রায়সাহেবের মসৃণ বর্ণনা বইটিতে অনুপস্থিত। প্রচুর কাঁচা তথ্য আছে, সেসবের ভিড়ে দিশা খানিকটা হারাতে হয়। "বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব)" যেমন সুখপাঠ্য, এ বইটি তেমন নয়। বিন্যাস খানিকটা পাল্টে লিখলে হয়তো এর কলেবর কমে আসতো, কিন্তু সাধারণ পাঠকের পক্ষে দাঁত বসানো সহজ হতো।
দুটি নতুন তথ্য জেনে চমৎকৃত হয়েছি। প্রথমত, বাংলায় আগত আর্যরা ঋগ্বেদীয় আর্য নয়, বরং অ্যালপীয় আর্য, এবং এ কারণেই বাংলায় বর্ণাশ্রমে উত্তর ভারতের মতো ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য অনুপস্থিত ছিলো, কেবল ব্রাহ্মণ-শূদ্র-অন্ত্যজ বর্ণভেদ চলতো। পরবর্তীতে ভিন্ন অঞ্চলের বর্ণভেদ প্রথার সাথে বাংলার বর্ণভেদের সংঘাত ঘটে, সেটি রাজনীতি আর অর্থনীতিতেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রম গৃহী বৌদ্ধরাও মেনে চলতো, তবে ভিন্ন আচার-শাসন প্রসঙ্গে বাংলার বৌদ্ধ শাসকেরা (পাল ও চন্দ্র) যতখানি উদার ছিলেন, কর্ণাটক থেকে আগত সেন আর কলিঙ্গ থেকে আগত বর্মণরা গোঁড়া ব্রাহ্মণপন্থী ছিলো বলে ততটাই অনুদার আচরণ করেছে। যেমন সোমপুর মহাবিহার ধ্বংসের জন্যে লেখক জাতবর্মণকে চিহ্নিত করেছেন। সেন-বর্মণদের শাসনামলে নানারকম উৎসাখ্যান বা অরিজিন স্টোরি হিসেবে বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্র লেখার ধুম পড়ে যায়, সেগুলোকে প্রামাণ্য ধরে সমাজেও ক্রমশ বর্ণ আর শ্রেণীর চাপ বাড়তে থাকে।
বাংলায় বর্ণভেদে বণিক ও শিল্পীরা শূদ্র হিসেবে চিহ্নিত ছিলো, কিন্তু যতদিন ধনোৎপাদনের জন্যে বাণিজ্যের ভূমিকা মুখ্য ছিলো, ততদিন এ কারণে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়নি, রাজশক্তিও এ ব্যাপারে নমনীয় ছিলো। সপ্তম শতকের পর বাংলার অর্থনীতিতে কেন বাণিজ্যের ভূমিকা খর্ব হয়ে কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্প প্রাধান্য পায়, এবং বর্ণভেদে কৃষকের স্থান বণিক ও কারুর ওপরে চলে আসে, তা নিয়ে এ বইতে রায়সাহেব আলোকপাত করেননি। এই উসকে দেওয়া প্রশ্নের উত্তর অন্যত্র খোঁজার দায় পাঠকের কাঁধেই।