আটত্রিশ বছরের রিমুল সেনকে হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপনের জন্য কলকাতা নিয়ে আসা হচ্ছে। রিমুলের জন্য হৃদয় আসবে চেন্নাই থেকে। কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট করবেন তিনজন চিকিৎসক। সব বাধা পেরিয়ে গ্রিন করিডর দিয়ে আসবে কি কাঙ্ক্ষিত হৃদয়? রিমুল আর প্রান্তরের কুড়ি বছরের অপূর্ণ প্রেম কি পূর্ণতা পাবে?
ইন্দ্রনীল সান্যালের জন্ম হাওড়ার বালিতে, ১৯৬৬ সালে। নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ থেকে এম বি বি এস। প্যাথলজিতে এম ডি, পিজি হাসপাতাল থেকে।সরকারি চাকরির সূত্রে কাজ করেছেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মহাকরণের ডিসপেনসারিতে, লালবাজার সেন্ট্রাল লকআপ থেকে গঙ্গাসাগর মেলার হেল্থ ক্যাম্পে।বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত।প্রথম প্রকাশিত গল্প ২০০৪ সালে ‘উনিশকুড়ি’ পত্রিকায়।শখ: বই পড়া, ফেসবুকে ফার্মভিল এবং হ্যাপি অ্যাকোয়ারিয়াম খেলা, সুদোকু সমাধান।
বইটি এক কোথায় সিনেমাটিকে। মুভি হিসাবে হলে দেখলে নির্ঘাত ৫ বাকেট পপকর্ন শেষ করে ফেলতাম উত্তেজনায়। একদিনেই শেষ করা যায় বইটি কিন্তু adventure তা রয়ে সয়ে অনুভব করার জন্য ইচ্ছা করে দুদিন ধরে পড়েছি। এবার বই কেমন এ থেকেই বুঝে নিন।🤩🤩 একটি হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে গল্পটি। তার সাথেই আছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রব্লেম, ডাক্তার দের মানসিক অবস্থার চিত্রানুগ বিবরণ, প্রেম এবং আরও অনেক কিছু। একটা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল কে কত রাজনীতি, মানসিক চাপ সামলে টিকে থেকে ব্যবসা করতে হয় তা বোঝানো হয়েছে গল্পতে। কিছু হাসপাতাল কে যেমন চোখ বুজে গালাগাল দেয়া যায় এবং কিছুকে আমরা গালাগাল, বদনাম তথা ভাঙচুর ক'রে আদতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি আর ডাক্তারদের মানসিক শান্তির ষষ্ঠীপুজো করে ফেলি তাও বুঝিয়েছেন গল্প দিয়ে। ডাক্তারদের মতো একটি বুদ্ধিমান প্রজাতির মনে কি চলে তা বোঝা কষ্টকর হলেও লেখকের প্রাণবন্ত ভাষায় তা সরল এবং মর্মভেদী হয়ে উঠেছে। হাসপাতাল মালিক কে কত ডেডিকেটেড আর স্তিতধী সম্পন্ন হতে হয় তার মাপও দেয়া আছে গল্পে। আর আছে কিছু কম পড়াশোনা করা সাধারণ মানুষের সরল সাবলীল ডাল ভাতের গল্প। বইটি খুব ইনফোরমেটিভ এবং বেশ শিক্ষাদায়ী। তবে কারা কেমন হয় সেটা সেই নিজেই বুঝতে হয় গল্প পড়ে তা শেখা সম্ভব না বলাইবাহুল্য।
মেডিকেল থ্রিলার এই প্রথম পড়া আমার। বন্ধু মৃন্ময় কে ধন্যবাদ এই genre টির সাথে পরিচয় করানোর জন্য। 🤗🤗
🔸গল্প-সংক্ষেপ : একদিকে চেন্নাইয়ের প্রবাসী বাঙালি যুবক সায়ক মন্ডল বাইক অ্যাক্সিডেন্ট করে প্রথমে কোমায় চলে যায়, তারপর তার ব্রেন-ডেথ হয় । অপরদিকে, হার্টের সমস্যা নিয়ে পাটনার সিথ্রি নামক হাসপাতালে ভর্তি হন রিমুল সেন নামের এক মহিলা । সিথ্রির ‛কার্ডিও থোরাসিক সার্জন’ ডাঃ স্বপন মিশ্র জানান রিমুল ডায়ালেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথির পেশেন্ট । অতএব খুব দ্রুত হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হবে রিমুলের । তার জন্য প্রয়োজন সেম ব্লাড গ্রুপের একজন হার্ট ডোনার । চেন্নাইয়ে ব্রেন-ডেথ হওয়া সায়ক মন্ডলের সাথে রিমুলের ব্লাড গ্রুপ ম্যাচ করে । তখন চেন্নাইয়ের ঐ হাসপাতালের ডাঃ পীযুষ আইচ, সায়কের বাবা-মা কে রাজি করান হার্ট ডোনেশনের জন্য । পাটনার ঐ হাসপাতালে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্ভব নয়, অতএব পেশেন্টকে নিয়ে আসতে হবে সিথ্রির কলকাতার শাখায় । সেখানে আছেন ‛কার্ডিও থোরাসিক সার্জন’ ডাঃ রঘুবীর চক্রবর্তী, যার অপারেশন টেবিলে মারা যায় পাঁচ বছরের এক শিশু । আর আছেন সিথ্রির সিকিউরিটি ইনচার্জ কাম ড্রাইভার প্রান্তর দাস, যাকে দীর্ঘদিন জেল খাটতে হয়েছে ভালোবাসার অপরাধে ।
একদিকে চেন্নাই থেকে আসছে হার্ট, পাটনা থেকে আসছে পেশেন্ট, আছে কলকাতার বিশিষ্ট সার্জনের নিজের হৃতগৌরব ফিরে পাওয়ার লড়াই, আর আছে কুড়ি বছর ধরে নিজের হারানো ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে থাকা একটি মানুষের দায়িত্ববোধ । অপরদিকে কলকাতার দুটি হার্ট-ক্লিনিকের শ্রেষ্ঠত্ব আসন লাভের লড়াই । দাতার দেহ থেকে হার্ট তুলে চারঘন্টার মধ্যে গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপিত না করতে পারলে হার্টের পচন শুরু হওয়া অবশ্যম্ভাবী । এর জন্য তৈরী করতে হবে ‛গ্রীণ করিডোর’ বা ‛সবুজ সরণি’ । এরপর.....
🔸প্রতিক্রিয়া : কিছু কিছু বই থাকে যেগুলির এক অদ্ভুত আকর্ষণী শক্তি থাকে, ছেড়ে ওঠা যায় না । আবার বইটি শেষ হয়ে যাবে ভেবে এক অদ্ভুত মনখারাপ ঘিরে ধরতে থাকে । এইরকম মিশ্র অনুভূতির আদর্শ উদাহরণ এই বইটি ।
এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু কি? শুধুই কি থ্রিলার? ‛সবুজ সরণি’ একটি আদ্যোপান্ত মেডিকেল থ্রিলার যার পরতে পরতে মিশে আছে এক অভূতপূর্ব ভালোবাসার গল্প । লেখক ইন্দ্রনীল সান্যালের থ্রিলার সবসময়ই বেশ গতিশীল, কিন্তু এইক্ষেত্রে তার সাথে যোগ হয়েছে প্রেম-বিচ্ছেদ, অবিশ্বাস, কুৎসা, হেরে যাওয়া, বিবেক দংশন, সামাজিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র - এই সবকিছু । আর ঠিক এই কারণগুলির জন্যই ‛সবুজ সরণি’ আর সব থ্রিলার উপন্যাসের চেয়ে আলাদা, স্বতন্ত্র । লেখকের দৃশ্যপট বর্ণনা এত সুন্দর যে পাঠককে কোথাও আটকাতে হয় না এতটুকুও, বরং বইয়ের পাতার সাথে আটকে রাখে শেষ অবধি ।
বেশ কিছু দৃশ্য বারবার পড়েছি । শেষ পাতায় লেখক যে দুটি ভালোবাসার দৃশ্য তুলে ধরেছেন তা থেকে ভালোলাগা এবং অদ্ভুত মনখারাপ মেশানো অনুভূতি হয়েছে । বইটি বেশ শিক্ষাদায়ী, মৃত্যু পরবর্তী অঙ্গদান বিষয়টিতে যে সচেতনতা জাগানোর জন্য এটি বেশ প্রশংনীয় পদক্ষেপ ।
মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বরাবরই উঠে এসেছে হৃদয়ের নাম.. বেঁচে থাকাই হোক বা প্রেমে পড়া; হৃদয় কিন্তু গুরুত্ব পেয়েছে সবসময়ই.. তবে,হৃদয় নামক এই গোলমেলে জিনিসটার ওপর আমাদের অনেক কিছু নির্ভরও করে.. এই হৃদয়ের ধুকপুকানি শুধু একজন মানুষের প্রাণস্পন্দন না হয়ে কিভাবে অনেকগুলো মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী ক্ষমতাবান ঈশ্বর হয়ে ওঠে; সুদক্ষ লেখনীর মধ্যে দিয়ে সেই কাহিনীই তাঁর এই 'সবুজ সরণি' উপন্যাসে তুলে ধরেছেন লেখক ইন্দ্রনীল সান্যাল.. হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট, গ্রীন করিডোরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কিভাবে দুই নার্সিংহোমের মধ্যে রেষারেষি ও ঘৃণ্য রাজনীতি এসে ভিড় করে, বাস্তবতার সেই চিত্রই বারবার ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে.. তবে শুধুমাত্র হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের মতো কঠিন বাস্তবতাই নয়, এই বাস্তব চিত্রের আড়ালে উঠে এসেছে অন্য আরেক গল্প.. যে গল্পে ভিড় করেছে রিমুল, প্রান্তর, রঘুবীর, মেহুল ও সায়কের মতো চরিত্ররা.. না জেনেই তারা জড়িয়ে পড়েছে জীবনের এই গোলকধাঁধায়.. কখনও ধরা পড়েছে প্রেমের ফাঁদে তো কখনও জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়েছে প্রতিশোধের আগুনে.. বাস্তবের এই কঠোর রেষারেষি পেরিয়ে সত্যিই কি তারা পৌঁছতে পারবে নিজেদের লক্ষ্যে? বর্তমান সমাজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই টানটান পটভূমিকার সাক্ষী হতে চাইলে হেঁটে আসতেই হবে 'সবুজ সরণি' ধরে..
আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন ইন্দ্রনীল সান্যাল। ওনার লেখা বই পড়ে একটা সন্তুষ্টি পাওয়া যায় যেটা পরের বই গুলো পড়ার জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়। এই বইটিও তার মধ্যেই একটা। তাছাড়া এই ধরনের বই পড়ে অনেক কিছু জানা যায় চিকিৎসা জগতের সম্পর্কে। প্রেম,ভালোবাসা,জীবন ,মৃত্যু, বেচেঁ থাকার লড়াই,রোমাঞ্চ,সব চরিত্রদের জীবনের কাহিনী সব তুলে ধরা হয়েছে এই বই এ।সব মিলিয়ে একটা দারুন মেডিক্যাল থ্রিলার ।ভীষণ গতি আছে এই বই এ সেটা পাঠক শুরু করার সাথেই বুঝতে পারবে।সবাই কে পড়ার জন্য অনুরোধ রইলো। নিঃসন্দেহে বইটি পড়ে হতাশ হবেন না ।