বছর বছর পুকুর খুঁড়েও কেন মেলে না বাড়তি জল? চার বছর স্কুলের বেঞ্চে বসে থেকেও কেন লেখাপড়া শেখে না শিশুরা? এ-প্রশ্নগুলো তেমনভাবে করা হয় না। করলেও চটজলদি উত্তরে পৌঁছনোর তাগিদ থাকে বেশি। অনেকে বলেন, সার্বিক বিপ্লব, আমূল সংস্কার না হলে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে লাভ কী? এ বই বলছে- না। এমন ছোট ছোট প্রশ্নের উত্তর থেকে গরিবের জীবনে আসতে পারে বড় পরিবর্তন। আর তা আসছেও।
অভিজিৎ ব্যানার্জি ও স্বাতী ভট্টাচার্যের লেখা কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন 'বিকল্প বিপ্লব'। জনাব ব্যানার্জির কিছু কলাম ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলোর ভাষান্তর করেছেন স্বাতী ভট্টাচার্য।
রাজীব গান্ধি তখন প্রধানমন্ত্রী। কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, সরকার এক টাকা বরাদ্দ দিলে জনতার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই টাকা সতেরো পয়সায় দাঁড়ায়। ঠিক কেন পুরো টাকা জনগণের কল্যাণে কাজে না লেগে হাপিস হয়ে যায়, তার কারণ আমাদের জানা। গরিব দেশগুলোর এটি সাধারণ সমস্যা। সেই সমস্যা থেকে কিছু কিছু দেশ কীভাবে মুক্তি পেয়েছে তা নিয়ে চমৎকারভাবে লিখেছেন অভিজিৎ ব্যানার্জি।
শিক্ষাব্যবস্থার পয়সা খরচ করলেই এটি কার্যকরী হয়ে ওঠে এমন নয়। বিনিয়োগকৃত অর্থের সুফল মূল্যায়ন করা জরুরি। ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে না। কারণ- 'ব্রিটিশরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছিল অল্প কিছু কেরানি নিয়োগ করার তাগিদে। তারা এমন লোক চেয়েছিল যারা পরীক্ষায় পাশ করতে ওস্তাদ, প্রশ্ন করলে ইংরেজিতে উত্তর দিতে পারবে, আর অন্য সময়ে মুখ বন্ধ রাখবে।'
স্বাস্থ্যব্যবস্থা দেশের সর্বত্র সহজলভ্য করার চাইতে বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং দ্রুততম সময়ে গ্রাম থেকে সেই হাসপাতালে পৌঁছানোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন অভিজিৎ ব্যানার্জি।
পরিকল্পনা করলেই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে না। পরিকল্পনার ভালো-মন্দ দিকগুলো যাচাই করা আবশ্যক। ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব এলেই তাতে সায় দেওয়ার আগে পূর্বে বরাদ্দকৃত টাকা ঠিকঠাক খরচ হয়েছে কি না, এটি খোঁজ নেওয়া জরুরি। আরও বেশি দরকারি দেশের রাজনীতিবিদের সদিচ্ছা। কেননা,
,নেতাদের ইচ্ছা যখন মানুষের ইচ্ছার বিপরীতে যাবে না, তাঁদের স্বার্থের সঙ্গে জনস্বার্থের বিরোধ বাধবে না পদে পদে, তখন সেই ব্যবস্থা হয়ে উঠবে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যোগ্য শাসনতন্ত্র।'
প্রবন্ধগুলো ভারতের প্রেক্ষাপটে লেখা। তাই বাংলাদেশের পাঠক হিসেবে অনেকক্ষেত্রেই ততো মনোযোগ রাখতে পারিনি এবং বাংলাদেশে বিষয়গুলো তেমন আলোচিতও নয়। যেমন: স্যানিটেশন ব্যবহার করে না ভারতের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ। বাংলাদেশে এই হার নগণ্য মাত্র ৪ শতাংশ ( এই তথ্যটি অভিজিৎবাবুই দিয়েছেন)। তবুও, দারিদ্র্য, দুর্নীতি, অপরিকল্পিত উন্নয়নপ্রকল্পসহ অনেকক্ষেত্রেই মিল খুঁজে পেয়েছি।
'বিকল্প বিপ্লব' দুর্দান্ত কোনো কেতাব নয়। না পড়লেও ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না।
এই প্রবন্ধ সঙ্কলনের লেখাগুলো মূলত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের উপর নির্ভরশীল। সে কারণে পরে পড়তে গিয়ে কয়েকটি জায়গায় সীমাবদ্ধ মনে হয়েছে।
কিন্তু সেটুকু বাদ দিলে, বইটি অত্যন্ত উপভোগ্য। বুদ্ধিদীপ্ত গদ্য, শাণিত যুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী অর্থনীতিবিদদের স্বভাবগত রিজিডিটির বাইরে দাঁড়িয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে। Poor Economics যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা বাংলায় অনেকটা সেই রকম একটি বইয়ের স্বাদ পাবেন।
সমাজনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির চিরাচরিত কর্মপদ্ধতিকে কাঠগোড়ায় তোলা হয়েছে অত্যন্ত যুক্তিসহকারে এবং কিভাবে এড়ানো যায় তারও কিছু উপায় বাতলে দেওয়া আছে উদাহরণসহ। তথ্যসমৃদ্ধ সহজপাঠ্য এবং অবশ্যপাঠ্য বই।