সুনীল মারা যাবার পর তাঁরই ভক্ত এক কবি এক ইন্টার্ভিউতে বলছিলেন যে সুনীল শিখিয়েছিলেন, 'কাঁচা' করে লেখা। জানি না, এর অর্থ তাঁর কাছে কি ছিল, হয়তো সহজ করে লেখা বুঝিয়েছিলেন। 'সহজ' কিছুর প্রতি কেমন এক বিরূপতা আছে আমাদের মধ্যে। শব্দ নিয়ে তুখোড় ড্রিবলিং না চালালে আমাদের সেই লোককে লেখক বলতেই মন চায় না। অবশ্য, এটা যার যার ব্যাপার। যতক্ষণ না আমরা মনে করছি কে কি পড়বে, দেখবে বা শুনবে তা আমরা ঠিক করবো, (কারণ, আমরা প্রতিদিন বিরিয়ানী খাই ) ততোক্ষণ সবার সহনশীলতা সবকিছুকেই সুন্দর করে তোলে।
এখন পড়ছি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী'। সেখানে 'সৌন্দর্যের সন্ধান' অংশে লেখক লিখেছেন, "সুন্দরকে ধরবার জন্য নানা মুনি নানা মতো আরশি আমাদের জন্য সৃজন করে গেছেন, সেগুলো দিয়ে সুন্দরকে দেখার জন্য একটুও সুবিধে হত তো মানুষ কোন কালে এইসব আয়নার কাচ গলিয়ে মস্ত একটা আতশী কাচের চশমা বানিয়ে চোখে পরে বসে থাকতো, সুন্দরের খোঁজে কেউ চলতো না; কিন্তু সুন্দরকে নিয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই স্বতন্ত্র-স্বতন্ত্র ঘরকন্না তাই সেখানে অন্যের মনোমতোকে নিয়ে থাকাই চলে না, খুঁজে পেতে আনতে হয় নিজের মনোমতোটি।" কথাটা বড় সত্য।
সুনীল আমার কাছে এমন একজন, যার লেখা খুব বেশিদিন না পড়লে মনে হয় যে সহজ ও সুন্দর করে ভাবার কায়দা ভুলে বসেছি। 'অর্জুন' শেষ করবার আগে অনেকদিন লাগিয়ে একটি বই শেষ করেছিলাম। 'অর্জুন' খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেল। শেষ হবার পর মনে হচ্ছিল, আরো একটু লিখতেন, কি হল অর্জুনের শেষমেশ?...
অর্জুন তার মায়ের সাথে রিফিউজি কলোনিতে থাকে। দেশভাগের সময়ে সে তার ভাই ও মাকে নিয়ে কলকাতায় আশ্রয় খুঁজে পায়। সেই কলোনী আসলে দত্তদের বাগানবাড়ি, যা তারা নিরুপায় হয়ে রিফিউজিদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। ছোট একটা জায়গায় নানারকম শেকড় হারানো মানুষেরা এসে জড়ো হয়েছিল। কিশোর অর্জুন নিজের ভাইকে হারিয়ে এখন কালের ফেরে পুর্নযুবা। উপন্যাসটি শুরু হয় অর্জুনকে কেউ অতর্কিতে আক্রমণ করে মরতে ফেলে গিয়েছিল এবং তাকে লাবনী আবিষ্কার করে। এরপর সে হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়। তাকে দেখতে আসে তারই বন্ধু শুক্লা এবং অন্য মানুষেরা। লেখাপড়ায় ভালো অর্জুন কলোনীর দিব্য ও সুখেনের চেয়ে মার্জিত ও উন্নত চিন্তার অধিকারী। ফ্যাক্টরির মালিক কেওয়েল সিং এর কলোনির এক অংশ দখল করার দুরভিসন্ধি ধরতে পেরে অর্জুন বুঝিয়েছিল সবাইকে জমি না ছাড়তে। পরিণাম ভালো হয় নি। কারো জন্যই। পথভ্রষ্ট দিব্য-সুখেনরা চোখের সামনেই পশু হয়ে যায়। পূর্ণিমা হতে না চেয়েও ভাগ্যতাড়িত লাবনী বাস্তবতার কাছে হার মেনে নেয়। একালের অর্জুন চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। সে হাতে অস্ত্রও তুলে নেয়। ফলস্বরূপ, বাঁচাই দুষ্কর হয়ে পড়ে।
'অর্জুন' আমাদেরকে দেশভাগের অসাড়তা মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, রিফিউজি শব্দটি সবকালে, সব জায়গায়ই একইরকম এবং অস্তিত্বের সাথে লড়তে থাকা মানুষেরা সবার কাছেই সহজ শিকার। কালকে ছাড়িয়ে সকলের মঙ্গলচিন্তায় মত্ত অর্জুনেরা সহজে লোকসমর্থন পায় না। তাই, কলিযুগের মতো সব ছেড়েছুঁড়ে চলে যাওয়া ছাড়া তাদের উপায় থাকে না।