ময়মনসিংহের বিখ্যাত জমিদার সূর্যকান্ত আচার্যের শিকার কাহিনী এই বই। লেখক অত্যন্ত সরস ভঙ্গীতে তার অভিজ্ঞতা এই বইয়ে বর্ণনা করেছেন। বইটির প্রকাশ ১৩১৩ বঙ্গাব্দ। ১০০ বছরেরও আগের ময়মনসিংহ অঞ্চলের অরণ্যে শিকারের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই বই, যে অরণ্য এখন কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে সেই সময়ের মতোই।
সূর্যকান্ত আচার্য নামে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার একজন জমিদার ছিলেন জানতাম এবং তিনি যে বেশ বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন এটাও জানতাম, তিনি যে একটা আস্ত শিকার কাহিনী লিখেছিলেন সে সম্পর্কে কোন ধারণা ছিলো না। জমিদারশ্রেণী ছিলো স্বভাবতই বিলাসপ্রিয়, বিনোদনের নানা উপকরন তারা খুঁজে বেড়াতেন। শিকারও এককালে বিনোদনের একটা মাধ্যম ছিলো।সূর্যকান্ত আচার্য ও এই শখের একজন শৌখিন ছিলেন। সূর্যকান্ত রীতিমতো শিক্ষিত লোক ছিলেন। তার সাহিত্য প্রতিভাও যে যথেষ্ট ছিলো তা তার এই বই পড়লেই বোঝা যায়। এই শিকার কাহিনী মূলত তার প্রথম যৌবনের শিকার কাহিনী, যখন প্রকৃতপক্ষে তিনি ভালো করে বন্দুক ধরাই পারতেন না, আনাড়ির মতো বন্দুক ছুড়তেন, সে সময়েও অনেকবার তিনি গিয়েছিলেন শিকার করতে। পরবর্তীতে তিনি বিস্তর শিকার করেছেন এবং বাঘুয়া রাজা নামেও নাকি খ্যাত হয়েছিলেন তবে সেসব শিকার কাহিনী এই বইয়ে নেই। এই বইয়ের সব শিকার কাহিনীই তার জমিদারির আশেপাশের বন জঙ্গলে এবং মূলত মধুপুরের জঙ্গলে করা শিকার কাহিনী। বইয়ের প্রকাশকাল ১৩১৩ মানে একশ বছরেরও আগে, সূর্যকান্ত লিখেছেন তারও অনেক আগের কথা মানে ঊনবিংশ শতকের কথা। সেসময়ের মধুপুরের জঙ্গলে হরিণ ছিলো প্রচুর, গাউজ, চিতা, নেকড়ে এমনকি বড় বাঘ, বুনো মহিষ পর্যন্ত ছিলো। যদিও আনাড়ি ছিলেন তবু বেশ কিছু শিকার করার সৌভাগ্য তার হয়েছিলো, ব্যর্থতাও ছিলো প্রচুর। অন্যকে নিয়ে যেমন ঠাট্টা করেছেন, তেমনি করেছেন নিজেকে নিয়েও। আর এটাকে স্রেফ শিকার কাহিনী বলা যায় না, আত্মজীবনী, ভ্রমণকাহিনী, প্রবন্ধ সব কিছুরই মিশেল যেন এটা। তাছাড়া স্থানে স্থানে কবিতা, রূপকথা,কাব্যমিশ্রিত ভাষা, বিশ্লেষণী চিন্তাও আছে এই লেখায়। সাহিত্যমানের বিচারে বেশ উঁচু দরের মনে হয়েছে আমার লেখাটি। তাছাড়া মধুপুরের জঙ্গলের শতাব্দী প্রাচীন রূপ জানার সুযোগও তো হলো, যা আজকের মধুপুরের গড়ে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
জিম করবেটের শিকার কাহিনী পড়তে পড়তে ভাবতাম আমাদের দেশীয় কোন শিকারির এরম কাহিনী পড়তে পারলে মন্দ হতো না। মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্যের "শিকার কাহিনী" বইটা পড়ার জন্য তাই অনেক আগ্রহ ছিলো।
সেই ১০০ বছর আগে মধুপুর গড় নিবিড় ঘন বন ছিলো এবং এই বন-জঙ্গলে নানা প্রজাতির পাখি, হাঁসের সাথে সাথে বিভিন্ন জাতের হরিণ, বাঘ, নেকড়ে, বরাহ আর বুনো মোষও একসময় রাজত্ব করতো বিশ্বাস হচ্ছিলো না। সময়ের পরিক্রমায় তা আজ বিলুপ্ত।
বইটা মূলত জমিদার মশায়ের শিক্ষানবিশ শিকারি কালের স্মৃতিচারণ। সম্ভবত সে কারণেই স্মৃতিচারণের পাশাপাশি মানুষের স্বভাব, জীবন নিয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারার প্রকাশ পেয়েছে। সবচেয়ে চমৎকৃত হতে হয় প্রকৃতি নিয়ে তাঁর কাব্যিক সরস বর্ণনায়। প্রকৃতি আর সৌন্দর্য প্রেমীর বয়ানে তাই কাহিনী পড়ে যেতে থামতে ইচ্ছে হয়নি। সেই সাথে তৎকালীন সমাজেরও কিছু ধারণা পাওয়া যাচ্ছিলো।
অনেক আগের বনেদি বাংলায় লেখা বলে পড়ার গতি অনেক স্লো ছিলো আমার। কয়েকবার করে পড়তে হয়েছে বুঝার জন্য। তবে হ্যাঁ শিকার কাহিনীও যে এরকম সাহিত্যিক ভাষায়ও বর্ণনা করা যায় এই বই না পড়লে বুঝতাম না।
অসাধারণ একটি বই । তৎকালীন একজন জমিদার মহারাজা যে এমন বই লিখেছেন খুব অবাক করার মত। এই বই টি মধুপুর বনাঞ্চলের একটি দলিল । এই বনে বাঘ, ভাল্লুক , হরিণ এবং ময়ূর পাওয়া যেত বিষয়টি জানতাম, কিন্তু এমন জীবন্ত বর্ণনা সত্যই অবাক করেছে আমাকে। মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য একজন উঁচু মানের লেখক এবং বই এর কিছু অংশে তাঁকে দার্শনিক ও মনে হয়েছে ।