ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর ছিলেন একাধারে ইসলামী চিন্তাবিদ, টিভি আলোচক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিস বিভাগের অধ্যাপক আলেম, গবেষক ও লেখক ।
তিনি পিস টিভি, ইসলামিক টিভি, এটিএন ও এনটিভিসহ বিভিন্ন টিভিতে ইসলামের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। ফরেন টেলিভিশন চ্যানেল আইটিভি ইউএস-এর উপদেষ্টা ছিরেন তিনি । এছাড়াও তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সিম্পোজিয়াম, সেমিনার, মসজিদের খুতবায় ও টিভি আলোচনায় খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে দেশের সহজ-সরল মুসলমানদের ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়গুলো আলোচনা করে জনসচেতনতা তৈরি করে আসছিলেন।
এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বের জন্ম হয় ১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের ধোপাঘাট গোবিন্দপুর গ্রামে। তার পিতা খোন্দকার আনওয়ারুজ্জামান ও মা বেগম লুৎফুন্নাহার।
তিনি ১৯৭৩ সালে ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করেন । এরপর একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৭৫ সালে আলিম এবং ১৯৭৭ সালে ফাজিল ও ১৯৭৯ সালে হাদিস বিভাগ থেকে কামিল পাস করার উচ্চতর শিক্ষার জন্যে সৌদি আরব গমন করেন। রিয়াদে অবস্থিত ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাঊদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৮৬ সালে অনার্স, ১৯৯২ সালে মাস্টার্স ও ১৯৯৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তর রিয়াদ ইসলামি সেন্টারে দাঈ ও অনুবাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
রিয়াদে অধ্যয়নকালে তিনি বর্তমান সৌদি বাদশাহ ও তৎকালীন রিয়াদের গভর্নর সালমানের হাত থেকে পর পর দু’বার সেরা ছাত্রের পুরস্কার গ্রহণ করেন। সৌদিতে তিনি শায়খ বিন বাজ বিন উসায়মিন, আল জিবরিন ও আল ফাউজান সহ বিশ্ববরেণ্য স্কলারদের সান্নিধ্যে থেকে ইসলাম প্রচারে বিশেষ দীক্ষা গ্রহণ করেন।
রিয়াদে অধ্যয়নকালে তিনি উত্তর রিয়াদ ইসলামি সেন্টারে দাঈ ও অনুবাদক হিসেবে প্রায় তিন বছর কর্মরত ছিলেন।
লেখাপড়া শেষ করে ১৯৯৮ সালে কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামি স্টাডিজ বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন।
১৯৯৯ সালে তিনি ইন্দোনেশিয়া থেকে ইসলামি উন্নয়ন ও আরবি ভাষা বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
২০০৯ সালে তিনি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে প্রফেসর পদে উন্নীত হন।
ঝিনাইদহ শহরের গোবিন্দপুরে আল ফারুক একাডেমি ও আস সুন্নাহ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন বরেণ্য এই ইসলামী ব্যক্তিত্ব। সেখানে ছেলেমেয়েদের হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব হিসেবে কাজ করেছেন শিক্ষা ও ঝিনাইদহের চ্যারিটি ফাউন্ডেশনে, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউটের।
এছাড়াও তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দারুস সালাম মাদ্রাসায় খণ্ডকালীন শায়খুল হাদিস হিসেবে সহীহ বুখারীর ক্লাস নিতেন। তিনি ওয়াজ মাহফিলের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন আলোচক ছিলেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে তিনি মানুষকে শোনাতেন শাশ্বত ইসলামের বিশুদ্ধ বাণী।
বাংলা ইংরেজি ও আরবি ভাষায় সমাজ সংস্কার, গবেষণা ও শিক্ষামূলক প্রায় পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- এহয়াউস সুনান, তরিকে বেলায়েত, হাদিসের নামে জালিয়াতি, ইসলামের নামে জঙ্গীবাদ ইত্যাদি।
ফুরফুরা শরীফের পীর আবদুল কাহহার সিদ্দীকির মেয়ে ফাতেমার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
মাত্র ১৬ পৃষ্ঠার একটা বই, অথচ ১৬০০ পৃষ্ঠার বইয়ের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ এবং যথোপযুক্ত আলোচনায় সমৃদ্ধ। মুসলিম উম্মাহর বিভেদ আর অনৈক্যের মহামারী নিয়ে সবাইই শঙ্কিত। কিন্তু এর মূল কারণগুলো কি, কীভাবে এর থেকে উত্তরণ পাওয়া যাবে এ নিয়ে টু-দ্য-পয়েন্টে উপযুক্ত আলোচনা খুব কমই আছে। ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার ঐক্যের ব্যাপারে সবময়ই বলতেন এবং এ ব্যাপারে ওনার সমসাময়িক আর কেউই সম্ভবত এত চমৎকার করে বলতেন না। এই বইতেও তিনি তাঁর সেই যোগ্যতার সাক্ষর রেখেছেন। অল্প কথায় একেবারে মূল কথাগুলো তুলে ধরেছেন। অনেকেই ঐক্যের কথা বলে। সেই ঐক্যের মূল কথা হলো, 'আসেন আমাদের দলে আসেন, আমরা একসাথে কাজ করি' - তাঁদের দলে গিয়ে তাঁদের সাথে কাজ করাটাকেই তারা মুসলিমদের মাঝে ঐক্যের স্বরূপ হিসেবে প্রচার করে। কেন তাঁদের দলে যেতে হবে? কারণ 'তারাই একমাত্র হকপন্থী দল'। তারা ছাড়া বাকিরা কি? 'ভ্রান্ত'। এই মনমানসিকতাই যে মূলত মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সবচাইতে বড় বাধা সেটা খুব চমৎকারভাবে আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন। তিনি 'ইখতিলাফ' (মতভিন্নতা) আর 'ইফতিরাক' (দলাদলি) এর ব্যাখ্যা করে বলেছেন কেন 'ইখতিলাফ' কোন সমস্যা না। সাহাবী, তাব-তাবেঈনদের সময়ও ইখতিলাফ ছিলো এবং তারা সেটা নিয়েই নিজেদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব এবং সম্প্রীতি বজায় রেখেছেন। অথচ আমরা এখন ইখতিলাফকে উপলক্ষ করে দেদারছে ইফতিরাকের পথে হাঁটছি। "ইখতিলাফের ভিত্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইলম বা জ্ঞান ও দলিল। আর ইফতিরাকের ভিত্তি সর্বদাই ব্যক্তিগত পছন্দ বা প্রবৃত্তির অনুসরণ, জিদ এবং ইখলাসের অনুপস্থিতি।" খুবই ছোট্ট একটা বই, এক বসায় পড়ে ফেলার মত। কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ন। সুযোগ করে পরে ফেলার অনুরোধ রইলো।
মতভেদ (ইখতিলাফ) ও দলভেদের (ইফতিরাক) মধ্যে যে পার্থক্য বিদ্যমান তা আমরা কেউই বুঝতে সক্ষম হই না। জ্ঞান ও দলীলের ভিত্তিতে পৃথক আর স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণের ভিত্তিতে পৃথক হওয়া কি কোনোভাবেই এক হতে পারে?
মতপার্থক্য মানেই আমাদের কাছে দলাদলি করা, পার্থক্য করা, বিচ্ছিন্ন করা। অথচ সাহাবা, তাবেয়ীদের নিজেদের মাঝে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তাদের মাঝে ছিল এক অসাধারণ ঐক্য।
আর ঐক্য মানেই আমাদের কাছে অন্য সব মতকে বাতিল বলে নিজের মতের মানুষদের একত্রিত করা। অথবা সব মতকে একীভূত করা। অথচ হাতের পাঁচটি আঙুল সমান না হওয়া সত্ত্বেও তা দিয়ে সুন্দরভাবে কোনো বস্তুকে ধরা যায়। মুষ্টিবদ্ধ করে আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। এর জন্যে হাতের আঙ্গুল কেটে সমান করার কোনোই প্রয়োজন হয় না।
মুসলিমদের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিত, এই সমস্যার কারণ ও নিরসন নিয়ে স্যারের লেখা মাত্র ১৬ পৃষ্ঠার এই পুস্তিকাটি ১৬০০ পৃষ্ঠার ১৬টি পুস্তক থেকেও অনেক বেশী ইফেক্টিভ ও তাৎপর্যপূর্ণ।
▪︎প্রত্যেকটা দল আমাদের ঐক্যের কথা বলে। তবে তাদের কথার ধরণ অনেকটা এমন, "আমাদের দলে আসো, আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকবো।" মতভেদ আছে, ছিলো এবং থাকবেও যুগ যুগ ধরে। এ মতভেদ মানেই বিভক্তি না। ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীয়তা, পদ্ধতি এবং না থাকার পরিণাম নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে। জামায়াতের অর্থ নিয়ে সকল ভুল ধারণা বা ভুল অর্থ পরিস্কার হয়ে যাবে আশা করছি। পরিশেষে, ঐক্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে এই বই অবশ্য পাঠ্য।
☆☆☆ছোট্ট বই, আকারে একটা প্রবন্ধের সমান। তবে খুবই উপকারী।
বই : কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জামায়াত ও ঐক্য লেখক : খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহিমাহুল্লাহ) মুদ্রিত মূল্য : ২০ টাকা