আমি এই গল্পটা প্রথম পড়েছিলাম আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী ১৯৮৯-তে। তখনও বুঝিনি—জঙ্গল, ষাঁড়, কেল্লা আর অঙ্কস্যারের মধ্যে এমন অদ্ভুত এক রসায়ন লুকিয়ে আছে যা পরে কিশোর কালের অমোচনীয় স্মৃতি হয়ে যাবে। শীর্ষেন্দু বাবুর ‘পটাশগড়ের জঙ্গলে’ ঠিক তেমনই একটা উপন্যাস, যা অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বাইরে গিয়েও বাংলা সাহিত্যের কল্পবিজ্ঞান-ফ্যান্টাসি জঁরকে একটা জরুরি ধাক্কা দিয়ে যায়—তাও একেবারে সায়েন্সের টার্মস-এ নয়, ছেলেবেলার কল্পনার ভাষায়, চায়ের দোকানের আড্ডার ঘ্রাণ মাখিয়ে।
গল্পের শুরুতেই মাঠে ফুটবল খেলা, ষাঁড় কালুর হঠাৎ প্রবেশ, আর তারপর একেবারে চলচ্চিত্রের মতো ফ্রেমে উঠে আসে—জয়পতাকাবাবুর কালুর পিঠে উঠে জঙ্গলে চলে যাওয়া। যেন ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’-র স্প্যানিশ বুলফাইটার সাজার মহড়া আরেকবার ফিরে এলো, শুধু এবার গরুর বদলে ষাঁড়, বর��াচরণের বদলে অঙ্কস্যার। অথচ এই অনুরণন পুরোটাই চমৎকারভাবে নতুন করে লেখা, পরিচিত টেম্পলেটের ওপর অনন্য একটি গল্পের ক্যানভাস গড়ে তোলা।
জঙ্গলের মধ্যে এক দুর্গ—কখনো চোখে পড়ে, কখনো মিলিয়ে যায়, ধ্বংসস্তূপ কিংবা আলোকময় রাজকীয়তার ভঙ্গিতে হাজির হয়, আবার পুরোপুরি গায়েবও হয়ে যেতে পারে। কে বানিয়েছে, কেন বানিয়েছে, সে সব অজানা; কিন্তু জানা যায় দুর্গটি আসলে গ্রহান্তরের উন্নত জীবের তৈরি আশ্রয়স্থল। আধা-দর্শন, আধা-বিজ্ঞান মিলে এখানে ঢুকে পড়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্স, রেজোন্যান্স, অদৃশ্য হওয়ার তত্ত্ব—এসবই, কল্পনার চাদরে মোড়া হয়ে আসে আমাদের সামনে। টাইম বেরিয়ার আছে, টাইম লুপ আছে, এমনকি চোরাবালির মধ্যেও রয়েছে ‘রিডিমেবল’ পাথ, যদি তুমি ঘড়ির কাঁটার দিকে সরে সরে চলতে পারো।
এই যে বিজ্ঞান আর রোমাঞ্চের ককটেল, সেটা এতটা মসৃণভাবে গাঁথা যে মনে হয় না একটা কিশোর উপন্যাস পড়ছি, মনে হয় যেন স্টার ট্রেক বা এইচ জি ওয়েলসের টাইম মেশিনের বাংলা শাখা আবিষ্কার করে ফেলেছি। অথচ কোথাও কোনো অতিবাগ্ন্যতা নেই। প্লট সরল, চরিত্র কম—এই অর্থে বইটি আগের ‘ঝিলের ধারে বাড়ি’র মতো গুলিয়ে যায় না, বা ‘নৃসিংহ রহস্য’র মতো প্রেডিক্টেবলও নয়। গল্প একেবারে খাপে খাপে বসানো।
সবচেয়ে দারুণ লাগে চরিত্রগুলির টোনাল ভ্যারিয়েশন। ব্যোমকেশ নামের এক চতুর রাজনীতিবিদ আছেন—যিনি একাধারে প্রশংসা সভা ও ধিক্কার সভা দুটোতেই সভাপতিত্ব করতে চান। শীর্ষেন্দুর এই মৃদু রাজনৈতিক ব্যঙ্গ অদ্ভুতুড়ে সিরিজে এবারই প্রথম এত সরাসরি এসেছে। আর আছে জয়পতাকার ঠাকুরদা জয়ধ্বনি—এক প্রাচীন পণ্ডিত বাঙালি, যিনি সংস্কৃত জানাটাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান মনে করেন। চায়ের দোকানের আড্ডায় মুখে মুখে চতুর্ভুজ হয়ে উঠার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে কুপমণ্ডূকতার চূড়ান্ত নমুনা। তাঁর বিপরীতে রয়েছেন শ্যাম লাহিড়ী—শিকারি, বাস্তববাদী, দুঃসাহসিক; একমাত্র ‘স্বাভাবিক’ ভদ্রলোক যিনি যুক্তি-তর্কের ভিত্তিতে কাজ করেন।
তবে গল্পের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক চরিত্র ভুতু। কাঁকড়াবিছে ফেলে টিম থেকে বাদ পড়া সেই ছেলেটা, যে প্রতিশোধের ঝোঁকে ষাঁড়কে মাঠে ছেড়ে দিয়ে একটা বিপদ ডেকে আনে, কিন্তু পরে অনুতাপে পোড়ে, আর শেষ পর্যন্ত স্যারের সন্ধানে একলা জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। তাঁর মধ্যে রয়েছে ‘অবলা বালক’ ট্রপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটা redemption arc। গল্পের শেষে এসে বোঝা যায়—যে ছেলেটিকে সকলে এড়িয়ে চলে, সেই-ই গল্পের চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে।
উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, ছোট আয়তনের মধ্যেও এতখানি বহুমাত্রিকতা। রহস্য, সাসপেন্স, সায়েন্স, ব্যঙ্গ, আত্মোপলব্ধি—সবই রয়েছে, অথচ কোনওটাই একে অপরকে গ্রাস করে না। গল্পের ক্লাইম্যাক্সও তাড়াহুড়ো নয়; বরং যতটা প্রয়োজন, ততটাই ডিটেলিং এসেছে। শীর্ষেন্দুর গদ্য এখানে আরও পরিণত, মেজাজ আরও ভারসাম্যপূর্ণ।
এই কাহিনিটি হয়তো কড়া কল্পবিজ্ঞান নয়, কিন্তু একেবারে খাঁটি সায়েন্স-ফ্যান্টাসি। আনন্দ, কৌতুক আর হালকা-কঠিন বিজ্ঞান মেশানো এক দুর্দান্ত কিশোর উপন্যাস—যা যে কোনো সময়ের পাঠককেই ফেরত নিয়ে যাবে সেই সময়ে, যখন প্রশ্ন ছিল—কীভাবে কেল্লা উধাও হয়ে যায়, কই গিয়েছিলেন অঙ্কস্যার, আর ষাঁড় কালু আসলে কী চেয়েছিল?
অনন্যসাধারণ বললেও কম বলা হয়।