বৌদ্ধধর্ম তথা বৌদ্ধ সাহিত্যের চর্চায় 'চতুরশীতি-সিদ্ধ-প্রবৃত্তি' নামক তিব্বতি বইটির অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। এই 'সিদ্ধ'-দের রচনাই চর্যাপদ। বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্যিক নিদর্শন যাঁরা রচনা করেছেন, তাঁদের জীবনকাহিনির মধ্যে সেই সময়ের বাংলা ও বাঙালির জীবনের প্রতিফলন খোঁজাই স্বাভাবিক। তাই আলোচ্য বইটিকে ইতিহাস-জ্ঞানেই পড়তে গেছিলাম। অভিজ্ঞতাটা সুখপ্রদ হল না। কেন? কারণ এই পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণটিতে বিস্তর টীকা, বিস্তৃত ভূমিকা এবং তালিকা ইত্যাদি থাকলেও মূল অংশটি ভয়ানক নীরস। সিদ্ধদের জীবনকাহিনি পড়তে বসলে পঞ্চতন্ত্র কি কথাসরিৎসাগর পাঠের ছিঁটেফোঁটা রসও পাওয়া যায় না। বরং অকারণ অলৌকিকত্বর ওই তালিকা পড়ে মনে হয়, তাহলে আর আকাশে রকেট (ক্যাপসুল?) পাঠিয়ে গ্রহ (শুক্র?)-র অবস্থান বদলাতে চাওয়া জ্যোতিষী কী দোষ করল? তার থেকেও বড়ো সমস্যা, ডক্টর চট্টোপাধ্যায় চর্যাগীতিকার সিদ্ধদের দুম করে দক্ষিণ ভারতের সিদ্ধদের সঙ্গে মিশিয়েছেন— যার কোনো ঐতিহাসিক কারণ দেওয়া হয়নি। আলভার-নায়নার এবং অন্য ভক্তিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যে চর্যাপদের ভাবনার বিস্তর পার্থক্য ছিল সেটা তাঁর অজানা নয়৷ তা সত্বেও এই দুই আন্দোলনকে স্রেফ ডায়ালেকটিকের কাঠামোয় আঁটানোর জন্য পাশাপাশি আনা মেনে নেওয়া যায় না। বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের এই ধরনের তাত্ত্বিক প্রকৌশলের প্রয়োগে বাংলার ইতিহাসচর্চার যে সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে তা আমরা জানি। দুঃখের বিষয়, এই বইয়েও সেই প্রবণতা স্পষ্ট। বইটির অ্যাসেট হল দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় রচিত 'ভূমিকার উত্তরকথন— সিদ্ধ আন্দোলন ও কৈবর্ত বিপ্লব'। এটি যেমন সুলিখিত, তেমনই কৌতূহলোদ্দীপক। সমকালীন সাহিত্যকে ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে নিয়ে এই ভাবনাটির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ কেউ করুন— এই দাবি জানাই বিদ্বজ্জনেদের কাছে। বইয়ের একমাত্র ★ ওই জন্যই দিলাম। বাকি বইটা লায়াবিলিটি, তাই না পড়াই ভালো।