প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন যে, আমার এই লেখাটি প্রথাগত ‘ইতিহাস গ্রন্থ’ নয়। আবার এটি নিছক কোন ‘ফিকশন’ও নয়। ঐতিহাসিক প্রতিটি তথ্য অক্ষুন্ন রেখে কখনও গল্পচ্ছলে, কখনও পাঠকের সাথে আলাপচারিতার ঢঙে আমি মোগলদের উত্থান থেকে শুরু করে আওরঙ্গজেবের মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের কালক্রমিক ঘটনাবলি বর্ণনা করেছি। সেই সকল ঘটনার প্রতিটা ঐতিহাসিক, এবং ঐতিহাসিকভাবে সত্য। সেখানে কোন কল্পনার আশ্রয় নেই। প্রথাগত ইতিহাস গ্রন্থের কাঠখোট্টা ভাব থেকে বেরিয়ে এসে আমি নতুন ধারায় ইতিহাস কথনের প্রয়াস পেয়েছি, যেন তা আগ্রহী পাঠকদের জন্য সহজপাঠ্য হয়, আবার ঐতিহাসিক সত্যও সেখানে অক্ষুন্ন থাকে। আবার এর পাশাপাশি আছে মোগলদের নিয়ে প্রচলিত নানা উপকথা তথা মিথের সত্য মিথ্যা নিরূপণের চেষ্টাও করেছি। উপযুক্ত তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি মোগল ইতিহাসকে।
তিন বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমে লেখা এই বই সম্পর্কে একথা আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, যাদের ইতিহাসে আগ্রহ আছে তারা এ বই পড়ে আনন্দিত হবেন। যারা গল্প পড়তে চান, তারা এ বইয়ে গল্প খুঁজে পাবেন। আবার মোগল ইতিহাসের নানা বাঁকে আছে রহস্য। যারা থ্রিলার পছন্দ করেন, তারাও কিছুটা থ্রিল খুঁজে পাবেন। আবার যারা ঐতিহাসিক তথ্য তথা একাডেমিক পড়াশোনা করতে চান, তাদের জন্যও এ বইয়ে রয়েছে তথ্যের ভাণ্ডার।
এ বই নিছক ইতিহাস নয়, এটি একটি যাত্রা। আমি আপনাদের একটি যাত্রায় নিয়ে যেতে চেয়েছি। আপনাদের সে যাত্রা মসৃণ করতে সব ধরনের চেষ্টাই আমি করেছি, তবু পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত করা হয়ত সম্ভব হয়নি। সে সব ত্রুটি নিজগুণে ক্ষমা করতঃ যদি আমার গোচরীভূত করেন, তবে আশা রাখি পরবর্তী যাত্রায় তা শুধরে দিতে পারবো।
প্রকৃত রেটিং ২.৫। কেউ যদি মুঘল সম্রাটদের উপর আলাদা করে কোন বই এর আগে পড়ে না থাকে, তাহলে তার জন্য ঠিক আছে। বলা ভাল, কিশোরদের জন্য সরলীকৃত মুঘল ইতিহাস, যেখানে মূলত ঘটনাপঞ্জীগুলো তুলে ধরা হয়েছে সহজ ভাষায়। তেমন কোন বিশ্লেষণ চোখে পড়লো না। লেখকের পড়ার পরিধি প্রশংসনীয়, কিন্তু মুঘলদের মত জটিল চরিত্র আর ইতিহাসকে এত স্বল্প পরিসরে চেপেচুপে ঢোকানোটা মনে হয় ঠিক না। কিছু জায়গায় 'জাজমেন্টাল'-ও মনে হয়েছে, এবং অতি অবশ্যই মুঘলদের দিকে একরকম মুগ্ধতাও দেখা গেছে। রেফারেন্স নিয়ে যে লেখকের আলসেমি আছে সেটা নিজেই ভূমিকায় বলেছেন, কিন্তু সেই আলসেমিটাও বেশিই মনে হয়েছে। ইতিহাস নিয়ে বই লিখলে লেখায় আরেকটু যত্নবান হলে মনে হয় ভাল। সব মিলিয়ে ২ খণ্ড পয়সা দিয়ে কেনা পোষালো না আরকি।
বাবার হইল আবার জ্বর, সারিল ঔষধে! ইতিহাস পড়ার সময় এই ছন্দ একবার মাথায় গেঁথে নিলে প্রধান প্রধান মুঘল সম্রাটদের নাম অন্তত আর ভুল হয় না। উপমহাদেশের শাসনতন্ত্রের ইতিহাসে আমার সবসময়ই সবচেয়ে পছন্দের পিরিয়ড ছিল মুঘল আমল। আর আকবর দ্য গ্রেটকে জানার জন্য ছিল সবচেয়ে বেশি আগ্রহ। নানান সূত্র থেকে খেপে খেপে জানলেও চাইছিলাম একটা কালানুক্রমিক পূর্ণাঙ্গ বিবরণী যা মুঘল ইতিহাস নিয়ে দেবে একটা সলিড ধারণা। মোগলনামা ১ম খণ্ড সেই আগ্রহ অনেকটাই পূরণ করেছে। তরুণ এই লেখক তাঁর প্রথম বইয়ের বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছেন ইতিহাস, সেকারণে প্রথমেই তাঁকে জানাই সাধুবাদ। লেখনশৈলী এমন ছিল যে একের পর এক কাহিনী জানার একটা আগ্রহ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়াও, গল্পের ছলে ইতিহাস বলার কায়দায় মনে হয়নি যেন খুব ভারী কোন তথ্য গেঁথে নিচ্ছি। নানান বই থেকে নির্যাস নিয়ে বর্তমান বইটি লিখলেও এতে ছিল লেখকের নিজস্ব ধারণা এবং মৌলিকতার ছাপ। এতদিন ধরে জেনে আসা ভুল শব্দ পানিপথ যে আসলে পানিপাত, তাও তো জানতাম না। দারাশুকোহ কে সবসময়ই দারুণ ইন্টারেস্টিং লেগেছে, এই বই পড়ে আরো বেশি জানার একটা আগ্রহ কাজ করছে। আওরঙ্গজেবের মনস্তত্ত্ব, ধর্মনীতি এবং রাজনীতিজ্ঞান খুব সুন্দরভাবে আলোচিত হয়েছে। সব মিলিয়ে মুঘল সাম্রাজ্য সম্পর্কে একটা ভালো ধারণার জন্য বইটা বেশ কাজের, একই সাথে উপভোগ্য ও।
শেষ করলাম মাহমুদুর রহমানের 'মোগলনামা: প্রথম খন্ড'। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবুরের উত্থান থেকে শুরু করে আওরঙ্গজেবের মৃত্যু পর্যন্ত ভারতবর্ষের মোগল শাসনের কালক্রমিক বিবরণ দেয়া হয়েছে এই বইতে। ২৯৬ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে গিয়ে একবারের জন্যও বিরক্তি তো আসেই নি, বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে পড়েই গেছি।
লেখক কখনও গল্পচ্ছলে, কখনও পাঠকের সঙ্গে আলাপচারিতার ঢঙ্গে মোগল ইতিহাসের নানা ঘটনা, নানা উপকথা এবং ঐতিহাসিক সত্য উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, এবং আমি বলতে চাই তিনি পুরোপুরি সফল হয়েছেন। তিন বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমে লেখা চমৎকার, সুখপাঠ্য এই বইটির জন্য তিনি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। বইটি লিখতে গিয়ে কি পরিমাণ খাটাখাটনির প্রয়োজন হয়েছে তা বইয়ের শেষে দেয়া সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি দেখেও আন্দাজ করা যায়।
যারা ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী, মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে আগ্রহ আছে, তাদের জন্য তো এই বই অবশ্যপাঠ্য। যাদের ইতিহাস পছন্দ না, তাদেরও ভালো লাগবে এটা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়।
মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে অত্যন্ত চমৎকার, প্রাঞ্জল এবং ঝরঝরে একটা লেখা মোগলনামা। বাবর থেকে আওরঙ্গজেব এই ছয় সম্রাট নিয়ে আমাদের সবারই কমবেশি পড়াশোনা থাকে। আমিও ব্যাতিক্রম না। আলাদা আলাদা প্রত্যেককে নিয়েই ভালো কিছু বই পড়া ছিল। তাই সম্পূর্ণ বইটা কে বেশ উপভোগ করেছি।
আমার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি ২য় খন্ড নিয়ে। শুধুমাত্র ২য় বাহাদুর শাহ (জাফর)আর ফররুখশিয়ার বাদে আর কারো নিয়ে তেমন পড়াশোনা নেই। দেখা যাক লেখক কিভাবে আমাকে তৃপ্ত করতে পারেন।
ইতিহাস বরাবরই আমার সবচেয়ে আগ্রহের বিষয়। আর সেই ইতিহাস এর বিষয় যদি হয় মোগল আমল তবে তো কথাই নেই৷ এতদিন মোগল আমল নিয়ে যতো বই পড়েছি তার প্রায় সবই ছিলো 'হিস্টরিকাল ফিকশন'। সেসব বই এ যদিও ইতিহাসেরই প্রাধান্য বেশি, তবুও কল্পিত চরিত্রের উপস্থিতি বিভ্রান্ত করতে বাধ্য। তাই খোঁজ ছিলো এমন একটা বইয়ের যা শুধু ইতিহাসটাকেই তুলে ধরবে এবং তা অবশ্যই নীরস ভাবে নয়! এদিক দিয়ে প্রায় পুরোপুরি সফল মোগলনামা বইটি। বাবর থেকে শুরু করে আওরঙ্গজেব এর সময় পর্যন্ত ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো তুলে ধরতে গিয়ে লেখককে যে কম পড়াশোনা করতে হয়নি তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। লেখাও বেশ প্রাঞ্জল। তাই নন-ফিকশন ইতিহাসের বইটা পড়ার সময় কখনোই মনে হয়নি ইতিহাসের কপচানি গলঃধকরণ করছি। আর বর্ণনার সময় লেখক যে শুধু ধারাবাহিক ভাবে ইতিহাসই বলে গেছেন তা নয়। নিজের যুক্তি দিয়ে ঘটনা গুলো ব্যখ্যা দেওয়ারও চেষ্টা করেছেনে যা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার! পরবর্তী খন্ডের অপেক্ষায় রইলাম!
'বাবার হইল একদিন জ্বর সারিল ঔষধে।' ছোট ক্লাসে থাকাকালীন এভাবেই এক শিক্ষক প্রধান ছয় মোগল সম্রাটের নাম মুখস্থ করিয়েছিলেন। মোগল শাসনের স্বর্ণালি যুগ ছিল বাবর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে পরবর্তীতে আরো চৌদ্দ জন সম্রাট হলেও আগের মতো জৌলুশ ছিল না । মাহমুদুর রহমানের মোগলনামা প্রথম খন্ড বইটি, ১৫২৬ সালে বাবরের দিল্লির সিংহাসনে আরোহন হতে শুরু করে ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যু পর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্যের শাসন, সিংহাসনের লড়াই, সাম্রাজ্য বিস্তার ইত্যাদি বিষয়াদি দিয়ে সাজানো হয়েছে।
ভারতবর্ষ এক আজব দেশ। এখানে নানা ধর্মের, বর্ণের মানুষের বসবাস। কারো সাথে কারো মিল নেই। সবাই যার যার মতো স্বাধীন সাম্রাজ্য শাসন করে বসবাস করে। এই মহাদেশে বৌদ্ধ ও হিন্দুরা পূর্ব হতে থাকলেও মুসলিম শাসকদের আগমন অনেক পরে তেরো শতকের শুরুর ��িকে। গুপ্ত, মৌর্য, পাল রাজাদের পর সুলতানি শাসন ছিল দিল্লির সিংহাসনে। ষোল শতকে এই উপমহাদেশে আসেন মোগল শাসকেরা।
ফারগানা (বর্তমান উজবেকিস্তানের একটা শহর)রাজ্যের শাসক ছিলেন বাবরের পিতা উমর শেখ মির্জা। ছিলেন তৈমুর রক্তের অধিকারী। বাবার মৃত্যুর পর মাত্র এগারো বছর বয়সে ফারগানার সিংহাসনে বসেন বাবর। নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে ১৫২৬ সালের দিকে বাবরের নজর পড়ে ভারতবর্ষের দিকে। দিল্লির শাসনে তখন লোদী বংশের ইব্রাহিম লোদি। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে বাবর দিল্লি অধিকার করেন এবং মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
বাবরের মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর এই বংশকে নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে চলতে হয়েছে। বাবর পুত্র হুমায়ুনের শাসনকালে তিনি শের শাহের কাছে দিল্লির সিংহাসন হারান এবং দীর্ঘদিন পালিয়ে বেড়ানোর পর সিংহাসন পুনরায় দখল নিতে সক্ষম হন।
মোগল সাম্রাজ্য তথা ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শাসকদের নাম উল্লেখ করলে সম্রাট আকবরের নাম শুরুর দিকেই থাকবে। কেননা তাঁর সময়েই মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তার হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি ধর্মের দিক দিয়ে ভারতবর্ষকে এক পতাকার নিচে আনার জন্য 'দ্বীন-ই-ইলাহি' ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন। সাম্রাজ্য পরিচালনায় পাশে পেয়েছিলেন আবুল ফজল, বীরবল ও টোডরবলের মতো মানুষদের। আকবর খুব কম বয়সেই ক্ষমতা পান, তাঁর অভিভাবক ছিলেন বৈরাম খাঁ। কিন্তু এই বৈরাম খাঁ-কে হত্যার জন্য আকবর হয়ে আছেন নিন্দিত। যদিও কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আকবরের পর ক্ষমতায় আসেন জাহাঙ্গীর। এবং পরবর্তীতে আসেন জাহাঙ্গীর পুত্র শাহজাহান। শাহজাহানের হাতে যেমন লেগেছিল নিজ বংশের রক্ত সেই একই পথে হেঁটে ক্ষমতায় এসেছিলেন তাঁরই পুত্র আওরঙ্গজেব। আওরঙ্গজেব ব্যপক সংস্কার করেন মোগল শাসনব্যবস্থার। অমুসলিমদের উপর বিভিন্ন আইন প্রণয়নের কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা কমতে থাকে এবং মুদ্রার অন্যপিঠে উত্থান ঘটে মারাঠা সাম্রাজ্যের ছত্রপতি শিবাজীর। মোগল সাম্রাজ্যের সোনালি দিনের সমাপ্তির জন্য আওরঙ্গজেবের হঠকারিতাকে অনেকখানি দায়ী করা হয়।
আপনি যদি খুবই সহজ ভাষায় অর্থাৎ আপনার নিজের ভাষায় মোগলদের ইতিহাস জানতে চান আপনার জন্যই বইটি। খুবই সাবলীলভাবে কালানুক্রমিকভাবে মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস বর্ননা করেছেন লেখক। ইতিহাসের বই সাধারণত একটু রুক্ষ ধরনের হয়। পড়লে মনে হয় খরায় ফেটে যাওয়া ক্ষেতের উপর দিয়ে হাঁটতেছি। আবার কিছু কিছু লেখক ইতিহাসকে গল্পের ঢং এ লিখেন, যা পড়লে সামনে আরো জানার আগ্রহ প্রবল হয়। মোগলনামা তেমন একটি বই। যদিও লেখকের প্রথম বই, সেই হিসেবে লেখকের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।
প্রথম লেখা হিসেবে বইতে ভুল-ত্রুটি থাকাটা স্বাভাবিক। তবে আমার চোখে যা পড়েছে তাই নিয়ে কিছু বলাটা উচিৎ বলে মনে করি। বইটা মূলত মোগল সাম্রাজ্যের সিংহাসন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে। এর বাইরে আকবর ও অন্যান্য সম্রাটের ধর্ম ও আধ্যাত্মিক আলোচনার প্রভাব আলোচিত হয়েছে। মোগলদের ভাষা ও সংস্কৃতির আলোচনা খুব কম করা হয়েছে। ছোট বই হিসেবে অল্পস্বল্প ছিল। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অতীতের ঘটনা প্রাসঙ্গিকভাবে আসবে স্বাভাবিক। তবে অপ্রয়োজনে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।
কৈফিয়তে লেখক বইটিকে নতুন ধারার ইতিহাস বলেছেন। তবে এটা নতুন ধারা বলে মনে হয়নি। এমন ধারায় আরো অনেকেরই বই আছে। আরেকটা কৈফিয়তে লিখেছেন ভিন্ন নামের ব্যাপারে। একেক ইতিহাসবিদ একই নামকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। তবে লেখকের উচিৎ ছিল নিজ স্বকীয়তার উপস্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট একটি নামকে নির্বাচন করা যাতে একই বইতে একই ব্যক্তির দুই ধরনের নাম না থাকে। লেখক এটাও লিখেছেন এমন হলে সেটা অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু একই অনুচ্ছেদে একই ব্যক্তির দুই ধরনের নাম দৃষ্টিকটু।
আকবরকে অপহরণের পর পরের অধ্যায়ে আকবরকে দৃশ্যপটে উপস্থিত করা হয়েছে কিন্তু কিভাবে এখানে আসলো সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। 'দ্বীন-ই-ইলাহিকে ঠিক ইসলামবিরোধী বলা যায়না।' এমন মন্তব্য অযৌক্তিক। কারণ আকবরের নতুন ধর্মে অগ্নি পূজা, সূর্য পূজা ছিল; যা ইসলামের মৌলিক বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া ধর্ম নিয়ে আকবর-অশোকের তুলনামূলক সিদ্ধান্ত মনঃপূত হয়নি।
শাহজাহানের সন্তানদের নাম উল্লেখের সময় সেখানে আওরঙ্গজেব এর নাম ছিল না। তারপর শাহজাহানের স্ত্রী শোকে এক রাতে সব চুল পেকে যাওয়ার গল্পকে লেখকের সমর্থন দেওয়াটা কেমন বিদঘুটে লাগলো! এটাও কি সম্ভব? দারাশুকোহকে নিয়ে লেখা অধ্যায়তে বলা হয়েছে নাদিরা বেগমকে নিয়েই তিনি সুখে ছিলেন এবং আর বিয়ে করেন নি। অথচ কয়েক পৃষ্ঠা পরেই দারার প্রেম কাহিনি এবং নাদিরা বেগমের পর রাণাদিলকে বিয়ের উল্লেখ করেছেন যার ঐতিহাসিক সত্যতা জাহানারার আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়। দারাশিকোহ নাস্তিক ছিলেন কিনা জানিনা, তবে লেখক তাকে নাস্তিক নয় প্রমাণ করতে উদাহরণ হিসেবে সুফি-সাধকদের জীবনী রচনাকে হাজির করেছেন। একজন নাস্তিক অবশ্যই ধর্মীয় ব্যক্তিকে নিয়ে লেখালেখি করতে পারেন। আরেকটি ব্যাপার হইল মোগল সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার শাহ সুজাকে নিয়ে কিছু লেখা উচিৎ ছিল। আরাকানের রহস্য ওভাবেই রেখে দেয়া হয়েছে।
বইয়ে ব্যবহৃত ছবিগুলোর নিচে নাম দিলে ভালো হতো। তারপর ইংরেজি লেখার অনুবাদ। আর সহজ বাংলা আছে এমন শব্দের বিপরীতে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার দৃষ্টিকটু মনে করি।
কয়েক জায়গায় সাল ভুল আছে। একই ব্যক্তি দুই বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন অথচ দুই বছর পর অভিযানে গিয়েছেন, এটা মারাত্মক একটি ভুল। বইটির তিনটি মুদ্রণ হয়েছে, তবে ভুলগুলো সংশোধন করে নতুন সংস্করণ বের করা উচিৎ বলে মনে করি। বইয়ের দামের তুলনায় মান আরেকটু ভালো করলে সুন্দর হতো। একেবারে নড়বড়ে অবস্থা।
মোগল সাম্রাজ্যের আলো-অন্ধকারের গলিঘুচির দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগতম। হ্যাপি রিডিং।
মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে কৌতুহল টা বেশ পুরনো। এমন একটা বই এর সন্ধানে ছিলাম যেটা মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে সম্পূর্ণ ধারণা দিতে পারবে।লেখকের প্রথম কাজ হিসেবে মোগলনামা সত্যিই খুব ভালো মনে হয়েছে।ইতিহাসের নানা মতবাদ, গুজব থেকে বের করে এনে লেখক সঠিক তথ্যটাই উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।এক্ষেত্রে তাঁর পরিশ্রম সত্যিই প্রশংসনীয়। সর্বোপরি নবীন কোন লেখকের নন-ফিকশনের ওপর কাজ দেখে ভাল লেগেছে।আর মোগলদের কথকতা বলে বইটা পছন্দের তালিকাতেই থাকলো।পরবর্তী খন্ডের জন্য অপেক্ষা থাকবে।
মোগলনামা ১ বাবর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত প্রায় আড়াইশো বছরের প্রাথমিক ইতিহাসের তিনশ পৃষ্ঠার ছোটখাটো সংকলন। আসলে একজন মোগল সম্রাটের সময়ের ইতিহাস লিখতে এর চেয়ে অনেক বড় বই লিখতে হবে। মোগলদের একটা ছোটখাটো সামারি জানতে এটা পারফেক্ট এবং প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা সুখপাঠ্য বই। আর যারা বিস্তারিত পড়তে চান এই পিরিয়ড নিয়ে তারাও নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন কারণ এটা কৌতুহল বাড়িয়েই তুলবে। কিছুদিন আগে পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ এসেছে তবে আমি প্রথম সংস্করণ পড়েছি। আসলে বইটা পড়তে একটা ম্যাপ দরকার যা দ্বিতীয় সংস্করণে আনা হয়েছে শুনেছি। ইন্টারনেট থেকে আমাকে বেশ কিছু ম্যাপ, ছবি ও উইকি প্রোফাইল ঘাটতে হয়েছে যদিও অধ্যায়ের শেষে কম-বেশি নোট ও রেফারেন্স ছিল। লেখক হয়তো প্রথমে বইটা আরও সংক্ষিপ্ত করতে চেয়েছিলেন কারণ বাবর ও হুমায়ূন মাত্র ১৩% জায়গা দখল করেছে। তবে গ্ৰেট আকবরের আমল এসে বেশ বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তবুও সামরিক অভিযান সম্পর্কে মাত্র এক লাইন করে খরচ করা হয়েছে। তবে পারিবারিক স্ক্যান্ডালের দিকেই লেখকের ঝোঁক খুব বেশি লক্ষ করেছি! কিছু কিছু প্রচলিত মিথও ভেঙেছেন রেফারেন্স সহকারে। আকবরের বিস্তৃত ইতিহাসের শেষে জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান সম্পর্কে পরিমিত বর্ণনা করা হয়েছে। কিছু বিদুষী মোগল রমণী, সেনাপতি-অমাত্যদের অজানা জীবনও যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে লিখেছেন লেখক। আওরঙ্গজেব একাই নিয়েছে বইয়ের তিনভাগের একভাগ জায়গা এবং সামরিক অভিযান বেশ গুরুত্ব পেয়েছে তার শাসনামলের বর্ণনায়। যাই হোক আওরঙ্গজেব সম্পর্কে বর্তমান প্রচার-অপপ্রচারকে মাথায় রেখে লেখক তার সময়কে ক্ষুদ্র কলেবরেও চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন যেটা অ্যাডমায়ারেবল।
একটা কথা প্রচলিত আছে,ইতিহাস নাকি সবসময়ই নিরস হয়। ইতিহাসের একঘেয়ে বর্ণণার বদান্যতায় অনেকেরই নাকি নিদ্রাদেবীর সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। কিন্তু এই বইয়ে সেই সুযোগ নেই। মোগলদের একেবারে শুরু থেকে 'প্রায় শেষ' পর্যন্ত পুরো ইতিহাসই বর্ণিত হয়েছে এই বইয়ে। কিন্তু সেই ইতিহাস পড়তে আপনার বিরক্তি আসবেনা একটুও। কারণ পুরো বইটিই আসলে একটু 'মজলিশি ঢং'-এ লেখা। লেখক যেন ইতিহাসের ক্লাস নয় বরং একটা গল্প শোনাতে চেয়েছেন আমাদের। বলাই বাহুল্য,সে কাজে তিনি 'প্রায় শতভাগ' সফল ও হয়েছেন। যারা ইতিহাস পছন্দ করেনা তারাও একটানে পড়ে ফেলতে পারবে এই বই।
ইতিহাসের বিভিন্ন বইয়ে একটা ব্যাপার লক্ষ করা যায় প্রায়-ই। প্রায় সব লেখকগণই যেন কোথাও না কোথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রতি হয় পক্ষপাতিত্ব নয়তো অন্যায় সমালোচনা করেছেন। অনেক ভুলকে ঠিক আর ঠিক'কে ভুল বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ও চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই বইয়ে ইতিহাসের কোনো পক্ষের প্রতিই কোনো পক্ষপাতিত্ব বা অন্যায় কিছু চোখে পড়েনি। বরং লেখক সব ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়ে যথেষ্ট খোলামেলা আলোচনা করেছেন এবং যেটা যথেষ্ট রেফারেন্স সহ।
পুরো বইয়ে টুকটাক কিছু টাইপিং মিস্টেক আর শেষের দিকে কয়েকটা ভুল শব্দের ব্যবহার ছাড়া অন্যকোনো ভুল চোখে পড়েনি। তবে, এতোবড় বইয়ে প্রকাশক কেন একটা বুকমার্ক জাতীয় কোনোকিছু দেননি সেই রহস্য আমার বোধগম্য হয়নি।
ইতিহাস ভালোবাসলে,বিশেষত মোগল ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী হলে এই বইটি অবশ্য পাঠ্য। মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আপনার যাত্রা শুভ হোক।
রিভিউ দিচ্ছি না, বই শেষ করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছি কেবলমাত্র।
প্রায় ৩০০ পেইজের এই মোগলনামা আমার কাছে একটা টাইম মেশিন হয়ে ছিল গেল কয়েকদিন ধরে। যেই মেশিনে চড়ে ভারতবর্ষের শত বছর আগেকার ইতিহাস প্রত্যক্ষ করে এসেছি।
বাবুর এর দ্বারা গোড়াপত্তন করা মোঘল সাম্রাজ্যের এই যে বাড়বাড়ন্ত উপমহাদেশের ইতিহাসে, তা যেকোনো থ্রিলার উপন্যাস কে হার মানায় বলে আমার বিশ্বাস।
এখানে কোন খেয়ালী সম্রাট হয়তো সুরায় ডুবে আছে, আবার অন্য কোন সিংহাসন ভাগীদার ঐ সময়েই নতুন কোন চালে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যাস্ত।
রাজমহল থেকে অন্দরমহল সবজায়গায় তেই লেখক সুন্দর করে আলোকপাত করছেন।
এতো এতো চরিত্র চারপাশে কখনো কখনো হয়তো খাপ খাওয়ানোতে মুশকিল হতে পারে। তাই একটু বিরতি নিয়ে নিয়েই এই বই পড়া ভাল হবে।
মাঝেমধ্যে তথ্যের পুনরাবৃত্তি চোখে লাগতে পারে তা ঠিক। আশা করি পরবর্তী পর্বে আরও চমকপ্রদ কিছু পাব লেখকের কাছ থেকে। সেই সাথে আশা করবো বই শেষে লেখক যেই বিরতি নিয়েছে তা যেন অতি শীঘ্রই শেষ হয় 😀।
বইটা প্রথম চোখে পড়ে ফেসবুক মার্কেটিং এর কল্যাণে। স্পন্সরড কোন এক পোস্টে "মোগলনামা", নামটা দেখে আগ্রহ ঠেকল, রকমারিতে গিয়ে সার্চ দিলাম। দুই এক পাতা পড়ে মনে হল ফ্লো আছে, তাই আবদার করে গিফট আদায় করে ফেললাম!
শুরু করার পর থেকেই রুদ্ধশ্বাসে পড়ে শেষ করেছি। এত চমৎকার একটা বই! অফিসে মাঝখানে ১ঘন্টা লাঞ্চ ব্রেক থাকে, সেই ব্রেকেও অনেকটুকু পড়েছি। ঝরঝরে লেখা, পড়তে গিয়ে কোথাও আটকায় না। অথচ এ তো ইতিহাস, লেখকের তো কল্পনার আশ্রয় নেবার মতন খুব বেশি জায়গা নেই। ইতিহাস জিনিসটাকে খুব বাজেভাবে উপস্থাপন করা হয় আমাদের একাডেমিক লাইফে। কিন্তু ইতিহাসের চেয়ে আশ্চর্য জিনিস মানবজাতির "ইতিহাসে" দ্বিতীয়টা নেই। শুরু করেও আমি "গেম অফ থ্রোনস" খুব একটা আগাইতে পারি নাই। তবে কথাবার্তা থেকে যতটুকুন বুঝি, ড্রাগন থাকুক আর না থাকুক মোগল আমলের ঘটনাবলী কোন অংশেই জিওটি থেকে কম না! কূটনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধ, খুন, গুম, বিশ্বাসঘাতকতায় পূর্ণ এই ইতিহাসের কাছে বানানো জিনিস নস্যি!
বইয়ের লেখককে নিয়ে দুটি কথা না বললেই না। ব্যাকফ্ল্যাপে লেখা দেখে জানতে পারলাম এই মাহমুদুর রহমান বয়সে আমার থেকেও তিন বছরের ছোট! আর তিনি এই বই লিখেছেনও তিন বছর ধরে। সবচাইতে আশ্চর্যের বিষয়, তিনি ইতিহাস বা এর ধারেও কাছের কোন বিষয়ের ছাত্র না, তিনি এনএসইউ-তে ইলেক্ট্রিকাল পড়েন! তাকে ধন্যবাদ, বাবর, হুমায়ূন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, আওরঙ্গজেবদের রাজ্যে আমাকে ঘুরিয়ে আনবার জন্য, পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য অসম্ভব আগ্রহ জাগানিয়া একটি বিষয়ের সাথে!
ছোট্ট একটি বিষয়, বইটি একদম শেষ দিকে গিয়ে কেমন খেই হারিয়ে ফেলেছে মনে হয়। তবে এ পাঠক হিসেবে আমার ব্যর্থতাও হতে পারে। কারণ সমস্ত বইয়ের সাথে তুলনা করলে শেষদিকের এই "তুলনামূলক কম আগ্রহ জাগানিয়া" অংশটুকুন নিতান্তই গৌণ!
ছোটোবেলায় "সমাজ" নামের এক বিদঘুটে সাবজেক্টের অধীনে টুকটাক ইতিহাস পাতিহাঁস পড়েছিলাম। মরা মানুষের গল্প। বোরিং লাগতো। তখন নিজেকে কথা দিয়েছিলাম বড় হয়ে আর যাই হোক এই ইতিহাসের পাশ ঘেঁষবো না। নিজেকে দেওয়া আর দশটা কথার মতো এটাও রাখতে পারি নাই।
রাজায় রাজায় লড়াই হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। মোগল সাম্রাজ্যের এক বিশাল ইতিহাস এমনি এমনি গড়ে উঠেনি। বুদ্ধির খেলা থেকে পেশীশক্তি - সবই লেগেছে এই সাম্রাজ্যের উত্থানে। এবং কত উলুখাগড়ার প্রাণ গেল তার খবর কে রাখে! ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে উত্তরে এক পাহাড়ি উপত্যকায় ছিল ফারগানা নামক এক রাজ্য। সেখানকার রাজা উমর শেখ মীর্জা। দুর্ঘটনায় উমর শেখের মৃত্যু হলে উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসনের কাছে যান এগারো বছর বয়সী বাবর।
ছোট রাজ্য কিন্তু সিংহাসন নিয়ে ষড়যন্ত্র ছিল বড়সড়। কাজেই রাজ্য ধরে রাখতে তাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। এরইমধ্যে বাবর সমরখন্দ দখল করেন। এই রাজ্য নিয়ে অনেক বড় ধরনের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু সমরখন্দ দখলের পরেই জানতে পারেন যে ফারগানা তাঁর হাতছাড়া হয়ে গেছে! তখন আবার ফারগানা উদ্ধার করতে গিয়ে সমরখন্দ হারিয়ে রাজ্যহারা রাজায় পরিণত হন তিনি। এই সময়টা কেমন ছিল বাবরের জন্য? আস্তে আস্তে আবার সেনাবাহিনী তৈরি করলেন, পিতৃভূমির আশা বাদ দিয়ে কাবুল দখল করলেন, এবং ফাইনালি পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে দখল করলেন দিল্লির সিংহাসন। সেই থেকে শুরু হয় ভারতের ইতিহাসের আরেক অধ্যায় - মোগলদের ভারত-শাসন!
এখান থেকেই শুরু মোগলনামার যাত্রা। তৈমুরি রক্তের অধিকারী বাবর কেন এই সাম্রাজ্যের নাম মোগল রাখলেন সেই অনুমতি ধারণাও ব্যাখা করা আছে এখানে। বাবরের পরে তাঁর পুত্র হুমায়ুন বসেন সিংহাসনে, এরপরে হুমায়ুনপুত্র আকবর এবং এভাবেই চলতে থাকে। তবে সিংহাসনে বসা মোটেও সহজ ছিল না কারো জন্যই। সিংহাসনের জন্য হারেম এবং হারেমের বাইরে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয়েছে, অনেক মোগল সম্রাট তো পথের কাঁটা বাদবাকি ভাইদেরও দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পিছপা হয়নি!
হুমায়ুন নিয়ে প্রথম একটা বই পড়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদের। বাদশাহ নামদার! স্কুলের থাকাকালীন পড়া। এই বইটা কেন যে কিনেছিলাম, আর পড়ে মোগলদের সম্পর্কে কতটুকুই বা বুঝেছিলাম?
বাবর-হুমায়ুনের পরে সম্রাট আকবরের যুগ শুরু হয়। ব্যাক্তিগতভাবে বাদশাহ আকবরের শাসনামলের ব্যপারে বেশ আগ্রহ বোধ করলাম। বাবর বা হুমায়ুন - কেউই আসলে বেশি সময় নিয়ে শাসন করতে পারেনি। সেই তুলনায় আকবর যথেষ্ট সময় পেয়েছিলেন শাসন করার। এতটাই যে তাঁর নিজের পুত্ররা তাঁর বিরুদ্ধে এক প্রকার বিদ্রোহই করে বসে সিংহাসনের জন্য! যদিও আকবার এইসব বিদ্রোহ ভালোরকমই দমন করেছিল। আকবর কেমন মানুষ ছিলেন? ধার্মিক না কি ধর্মচ্যুত? তাঁর দ্বীন-ই-এলাহি-র প্রবর্তন আসলে কী নির্দেশ করে? এই যে ভারতবর্ষের মানুষদের একত্র করার জন্য আকবরের এই নতুন ধর্মের প্রবর্তন তা আদৌ কতখানি সফল হয়েছিল? ভারতের মানুষ এমনিতেও ধর্মের ব্যপারে সংবেদনশীল। তা আকবর ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। এজন্যই কি তাঁর এই নতুন ধর্মের প্রবর্তন?
আকবর জ্ঞানের কদর করতেন, গুণের কদর করতেন। নিজে যদিও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একদমই লাভ করতে পারেননি। হালের ইতিহাসবেত্তাগন বলে থাকেন যে তিনি ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগ (?) সম্পর্কে প্রথম জানতে পেরেছিলাম জাফর ইকবালের প্রডিজি বইতে। পরবর্তীতে আমির খানের 'তারে জামিন পার' সিনেমায়।
এরপরে যথাক্রমে জাহাঙ্গীর, শাহজাহান এবং আওরঙ্গজেবের শাসন। আওরঙ্গজেবের শাসনেই আমরা ভারতবর্ষ বলতে যা বুঝতাম অর্থাৎ ওদিকে আফগানিস্তান থেকে এদিকে চট্টগ্রাম অব্দি পুরোটাই একই মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে! এর আগে পুরো ভারতবর্ষ কখনোই একই মোগল সম্রাটের অধীনে ছিল না।
আওরঙ্গজেবের শাসনকালকেও আমার ব্যাক্তিগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। প্রথমত আওরঙ্গজেব নিজের সিংহাসনের রাস্তা অকণ্টক করেছেন। তৈমুরি রক্তের অধিকারীদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে বিবাদ খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু আওরঙ্গজেব যা করেছেন তা আসলেই মাত্রাকে অতিক্রম করে যায়! ব্যাক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন এক প্রকার কট্টরপন্থী সুন্নী। অথচ তিনিই না কি যৌবনে এক বিধর্মীর প্রেমে পড়েছিলেন! হায় অন্ধ প্রেম! (শেষের তিনটা লাইন এভাবে লেখা উচিত হয়নি। যৌবনে মানুষ ভুল করতেই পারে, তবে সেটা দিয়ে তাঁর পরবর্তী জীবনকে বিচার করা বিচক্ষণতা নয়। তবে এটা ঠিক আওরঙ্গজেব ধর্মের ব্যপারে অনেক বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন।)
আওরঙ্গজেবের দীর্ঘ প্রায় অর্শ শতকের শাসনামল অনেক ইন্টারেস্টিং! তবে লেখকের একটা ব্যাপার আরও ইন্টারেস্টিং লেগেছে তা হল, লেখক একটা প্যারায় এসে আওরঙ্গজেবের সমালোচনা করেছেন, আবার পরের প্যারাতেই লিখেছেন যে আওরঙ্গজেব মোগল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শাসক! পড়তে গিয়ে একটু কনফিউজিং লাগতে পারে। তবে কনফিউজড হওয়ার কিছু নেই। দুটোই সত্য!
শাহজাহানের কথা বলা যেতে পারে। রাজকোষ প্রায় খালিই করে ফেলেছিল তাজমহল তৈরি করতে গিয়ে। যদিও মোগলদের রাজকোষ কখনোই খালি হবে না - এমনটা জনশ্রুতি আছে। মমতাজের মৃত্যুর পরে রাজার যে অবস্থা বিভিন্ন লেখায়/মিডিয়ায় বর্ণিত হয় সেরকম আসলে ছিল না। রাজা একেবারেই যে ভেঙে পড়েছিলেন এমনটা না- যেটা লেখক তাঁর লেখায় বিভিন্নভাবে প্রমাণ করেছেন। কষ্ট লেগেছে এটুকু পড়ে যে শেষ বয়সে শাহজাহান দুর্গে বন্দি ছিলেন এবং জানালা দিয়ে শুধুই নিজের অমর কীর্তি তাজমহল দেখতে পেতেন। দুর্গে প্রবেশের পথও না কি ঢালাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল! করুণ!
মোগলনামার প্রথম খন্ডে এই ছয়জন মোগল সম্রাটের প্রসঙ্গই এসেছে। শুরুতে যেমনটা লিখেছিলাম, ইতিহাস হলো বোরিং সাবজেক্ট - বইটা পড়লে ওরকম লাগবে না। আসলে ইতিহাস কখনোই বোরিং সাবজেক্ট না! উপস্থাপকের উপস্থাপনার উপরেই অনেক কিছু নির্ভর করে আসলে। বইয়ের ভাষা সহজ সরল সাবলীল। গল্পের মতো করেই সাজানো গোছানো। ভালো লেগেছে একটা ব্যাপার - যখনই কোনো মোগল সম্রাট বা কোনো চরিত্রের দোষগুণের কথা এসেছে তখন লেখক পূর্ববর্তী মোগলদের সাথে তাঁর একটা তুলনামূলক চিত্রও দেখিয়েছেন। আরও অনেকগুলো মিথও ভাঙা হয়েছে দেখলাম।
তবে পুরো বই জুড়েই ছিল ছাপাখানার ভূতের উৎপাত। প্রকাশকের আরও বেশি যত্নশীল হওয়া উচিত যেন উৎপাত কমে আসে।
বরাবরের মতো এখানেও শতাব্দী আপুর প্রসঙ্গ নিয়ে আসতে হবে। বইয়ের সাজেশন তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলুম। তাঁহার জন্য ধন্যবাদ। আগ্রহী পাঠকদের জন্য মোগলনামার প্রথম খন্ড পড়ার পরে দুটো করণীয় - প্রথমত দ্বিতীয় খন্ড পড়া, দ্বিতীয়ত মোগল সংক্রান্ত অন্যান্য বইও ঘেঁটে দেখা। একটা বই থেকেই সব ইতিহাস জেনে ফেলা যাবে এরকমটা ভাবলে চলবে না যে!
‘ বাবার হইল আবার জ্বর, সারিল ঔষধে’ প্রধান মোগল শাসকদের নাম মনে রাখার এই লাইনটা শিখেছিলাম সেই ছোটবেলায় । ঐ পর্যন্তই, মোগলদের বিষয়ে আর বিস্তারিত পড়া হয় নি কখনও। কিন্তু মোগলদের বিষয়ে একটা আগ্রহ ছিল সবসময়ই। সেই আগ্রহের জন্যই লেখকের দুই খন্ডের এই মোগলনামা সিরিজটা কেনা।
মধ্য এশিয়ার ফারগানা থেকে ভারতবর্ষে এসেছিলেন জহিরুদ্দীন মোহাম্মদ বাবুর। ১৫২৬ সালে পানিপাতেরপ্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে ভারতবর্ষে মোগল শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। মাত্র চার বছর শাসন করার পর তিনি মৃত্যুবরণ করলেও তার উত্তরপুরুষরা ভারতবর্ষে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন আরও কয়েক শত বছর। কিন্তু মূলত আওরঙ্গজেবের পরেই মোগল শাসনের পতন শুরু হয়। এই বইয়ে লেখক আলোচনা করেছেন সেই আওরঙ্গজেব তথা মোগল যুগের প্রধান ছয় নৃপতিদেরকে নিয়ে।
বইটা একদিকে যেমন মোগলদের উত্থান-পতন, বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ ইত্যাদির কথা বলেছে তেমনি বলেছে মোগলদের প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের কথাও। শায়বানী, শের শাহ, প্রতাপ, শিবাজী প্রভৃতি সমর নায়কদের কথা লেখক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। উঠে এসেছে মোগল হারেমের প্রভাবশালী নারীদের কথাও ; নুরজাহান, মমতাজ, জেবুননাহার এদের মধ্যে অন্যতম।
মোগল ইতিহাসের নবীন পাঠক হিসেবে আমার কাছে বইটা বেশ ভালো লেগেছে। মূলত যে বিষয়টা আমি বইটা থেকে জানতে চেয়েছিলাম তথা মোগলদের একটা ধারাবাহিক ইতিহাস সেটা এই বই আমাকে দিয়েছে। ছোট ছোট পর্বে ভাগ করে লেখক যেভাবে সময়কাল ধরে ধরে এগিয়েছেন তাতে সেই যুগটা বুঝতে আমার কোনো অসুবিধাই হয় নি। অর্থাৎ যেটা বলতে চাচ্ছি, আমার মতো একজন নবীন পাঠক যার শুধু কয়েকটা মোগল শাসকের নামই জানা, সেও স্বাচ্ছন্দ্যে বইটা পড়তে পেরেছে। আর এখানেই আসবে আমার দ্বিতীয় পয়েন্ট, বইটা মোগলদের বিষয়ে আমার ইন্টারেস্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বইয়ের শেষদিকে লেখকের যোগ করা গ্রন্থপঞ্জির তালিকা পরবর্তী বই নির্বাচনে যথেষ্ট সাহায্য করেছে, এখান থেকেই গুডরিডস তালিকায় নতুনভাবে যোগ হয়েছে তেরটা বই!
ভূমিকাতে লেখক বলেছিলেন তিনি ইতিহাসের কাটখোট্টা ভাব থেকে বেড়িয়ে আসতে চান এবং আমার মনে হয়েছে তিনি এক্ষেত্রে সফল। শুধু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা তথ্য সরবরাহ না কর��� লেখক বেশ বুদ্ধিমত্তার সাথে কখনও গল্পচ্ছলে, কখনও একে অপরের সাথে তুলনা করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে এনেছেন। বাবুর-হুমায়ূন, আকবর-আওরঙ্গজেব, দারা-আওরঙ্গজেব, নুরজাহান-মমতাজ প্রভৃতি জোড়ার একে অপরের সাথে তুলনা করেছেন, পার্থক্য তুলে ধরেছেন। বেশকিছু নতুন বিষয় জানতে পেরেছি এবং জানা তথ্যের অন্য আঙ্গিকও জানতে পেরেছি বইটা থেকে। পানিপাত, ঘোড়ার ডাক, মনসবদার, হারেম, উর্দু ভাষা ইত্যাদি ���াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
এবার একটু ভিন্নদিকে আসি। লেখক যে মোগলদের প্রতি মুগ্ধ সেটা তো ভূমিকাতেই বলেছেন। কিন্তু যেটা তিনি ভূমিকাতে সরাসরি বলেননি কিন্তু পুরো বইতেই বারবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বলেছেন সেটা হলো তিনি সম্রাট আকবর এবং শাহজাদা দারার প্রতি বিশেষভাবে মুগ্ধ। তাঁদের বিভিন্ন নীতির বিশেষ করে ধর্মীয় নীতির প্রশংসায় লেখক একদম গদগদ, এমনকি একজায়গায় এমনও বলেছেন যে বর্তমানে নাকি আকবরের মতো ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কথা বলা হচ্ছে! মানে সব ধর্ম মিলে একটা ‘ খিচুড়ি’ ধর্ম আরকি! এটা লেখক কোথায় পেলেন আমি বুঝতে পারি নি। লেখক লাইনটা দ্বারা সবার জন্য একই সংবিধান বা শাসনতন্ত্র থাকার কথা বুঝিয়েছেন হয়তোবা।
এরপরে বলা যায় রেফারেন্সিংয়ের কথা। ভূমিকাতে লেখক প্রথাগত রেফারেন্সিংয়ের প্রতি তাঁর অনীহার কথা বললেও তিনি কোথায় ‘অপ্রচলিত রেফারেন্সিং' করলেন সেটাই খুঁজে পেলাম না! ঘুরেফিরে সেই প্রচলিত পদ্ধতিই তিনি ব্যবহার করেছেন, অর্থাৎ বিশেষ লাইনে নাম্বার দিয়ে পৃষ্ঠার নিচে বা অধ্যায় শেষে বই বা জার্নালের নাম অথবা লেখকের নিজের নোট। ভূমিকার সাথে আরও কিছু অমিল লক্ষ্যণীয়। যেমন : একই ব্যক্তির নাম একেক জায়গায় ভিন্ন বানানে ব্যবহার, ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের কথা বলার কথা বলেও সেই সম্রাট আর শাহজাদাদের অভিযান আর জৌলুসের বর্ণনা ইত্যাদি। আরেকটা ব্যাপার বলা যায় সেটা হলো পুনরাবৃত্তি। একই তথ্য, অনেক জায়গায় কয়েকটা লাইন ঘুরেফিরে এসেছে বারবার। দু-একটা জায়গায় লেখক আরও করতে পারতেন যেমন কোহিনূরের ইংল্যান্ডে যাওয়া বা ভারতবর্ষে অমাত্যদের ভোটে নির্বাচিত রাজার উদাহরণ দেওয়া।
প্রোডাকশন নিয়েও কিছু কথা বলা যায়। প্রচ্ছদটা বেশ ভালো, মোগলদের কথা শোনাতে গিয়ে প্রকাশক যেন পাঠককে অগ্রীম যুদ্ধ-বিগ্রহের বিষয়ে সতর্ক করেছেন! পেইজ বা বাইন্ডিং নিয়েও কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু বানানের কথা বলতেই হবে। গোটা পনেরো বানান ভুল, বেশ কয়েক জায়গায় স্পেস না দেওয়া, দু-একটা সাল ভুল লেখা বা একবার শাহজাহানকে দিয়ে খুররমকে হত্যা করানোর (!) মতো ব্যাপার নজরে এসেছে। এছাড়া বেশ কয়েক জায়গায় লাইনের উপরে রেফারেন্স নাম্বার লেখা থাকলেও অধ্যায় শেষে গিয়ে কোনো রেফারেন্স পাওয়া যায় নি।
যেহেতু আমার মোগলদের নিয়ে বিস্তারিত পড়া নেই, তাই আমি লেখকের তথ্যের নির্ভুলতা বা বিশ্লেষণের মৌলকত্ব নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। তবে বইটা যে মোগলদের সম্পর্কে আমাকে ন্যূনতম একটা ধারণা দিয়েছে তা বলাই বাহুল্য। তাইতো বেশ কিছু ব্যাপার খারাপ লাগলেও বইটা নিয়ে মোটের উপর আমি সন্তুষ্ট।
একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে নন-ফিকশন ইতিহাস পড়তে গেলে আমাকে সবসময়ই দুইটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।(১)বর্ণনার নীরস ভাব (২)লেখকের বায়াসড মনোভাব।বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষার জন্যই যা সত্য।খুব কম বই-ই পাওয়া যায় যা এই দুই দোষমুক্ত।'মোগলনামা' এই দুর্লভ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। বাবর থেকে শুরু করে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত সবার শাসনকালের একটি গতিময় কিন্তু তথ্যবহুল বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।লেখক যথাসম্ভব নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন যা প্রশংসাযোগ্য। তবে লেখক মোগলদের পার্শ্বচরিত্রদের উপর তেমন আলো ফেলতে পারেননি এই ভাগে।আশা করা দ্বিতীয় ভাগে তা পুষিয়ে দিবেন।
বড়ই আনন্দ নিয়ে পড়েছি। ইতিহাস আমার গোপন ভালবাসাগুলোর মধ্যে একটি। বহুদিন তার সংস্পর্শ না পাওয়ায় তীব্র পিপাসা নিয়ে বইটা পড়া। বলা বাহুল্য, শুষ্ক প্রাণে জীবনের সঞ্চার করেছে বইটি। ধন্যবাদ লেখককে।
ইতিহাস বরাবরই আমার সবচেয়ে প্রিয় একটি বিষয়। বিশেষ করে ভারতবর্ষের সমৃদ্ধ ইতিহাসের প্রতি মনোযোগ আমার সবসময় ছিলো এবং আছে। মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস সেসময়কার ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবুরের হাত দিয়ে শুরু হয়ে এর শেষ হয়েছে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মাধ্যমে মোগলনামার এই প্রথম খন্ডটিতে।
মোঘল ইতিহাস জানা ছিলো বিধায় অনেক কিছুই বিস্তারিত জানা ছিলো না, যা অনেকটা পূরণ করেছে এই বইটি। তবে যেভাবে ক্রমানুসারে একেকটা পর্ব দেখানো হয়েছে যা লেখকের ভাষায় সময়ের পরিভ্রমণ মাত্র। সব মিলিয়ে যথেষ্ট ভালো লেগেছে বইটি!
A very well written and well organized novel. Section divisions were just the length it should be. Only reason i gave one star less is that I feel that the chapters related to Akbar and Aurangzeb could have been a bit longer.
The book is of average volumed but considering the context or the history it is covering -- 50/100 more pages wouldn't have been a problem.
মোগল ইতিহাসের নানা বাঁকে আছে রহস্য। যারা থ্রিলার পছন্দ করেন, তারাও কিছুটা থ্রিল খুঁজে পাবেন। আবার যারা ঐতিহাসিক তথ্য তথা একাডেমিক পড়াশোনা করতে চান, তাদের জন্যও এ বইয়ে রয়েছে তথ্যের ভাণ্ডার।
রাগী রাগী চেহারার চোখ কটমট করে তাকিয়ে থাকা সব সম্রাট-বাহদুরদের ছবি, অমুকের ছেলের নাম তমুক, যুদ্ধ-বিগ্রহ, কামান-গোলা, তলোয়ারের ঝনঝনানি... ইতিহাস মানেই আমার কাছে রুক্ষ এক মহাকাল। তবে বইটাতে লেখক রুক্ষ এই বিষয়গুলাকে বেশ যত্ন নিয়ে একটা কোমল সুতোয় গেঁথে ফেলেছেন। পড়তে পড়তে কখন যেন রুক্ষ মহাকালটা সরে গিয়ে, "এইতো সেইদিনের ঘটনা!" বলে মনে হতে লাগলো।
একের পর এক সম্রাটদের ক্ষমতা নিয়ে ভিন্ন-ভিন্ন নাটকীয়তা, আবার সময়শেষে প্রায় অভিন্ন পরিণতিতে প্রতিটা অধ্যায়ের সমাপ্তি। আর এসব পড়ে মনের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি জেগে উঠা! ইতিহাসের মতো রুক্ষতর বিষয়ে পাঠকের ইমোশন খরচ করানোর এই ক্রেডিটটা লেখককে বিনাবাক্যে দিয়ে দেওয়া যায়।
কিন্তু ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর উপর লেখকের ব্যাক্তিগত অভিমত কয়েকটা জায়গায় একটু ছেলেমানুষির মতো চোখে লাগে। আকবরের প্রতি লেখকের ভক্তি, দারা শুকোহ্-র প্রতি খানিকটা পক্ষপাতিত্ব, নূরজাহানের প্রতি মুগ্ধতা আর মমতাজকে রীতিমতো উপেক্ষা এসব বাদ দিলেও, আমার ধারণা লেখক সবচেয়ে বেশি কনফিউজড ছিলেন আওরঙ্গজেবকে নিয়ে। কোথাও কোথাও আওরঙ্গজেবকে ধর্মান্ধ আর ধংসাত্মক আবার কখনও কীর্তিমান শাসক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন!
তো সে যাইহোক আমার মতো যারা ইতিহাসের শুরুর দিককার পাঠক, তারা এই বইটা দিয়ে একদম নির্ভয়ে কয়েকশত বছর আগের মোঘল সাম্রাজ্যে ঘুরে আসার যাত্রাটা শুরু করতে পারেন।
ছেলেবেলায় প্রবল ইতিহাসভীতি থাকার কারণে ম্যাডামদের কাছে বকা খেয়েছি প্রচুর। তবে সব ভীতি, বকার দুর্ভাবনা ছাপিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি একটা সুপ্ত আগ্রহ তো অবশ্যই ছিলো, যা প্রকট আকার ধারণ করলো বইটা হাতে পেয়েই।
মুঘল সাম্রাজ্যের ছয় বিখ্যাত সম্রাটের নাম সহজে মনে রাখার বেশ দারুণ একটা টেকনিক খাটাতাম সেসময়-- "বাবার হইল একবার জ্বর, সারিলো ঔষধে"। বইটা পড়তে পড়তে এই টেকনিকটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো বারবার, যার সাথে মিশ্রিত ছিলো ছোটবেলার সামাজিক বিজ্ঞান পড়ার সময়কার সেসব নস্টালজিক স্মৃতি, আর সেই ঐতিহাসিক সময় নিয়ে নানান রোমাঞ্চকর ফ্যান্টাসির আনাগোনা।
"মোগলনামা" বইটি দুটো খণ্ডে বিভক্ত, যার প্রথম খণ্ডে, অর্থাৎ এই বইটিতে রয়েছে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবুরের উত্থান থেকে শেষ সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যু অব্দি ঘটে যাওয়া বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সমাহার। জানতে পেরেছি তৎকালীন শাসকদের রাজ্যশাসন সম্পর্কিত তথ্যাদি। কেউ ছিলেন খেয়ালি, আবার কেউবা ছিলেন দূরদর্শী। কেউ ক্ষমাশীলতার চমৎকার উদাহরণ, আবার কেউবা দিতেন না একচুল ছাড়। কেউ ছিলেন বেশ উদার ও সংস্কৃতিমনা, আবার কারো মন মননে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলো ধর্মীয় গোঁড়ামির চেতনা। তবে মুঘল সাম্রাজ্য, রাজসিংহাসন, ক্ষমতা, ষড়যন্ত্র, রাজ্যশাসনের ভার-- সবকিছুকে ঘিরে সাম্রাজ্যের অধিপতি এবং উত্তরাধিকারীদের মোহের অবস্থান ছিল যেন পারিবারিক বন্ধন, ভ্রাতৃত্ববোধ, নিষ্ঠা, সততা ইত্যাদি মূল্যবোধেরও ঊর্ধ্বে !
মুঘল সাম্রাজ্যের শুরুটা ছিলো বেশ সুন্দর। সুন্দর এই অর্থে, যা কিছু বাবুর পেয়েছিলেন, তা শুধুমাত্র তার একান্ত ইচ্ছাশক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের তাগিদে। সেই সুন্দরের রেশ ধরে রেখেছিলেন তার পুত্র হুমায়ূন এবং পৌত্র আকবরও। কিন্তু সম্রাট জাহাঙ্গীরের অদূরদর্শিতা তাকে অনেকটাই নিষ্প্রভ করে দেয়। তবে জাহাঙ্গী্র যতটা আলোর বাইরে ছিলেন, তার স্ত্রী নূর জাহান ঠিক ততটাই আলো ছড়িয়ে গিয়েছেন পুরো মুঘল সাম্রাজ্যে, তার বিচক্ষণতা ও জ্ঞানগরিমা দ্বারা। তবে ইতিহাস এও বলে যে, নূর জাহানের এই বিচক্ষণতার এক পৃষ্ঠে সমান্তরালভাবে অবস্থান করছিলো তার স্বার্থান্বেষী এবং রাজনৈতিক কূটনীতি, যার প্রমাণ পাঠকরা এই বইটিতেই পাবেন।
এবার আসি লেখকের লেখনশৈলী সম্পর্কে। বইটিকে ইতিহাস বিষয়ক আপাদমস্তক খটমটে তথ্যে ঠাসা কোন একঘেয়ে বই বলব না, বরং আমি বলব, এটি মুঘল সাম্রাজ্যের এক সুবিশাল যাত্রা, যেখানে লেখক কখনো গল্পচ্ছলে, কখনো কথোপকথনের মাধ্যমে, আবার কখনোবা একটু সিরিয়াস ভঙ্গিমায় পেশ করেছেন মুঘল ইতিহাস সম্পর্কিত নিজের জ্ঞান ও আগ্রহকে। তার সেই আগ্রহের সুস্পষ্ট ছাপ প্রতিফলিত হয় বইয়ের শুরুতে তার দেয়া কৈফিয়তনামা এবং শেষে দেয়া রেফারেন্স লিস্টের মাধ্যমে।
ইতিহাসের মত সুবিপুল বিষয়কে সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপস্থাপন করা সহজ না, যা লেখক তার প্রতিটি অধ্যায়ে চমৎকারভাবে করে দেখিয়েছেন। এতে করে বইটি আমার কাছে প্রাঞ্জল এবং সাবলীল লেগেছে। লেখকের তথ্য বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনের ধরনে ব্যক্তিগতভাবে আমি যে বিষয়টি উপলব্ধি করেছি, তিনি ইতিহাসকে অনেকটা ইতিবাচকতা এবং নিরপেক্ষতার ছাঁচে ফেলে বিচার করতে চেয়েছেন। প্রতিটি ঐতিহাসিক চরিত্র এবং তাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলোকে তিনি যেমন নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন, নিজের যুক্তি দিয়ে বিচার করেছেন, তেমনি উপস্থাপন করেছেন সেই চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও। আর অবশ্যই সেই উপস্থাপনে ছিলো ইতিহাস আশ্রিত প্রামাণিকতার ছোঁয়া, যা বইটিকে আরো জীবন্ত ও বাস্তব করে তুলেছে। একইসাথে প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে দেয়া নোটগুলোও ছিলো প্রাসঙ্গিক এবং তথ্যবহুল।
যদিও বইটিতে কিছু প্রিন্টিং মিসটেক এবং বানান ভুল ছিলো, বইটির আগ্রহ জাগানিয়া সরস আবহের কারণে সেসব আমার পাঠকমনে ব্যাঘাতের সৃষ্টি করেনি।
পরিশেষে এটাই বলব যে, এই বইটি তিন শ্রেণীর পাঠকের জন্য সুখপাঠ্য হতে বাধ্য।
১। যারা মুঘল ইতিহাস সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে জানতে আগ্রহী ২। যারা ইতিহাস ভালোবাসেন ৩। যাদের কাছে ইতিহাস নিছক নীরস, খটমটে ও নিষ্প্রাণ গোছের কিছু একটা বলে মনে হয়।
বইয়ের নামঃ মোগলনামা লেখকঃ মাহমুদুর রহমান ধরনঃ নন-ফিকশন, ঐতিহাসিক গ্রন্থ প্রকাশনীঃ আহমদ পাবলিশিং হাউস প্রথম প্রকাশঃ ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মোট পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ২৯৬
আমি পাঠক হিসেবে খুবই ধীরগতির। কিন্তু এরপরও বেশ বড় এই বইটা দ্রুতই শেষ করতে পারলাম লেখকের চমৎকার উপস্থাপনার বদৌলতে। একদম ঝরঝরে লেখা। পুরো বই পড়ার সময় একবারের জন্যও ক্লান্তি বা বিরক্তি আসেনি। মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে এটি একটি চমৎকার বই। লেখক যে প্রচুর পড়াশোনা করে বইটি লিখেছেন তা বোঝার জন্য গ্রন্থপঞ্জি বাহুল্য৷ ইতিহাসের বই হিসেবে এটি বেশ সমৃদ্ধ ও তথ্যবহুল।
তবে আমার কাছে একটা বিষয় ভালো লাগেনি। লেখক অসংখ্য জায়গায় গোঁড়ামি, কাঠমোল্লা এসব শব্দ লিখেছেন। যদিও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি এখানে ব্যক্তিগত আদর্শের কারণে প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারেন। যে কারণে আকবরের ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে তার লেখার মধ্যে যেরকম প্রশংসার ফুলঝুরি, আওরঙ্গজেবের ক্ষেত্রে পুরোটাই উল্টো। লেখক হয়তো দাবি করতে পারেন তিনি আওরঙ্গজেবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকেই তুলে ধরেছেন। কিন্তু আমার কাছে তা মনে হয়নি। বরং তার সমালোচনা করেছেন অনেক বেশি। যদিও শেষে আওরঙ্গজেবের অবদানও স্বীকার করেছেন। কিন্তু সবমিলিয়ে তিনি আওরঙ্গজেবের সমাল��চনাই বেশি করেছেন।
তবে সবমিলিয়ে এটি একটি অনবদ্য বই। মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে যারা জানতে আগ্রহী তারা বইটি পারেন।
যদি মোঘল-দের নিয়ে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানতে হয়,তাহলেএই বইটা ভালোই। কিন্তু,যারা বিস্তৃত ইতিহাসে ডোব দিতে চান বা মোঘল ইতিহাস নিয়ে আগেই যাদের জানাশোনা আছে, তাদের জন্য এই বই না!
এটা নিয়ে আর কি বলবো? তবে সম্রাট আওরঙ্গজেব কিন্তু পীর ছিলেন না! তিনি তার ভাইকে হত্যা করে ক্ষমতায় বসেছিলেন। সেই কাহিনিটা খুব চমকপ্রদ, পড়ে দেখতে পারেন।