মহীদাদুর অ্যান্টিডোট কিশোরদের জন্য লেখা সায়েন্স ফিকশন। এটি এমন এক ভবিষ্যতের পৃথিবীর গল্প, যেখানে মানুষের মনের স্বাভাবিক, শৈল্পিক দিকগুলি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নষ্ট করে দিয়ে চেষ্টা হচ্ছিল এক যান্ত্রিক বিশ্ব তৈরির। ব্যবস্থা হচ্ছিল মানুষ যাতে কোনওদিন বিদ্রোহ করতে না পারে, প্রতিবাদ করতে না পারে, যাতে সব অন্যায় সহজে মেনে নেওয়াই তাদের অভ্যাস হয়ে যায়। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বানচাল করে দিলেন মহীদাদু । তাঁর তৈরি অ্যান্টিডোট গোপনে ছড়িয়ে দিল নাতি নয়ন। রহস্য, রোমাঞ্চ, বিজ্ঞান আর তার সঙ্গে জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ গূঢ় কথা বলে মহীদাদুর অ্যান্টিডোট।
দীপান্বিতা রায়ের ছোটবেলা কেটেছে শিল্পশহর বার্নপুরে। স্কুলের পাঠ সেখানেই। তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। দীপান্বিতা লেখেন নিজের চারপাশের জগৎ নিয়ে। দৈনন্দিন জীবনের কঠিন বাস্তব, অভ্যস্ত খুঁটিনাটিই তাঁর উপজীব্য। শিশুদের জন্য লেখায় তিনি পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। এ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী পুরস্কার, গজেন্দ্রকুমার মিত্র সুমথনাথ ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার, নীল দিগন্ত পুরস্কার, দশভুজা পুরস্কার এবং সাধনা সেন পুরস্কার।
সায়েন্স ফিকশন না সায়েন্স ফ্যান্টাসী? - এই নিয়ে প্রচুর বাকবিতণ্ডা প্রায়ই হয়। আমার ব্যক্তিগত পড়ার অভিজ্ঞতায় বিজ্ঞান আশ্রিত কাহিনিকে তিনভাগে ভাগ করেছি। সেগুলি যথাক্রমে - ১) হার্ডকোর কল্পবিজ্ঞান : যেখানে বিজ্ঞানের নানারকমের প্রচলিত থিওরিগুলিই বেশ পাকাপোক্তভাবে এস্টাব্লিশ করে বা যৎসামান্য রদবদল করে কাহিনির প্লট গড়ে ওঠে। এগুলি পড়তে পড়তে প্লটের বুদ্ধিদীপ্ততা পাঠককে অবাক করে। ২) ছেলেভুলানো কল্পবিজ্ঞান : যেখানে কাহিনি হয় মোটামুটিরকমের রুপকথা গোছের। কল্পনা আর বিজ্ঞানের মধ্যে কল্পনার প্রাধান্যই বেশি। সাধারণ রুপকথার হোকাস-ফোকাস ম্যাজিক গোছের এলিমেন্টগুলি কেবল এখানে পরিবর্তিত হয়ে রুপ পেয়েছে বিজ্ঞানের কাল্পনিক সমস্ত থিওরির/আউটকামের। এইসমস্ত কাহিনির ঘটনাক্রমই পাঠকের কাছে উপভোগ্য। এইসব কাহিনির বিজ্ঞানের অংশগুলি অনেকক্ষেত্রেই বাস্তব বিজ্ঞানের পরিপূরক নয়। তাই এগুলি রুপকথা বা ছেলেভুলানোর আওতায়। ৩) গাঁজা এফেক্ট কল্পবিজ্ঞান : এগুলির প্লটে বৈজ্ঞানিক এলিমেন্ট কৃত বুদ্ধিদীপ্ততা কিংবা ঘটনাক্রমের উপভোগ্যতা, কোনটাই নেই। এগুলিতে মোটামুটি ক্লাস সেভেন থেকে নাইনের পরিবেশ পরিচিতি কিংবা ভৌতবিজ্ঞান বই থেকে তোলা তথ্যগুলিকে ঘুরিয়েপেঁচিয়ে নীতিশিক্ষা কিংবা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি লেখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। না হয় এগুলি সুখপাঠ্য, না হয় মনে দাগ কাটার মতোন।
বিগত কিছু সময়ে কিশোরপাঠ্য শারদীয়ার পাতা থেকে উঠে আসা খুব কম কাহিনিই ১-এর আওতায় পড়ে। বর্তমানে এরকম কিছু কাজ একটু একটু করে বাস্তবায়িত হলেও, একটু পিছিয়ে গেলেই ২ এবং ৩ গোত্রভুক্ত কাহিনিই বেশি।
আলোচ্য উপন্যাসটি প্রথমে পড়তে পড়তে ৩ নং-এর হবে বলেই মনে হচ্ছিল। সেই থোড়বড়িখাড়া ভবিষ্যতের দুনিয়া। উড়ন্ত গাড়ি, দুরন্ত রোবট ইত্যাদি। কিন্তু গল্প যত এগিয়েছে প্লটের মধ্যে ততই একটি সুচিন্তিত কাহিনির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়ন কীভাবে তার মহীদাদুর থেকে এমন এক জিনিসের অ্যান্টিডোট পেয়ে তা দুনিয়া বদলানোর কাজে ব্যবহার করল তা নিয়েই কাহিনির বিস্তার। টিপিক্যাল হ্যাপি এন্ডিং পড়তে বেশ আরামদায়ক।
সমগ্র কাহিনিটিকে লজিকের চুলচেরা বিশ্লেষণের আওতায় ফেললে অনেক জায়গাতেই মনে হতে পারে এখানে এরকম কেন হল? ওখানে সিসি-ক্যামেরা কেন বসানো নেই? সেখানে কেন ওই সময় উপরওয়ালারা সতর্ক হল না। কিন্তু ভাবতে বসলে এটাও দেখা যাবে যে এটিকে ২-এর আওতাভুক্ত করে লেখার কথাই ভাবা হয়েছে প্রথম থেকে, তাই এরকম। এটিকে চেষ্টাচরিত্র করে সিরিয়াস মেজাজের প্লট সৃষ্টির জন্য আরও অনেক খেলিয়ে আরও অনেক যোগ বিয়োগের মাধ্যমে ১-এর আওতাভুক্ত করাও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু শারদীয়া উপন্যাসের সীমাবদ্ধতায় তা করা অনেকটাই অসম্ভব।
তাই যেটুকু যেভাবে আছে সেটুকু উপভোগ্য। বিজ্ঞান শিক্ষকের পরীক্ষার খাতা চেক করতে বসার কঠিন মনোভাব সরিয়ে রেখে হালকা মেজাজের কিশোর-কাহিনি হিসেবে পড়তে পারলে খুবই সুন্দর একটি কাহিনি। আমি পড়েছি ১৪২৫ শারদীয়া আনন্দমেলা থেকে, তবে এটি বর্তমানে একক বই হিসেবেও প্রকাশিত।