"হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন— শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।" গানে হোক বা কবিতার আকারে, এই কথাগুলো আমরা বলে আসছি একেবারে শৈশবকাল থেকেই। মাথায় বসে যাচ্ছে অনেকগুলো আপাত অচেনা, পরে ইতিহাসে বারবার দেখা ও শেখা শব্দ। তারপর ইতিহাস বই থেকে শিখছি, আর্য মানে ককেশীয় বহিরাগতের দল, যারা ভারতের বন্য অনার্যদের মেরে, তাড়িয়ে, পরাস্ত করে, সর্বোপরি 'সভ্য' করে এ-দেশের সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল। অনেক পরে বুঝেছি, কথাগুলো সর্বৈব মিথ্যা। আর্য জাতি বলে কিছু হয় না। ঠিক সেভাবেই জাতিগতভাবে অনার্য বলে কিছু হওয়া সম্ভবই নয়। বরং ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো দুটো প্রশ্নর উত্তর ইতিহাস বইয়ে পাওয়াই যায় না। সেগুলো কী বলুন তো? (ক) ভারতীয় সংস্কৃতি বলতে আমরা যা-যা বুঝি তার সূচনা ও বিস্তার ঘটল কীভাবে? (খ) এই উপমহাদেশের প্রাচীনতম তথা বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো সভ্যতাগুলোর অন্যতম বলে যাকে জানি, সেই সিন্ধু-সভ্যতার শেষ অবধি কী হয়েছিল? দুটো প্রশ্নের উত্তর যে একই, সেটা আমি প্রথম বুঝি মাইকেল ড্যানিনো'র যুগান্তকারী বই "The Lost River: On the Trail of the Sarasvati" পড়ে। সে-বই থেকে জানা যায়, কীভাবে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতাই বিবর্তিত হয়েছিল আর্য সংস্কৃতির চেহারায়— যার চিহ্ন রয়ে গেছে কিংবদন্তি আর পুরাণে। অবধারিতভাবেই ভাবতে শুরু করেছিলাম, বাংলায় কি এমন কোনো বই আছে, যা ভৌগোলিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং জিনগত তথ্যের সাহায্যে এই আর্য-অনার্য বিভাজনের প্রকাণ্ড মিথ্যেটা প্রমাণ করে দিতে পারে? জানতে পারলাম, তেমন বই আছে। সেটি প্রশ্নাতীতভাবে যুক্তি, তর্ক ও তথ্যের সাহায্যে আর্য-অনার্য নামক বিভাজনকে মিথ্যা বলে সাব্যস্ত করেছে। তারই সঙ্গে সেটি নতুন করে দেখিয়েছে, কীভাবে পুরাণের মধ্যে রূপকের আকারে লুকোনো রয়েছে ইতিহাস। অথচ সে-বইটির কথা জানেন এমন মানুষের সংখ্যা ভীষণ কম। অতঃপর বইটি ক্রয়, পাঠ এবং একেবারে স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া! সেটিরই রিভিউ করছি এখন।
ঠিক কী-কী আছে এই বইয়ে? একটি সংক্ষিপ্ত 'ভূমিকা' এবং ডক্টর ইন্দ্রজিৎ সরকারের 'প্রস্তাবনা'-র পর এতে এসেছে নিম্নলিখিত ক'টি অধ্যায়~ প্রথম খণ্ড: আর্য সভ্যতার কাহিনি ১. আর্য আক্রমণ তত্ত্ব এবং দেড়শো বছরের এক ঐতিহাসিক ধাপ্পা; ২. তাহলে আর্য কারা? ৩. বৈদিক সাহিত্য, ঋক্বেদ এবং ভারতবর্ষ ৪. মহাভারতের কালনির্ণয় ৫. বৈদিক সাহিত্য ও পৌরাণিক বংশাবলী ৬. আর্য জনজাতির বিস্তার ৭. আর্য জনজাতির পরবর্তী বিস্তার ৮. অসুর জাতির কথা ৯. স্বর্গ ও মর্ত্যের নানান কথা দ্বিতীয় খণ্ড: আর্য সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতা— তুলনামূলক আলোচনা ১) সরস্বতী নদী ২) ধর্মীয় আলোচনা ৩) অশ্ব ও রথের কথা ৪) নগর ও গ্রামীণ সভ্যতা ৫) নৃতাত্ত্বিক আলোচনা ৬) কৃষিকার্য ৭) সেচ ব্যবস্থা ৮) মৃত সৎকার পদ্ধতি ৯) ভাষা ও লিপি ১০) সিন্ধুলিপি ও তার পাঠোদ্ধার ১১) উপসংহার এই বিষয়ে যাঁরা লেখালেখি করেছেন তাঁদের অতি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়ে বইটা শেষ হয়েছে।
এ-বইটা আমার মনোজগতে প্রায় ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছিল— এ-কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে পাথুরে প্রমাণ, আর সরস্বতী নদীকে নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে ভৌগোলিক আলোচনা সম্বন্ধে আমি কিছুটা ওয়াকিবহাল ছিলাম। কিন্ত পুরাণ ও বেদের বিশ্লেষণ করে তার মধ্যেই ভারতেতিহাসের জটিলতম ওই দুটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার পদ্ধতি ও প্রকরণটি আমার অভিনব, দুঃসাহসিক, অথচ যৌক্তিক বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এ-বইয়ের দুটো প্রকাণ্ড সমস্যা ছিল। প্রথমত, বইটার প্রচ্ছদ ছিল অত্যন্ত বোরিং। সৌভাগ্যক্রমে, খড়ি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এটির নবকলেবর-এর প্রচ্ছদটি রুচিশীল ও যথাযথ। দ্বিতীয়ত, লেখক সর্বসাধারণের কাছে বইটিকে জনপ্রিয় করে তোলার মতো করে লেখেননি। তিনি একেবারে রিসার্চ পেপার লেখার মতো করে এতে ছবি, স্কেচ, পরিসংখ্যান, মানচিত্র, ফটো— সবকিছু দিয়েছেন। ফলে বইটা পড়া রীতিমতো কঠিন কাজ হয়ে গেছে। কিন্তু এই কঠিন আকার ও বিন্যাসের মধ্য দিয়ে শেষ অবধি যেতে পারলে এই বই এমন কিছু কথা আমাদের সামনে তুলে ধরে, যা ইতিহাস ও পুরাণের পাঠকে একেবারে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। লেখক তার মধ্য থেকে যে-সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে আপনি একমত হতে পারেন বা না-পারেন। কিন্তু ভারততীর্থের এই মহামানবের সাগরতীরে যে কালসমুদ্র ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে, আবার পিছিয়ে যাচ্ছে— তার কল্লোল আপনার প্রাণকে স্পর্শ করবেই। যদি আপনি এ-দেশের সত্যিকারের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হন, তাহলে এই বইটি আমি আপনাকে অতি অবশ্যই পড়তে বলব।