষলকাল’’। মৌষলকালের অর্থ বা এমন নামকরণের কারণ লেখক উপন্যাসটিতেই উল্লেখ করেছেন, তারপরও পাঠক সুবিধার্থে সহজ ভাবে বললে-
মৌষল হল মহাভারতের একটি অংশবিশেষ। উপন্যাসের নামকরণ হয়েছে রুপক অর্থ।
৭০ এর দশক ও সেই থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়ের সাথে লেখক কুরুক্ষেত্র পরবর্তি অংশের রুপক সাদৃশ্য বিবেচনায় এই উপন্যাসের নাম দিয়েছেন 'মৌষলকাল'।
এই সিরিজটি সম্পূর্ণটাই রাজনৈতিক পালাবদল নিয়ে রচিত হয়েছে। উত্তরাধিকারে লেখক দেখিয়েছেন স্বাধীনতা পরবর্তী কংগ্রেস শাসন। পরবর্তীতে কালবেলায় তুলে ধরেছেন কংগ্রেসের প্রতি অন্যান্য দকের অনাস্থা, বামপন্থী দলের বিরোধিতা ও নকশাল আন্দোলন। তৃতীয় কিস্তি কালপুরুষে চিত্রায়িত হয়েছে সিএমপির ক্ষমতা দখল ও নিজেদের সমাজতান্ত্রিক নীতি ভুলে পুঁজিবাদ রাজনীতির চর্চা। টেট্রালজির শেষ খন্ড অর্থাৎ মৌষলকালে সমরেশ মজুমদার দেখিয়েছেন সিএমপির পতন ও তৃনমূল কংগ্রেসের উত্থান। অনেকেই বলেছেন “মৌষলকাল- কালবেলা, কালপুরুষের যোগ্য উত্তরাধিকার নয়”। ব্যাপারটিকি আসলেই তাই!
শুরু থেকেই নায়কের ভূমিকা পালন করা স্বর্গছেড়ার সেই ছোট্ট বালক অনি প্রৌঢ় হয়েছে। তার ছেলে অর্ক রীতিমতো যুবক বয়সের শেষার্ধে। অর্কর চিরিত্রে আগেকার খণ্ডের প্রধান চরিত্রগুলোর ছায়া প্রতিফলিত হলেও সে তার নিজ ব্যক্তিত্ব, চিন্তা, স্বপ্ন, সমাজ পরিবর্তনের ইচ্ছা এই বৈশিষ্ট্য গুলো উপন্যাসটিকে আলোকিত করেছে।
সাধারণ মানুষকে স্বপ্ন দেখানো মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস দলটি বিধানসভায় নির্বাচিত হয়, কিন্তু আগের সেই অসাধু চক্র থেকে বের হতে পারে না পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। মানুষের কল্যানের জন্য আবারও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে অর্ক, কিন্তু সেই রাজনীতি তাকে গ্রহণ না করে উগড়ে ফেলে দেয় সেই ভাগাড়ে, যেখান্র একসময় তার বাবা ছিলেন, সে নিজেও ছিলো। কিন্তু এবার বাবা ছেলে দুইজনই সেই আস্তাকুড়ের বাসিন্দা! অসহায় ভাবে অনিমেষের পথের পানে চেয়ে থাকে মাধবীলতা- যে পঁয়তাল্লিশ বছরেও মানুষটিকে চিনতে পারলো না। অপরদিকে কুন্তি থাকে অর্কের প্রতীক্ষায়! যেই মাওবাদীকে অস্বীকার করেছিলো তৃণমূল নেত্রী, সেই মাওবাদীদের প্রশ্রয় দেওয়ার অপরাধেই গ্রেফতার হতে হয় তাদের! এমন প্রহসনই তো চলছে বিশ্ব রাজনীতিতে। তাই উপন্যাসের শেষাংশে সমরেশ বলেছেন-
“কোটি কোটি মানুষকে স্বপ্ন দেখানো দিদি যেন মহাভারতের মুষলপর্বের শ্রীকৃষ্ণ”।
উপন্যাসটিকে সময় অনুযায়ী পড়লে পাঠক হতাশ হওয়ার কথা নয়। অনেক পাঠকই কালবেলা'র মতো একশন চান, বিপ্লব চান। কিন্তু বাস্তবিতা কি বলে! ১৯৪৭ পরবর্তী রাজনীতি বা ১৯৭০ সালের নকশাল আন্দোলন কি ২০০৮ এ সম্ভব? মোবাইল ফোন কানে নিয়ে স্টেনগান হাতে কোনো বিপ্লবী দৌড়াচ্ছে- এগুলো সিনেমায় হয়ত সম্ভব। কিন্তু বাস্তব সময়কে তুলে ধরতে গেলে অবশ্যই বাস্তবতার নিরিখেই গল্পটি সাজাতে হয়- যা সমরেশ মজুমদার পেরেছেন বলেই মনে করি আমি। পাঠক বর্তমান সময়কার প্রেক্ষাপট কল্পনায় রেখে বইটি পড়লে আশাহত হবেন না বলেই আমার বিশ্বাস।
এবার বলি, কেনো আমার মনে হয়েছে যে এই টেট্রালজির পরবর্তী খণ্ড বের হবে না।
আমার দৃষ্টিতে লেখক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পালাবদল নিয়েই এই সিরিজটিতে কাজ করেছেন। সেক্ষেত্রে প্রথমে কংগ্রেস শাসন, বামপন্থী আন্দোলন ও নকশাল আন্দোলন, সিএমপি শাসন, সিএমপি বিরোধী আন্দোলন ও তৃনমূল কংগ্রেসের ক্ষমতা দখল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির প্রতিটা বাঁক তুলে ধরেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে এটা পরিষ্কার ভাবেই বলা চলে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী আন্দোলনের সম্ভাবনা বা শূন্যের কোঠায়। তবে যদি লেখক তৃণমূলের শাসন ব্যবস্থা দেখাতে চান, তাহলে হয়ত আরেকটি খণ্ড আসতেও পারে, তবে আমি তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।
সমরেশ টেট্রালজিটি আপনাকে রাজনৈতিক চাল বুঝতে শিখাবে, আবেগী রাজনীতির ফলাফল দেখাবে, সর্বোপরি আপনাকে খুব ভালো সঙ্গ দিয়ে যাবে।