বছরের প্রথম বই। মাত্র চল্লিশ পাতার। উপন্যাসিকাও বলা ঠিক হবে না, বড় গল্প বলা যেতে পারে।
তবে আহমেদ ছফা বলে কথা - এই অল্প পরিসরেও কাঁপিয়ে দিয়েছেন। কাহিনীর গতি আছে, লেখনীতে ছন্দ আছে, আবেগের উত্থান আর পতন আছে।
দৃশ্যপট আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সময়, তবে শুরুটা আরো এক দশক আগে। মামলাবাজ বাবা, ঘুণে ধরা আইন আর সমাজ ব্যবস্থা, আর তার মাঝে নিষ্পৃহ এক যুবকের গল্প। নায়িকা হিসেবে আসে এক হার না মানা নারী। তার বোবা কণ্ঠে ফুটে কি উঠবে বাংলাদেশের নাম?
'আমার ধারণা হল আমি বোবা মেয়ে বিয়ে করেছি এবং তার কর্তা বলেই আমাকে এসব কথা শুনিয়ে শুনিয়ে বলে। তখন থেকেই আমি নৃপেন কে ঘৃণা করতে আরম্ভ করলাম, মনে করতে লাগলাম, নৃপেন একটা বাজারের খানকি বিয়ে করেছে। একমাত্র খানকিরাই অত বেশি হাসে, কথা বলে এবং ভঙ্গি করে। প্রতিশোধ নেবার তীব্র ইচ্ছে মনের ভেতর ফণা করে জেগে উঠত। কিন্তু আমার ইচ্ছে অনিচ্ছের কতটুকু দাম! প্রেম কিংবা ঘৃণার পক্ষে বিপক্ষে কিছু করার ক্ষমতা আমার ছিল না। '
বাবা-মায়ের ভিটেমাটি রক্ষার্থে একপ্রকার নিরুপায় হয়ে লেখক মোক্তার সাহেবের বোবা মেয়ে বিয়ে করেন। লেখকের বউ বোবা এতে তার প্রতি যে যথেষ্ঠ ঘৃণা রয়েছে তা কিন্তু নয়। তবে তারও ইচ্ছে হতো কিন্নরকণ্ঠের কোনো নারীর সঙ্গ লাভ, যার ভালোবাসা তাকে নিংড়ে দিবে। যার কণ্ঠের বাণী শ্রবণে হৃদয়খানি শীতল হয়ে যাবে।
'একরাতে বোবা স্ত্রীকে হারমোনিয়ামে গান গাওয়ার অক্লান্ত চেষ্টা করা দেখে লেখকের মায়া হয় স্ত্রীর প্রতি। ঊনসত্তরে আসাদের মৃত্যুর পর বাড়ির সামনে দিয়ে মিছিল চলে যাবার সময়, 'আচানক বোবা বউ জানালাসমান লাফিয়ে 'বাংলা' অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করল। তার মুখ দিয়ে গলগল রক্ত বেরিয়ে আসে। তারপর মেঝেয় সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে থাকে। ভেতরে কী একটা বোধ হয় ছিড়ে গেছে। আমি মেঝের ছোপ ছোপ টাটকা লালরক্তের দিকে তাকাই, অচেতন বউটির দিকে তাকাই। মন ফুড়েঁই একটা প্রশ্ন জাগে __কোন রক্ত বেশি লাল। শহীদ আসাদের __না আমার বোবা বউয়ের?'
উপন্যাসটি মূলত ৬৯-এর গণ–অভ্যুত্থানের সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত। মেদহীন ঝরঝরে বাক্যে সহজবোধ্য ভাষায় মাত্র ৩৮ পেজে 'ওঙ্কার' রুপক উপন্যাসটি রচিত হয়েছে।
হিন্দু-পুরাণ মতে, 'ওঙ্কার' শব্দের মানে হলো 'আদি ধ্বনি' বা সকল ধ্বনির মূল।
সামান্য ৩৮ পেজের উপন্যাসের মাহাত্ম্য যে কতটা সামান্য দুটি লাইন অনুধাবন করলেই বোঝা যায়,
"গোটা বাংলাদেশের এক প্রসব বেদনা ফড়িয়ে পড়েছে। মানুষের বুকফাটা চিৎকারে ধ্বনিত হচ্ছে নবজন্মের আকুতি।"
বাংলা সাহিত্যে খুব স্বল্প পরিমাণে মেটাফোর রচিত হয়েছে। তার সিংহভাগ আবার কবিতায়। কিন্তু মেটাফরিকাল সফল উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে খুব কম রচিত হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যে রূপকধর্মী উপন্যাস রয়েছে অঢেল। বাংলা সাহিত্যে শওকত ওসমানের 'কৃতদাসের হাসি' ও অন্যান্য উপন্যাস রচিত হয়েছে রুপক অর্থে।
'ওঙ্কার' উপন্যাস লেখার পেছনে লেখকের ব্যাক্তিগত জীবনে দারুণ একটা ঘটনা রয়েছে।
এই ঘটনার কথা হুমায়ূন আহমেদ বয়ান করেছেন। তাঁরা আনিস সাবেতের বোনের বিয়েতে কুমিল্লা গিয়েছিলেন। সেখানে আনিস সাবেত ছফা’র কোন একটি লেখার সমালোচনা করলে তিনি ভীষণ রকম খেপে যান। আনিস সাবেত তাঁর মতে অটল থাকার কারণে ছফা ঢাকার উদ্দেশ্যে রাতের বেলা ওঁদের ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। তখন রাত এত গড়িয়েছিল যে রাস্তায় কোন গাড়ি ছিল না। ফলে ছফা কাকা কুমিল্লা থেকে হেঁটে ঢাকা চলে এসেছিলেন। তাতে ছফা পা ফুলে গিয়েছিল। তাঁর জ্বর এসে গিয়েছিল। বেশকিছু দিন পর ভয়ে ভয়ে আনিস সাবেত ছফা কাকার কাছে ক্ষমা চাইতে গেলে তিনি বলেছিলেন, সারা রাস্তা হেঁটে আসার কারণে তাঁর মাথায় একটি উপন্যাসের ধারণা মাথায় এসে গিয়েছে। রাগ করে না এলে এ ধারণাটা আসত না। হুমায়ূন আহমেদের কথায় যে উপন্যাসের গল্পটি তাঁর মাথায় এসেছিল তার নাম ‘ওঙ্কার’।
আমার পড়া আহমদ ছফার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস 'ওঙ্কার'।
২০২৫ রিভিউ বিষয়ঃ বই রিভিউ ০২ বইয়ের নামঃ ওংকার লেখকঃ আহমদ ছফা
গল্পকথক পরিবারের দুর্দশার প্রেক্ষিতে বাড়ির মোক্তারের বোবা মেয়েকে বিয়ে করতে রাজী হয়। কথা বলতে পারে না, কিন্তু অসহায় মেয়ের কী আফসোস! ননদের দেখে গলা সাধার আপ্রাণ চেষ্টা। গল্পকথকের আফসোস স্ত্রী কেন কথা বলে। অফিসের কর্মচারীর গল্পে হিংসা হয় তার। সময়কাল উত্তাল, মুক্তিযুদ্ধের কিছু বছর আগের সময়। বোবা স্ত্রী মিছিলের ঘ্রাণ পায়, কানে শোনেনা, কিন্তু মিছিলের আভাস সে পায়। একদিন সেই ডামাডলে নিহত হয় আসাদ। এরপর, গল্পকথকও যেন মিছিলের আভাস পায়। বোবা স্ত্রীর মুখে একদিন একটা শব্দ ফুটে ওঠে। কী সে?
গল্প থেকে নাটক আছে, সেটা ছোটবেলায় দেখা। গল্পের শেষদিকে এসে মনে পড়ল তার কথা। যারা জানবে না এই বইটার শুরু থেকে কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না, গল্প কোনদিকে যাচ্ছে। সাস্পেন্স আমিও ভাঙবো না। দু- তিন জায়গাতে ভাষা একটু গোলমাল লেগেছে এছাড়া গল্পটা মনে নতুন করে নাড়া দিয়ে গেল। ছোট্ট বই, গভীরতা অনেক।
গল্পটি অসাধারণ। কিন্তু বর্ণনার ভাষা খুব পছন্দ হল না। লেখক গল্পের নায়কের মুখ দিয়ে গল্প বলাচ্ছেন। কিন্তু তার সাথে সাথে জায়গাগুলোতে পৌঁছনো যাচ্ছে না। একটা পরিষ্কার ছবি ভেসে উঠছে না।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রিক বই বিবেচনায় ওংকার এক অসামান্য দলিল। আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে এক কিশোরী মেয়ের কন্ঠস্বরে যে বাংলা ভাষার উচ্চারণ তিনি অকপটে এঁকেছেন তার গভীরতা ব্যপ্তি সময়কে অতিক্রম করে নির্দিধায়। বাংলাদেশের ইতিহাস অধ্যয়নের সম্মিলনে এই ছোট উপন্যাসের আবেদন কোনকালেও কোন অংশে কমবে নাহ। ভাষা আন্দোলন এর প্রেক্ষাপটে লেখা তথা সাহিত্যে মননের উৎকর্ষ এই উপন্যাস পড়তে পড়তে সেই ১৯৫২ সালের দিনটাকেই স্মরণ করলাম আরও একটাবার নিমিষেই।
বরাবরের মতোই সেরা।তুলনাহীন।মন্ত্রমুগ্ধকর,নেশাজাগানিয়া।অনেক ছোট একটি বই হলেও বইয়ের প্রতিটি বাক্য যেন টেনে ধরে রাখে বহুক্ষণ। বোবার দেশপ্রেমের আখ্যান রচনা করে গেছেন জনাব ছফা।সেরা!!!!