মধ্যবয়স পার হতে থাকা বিবাহিত এক পুরুষের প্রণয় সম্পর্ক ঘটে যায় বছর তিরিশের এক তরুণীর সঙ্গে। তারপর একসময় অবধারিত ভাবেই এই সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর পুরুষটির জীবনে কী কী ঘটে, তার মানসিক অবস্থাই বা কোনদিকে এগোয় তারই কিছু বিবরণ আছে অসমবয়সী এই প্রেমের উপাখ্যানে।
ভারতীয় কবি জয় গোস্বামী (ইংরেজি: Joy Goswami নভেম্বর ১০, ১৯৫৪) বাংলা ভাষার আধুনিক কবি এবং উত্তর-জীবনানন্দ পর্বের অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি হিসাবে পরিগণিত।
জয় গোস্বামীর জন্ম কলকাতা শহরে। ছোটবেলায় তাঁর পরিবার রানাঘাটে চলে আসে, তখন থেকেই স্থায়ী নিবাস সেখানে। পিতা রাজনীতি করতেন, তাঁর হাতেই জয় গোস্বামীর কবিতা লেখার হাতে খড়ি। ছয় বছর বয়সে তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। মা শিক্ষকতা করে তাঁকে লালন পালন করেন।
জয় গোস্বামীর প্রথাগত লেখা পড়ার পরিসমাপ্তি ঘটে একাদশ শ্রেণীতে থাকার সময়। সাময়িকী ও সাহিত্য পত্রিকায় তিনি কবিতা লিখতেন। এভাবে অনেক দিন কাটার পর দেশ পত্রিকায় তাঁর কবিতা ছাপা হয়। এর পরপরই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কিছুদিন পরে তাঁর প্রথম কাব্য সংকলন ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ প্রকাশিত হয়। ১৯৮৯ সালে তিনি ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা কাব্যগ্রন্থের জন্য আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। ২০০০ সালের আগস্ট মাসে তিনি পাগলী তোমার সঙ্গে কাব্য সংকলনের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
অখিলেশ,একজন বিবাহিত প্রৌঢ় কবি। অনেক গুলো বই বের হয়েছে তার,নিয়মিত দৈনিক পত্রিকাতে লেখালেখি করেন। তার দিন কাটে পরিবার আর লেখালেখি নিয়ে।
হঠাৎ ই কবির কাছে একটা মেয়ে আসতে শুরু করেছে। মেয়েটার বয়স কবির মেয়ের বয়সী। ঐ মেয়ে একটা সরকারি কলেজের অধ্যাপিকা। অখিলেশের লেখার ভক্ত। সে নিয়মিত অখিলেশের কাছে আসে,তাকে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করে। একবার অখিলেশের চোখের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল,সেবার মেয়েটা তার কবিতা গুলো কপি করে দিত। এছাড়া ও,সে কবিকে বিভিন্ন বই কিনে দিত নিয়মিত।
এভাবে বিভিন্ন প্রীতিময় ঘটনার মধ্যে দিয়ে,সে লেখকের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠে। সেই প্রিয়পাত্র একদিন কবির হৃদয়ের একজনে রূপান্তরিত হয়। তাদের মধ্যে শুরু প্রনয়ের সম্পর্ক।
তারপর?
লেখক জয় গোস্বামীকে আমি চিনতাম কবি হিসেবে,তাই পূজাবার্ষিকীতে উনার উপন্যাস দেখে বেশ অবাক হয়েছি বলতে হয়। তার উপর উপন্যাসের নাম "ভেঙে যাওয়ার পরে" ও বেশ চিত্তাকর্ষক। তাই ঝটাঝট পড়তে শুরু করে দিই।
এখনো পর্য়ন্ত যতগুলো কবি'র গদ্য পড়েছি,সবগুলো আমার হৃদয় ছুঁয়েছে। জয় গোস্বামীর এই উপন্যাসটা ও তার ব্যাতিক্রম নয়। গল্পটার শুরুটা বেশ ভালো লেগেছে,কিন্তু যত পৃষ্ঠা বাড়ছে লেখা কেমন জানি গতিহীন হয়ে পড়েছে। উপন্যাসের সমাপ্তিও আমার ভালো লাগেনি। তবে সব বিবেচনা করে বলতে গেলে ভালোই,পড়ার মতো।
তবে লেখকের আরো উপন্যাস পড়ব। প্রথম উপন্যাস পুরোপুরি মনপুত না হলেও,উনার লেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছে।
"ভেঙে যাওয়ার পরে" উপন্যাসের নামটিই একটা আকর্ষক হিসেবে ধরা দেয় পাঠকসমাজে। এ কাহিনী প্রেম ছেড়ে যাওয়ার পরের নিযুত কোটি অভিঘাত সমুদ্রে নিমজ্জিত একটি আখ্যান।অখিলেশ সন্তান সহ এক বিবাহিত নারীকে বিয়ে করেছিলেন।তাঁর স্ত্রী সুরমা আর কন্যা টুকুন । টুকুন অখিলেশ কে বাবা বলত না আর সবার মতো অখি' দা'বলেই ডাকত। এই আক্ষেপ অখিলেশ তেমনভাবে কখনও প্রকাশ করেনি। অখিলেশের নিজের কোনো সন্তান ছিলনা বলেই এই ব্যথার খবর কেউ রাখেনি।পঞ্চাশোর্ধ এই প্রতিষ্টিত কবি প্রেমে পরেন এক বছর তিরিশের নারীর সাথে, যিনি তাঁর লেখার গুণমুগ্ধ এক পাঠিকা। বাইশ দিন হোক কিংবা তিনশোবাইশ দিন হয়তো বা বয়ে যাওয়া আজন্ম সবার চোখের সামনেই সুন্দরী গুণমুগ্ধার দ্যুতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন তিনি,নিজেকে সমর্পণ করেন সেই নারীতে।এক রকম রাগের কাছে আমরা একএকরকম রস, আনন্দ পায়,একটা মানুষের কাছেও তাই। ওর কাছে যে আনন্দ পেয়েছিলেন অখিলেশ সেই আলো কেবল ও-ই দিতে পেরেছিল।ঔপন্যাসিকের বয়ানে তাঁদের মধ্যে অন্য কোনও সম্পর্ক হয়নি,এই নয়বছরে।তবে অখিলেশের কবে যে প্রতিটি দেহকোষে আর মনকোষ ভেসে গিয়েছিল তা মনে করতে পারে না নিজেও।অথচ,সময়ের স্রোতে সেই নারী একদিন এক পদক্ষেপ এগিয়ে তাকে ফেলে রেখে চলে যায় করেন সর্বগ্রাসী হতাশায় এভাবে হারিয়ে যেতে থাকে অস্তিত্বে ধূসর অন্ধকার জঠরে। কবির সেই বিখ্যাত কবিতার উদ্ধৃতি টেনে বলা যেতেই পারে-'চলেও গেল কদিন পর মেঘ যেমন যায় কাঠফাটা রোদ দাঁড়িয়ে পড়ল মেঘের জায়গায় '। এভাবেই চলতে থাকে কাহিনী। পাঠকও বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে সেই মেঘের চলে যাওয়া, মরমিত হয় প্রখররৌদ্রের তাপে দগ্ধ হওয়া ধূসরের পরিণতিতে।সেই তাপে মন দগ্ধ হয়ে চোখের কোণ বিব্রত হয় তবুও আকাঙ্ক্ষার আশ মেটে না। তাই এই উপন্যাসের রস হৃদয়াঙ্গম করতে কবি জয় গোস্বামীর অসামান্য লেখনীর মেলবন্ধনের নদীতে ডুব দিয়েই দেখুন একবার।