হাদীসের সনদের বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে বা কোনো হাদীসকে ‘সহীহ’, ‘যয়ীফ’ বা ‘বানোয়াট’ বলার ক্ষেত্রে আমি পুরোপুরিই নির্ভর করেছি পূর্ববর্তী মুহাদ্দিস ও ইমামগণের মতামতের উপর। পুস্তকের মূল পাঠে আমি সংক্ষেপে হাদীসটির সনদের বিষয়ে তা ‘সহীহ’, ‘যয়ীফ’ বা ‘বানোয়াট’ বলে উল্লেখ করেছি। পাদটীকায় হাদীসটির সূত্র ও সনদ বিষয়ক মন্তব্যের সূত্র উল্লেখ করেছি। পাদটীকায় উল্লেখিত গ্রন্থগুলিতে বা গ্রন্থগুলির কোনো একটিতে সনদ বিষয়ক আলোচনা রয়েছে। যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি ইমাম বুখারী, তিরমিযী, নাসাঈ, তাহাবী, দারাকুতনী, বাইহাকী, যাহাবী, ইবনু হাজার, সাখাবী, সুয়ূতী ও অন্যান্য পূর্ববর্তী প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসের মতামতের উপর নির্ভর করার। …..বিস্তারিত জানতে বইটি পড়ুন
ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর ছিলেন একাধারে ইসলামী চিন্তাবিদ, টিভি আলোচক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিস বিভাগের অধ্যাপক আলেম, গবেষক ও লেখক ।
তিনি পিস টিভি, ইসলামিক টিভি, এটিএন ও এনটিভিসহ বিভিন্ন টিভিতে ইসলামের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। ফরেন টেলিভিশন চ্যানেল আইটিভি ইউএস-এর উপদেষ্টা ছিরেন তিনি । এছাড়াও তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সিম্পোজিয়াম, সেমিনার, মসজিদের খুতবায় ও টিভি আলোচনায় খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে দেশের সহজ-সরল মুসলমানদের ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়গুলো আলোচনা করে জনসচেতনতা তৈরি করে আসছিলেন।
এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বের জন্ম হয় ১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের ধোপাঘাট গোবিন্দপুর গ্রামে। তার পিতা খোন্দকার আনওয়ারুজ্জামান ও মা বেগম লুৎফুন্নাহার।
তিনি ১৯৭৩ সালে ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করেন । এরপর একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৭৫ সালে আলিম এবং ১৯৭৭ সালে ফাজিল ও ১৯৭৯ সালে হাদিস বিভাগ থেকে কামিল পাস করার উচ্চতর শিক্ষার জন্যে সৌদি আরব গমন করেন। রিয়াদে অবস্থিত ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাঊদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৮৬ সালে অনার্স, ১৯৯২ সালে মাস্টার্স ও ১৯৯৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তর রিয়াদ ইসলামি সেন্টারে দাঈ ও অনুবাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
রিয়াদে অধ্যয়নকালে তিনি বর্তমান সৌদি বাদশাহ ও তৎকালীন রিয়াদের গভর্নর সালমানের হাত থেকে পর পর দু’বার সেরা ছাত্রের পুরস্কার গ্রহণ করেন। সৌদিতে তিনি শায়খ বিন বাজ বিন উসায়মিন, আল জিবরিন ও আল ফাউজান সহ বিশ্ববরেণ্য স্কলারদের সান্নিধ্যে থেকে ইসলাম প্রচারে বিশেষ দীক্ষা গ্রহণ করেন।
রিয়াদে অধ্যয়নকালে তিনি উত্তর রিয়াদ ইসলামি সেন্টারে দাঈ ও অনুবাদক হিসেবে প্রায় তিন বছর কর্মরত ছিলেন।
লেখাপড়া শেষ করে ১৯৯৮ সালে কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামি স্টাডিজ বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন।
১৯৯৯ সালে তিনি ইন্দোনেশিয়া থেকে ইসলামি উন্নয়ন ও আরবি ভাষা বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
২০০৯ সালে তিনি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে প্রফেসর পদে উন্নীত হন।
ঝিনাইদহ শহরের গোবিন্দপুরে আল ফারুক একাডেমি ও আস সুন্নাহ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন বরেণ্য এই ইসলামী ব্যক্তিত্ব। সেখানে ছেলেমেয়েদের হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব হিসেবে কাজ করেছেন শিক্ষা ও ঝিনাইদহের চ্যারিটি ফাউন্ডেশনে, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউটের।
এছাড়াও তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দারুস সালাম মাদ্রাসায় খণ্ডকালীন শায়খুল হাদিস হিসেবে সহীহ বুখারীর ক্লাস নিতেন। তিনি ওয়াজ মাহফিলের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন আলোচক ছিলেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে তিনি মানুষকে শোনাতেন শাশ্বত ইসলামের বিশুদ্ধ বাণী।
বাংলা ইংরেজি ও আরবি ভাষায় সমাজ সংস্কার, গবেষণা ও শিক্ষামূলক প্রায় পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- এহয়াউস সুনান, তরিকে বেলায়েত, হাদিসের নামে জালিয়াতি, ইসলামের নামে জঙ্গীবাদ ইত্যাদি।
ফুরফুরা শরীফের পীর আবদুল কাহহার সিদ্দীকির মেয়ে ফাতেমার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
এই বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহ তা’য়ালা। তিনি আপনার এবং আমার স্রষ্টা। আমরা তাঁর সৃষ্টি। আমরা তাঁরই বান্দা। তাই তাঁর আদেশ-নিষেধ পালন করা আমাদের জন্য আবশ্যক। তাঁর নির্দেশ অমান্য করলে ধ্বংসের মুখে পতন নিশ্চিত। কিন্তু যিনি আপনার স্রষ্টা তিনি আপনার অকল্যাণ চাইবেন সেটা কী করে হয়? সেজন্যই তো তিনি আমাদের জন্য সবকিছু নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আমাদের জন্য কোনটি কল্যাণকর আর কোনটি অকল্যাণকর সেটা তাঁর চাইতে ভালো আর কেউ জানে না। কিন্তু আপনি যদি সেই নির্ধারিত বিষয়ের বাইরে যাওয়ার দুঃসাহস দেখান তবেই তো আপনার জন্য ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।
ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহি.) তাঁর এই বইটিতে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নারী ও পুরুষের পোশাক-পরিচ্ছদ কেমন হওয়া উচিত সেটা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। পোশাক-পরিচ্ছদ ও দেহসজ্জার ব্যাপারে তিনি সুন্নাহর অনুসরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। পোশাকের গুরুত্ব, শরীয়তে এর আদব ও মূলনীতি, নারী ও পুরুষের সুন্নাহসম্মত পোশাকের বিস্তারিত বিবরণ, বৈধ পোশাকের ধরণ এবং রঙ, সালাতের জন্য পোশাক, মহিলাদের পোশাক ও পর্দা, দৈহিক পরিপাট্য ইত্যাদি বিষয়ের ওপর এই বইটি রচিত। এই বইটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো লেখক প্রত্যেকটি বিষয়ের দলিলভিত্তিক আলোচনা করেছেন এবং পরস্পর সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রদান করেছেন। বর্তমান সময়ের একটি বিতর্কিত বিষয়- মহিলাদের জন্য মুখ ঢাকা ফরজ কি না- সেটা নিয়ে লেখক এই বইটিতে পক্ষে-বিপক্ষে দলিল ও অভিমতসমূহ নিয়ে নিরপেক্ষ আলোচনা করেছেন যা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। মুসলিম হিসেবে এই প্রত্যেকটা বিষয় আমাদের বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
সভ্য মানুষের অন্যতম সম্পদ হলো তার পোশাক। পশুরা কোনো পোশাক পরে না। কারণ তারা অসভ্য। কিন্তু মানুষ পোশাক পরে। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি হলো পোশাক। কিন্তু আপনি যেমন-তেমনভাবে পোশাক পরবেন তা হবে না। ঐ যে বললাম, তিনি সবকিছুই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সবকিছু শিক্ষা দেয়ার জন্য তিনি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা.)-কে প্রেরণ করেছিলেন। রাসূল (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ করার মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি। তাই পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে আমাদের উচিত সর্বতোভাবে তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ করা। নিজের খেয়াল খুশিকে দ্বীনের ওপরে প্রাধান্য দিলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। সৃষ্টি যখন তার স্রষ্টার দেয়া বিধান অমান্য করে তখন সেখানে বিশৃঙ্খলা অবশ্যম্ভাবী। পশ্চিমা বিশ্বের মানুষজনের মধ্যে নিজের খেয়াল-খুশিমতো চলার প্রবণতা বেশি। পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও তারা নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে। যার নাম তারা দিয়েছে ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ ও ‘আধুনিকতা’। তথাকথিত আধুনিকতার নামে তারা তাদের পোশাক দিন দিন ছোট করছে। বিশেষ করে মহিলাদের পোশাক। ডা. জাকির নায়েক বলেছিলেন, “শরীর দেখানো যদি আধুনিকতা হয়, তাহলে পশুরা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক।” যার জন্য আমাদের সমাজে অশ্লীলতার প্রসার ঘটছে। শয়তান অশ্লীলতার প্রসার ঘটাতে চায়। হযরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) যখন শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে গন্দম ফল খেয়ে ফেলেছিলেন তখন সর্বপ্রথম তাঁদের গা থেকে জান্নাতি পোশাক খুলে পড়ে। আর শয়তান সেটাই চেয়েছিল। আল্লাহ তা’য়ালা সূরা আল-আ’রাফের ২৭নং আয়াতে বলেন, “হে বনী আদম, শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে, যেভাবে সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল; সে তাদের পোশাক টেনে নিচ্ছিল, যাতে সে তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখাতে পারে। নিশ্চয়ই সে ও তার দলবল তোমাদেরকে দেখে যেখানে তোমরা তাদেরকে দেখ না। নিশ্চয়ই আমি শয়তানদেরকে তাদের জন্য অভিভাবক বানিয়েছি, যারা ঈমান গ্রহণ করে না।”
এজন্য আমাদের উচিত সুন্নাহসম্মত পোশাকের গুরুত্ব অনুধাবন করা। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পর্দার বিধান রয়েছে। আর এই ব্যাপারে নারীদের আরো বিশেষভবে সচেতন থাকা উচিত। কেননা আল্লাহ্ তা’য়ালা তাদেরকে আকর্ষণীয় করে সৃষ্টি করেছেন। তাই নারীদের জন্য পোশাক ও পর্দার বিশেষ গুরুত্ব বিদ্যমান।
প্রত্যেকটি মুসলিমের জন্য তাই পোশাক, পর্দা ও দেহসজ্জা নিয়ে বিস্তারিত জানা থাকাটা আবশ্যক। এই না জানার কারণে অনেকে অনেক ধরণের বিড়ম্বনার শিকার হয়ে থাকেন। তাই বাংলা ভাষাভাষিদের জন্য এই বইটি লেখকের পক্ষ থেকে একটি অনবদ্য অবদান।
আমরা ভালোবাসি রাসূল ﷺ কে। কতটা? নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি। মা বাবার চেয়ে বেশি। তাহলে নিশ্চয়ই তার আদর্শ আমরা ধারণ করে চলবো। তিনি যেভাবে চলেছেন আমরাও সে পথের পথিক হবো। গোটা দুনিয়ার মানুষের কাছে যে ﷺ লোকটি আদর্শ হিসেবে বিবেচিত, মুসলিম উম্মাহর প্রাণের স্পন্দন সে ﷺ লোকটির পোশাক ও দেহ সজ্জা কেমন ছিলো! তা জানার জন্য এটা একটি অসাধারণ বই। সেই সাথে সমাজে প্রচলিত পোশাক নিয়ে নানান ভ্রান্তি নিরসনের জন্যেও অবশ্যই পাঠ্য।